somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শাহ সাহেবের ডায়রি ।। শান্তিনিকেতন এখন ইউনেস্কো হেরিটেজের আওতায়

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৩ রাত ১০:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



স্বীকৃতি মিললে তার চাপও থাকে। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যক্ষেত্র (ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট) হিসাবে ঘোষিত হওয়ার পর, বেশ কিছু বিধিনিষেধ বা নিয়মকানুনের চাপে পড়তে হল শান্তিনিকেতনকেও। শান্তিনিকেতন বললে একটা বিস্তৃত পরিসর বোঝায়। যা মূল শিক্ষাঙ্গন ছাড়িয়েও চার পাশে অনেকটা ছড়িয়ে। ইউনেস্কোর স্বীকৃতির পরিসর সেই বিরাট শান্তিনিকেতনের কিছু নির্দিষ্ট অংশ।

কী কী পড়ছে সেই ঐতিহ্যক্ষেত্রে? ইউনেস্কো যে এলাকা ঠিক করে দিয়েছে তার মধ্যে রয়েছে আশ্রম ভবন, কলা ভবন, সঙ্গীত ভবন, উত্তরায়ণ। উত্তরায়ণের মধ্যেই রয়েছে রবীন্দ্রনাথের বাসগৃহ উদয়ন, উদীচী, শ্যামলী, পুনশ্চ, কোনার্ক। এ ছাড়াও উপাসনা গৃহ, ছাতিমতলা সবই ঐতিহ্যের তালিকায়। মুক্ত বিদ্যালয় বসে যে সব জায়গায়, তা-ও এই ক্ষেত্রের মধ্যেই পড়ছে।

শান্তিনিকেতনের এই স্বীকৃতি পাওয়ার নেপথ্যে রয়েছে বহু কালের লড়াই। বহু চেষ্টা। বহু মানুষের উদ্যোগ। তাঁদের মধ্যেই এক জন সংরক্ষণ-স্থপতি মণীশ চক্রবর্তী। কী কী নিয়ম মেনে চলতে হবে শান্তিনিকেতনকে, আনন্দবাজার অনলাইনকে তা জানালেন মণীশ। তাঁর কথায়, ‘‘শান্তিনিকেতনের ঐতিহ্য যেমন ছুঁয়ে দেখার, তেমন অনুভবেরও। সেখানে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা ও দর্শন যেমন ছড়িয়ে রয়েছে, তেমনই তাঁর নিজের এবং সহযোগীদের সৃষ্টি রয়েছে। সেটা যেমন কোনও ভবন, তেমনই ভবনের অন্দরসজ্জাও। আবার যে সব গাছ, বাগান, জলাশয় রয়েছে সেগুলিও ঐতিহ্যের মধ্যে। সবটাই যেমন ছিল, যেমন রয়েছে, তেমন ভাবেই সংরক্ষণ করতে হবে। কোনও বদল আনা যাবে না।’’ মণীশ আরও জানান, ‘‘একবিংশ শতাব্দীর স্থাপত্য রয়েছে এই সব ভবনে। যেখানে জাপান, চিন, বর্মার মতো দেশের স্থাপত্যের চর্চা হয়েছে। আবার শান্তিনিকেতনের ইট-কাঠ-পাথরে অথবা গাছের প্রতিটি পাতায় জড়িয়ে রয়েছে কবিগুরুর দর্শন। আমরা এগুলিই ইউনেস্কোকে জানিয়েছিলাম। এখন বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হয়ে গেল এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখা।’’ মণীশ জানিয়েছেন, মৌলিক কাঠামো (অথেন্টিসিটি) বজায় রেখে এ সবের সংরক্ষণ করতে হবে। জানলা, দরজা কিছু মেরামত করতে হলে তাতে কোনও বদল আনা যাবে না। নকশার তো নয়ই, যা দিয়ে তৈরি তাতেও বদল নয়। কোনও গাছ বদলে দেওয়া যাবে না। এমনকি কোনও অনুষ্ঠানে কেমন ভাবে আলপনা দেওয়া হবে, কেমন করে শঙ্খ বাজানো হবে, তাতেও শান্তিনিকেতনের বিশুদ্ধতা (ইন্টিগ্রিটি) মেনে চলতে হবে। এই এলাকায় কোনও নতুন নির্মাণও চলবে না।





মূল এলাকার বাইরের যে অংশ, অর্থাৎ বিশ্বভারতীর অধীনস্থ বাকি এলাকায় কিছু ছাড় রয়েছে। এই এলাকায় মূলত রয়েছে খেলার মাঠ, পড়ুয়াদের হোস্টেল। সেখানে আগামী দিনে প্রয়োজনে নির্মাণ করা যেতে পারে। তবে কেমন হবে সেই নির্মাণ, তা-ও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এর জন্য নতুন কমিটি তৈরি করতে হতে পারে বিশ্বভারতীকে। যা খুশি করা যাবে না। প্রয়োজনীয় উন্নয়ন করতে হবে ঐতিহ্য মেনে। ঐতিহ্যশালী স্থাপত্যের কোনও ক্ষতি হয়, এলাকাকে এমন দূষণ থেকে দূরে রাখার ব্যাপারেও খেয়াল রাখতে হবে। এর জন্য যানবাহন নিয়ন্ত্রণের কথাও বলে দিয়েছে ইউনেস্কো।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৪০ সালের ১৯ ফেব্রিয়ারি গান্ধীজিকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। ‘মহাত্মাজি’ সম্বোধন করে শান্তিনিকেতনকে রক্ষার আর্জি জানিয়েছিলেন। চেয়েছিলেন, তাঁর গোটা জীবনের আহরণ, সঞ্চয় যেন সুরক্ষা পায়। গান্ধীজি পত্রপাঠ জবাবে ‘গুরুদেব’কে জানিয়েছিলেন, বিশ্বভারতী শুধু জাতীয় নয়, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। কথা দিয়েছিলেন তাঁর সামর্থ মতো চেষ্টা করার।

১৯৪০ সালের সেই পত্রালাপের কথা ২০২৩ সালে দাঁড়িয়ে মনে করাচ্ছেন শান্তিনিকেতনকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকার অন্তর্ভূক্ত করার লড়াইয়ের সৈনিকেরা। বলছেন, এ বার স্থায়ী সংরক্ষণের সুবিধা মিলবে। রবিবারই মিলেছে সুখবর। সৌদি আরবের রিয়াধে বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির সভায় শান্তিনিকেতনের স্বীকৃতি ঘোষণা হয়েছে। এখন থেকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যক্ষেত্র হিসাবে স্বীকৃত বাংলার শান্তিনিকেতন।

শান্তিনিকেতনের বিশ্ব ঐতিহ্যের তকমা পাওয়ার লড়াই কম দীর্ঘ নয়। প্রায় দু’দশক ধরে চলেছে আবেদন, নিবেদন। চলেছে আইন-আদালতও। বড় আকারে যুদ্ধটা শুরু হয় ২০১০ সালে। সেটাও শেষে ভেস্তে যায়। ২০২১ সালে নতুন করে যে উদ্যোগ, তাতেই এল সাফল্য। একটা সময়ে চাওয়া হয়েছিল গোটা শান্তিনিকেতন শহরই আসুক ঐতিহ্যের তালিকায়। তবে তা হয়নি। এ বার ইউনেস্কো চিহ্নিত করে দিয়েছে কোন এলাকাকে হেরিটেজ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে আশ্রম এলাকা, উত্তরায়ণ, কলা ভবন এবং সঙ্গীত ভবন। এখানে রয়েছে ৩৬ হেক্টর জমি (নমিনেটেড প্রপার্টি)। এর বাইরেও একটা বর্ধিত অংশ (বাফার জোন) রয়েছে। ইউনেস্কো জানিয়েছে, সবটা মিলিয়ে ৫৩৭.৭৩ একর এলাকাই বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভূক্ত।

কিসের ভিতিতে ইউনেস্কোর কাছে স্বীকৃতি দাবি করা হয়েছিল? আভা নারায়ণ বলেন, “শান্তিনিকেতনে যে স্থাপত্য তা উপনিবেশ ধাঁচের নকল নয়। প্রাচ্যের আধুনিকতার হাত ধরেই রবীন্দ্রনাথ সারস্বত সমাজ ও সংস্কৃতি জগৎকে মিলিয়েছিলেন। আবেদনে এই বিষয়টিতে জোর দেওয়া হয়েছিল।” তিনি আরও জানান, শান্তিনিকেতনের বিভিন্ন ভবনে যে স্থাপত্য, চিত্রকলা, গৃহসজ্জা রয়েছে তার সঙ্গে মিলে রয়েছে কবির ভাবনা ও দর্শন। সেই সঙ্গে গোটা এলাকার প্রাকৃতিক বিন্যাসকেও ঐতিহ্য স্মারক হিসাবে আবেদন করা হয়েছিল। সবটাই ইউনেস্কোর শর্ত পূরণ করছে।’’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘অন্য পাঁচটা ঐতিহ্য স্মারক ও শান্তিনিকেতনের মধ্যে অনেক ফারাক রয়েছে। এটি একটি সচল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ফলে এখানে ঐতিহ্য বজায় রাখার চ্যালেঞ্জও বেশি। এখন বিশ্বভারতীর বাসিন্দা থেকে শান্তিনিকেতনের পড়ুয়া সকলেরই দায়িত্ব অনেক বেড়ে গেল।’’




পিনাকপাণি ঘোষ। বিশ্বভারতী / আনন্দবাজার
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৩ রাত ১০:২২
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিয়োগের রূপকথা

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৩



মা বরাবরই পাতে ভাত কম নিতো , বলতো- ভাতে না-কি  বাত বাড়ে।
বিশেষ বিশেষ দিনে বাড়ি পোষা মোরগের ঝোল কিংবা রুই মাছের তরকারীর সবটুকু  আমাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

দৃষ্টিকটু পোশাক ও দৃষ্টিকটু আচরণ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪



আপডেট - হাফপেন্ট আন্দোলন: ৩০/০৯/২০২৬
হাফপেন্ট পরে মেট্রো ট্রেন ও বাসে চলাচল বাংলাদেশের একটি নাগরিক চাহিদা হতে পারে। যেহেতু সমস্যা মেট্রোতে হয়েছে, আমি ধারণা করেছি বাংলাদেশে ফেসবুকে “হাফপেন্ট আন্দোলন” হওয়ার সম্ভবনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কঠিনতম সব চ্যালেঞ্জের মুখে বিএনপির ভবিষ্যৎ কি অন্ধকার??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১০



বিএনপির সামনে অনেক কঠিন সব চ্যালেঞ্জ...

তাদের মোকাবেলা করতে হচ্ছে দ্বিমুখী বিরোধী-দলীয় রাজনীতি বা কর্মকাণ্ড (যেটা কিনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আগে কখনো দেখা যায়নি)।

জামাত-এনসিপি যতই লীগের ফিরে আসার বিরুদ্ধে বিএনপির... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার নানা মরহুম শাহাবুদদীন মাহমুদ জায়গীরদার

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:২৫



আমার আম্মার সেঝ চাচা’র লেখা ‘My life is not mine’ বইটি পড়ছি। বইটিতে ‘মাইজম ভাই’ নামের একটি অধ্যায় আছে। এতে সেঝ নানা আমার নানার বিভিন্ন সত্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

মৃত্যু পেরিয়ে আবার ব্লগে------

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:০৬




প্রায় ০৩ মাস হয়ে গেলো ব্লগে আসনা হয় না, আসা হয়না মানে লিখা হয়না। প্রিয়জনের মৃত্যু শোক কাটিয়ে ব্লগে উকি দেওয়া হয় কিন্তু পোস্ট দেওয়া হয় না।


গত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×