
বাংলাদেশে পতিতাবৃত্তিকে উৎসাহিত করা না হলেও তা নিষিদ্ধ নয়। বিশ্বের যে কয়টি মুসলিম দেশে পতিতাবৃত্তি আইনত নিষিদ্ধ নয়, সেগুলোর একটি হলো বাংলাদেশ। ২০০০ সাল। বাংলাদেশের একটি আদালত যুগান্তকারী একটি রায় দেন। বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার সহায়তায় টানবাজার ও নিমতলী যৌনপল্লী'র ১০০-জন বারবণিতা'র করা একটি মামলায় হাইকোর্ট রায় দেন যে, বাংলাদেশে যৌনকর্ম বৈধ। রাষ্ট্র বনাম বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা (২০০০) মামলার এই রায়ে আরো বলা হয় যে জীবন ও জীবিকার স্বাধীনতা এবং আইনের সুরক্ষার সাংবিধানিক অধিকার যৌনকর্মীদের জন্যেও প্রযোজ্য এবং তাদের জীবিকার অধিকার হরণ করা বেআইনি। উচ্চ আদালত আরো বলেন যে, অনৈতিক কার্যক্রম দমন আইন ১৯৩৩ (যাকে পতিতা আইনও বলা হয়) এবং ১৮৬০-এর দন্ডবিধি অনুসারে যৌনপল্লি পরিচালনা ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌনকর্মে নিয়োগ নিষিদ্ধ হলেও পেশাদার যৌনকর্ম কোনো আইনেই নিষিদ্ধ নয়।
যৌনকর্মীদের আভিধানিকভাবে রূপোপজীবিনী, হট্টবিলাসিনী, দেহপসারিণী, নগরবধূ, বারাঙ্গনা, বারবধূ, বারবিলাসিনী, গণেরুকা, দেহোপজীবিনী, বেশ্যা, রক্ষিতা, খানকি, জারিণী, পুংশ্চলী, অতীত্বরী, গণিকা, কুলটা, বারবণিতা, কুম্ভদাসী, নটি, রূপজীবা ইত্যাদি নামে ডাকা হয়ে থাকে। UNAIDS-এর ২০১৬ সালের এক হিসেবে, বাংলাদেশে পতিতাদের সংখ্যা ১ লক্ষ ৪০ হাজার জন। এখানে লক্ষণীয় যে, যৌন কাজে থাকা এই মানুষদের চার ভাগের তিন ভাগের বয়স ১৩ থেকে ২৫ বছর।
এই হট্টবিলাসিনীরা কোথায় বসবাস করে? মাসে তাদের আয় কত? তারা কিভাবে এই পেশায় আসেন? গণিকাদের অধিকার সম্পর্কে বাংলাদেশের আইন কি বলে? এই শীতে তারা ভালো আছে তো? স্বভাবজাত কৌতূহল থেকেই এমন কিছু প্রশ্ন মাথায় আসলো।
বাংলাদেশে ঘোষনা দিয়ে পতিতাবৃত্তিতে আসতে হলে সরকারীভাবে নিবন্ধন করতে হয়। নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে প্রথম শ্রেণির একজন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে একটি হলফনামায় এই ঘোষনা দিতে হয় যে- তিনি অন্য কোন পেশা খুঁজে পেতে সমর্থ নন, এবং তার ভরণপোষণের অন্য কোন ব্যবস্থা কিংবা তাকে সাহায্য করার কেউ না থাকায় তিনি স্বেচ্ছায় এই জীবিকা বেছে নিয়েছেন। তাছাড়া এই পেশা নির্বাচনে কোন মহল তার ওপর কোন প্রভাব বিস্তার করেনি বা চাপ সৃষ্টি করা হয়নি বরং তিনি জোরজবরদস্তি ছাড়াই নিজস্ব পছন্দে যৌনকর্মকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এরপর সেই ব্যক্তি এই পেশায় সম্মতি জানালে তাকে একটি সনদপত্র দেওয়া হয়।
এই প্রক্রিয়া থেকে একটি ব্যাপার লক্ষনীয়। আর সেটা হচ্ছে- হলফনামায় ভোরন-পোষন ও চাকরী না থাকাতেই যে পতিতারা এই পেশাটি বেছে নিচ্ছেন তা উল্লেখ করতে হবে। তাহলে এই দুই সমস্যার সমাধান যদি হয়ে যায়, তাহলে, এই পেশা থেকে এই লক্ষাধিক নারী বেরিয়ে আসবেন কি? এই নিয়ে একটু গবেষনা হওয়া প্রয়োজন।

যদি আমাদের দেশের রূপোপজীবিনীরা রাজি থাকেন, সরকার কি করতে পারেন তাদেরকে পুনর্বাসন করার জন্যে? শুধু সরকার কেন, সমাজের ধনবান হিতৈষী ব্যক্তিরা এইক্ষেত্রে কি করতে পারেন? চটজলদি একটি হিসেব করে ফেলা যাক।
বাংলাদেশে একটি ৩ বেড রুমের একটি ফ্ল্যাট ১৫০০০ টাকায় ভাড়া পাওয়া যায়। এই ৩ রুমের ফ্ল্যাটে যদি ৬ জন থাকতে পারেন আর ৬- জনের একটি পরিবারের নূন্যতম সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বেঁচে থাকতে ২৫০০০ টাকা প্রয়োজন হয়। সেই হিসেবে, এই ১ লক্ষ ৪০ হাজার কুম্ভদাসিনীর প্রতি ৬ জনকে একটি গ্রুপে ভাগ করলে ২৩,৩৩৪টি পরিবার হয়। এই পরিবারগুলোর জন্যে মাসে যদি ৪০,০০০ টাকা খরচ করা হয়, তাহলে এক বছরে সরকারের খরচ হবে ১১২০,০৩,২০,০০০ বা প্রায় ১১২০ কোটি টাকা।
এখন সরকার ও সমাজ-হিতৈষীরা কি করতে পারেন এক্ষেত্রে? বাংলাদেশের একটি পত্রিকা কয়েক দিন আগে খবর প্রকাশ করেছে যে, বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের বিদেশী বায়াররা ৬০০% পর্যন্ত লাভ করে থাকেন। ঢাকা ট্রিবিউনের একটি রিপোর্টে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠান একটি কাপড়ের খুচরা মূল্য রাখছে ৩৪৭৫ টাকা যা বাংলাদেশ থেকে তাদের বানিয়ে নিতে খরচ পড়েছিলো মাত্র ২৭৩ টাকা! আরেকটি ফরাসী প্রতিষ্ঠান মেয়েদের দু'টি কাপড় বাংলাদেশ থেকে তৈরী করে নিয়েছিলো ২৯৪ এবং ৪২২ টাকায়। সেই দু'টি কাপড় ফ্রান্সে বিক্রি হয় যথাক্রমে ১৩৫৪ টাকা এবং ২০৭৪ টাকায়!
এক্ষেত্রে, বাংলাদেশের সরকার যদি পাব্লিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের আওতায় কয়েকটি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠা করে পূনর্বাসিত গণিকাদের চাকরী'র ব্যবস্থা করে দেয় এবং বিদেশে নিজস্ব আউটলেট তৈরী করে তাঁদের তৈরী পোশাকগুলো বিক্রির ব্যবস্থা করেন, তাহলে সহজেই এই অসম্মানজনক পেশা থেকে আমাদের নারীরা বেরিয়ে আসতে পারবেন। একই কথা খাটে যদি সরকার পাব্লিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে পূনর্বাসিত এইসব নারীদের দিয়ে পরিচালিত কয়েকটি ফার্মাসিউটিকেল কোম্পানী স্থাপন করতে পারেন। বাংলাদেশের ফার্মেসীগুলোতে মহিলা কর্মী নাই বলেই চলে। সেগুলোতেও কর্মসংস্থান হতে পারে এই নারীদের।
আর, এভাবেই হতে পারে সমাজের অবহেলিত এইসব নারীদের সমস্যার সমাধান।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জানুয়ারি, ২০২২ রাত ৮:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


