
'বেয়ারফুট ডক্টরস' বা 'খালি পায়ের ডাক্তার' -রা হলেন ১৯্৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে মাও সে তুং-এর আমলে চীনের গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় বিপ্লব আনা একদল আধা-প্রশিক্ষিত চিকিৎসাকর্মী। তাঁরা মূলত গ্রামীণ কৃষক, লোকজ কবিরাজ বা সদ্য হাইস্কুল পাস করা তরুণ-তরুণী ছিলেন, যাঁরা কৃষিকাজের পাশাপাশি গ্রামবাসীদের প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা দিতেন।
নামকরণের পটভূমি
চীনের দক্ষিণাঞ্চলের গ্রামীণ কৃষকেরা মূলত কাদামাখা ধানের জমিতে খালি পায়ে কাজ করতেন। এই কৃষকদের মধ্য থেকেই অনেককে প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। তাঁরা দিনে অর্ধেক সময় জমিতে খালি পায়ে চাষাবাদ করতেন এবং বাকি সময় গ্রামবাসীদের চিকিৎসা দিতেন। সাধারণ কৃষকদের মতো জীবনযাপন করার কারণে গ্রামীণ মানুষ ভালোবেসে তাঁদের "বেয়ারফুট ডক্টরস" বা খালি পায়ের ডাক্তার বলে ডাকত। ১৯৬৮ সালে চীনের রাষ্ট্রীয় মুখপত্র 'পিপলস ডেইলি'-তে এই নামটির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মেলে।
কেন এই ব্যবস্থার সূচনা হয়েছিল?
১৯৬৫ সালের আগে চীনের প্রায় ৮০-৯০% মানুষ গ্রামে বাস করলেও আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সিংহভাগই ছিল শহরকেন্দ্রিক। শহর থেকে পাস করা চিকিৎসকেরা দুর্গম ও দরিদ্র গ্রামগুলোতে যেতে চাইতেন না। এই চরম বৈষম্য দেখে ১৯৬৫ সালের ২৬ জুন মাও সে তুং একটি ঐতিহাসিক নির্দেশ জারি করেন (যা 'জুন ২৬ ডিরেক্টিভ' নামে পরিচিত)। তিনি নির্দেশ দেন—"চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবার সমস্ত গুরুত্ব গ্রামে স্থানান্তরিত করো।" এর পরেই দেশজুড়ে ব্যাপক হারে বেয়ারফুট ডক্টরদের প্রশিক্ষণ ও নিয়োগ শুরু হয়।
প্রশিক্ষণ ও কাজের পরিধি
স্বল্পমেয়াদী নিবিড় প্রশিক্ষণ: নির্বাচিত তরুণ ও কৃষকদের ৩ থেকে ৬ মাসের একটি প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। তাঁদের মানব অ্যানাটমি, ব্যাক্টেরিওলজি, রোগ নির্ণয়, প্রাথমিক সার্জারি, পরিবার পরিকল্পনা এবং মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষার মৌলিক বিষয়গুলো শেখানো হতো।
চিকিৎসা পদ্ধতি: তাঁরা অ্যালোপ্যাথি (পাশ্চাত্য চিকিৎসা) এবং চীনের ঐতিহ্যবাহী ভেষজ চিকিৎসা ও আকুপাংচারের একটি চমৎকার সমন্বয় ঘটিয়ে চিকিৎসা দিতেন। ওষুধ ও সুঁইয়ের অভাব হলে তাঁরা স্থানীয় বন-জঙ্গল থেকে ভেষজ উপাদান সংগ্রহ করে ওষুধ তৈরি করতেন।
প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা: তাঁদের মূল জোর ছিল রোগ প্রতিরোধের ওপর। গ্রামে স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা, কলেরার মতো মহামারীর টিকা দেওয়া এবং মশা-মাছি-ইঁদুর নিধনের মতো গণসচেতনতামূলক কাজে তাঁরা নেতৃত্ব দিতেন।
খরচ এবং অর্থনৈতিক কাঠামো
এই চিকিৎসকদের আলাদা কোনো বেতন ছিল না। তাঁরা যে কৃষি সমবায়ে (Commune) কাজ করতেন, সেই সমবায় থেকে সাধারণ কৃষকদের মতোই কাজের ভিত্তিতে পয়েন্ট পেতেন। ফলে চিকিৎসার পেছনে গ্রামীণ মানুষের বাড়তি কোনো খরচ হতো না এবং নামমাত্র মূল্যে প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্রতম মানুষটিও চিকিৎসার অধিকার পেত। কোনো রোগী বেশি গুরুতর অসুস্থ হলে এই ডাক্তাররা তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য উপজেলা বা জেলা হাসপাতালে রেফার করতেন।
এই ব্যবস্থার বিশ্বব্যাপী প্রভাব ও অবসান
ঐতিহাসিক সাফল্য: ১৯৭০-এর দশকের মধ্যে চীন প্রায় ১৫ থেকে ১৭ লক্ষ বেয়ারফুট ডাক্তার তৈরি করতে সক্ষম হয়। এর ফলে চীনে গড় আয়ু নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায় এবং শিশু মৃত্যুর হার এক ধাক্কায় অনেক কমে যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) স্বীকৃতি: ১৯৭৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঐতিহাসিক 'আলমা-আটা ঘোষণা'য় (Alma-Ata Declaration) চীনের এই বেয়ারফুট ডক্টর মডেলটিকে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বিশ্বের অনুন্নত দেশগুলোতে কীভাবে কম খরচে সবার জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা (Health for All) নিশ্চিত করা যায়, তার রোল মডেল ছিল এটি।
১৯৮০-এর দশকে মাও-এর মৃত্যুর পর চীন যখন বাজারমুখী অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু করে, তখন গ্রামীণ সমবায় ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ১৯৮৫ সালে চীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে "বেয়ারফুট ডক্টরস" পদটি বিলুপ্ত করে। যাঁরা পরীক্ষায় পাস করতে পেরেছিলেন, তাঁদের "ভিলেজ ডক্টরস" বা গ্রাম্য ডাক্তার হিসেবে লাইসেন্স দেওয়া হয় এবং বাকিরা সাধারণ স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে কাজ করতে থাকেন।
সীমাবদ্ধ প্রশিক্ষণ ও আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব সত্ত্বেও, বেয়ারফুট ডক্টরস ব্যবস্থাটি প্রমাণ করেছিল যে - বিশাল অর্থবিত্ত বা হাসপাতাল ছাড়াই কেবল সদিচ্ছা ও সামাজিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব।
====================
কক্সবাজার থেকে ঢাকা ফিরছি। মনে পড়লো আমাদের দেশের চিকিৎসা সেবার মানের কথা। আমরা কি এরকম কয়েক লক্ষ চিকিৎসক তৈরি করতে পারি না যারা কাজ করবেন শুধুই গ্রামের মানুষদের সেবা দেওয়ার জন্যে? আমার আব্বু মাও সে তুং-এর কথা কেন এতো বেশিবার আমাকে মনে করিয়ে দিতেন, তা আজ বুঝতে পারছি!
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



