somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

লীলাবতীর মৃত্যু

০৯ ই এপ্রিল, ২০১৫ রাত ২:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

চাকুরীতে আর বেতনে আমি সবেমাত্র থিতু হয়েছি মানে কোনমতে মাস আনি মাস খাই টাইপের,অন্যের কাছে হাত পাততে হয় না।আমরা সাভারের ব্যাংক কলোনীতে দুই রুমের ছোট ফ্লাটে সংসার পেতেছি।আমি অফিসে যাই ও একা একা থাকে,দিনে অন্তত পাঁচ ছয়বার ফোনে কথা হয়।এমনিতেই বয়স কম,কখনো বাইরে থাকে নি,বড় হয়েছে গ্রামে।সারাদিন শেষে বাসায় ফিরে মেয়েটার মুখ দেখলে হাহাকারে বুকটা ফেটে যায়।।কিছুই বলতে পারে না,কিন্তু চোখের দিকে তাকালে হাজার অভিব্যাক্তি ফুটে বেড় হয়।মনে হয় শালার চাকুরী ছেড়ে রাস্তায় গিয়ে থাকি,তবুও ওকে সারাদিন নিজের কাছে রাখি।সে উপায় নাই বাবার সাথে আমার সম্পর্ক নাই,আমার বিয়ের দুই মাসের মাথায় সে দ্বিতীয় বিয়ে করে,নাহলে তার কাছ থেকে টাকা নিয়ে কিছুদিন দেশান্তরি হওয়া যেত।বিয়ের দেড় বছর পার হল এভাবে।সিদ্ধান্ত নিলাম বাচ্চা নেব এভাবে আর মেয়েটাকে কষ্ট দেওয়া যায় না।তাছাড়া চারিদিকে যা দেখছি দেরী করে বাচ্চা নিতে চাইলে অনেকেরই বাচ্চা হচ্ছে না।এই রিস্ক নেওয়া যায় না।এই মেয়েটার মনে একটা বদ্ধমূল ধারণা ছিল সে কখনো মা হতে পারবে না(সেটা ওর সমস্যায়ও হতে পারে বা আমার সমস্যায়)।কেন এমন মনে হত আমি বলতে পারব না,হয়ত মেডিক্যাল সাইন্সে এর কোন ব্যাখ্যা থাকতে পারে।
আমরা বাচ্চা নেওয়ার জন্য চেষ্টা করতে থাকি,দিন যায়,সপ্তাহ যায়,মাস যায়,বছর যায় কিন্তু ভালো সংবাদ আসে না।মেয়েটা আরও মনমরা হয়ে পড়ে।আমি অনেক চেষ্টা করি ওকে হাসিখুশি রাখার কিন্তু ও কেন জানি মজা পায় না।শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলাম ডাক্তার দেখাব।ডাক্তার দেখাতে যে পরিমান খরচ হবে তা করে তা উঠতে বেশ সময়য় লাগবে।আর অপেক্ষা করা যাবে না।ধার দেনা করে হলেও ডাক্তার দেখাতেই হবে।
আমাদের বিয়ের বয়স তখন সাড়ে তিন বছর চলছে।আমি অফিস থেকে ফিরছি এমন সময় ও ফোন দিল,বলল একটা প্রেগনেন্সী টেষ্টের স্টীক নিয়ে আসতে।আমি একটা না ছয়টা কিনে নিয়ে গেলাম।টেষ্টের রেজাল্ট পজিটিভ।আমাদের কারও বিশ্বাস হচ্ছে না।পরপর চারবার টেষ্ট করালাম,পজিটিভ।ও বিশ্বাসই করতে পারছে না ও কনসীভ করেছে।মেয়েটা পাগলের মত আচরন শুরু করল,কি করবে ও নিজেই বুঝে উঠতে পারছিল না।আমার কেবলই মনে হতে লাগল মা হওয়াতে এত আনন্দ!ও সারারাত ঘুমালো না।সকালে উঠে বাকি দুটো ষ্টীক দিয়ে আবার টেষ্ট করালো।পরে নিজেকে নিজেই বুঝালো ছয় ছয়টা টেষ্ট তো আর ভুল হতে পারে না।একটু থামল যেন মেয়েটা।

এরপর শুরু হল দিনগোনা।আমি ওর এক্সট্রা কেয়ার নিতে শুরু করলাম।অফিস থেকে আগে বেড় হতে চেষ্টা করি।বাসায় সারাক্ষণ ওর সাথে খুনসুটি করি।তার পরেও চিন্তা করলাম সারাদিন একা একা থাকে কখন কি দুর্ঘটনা ঘটে যায়।সিদ্ধান্ত নিলাম বাড়ি পাঠিয়ে দেব।গ্রামের মুক্ত পরিবেশও পেল আবার লোকজনের সংস্পর্শেও থাকতে পারবে মন খারাপ হবে না।ওর যখন সাড়ে তিনমাস চলে,ওকে শ্বশুর বাড়ি রেখে এলাম।২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারী মাস সেটা।
অফিসে যাই মন টেকে না,বাসায় আসি একা একা খুবই খারাপ লাগে।সবচেয়ে বড় অসুবিধা হল রাতে রান্না করে খেতে হয়।এর মাঝে আমার নতুন চাকুরীর অফার আসল।ভালো বেতন,ভালো পোষ্ট,বাসা ফ্রি আর কি লাগে?আপ্রিলে জয়েন।আমি দিন গুনতে থাকি।আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকি আল্লাহ আমার প্রথম সন্তান যেন মেয়ে হয়।নামও ঠিক করে ফেলি।আমি মোটামুটি বই পড়তে পছন্দ করি।হুমায়ুন আহমেদের লীলাবতী উপন্যাস পড়ে লীলাবতী নামটা আমার খুব পছন্দ হয়ে যায়।ঠিক করে ফেলি আমার মেয়ের নাম হবে লীলাবতী।এর মাঝে হুমায়ুন আহমেদের আর একটি আর্টিকেল পড়ি লীলাবিতীর মৃত্যু নামে।হুমায়ুন আহমেদ আর শাওনের প্রথম সন্তানের মৃত্যুর কাহিনী।
আমি ওকে বাড়িতে রেখে আসার ঠিক সতের দিন পর,ওর তলপেটে ব্যাথা শুরু হল।আমার পরিচিত ডাক্তারদের কাছে জানলাম প্রেগনেন্সী অবস্থায় তলপেটে ব্যাথা খুব খারাপ। আমি দিশাহারা হয়ে ছুটে গেলাম।ডাক্তার দেখানো হল।পরীক্ষায় ধরা পড়ল প্রস্রাবে ইনফেকশন আছে এ কারনে পেট ব্যাথা হয়েছে।আমি সাভারে ফিরে এলাম।
মার্চ মাসের ১১ তারিখ সকাল ৯:১০ আমি মাত্রই অফিসের গাড়ী থেকে নেমেছি।এমন সময় শাশুড়ীর ফোন।রিয়ার পেটে অসহ্য ব্যাথা নাটোর নিয়ে যাচ্ছি।আমি স্যারকে বলে সাথে সাথে রওনা দিলাম।
রিয়ার মুখ দেখে বুঝতে পারলাম ওর কতটুকু যন্ত্রনা হচ্ছে।সারা মুখ যন্ত্রণায় কালো হয়ে গেছে।
আল্ট্রাসনো করানো হল,রিপোর্টে দেখা গেল বাচ্চা নেই।শুধু ডিওডেনাল স্যাক আছে,সেখানে ভ্রুণ প্রবেশ করার আগেই মিস্কারেজ হয়েছে।রিয়াকে জানানো গেল না কিন্তু ও আন্দাজ করতে পেরেছিল বারবার বলছিল বাচ্চা নেই না?আমি বলছিলাম বাচ্চা ঠিক আছে।
ডাক্তার ছালমা আক্তার জানাল ডি এন সি করাতে হবে।ডি এন সি ব্যাপারটার সাথে এই প্রথম আমার পরিচয়।এবং এই প্রথম অনুধাবন করলাম একটা মেয়ে হলে তার কতটা কষ্ট,একটা মা হতে গেলে তার কতটা কষ্ট।ডি এন সি করানো হল।রিয়াকে যখন কেবিনে দেওয়া হল।ওর অজ্ঞান শরীর আর ব্যাথা মাখা মুখ দেখে নিজেকে ঠিক রাখতে পারি নাই।আমার লীলাবতীর মৃত্যু হল ভ্রুণেই।
জ্ঞান ফেরার পর সবাই যখন বাসায় ফিরে গেল,আমি আর রিয়া একা হাসপাতালের কেবিনে।মেয়েটা সারারাত কাঁদল আমি কোনভাবেই তাকে শান্ত করতে পারলাম না।শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিলাম।গর্ভধারিনীর যে কষ্ট সেটা আমার মত অভাগার বোঝার কথা না।আমি শুধু এটুকু বলি আমাদের অপরিপক্ক ভ্রুণ লীলাবতী যেখানেই থাক ভালো থাক,সুস্থ হয়ে উঠুক তার গর্ভধারিনী।
১১টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জীবন পর্ব -১

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ১৮ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫২



(শালবন ভ্রমণ)
২০১২ সাল। সদ্য পাশ করে বের হয়েছি। কঠিন সময় পার করছিলাম। এদিক-সেদিক স্টেজ শো করে যে পেমেন্ট পেতাম, বাড়িতে ফিরতে ফিরতেই প্রায় শেষ হয়ে যেত। সকালে মায়ের হাতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

'তুমি আমাকে এটা কোন ধরনের হোটেলে নিয়ে এলে?'

লিখেছেন এমএলজি, ১৯ শে জুন, ২০২৬ রাত ১:২৮

এ লেখাটি ম্যাচিউর পাঠকদের জন্য। সে কারণে reader discretion is advised, অর্থাৎ, অস্বস্তি লাগলে পড়বেন না।

ব্যবসায়িক কাজে চায়না গেলেন হাজি মামুন (ছদ্মনাম)।

পঞ্চাশোর্ধ বয়সের সংসারী মানুষ তিনি। ঘরে পরহেজগার... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের শাহেদ জামাল- ৯৮

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৯ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:২২



আজ শুক্রবার। শুক্রবার মুসলমানদের জন্য বিশেষ একটি দিন।
আজ বাংলা আষাঢ় মাসের ৫ তারিখ। যদিও বর্ষাকাল। আজ আকাশে মেঘ নেই। বরং রোদ উঠেছে। রোদের তাপ ভালোই। শাহেদ পথে বের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইউরোপের সবচেয়ে বড় ফিনটেঁক কোম্পানী রিপাবলিক ইউরোপকে ছেড়ে দেওয়ার সত্য ঘটনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৯ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৩

বাংলাদেশের আইটি ফার্মগুলোর মাঝে আমার ফার্মই তাঁর ইঞ্জিনিয়রাদের সবচেয়ে বেশি বেতন দিতো। আমার সিনিয়র রুবি অন রেইলস ব্যাকএন্ড ডেভেলপার ছিলো রিফাত। বয়স ৩০, সেই বয়সেই সে মাসে পেতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে এসো পূর্ণিমায়

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৯ শে জুন, ২০২৬ রাত ৮:৫৫



তুমি ছাড়া ভালো লাগে না পূর্ণিমা চাঁদ, তুমি লুকিয়ে চন্দ্রিমার হলুদ বর্ণে। মায়াবী জোছনা মাখা রাত সবই যেন নিস্ফল, মন যেন হারিয়েছে আঁধারে সব সময় কাঁদে। চারিদিকে যেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×