ধর্ম-নিরপেতা এবং উত্তর-আধুনিক বিশ্বে ধর্মের অবস্থান
ভুমিকা: সেকুলার শব্দটির যে সাধারন অর্থ পাওয়া যায় সেটি হল পার্থিব, জড়জাগতিক, ইহজাগতিক
এমন কিছু। সেভাবে সেকুলারাইজেশনের অর্থ দাঁড়ায় ইহজাগতিকীকরণ। অর্থাৎ এটি এমন একটা কিছু যা আমাদের বাস্তব পৃথিবী, বস্তুকেন্দ্রীক ও ইহজাগতিক জগতের দিকে ধাবিত করে। এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থ হল 'ধর্ম-নিরপেতা'।
আমার মূল আলোচনা ধর্ম-নিরপেতা ও উত্তর-আধুনিক বিশ্বে ধর্মের অবস্থান প্রসঙ্গে। ধর্মকে বুঝতে যেয়ে নৃবিজ্ঞানের অবস্থান হল একটি নন-জাজমেন্টাল ও আন্ত:সাংস্কৃতিক দৃষ্টিতে ধর্মকে দেখা। মানুষের জীবনে ধর্ম কি ভূমিকা পালন করে,
আচার ও বিশ্বাসের মধ্যকার সম্পর্ক কি, ধর্মের সামাজিক দিকগুলো কি কি ইত্যাদি বিষয়গুলোকে বোঝার চেষ্টা করা।
আর তাই আলোচ্য প্রসঙ্গে আামার মূল জিগ্গাসাগুলো হল:
(1) ধর্ম-নিরপেতা মানে কি ধর্মহীনতা ?
(2) 'আধুনিক বিশ্ব' কি ধর্মহীন ?
(3) ধর্মীয় পরিচয় মানুষের জীবনে ও সমাজে কিভাবে প্রভাব ফেলছে ?
(4) বর্তমান বিশ্বে, বিশেষত বাংলাদেশের প্রেীতে সাধারণ মানুষের চর্চায় ধর্ম কিভাবে আছে ?
(5) সংস্কৃতির একটি অংশ হিসেবে ধর্মের ভূমিকা কি ?
ধর্ম-নিরপেতা ও আধুনিক বিশ্ব:
ধর্ম-নিরপেতা বলতে আমরা সাধারনত বুঝে থাকি এমন একটি ব্যাবস্থা যেখানে ধর্মকে কেন্দ্র করে কোন ধরণের পপাতিত্ব তৈরী হয়না। এর মধ্যে রয়েছে মানুষের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে ধর্মের কোন নিয়ন্ত্রক ভূমিকায় না থাকার বিষয়টি, ব্যাক্তি মানুষকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করা এবং তার ইচ্ছা অনিচ্ছার উপর ধর্ম চর্চার বিষয়টির নির্ভরশীলতা। এর মানে এটাও দাঁড়ায় যে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান-সমূহের প্রভাবশালী নিয়ন্ত্রক ভূমিকার বদলে একটি গৌণ অবস্থানে পৌছানো। যার সাথে যুক্ত 'আধুনিকতা'-র ধারণা। কেননা আধুনিক হল এমন কিছু যার সাথে যুক্ত বিজ্ঞানের ধারণা, সেভাবে 'আধুনিক' হয়ে ওঠার একটি অর্থ হল ধর্মীয় বিশ্বাসের বিপরীতে বিজ্ঞান প্রমাণিত প্রপঞ্চে আস্থা রাখা এবং সেভাবেই নিজের বিশ্ববীা গড়ে তোলা। আধুনিক সমাজে ধর্মের অবস্থান কি এ বিষয়ক অধ্যয়ণ এখন "ধর্ম-নিরপেতা" অধ্যয়ণের একটি প্রতিশব্দ হিসেবে বিবেচিত। মার্কস, ফ্রয়েড ও নিৎশের কাজে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে আধুনিকতা
অনর্্তনিহিতভাবেই ধর্মের বিপরীত একটা কিছু।
মেরী ডগলাসের মতে ধর্মের উপর আধুনিকতার প্রভাব চার রকমের:
(1) বিজ্ঞানের কতৃত্ব ও মর্যাদা ধর্মের ব্যাখ্যাকারী আবেদনকে কমিয়ে দিয়েছে
(2) আমাদের জীবন এখন আর পূর্বনির্ধারিত ধর্মীয় আচার বা রীতি দ্বারা চালিত হয়না
(3) আমলাতন্ত্র আমাদের জীবনকে অন্ত:স্থ ও বহি:স্থভাবে নিয়ন্ত্রণ করে
(4) প্রকৃতি থেকে আমাদের বিচ্ছিন্নতা এতটাই জোড়ালো যে এটি আর কোন ধর্মীয় অনুপ্রেরণাকে ধারণ করেনা
জ্যাক গুড্ডি দেখিয়েছেন যে ইউরোপে ধর্ম-নিরপেতার প্রভাবে সম্পদ সংগ্রহের েেত্র চার্চের মতা ক্রমান্বয়ে কমে আসছে। আবার গৃহী-জীবনের বিভিন্ন েেত্র যেমন বিয়ে, দত্তক নেয়া, বিবাহ-বিচ্ছেদের ঘটনায় চার্চের প্রভাব ক্রমশ দূর্বল হয়ে পড়ছে। ধর্ম-নিরপেতার ধারণা আধুনিকতার ডিসকোর্সের একটি সৃষ্টি। আর তাই দস্তয়ভস্কি আধুনিকায়নের উত্থান পর্বে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সমূহকে যে প্রশ্ন করেছিলেন তা আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে, "সভ্য মানুষ কি বিশ্বাস করতে সম" ? এই ধারণায়নে আধুনিক বিশ্বের দিকে তাকালে মনে হতে পারে যে ধর্ম-নিরপে বিভিন্ন রাষ্ট্র সমূহে ধর্ম, ধর্মীয় আচার, ধর্মের সামাজিক অবস্থান ইত্যাদি খুবই প্রান্তিক বিষয়। কিন্তু বিষয়টি এতটা সরল নয়, আধুনিকায়ন ডিসকোর্সে রাষ্ট্র কাঠামোয় এবং সেই সাথে আদর্শ জীবন ব্যবস্থার ধারণায়নে ধর্ম-নিরপেতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকলেও এর অর্থ কোনভাবেই ধর্মহীনতা নয়। আর ধর্ম-নিরপেতার বিষয়টিও কেবল রাষ্টী্রয় সংবিধান, আইন বা কাগুজে নিয়মাবলীর বিষয় নয় এটি চর্চার বিষয়ও বটে। যেমন আধুনিক বিশ্বের মূল কেন্দ্র ও ধর্ম-নিরপে সমাজ হিসেবে বিবেচিত এমন রাষ্ট্রে গুলোর মধ্যে একটি, আমেরিকার 94% লোক বিশ্বাস করেন যে ঈশ্বরের অস্তিত্ব রয়েছে এবং 77% লোক বিশ্বাস করেন যে তারা বেহেস্তে যেতে পারেন। আবার জাপানে দেখা যায় যে সৌভাগ্য বয়ে আনতে পারে এমন বিশ্বাসে একটি বড় ক্রেতাগোষ্ঠী বিভিন্ন স্টোর থেকে সৌভাগ্যসূচক মূর্তি বিপুল হারে কেনেন। ক্রিসমাসে আমেরিকা ইউরোপের বিক্রি বেড়ে যায়। অথবা ভারতের পর্যটন খাতের একটি বড় অংশ আসে বিভিন্ন তীর্থ-স্থান থেকে, সিনেমার শুটিং বন্ধ করতে হয়
অ-ধার্মিক চিত্রায়নের প্রতিবাদে অথবা বিভিন্ন স্যাটেলাইট চ্যানেলে (বিশেষত ভারতীয় চ্যানেলে) এখন দেখা যায় বিভিন্ন ধর্মীয় বস্তুর বিক্রয়ের বিজ্ঞাপন। ফলে দেখা যায় যে ধর্ম-নিরপেতা মানেই ধর্মহীনতা নয় বরং মানুষের প্রতিদিনকার চর্চায় সামাজিক সংগঠনে ধর্ম ও ধর্মীয় আচার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিরাজমান। ধর্ম-নিরপেতার বিষয়টি একটি সমস্যায়িত প্রসঙ্গ, এটি কেবলমাত্র মার্ঙ্ের আফিম নয় বা ডুর্খেইমের সামাজিক সংহতির বিষয় নয়। এর সাথে যুক্ত বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক এজেন্সী সমূহ। ধর্ম প্রতিটি সংস্কৃতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আর মানুষের দৈনন্দিন চর্চায় ধর্ম সবসময়ই একটি কেন্দ্রীয় হিসেবে থেকে এসেছে।
ধর্ম-নিরপেতা সম্পর্কে তালাল আসাদের বক্তব্য:
তালাল আসাদের " ধর্ম-নিরপেতা, জাতি-রাষ্ট্র, ধর্ম " ধর্ম-নিরপেতার তত্ত্বকে বিশেষভাবে আধুনিক জাতীয়তাবাদের গঠনের সাথে সম্পৃক্ত করে দেখতে চায়। সংেেপ বলতে গেলে তার উত্থাপিত প্রশ্নটি হল জাতীয়তাবাদ
কি আবশ্যিকভাবে ধর্মীয় নাকি ধর্ম-নিরপে। তার লেখা স্পষ্ট করে যে কিভাবে ধর্ম-নিরপেতার ভাষা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পাবলিক ও প্রাইভেট বলয়ের পৃথকীকরণের সাথে যুক্ত এবং কিভাবে এই বিচ্ছিন্নতা গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে জনগণের অংশগ্রহণকে প্রভাবিত করে।
তার বিশ্লেষণে বিভিন্ন ধর্ম-নিরপে তত্ত্বের সমালোচোনামূলক ব্যাখ্যা উপস্থিত। তিনি বলছেন যে
ধর্ম-নিরপেতার প েবা বিপরে কোন দলই 'ধর্ম-নিরপে' প্রত্যয়টির ঐতিহাসিক গঠন প্রক্রিয়াকে বিবেচনায় আনতে সম হয়নি। আধুনিকতার সাথে উপযোগী এমন কিছু হিসেবে বিভিন্ন বুদ্ধিজীবী বিভিন্ন "ধরণের" ধর্মের ধারণায়ণ তৈরী করেছেন। আসাদ বলছেন, " কেবলমাত্র সেই সব ধর্ম যেগুলি উদারনৈতিকতার ডিসকোর্সের সাথে সংগতির্পণূ সেগুলিকে প্রশংসিত করা হয়েছে, যেখানে আইন ও নৈতিকতার বিশেষ সমর্্পকের ভিত্তিতে সহিষ্ণুতার উপর জোর দেয়া হয়েছে।"
এেেত্র জনগণের ত্রেটি কেবল মাত্র যুক্তি তর্কের একটি মঞ্চ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা নয় বরং এটি একটি উপেতি অংশ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া পাবলিক বলয়টি এমন একটি অবস্থানে রয়েছে যা আবশ্যিকভাবে মতা কতৃক সম্পৃক্ত হয়েছে, "প্রত্যেকেই যারা এর মধ্যে প্রবেশ করে তাদের আবশ্যিকভাবে জনগণ ও অন্যান্য প্রসঙ্গে মতার কতৃত্ব স্থানাস্তরকে মেনে নিতে হয় এবং অন্যদের গুডউইলের ্ওপরে কিছু লোকের নির্ভর করতে হয়।"
আসাদ এই প্রসঙ্গে তিনটি প্রশ্ন উত্থাপন করছেন,
প্রথমত কিভাবে ধর্মের বিভিন্ন ধারণা এবং চর্চা শ্রোতাদেরকে সবার সামনে সাড়া দেবার েেত্র সহযোগীতা করে?
তিনি বলেন যে ধর্ম-নিরপেতা বিষয়ক আলোচনা গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে জনগণের অংশগ্রহণের বিতর্কের জন্য অপরিহার্য। তাঁর মতে-
গৃহে এবং বিদ্যালয়ের 'প্রাইভেট' অংশে ধর্মের যে অভিজ্ঞতা তা বিশেষ ধরণের পাবলিক সংস্কৃতির অনর্্তভূক্ত মানুষজনকে বোঝার েেত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি কেবলমাত্র কোন সংস্কৃতির শেয়ারড্ আদর্শগুলোর "ব্যাকগ্রাউন্ড" কে নির্দিষ্ট করে দেয় না, বরং একই সাথে ব্যাখ্যা করার েেত্র রাজনৈতিক আদর্শের "ফোরগ্রাইন্ডের" বিপরীতে কোনগুলোকে "ব্যাকগ্রাউন্ড" হিসেবে ধরা হবে সেই বিষয়টিও চিহ্নিত করে।
দ্বিতীয়ত ধর্মীয় সমর্থকগণ যদি পাবলিক েেত্র প্রবেশ করেন তাহলে তাদের অনুপ্রবেশ পূর্বের কাঠামোকে কি অবিকৃত অপিরিবর্তনীয় রাখে?
তিনি বলছেন যে নতুন ধরণের ডিসকোর্স চালু হলে এটি পাবলিক েেত্র চালু থাকা কাঠামোর ব্যাঘাত ঘটাতেও পারে আবার নাও ঘটাতে পারে।
তৃতীয়ত তার প্রশ্ন জাগে বিভিন্ন আইনকে ঘিরে। তিনি বলেন কেন মানুষের ব্যাক্তিগত জীবনে ধর্মের অনুপ্রবেশকে ভীতির দৃষ্টিতে দেখা হয়?
উত্তরে তিনি বলেন বিষয়টা এমন হতে পারে যে যখন ধর্ম-নিরপে আইন ব্যক্তির অধিকারকে নৈতিক বিষয় হিসেবে স্বীকৃতি দেয় তখন ধর্মীয় পরামর্শ সেগুলির উপর আধিপত্য শুরু করে এবং সেগুলিকে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। কেননা
যারা ধর্ম-নিরপে তার মনে করে ধর্ম ঐতিহাসিকভাবে সমাজে ব্যক্তির ও অন্যদের স্বাধীনতাকে লঙ্ঘন করে এসেছে।
এখানে আসাদ যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির দিকে দৃষ্টি দিতে আগ্রহী করে তোলেন তা হল, একটি আধুনিক সমাজে নৈতিকতার যে বৈচিত্র পাওয়া যায় তাতে কিভাবে কেউ একটি জাতীয় চেতনা বা একটি সামগ্রিক নৈতিক সংবেদন খুঁজে পাবার প্রত্যাশা করে?
ধর্ম-নিরপেতার সাথে জাতীয়তাবাদের সম্পৃক্ততা:
আসাদ জানতে চান জাতীয়তাবাদকে কি আসলেই একটি ইহজাগতিক ধর্ম হিসেবে বোঝা আবশ্যক কিনা। তিনি বলেন জাতীয়তাবাদ যে একটি ধর্ম এই ধারণার একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে, যেটি বিংশ শতকের শুরুর দিকে কার্লটন হাইস কতৃক শুরু হয়েছিল। অনেকই এই তত্ত্বকে সমর্থন দিয়েছেন যেমন: জুলিয়ান হাঙ্লী, মার্গারেট জেকব, কিফোর্ড গিয়ার্টজ এবং কার্ল শ্মিট্ড। যেমন হাঙ্লী বলছেন যে জাতীয়তাবাদ ধর্মের বিকাশের সবচেয়ে উপরের ধাপে রয়েছে জাতীয়তাবাদ। গিয়ার্টজ চিহ্নিত করছেন যে ধর্মীয় তাড়ণা থেকে উদ্ভুত বিভিন্ন পবিত্রতার প্রতীকের একটি কেন্দ্রীয় স্থান সকল সমাজের রাজনৈতিক জীবনে রয়েছে। আসাদ বলছেন আমাদের " ধর্ম-নিরপেতার" সংগতিপূর্ণ কাঠামোর চাইতে বরং মনোযোগ দেয়া উচিৎ পরস্পর পৃথক ফলাফলের দিকে। তার ভাষাতে বলা যায়_
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




