কোন এক কালে কোন এক মধ্যবিত্ত মহাজ্ঞানী আমাদের নাম দিয়েছিলেন মধ্যবিত্ত। বড় সাধ ছিল তাঁর নিজেকে চেনার। পরবর্তীতে নিজেকে চেনার সাধই হয়ে ওঠে মধ্যবিত্তের আকাঙ্খা। কিন্তু আমরা স্বার্থপর মধ্যবিত্তরা নিজেকে চেনার বিষয়টিকে আবশ্যক করতে যেয়ে মুছে ফেলতে চাই অন্যদের নিজেকে চেনার স্বপ্নকে। দরিদ্রের আকুতি আর ধনিকের নিপীড়ণকারী চরিত্রের দারুণ মিশ্রণ আমাদের মাঝে। সময় ও সুযোগমত আমরা শুধু চরিত্র পাল্টাই, কেননা আমরা জানি কোনকিছুই স্থির নয় পৃথিবীতে। সকলের জন্য সর্বোচ্চ গ্রহণ-যোগ্য ব্যাখ্যা প্রস্তুত করতেও আমাদের জুড়ি নেই। কেবল নিষ্পেষিত হয়ে মার খাবার সম্ভাবনা সামনে আসলেই আমরা একটু আধটু মৌলিক চিন্তার চেষ্টা করি। এরপর সেই চিন্তাকে ব্যবহার করতে করতে এতটা জীর্ণ করে ফেলি সেখান থেকে এমনকি ফিনিক্স পাখির পুন:জাগরণও প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। তবে আমরা দারুনভাবে অন্য ও আর নিজকে সংজ্ঞায়িত করি। আমরা শিক্ষিত মানুষেরা অপূর্ব দতায় সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় জায়গায় অন্য আর নিজকে নির্মাণে সবচেয়ে আগ্রহী হই। যে গভীর সংকট আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায় সেটি থেকে পালানোর জন্য আমরা কত চেষ্টাই না করি। মানবজাতির ইতিহাসে আমাদের ছায়ার সাথে যুদ্ধকে মহিমান্বিত যদিও পরিহাসমূলক করার জন্য আমরা প্রাণপাত করি।
তবে আমরা কিন্তু করি, কিছু না কিছু করি; শ্রেণী করি, দ্বন্দ্ব করি, তৈল করি অযুত লকোটি অসীম করি। কিন্তু করতে যেয়ে প্রায়শ আমরা ভুলে যাই আমরা কেন করি, কিসের জন্য করি। যেসব উপকরণগুলো নতুন কিছু করার জন্য সহায়ক সেগুলি আমাদের সামনে ভেসে বেড়ায় কিন্তু আমাদের অধিকাংশই সেটি ছুঁতে পারেনা। তখন আমরা "সম্পূর্ণ আপনার সাধ্যের মধ্যে" এমন প্রোজেক্ট ধরি। আমরা খুব বিপাকে না পড়লে স্বীকার করতে চাইনা যে আমরা মধ্যবিত্ত তবে যদি দেখি এটাই সম্ভাব্য নিয়তি তখন সেটিকে আমরা তীব্রভাবে আঁকড়ে ধরি। আমরা এমনকি যুদ্ধও করি, নেতৃত্ব দেই কিন্তু কখনই তৃপ্ত হইনা। তৃপ্ত হওয়ার সাথে আমাদের বিরোধীতা সবসময়ই। মজার ব্যাপার হল তারপরও আমাদের সবগুলো বিষয়কে আমরা 'সকর্মক ক্রিয়ায়' রূপ দেই, এমনকি আমাদের আলস্যকেও, এমনকি আমাদের নৈরাজ্যকেও, এমনকি আমাদের নিরর্থকতাকেও। শিক্ষা আমাদের এমনভাবে শিতি করে তোলে যে দৈনন্দিন আহারের মত সচেতনতাকেও আমরা বোরহানী বা মাঠার মত চেটে চেটে চুকচুক করে পান করি।
তবে সবচেয়ে ভালো যে কাজটা আমরা পারি তা হল পালানো। নিজেদের স্বপ্ন আর বাস্তবতার কাছ থেকে পালানোর দীর্ঘ অভ্যাসের কারণে পালানোকেও আমরা একটি মহৎ কাজ মনে করি, কেননা পলায়নই আমাদের দক্ষতা আমাদের স্বপ্ন। আত্ম-প্রবোধ ও পলায়ন-প্রবণতা আমাদের মজ্জাগত। তবে এর সবকিছুই আমরা করি কোন না কোন সূচককে মনে রেখে। শিক্ষা আমাদের নানা সূচকে নিজেদের প্রতিস্থাপন করে উত্তীর্ণ হতে উদ্দীপ্ত করে। যে কোন প্রেক্ষীতেই নিজেদের পরিস্থিতিকে জটিল ভাবতে আমাদের ভালো লাগে কিন্তু অপরাপর জটিলতাকে স্থান দিতে আমাদের বড় আপত্তি। আমরা অতিদ্রুত আত্ম প্রবঞ্চনার শিখরে পৌছে যাই এবং সেখানেই বসত গড়ে জীবন যাপন করতে থাকি। জনসমাগমে সবসময় প্রথম, সর্বোচ্চ, তীব্র ইত্যাদির কথা বললেও মাঝারি অবস্থানটি যে আমাদের জন্য সুবিধাজনক সেটা আমরা সবাই ভেতরে ভেতরে জানি; যদিও বাইরে কখনোই তা প্রকাশ করি না। কেননা আমরা বুঝি তীব্র অথবা সর্বোচ্চ কোনকিছুর মাতামাতির প্রয়োজন নেই । আমরা যেহেতু কখনোই কোন তীব্রতাকে ধারণ করতে সক্ষম নই সেহেতু মাতামাতি করাই আমাদের একমাত্র কাজ হয়ে ওঠে। তবে মাতামাতিতেও আমরা সবচেয়ে অবিশ্বাস করি অপর মধ্যবিত্তকে, যদিও কুৎসা করে সবচেয়ে বেশি সুখ পাই তারই সাথে।
নিজেদের বিভ্রান্তি বেশ দক্ষতার সাথেই আমরা অপরের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারি, বিভ্রান্তি তৈরী করা আর সেটিকে ছড়িয়ে দেয়ার দক্ষতায় নি:সন্দেহে আমরা অনেক সংক্রামক ব্যাধির সাথে পাল্লা দিতে সক্ষম। বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দিয়ে চুপচাপ বসে থাকার অবস্থানটিকে আমরা অতি যত্নে লালন করি। কল্পনা, লেখালেখি, কথপোকথনের বাইরের জগতে পদক্ষেপ দিতে আমাদের বড় ভয়। কখনো লোভ অথবা কখনো অস্তিত্ব আমাদের পরিচিত নিরাপদ বলয়ের বাইরে যেতে উদ্যমী করলেও রাজপথ বা মাঠের কাজটিকে আমরা অন্যদের দিয়ে করিয়ে নিতেই সবচেয়ে স্বস্তি বোধ করি। এটি কেবলমাত্র আত্মরক্ষার আনন্দ নয় এটি আমাদের গোপন সংকটকে সামলে নেবার সুখ, এক বিচিত্র অসুস্থ মধ্যবিত্ত ঔচিত্যবোধকে পূর্ণ করার তৃপ্তি। একজন প্রতিষ্ঠিত একনায়কের চেয়ে দ্রুতই আমরা সবকিছুকে বুঝতে পারি, কিন্তু সুযোগ ও সম্ভাবনা থাকলেও মজ্জাগত ভীতির কারণে ক্ষমতাবানের পদলেহন করে, তার নখের ম্যানিকিউর করে, তার পশ্চাৎ-দেশে তেল মাখিয়ে, তার শিশ্নযোণীস্তন মর্দন করে আমরা সুখ পাই। এ এক অবর্ণনীয় সুখ, ফ্রয়েডের লৈঙ্গিক পপাতিত্বের পরপারের এক অবস্থানগত তেলতেলে সুধা। এটি নারীপুরুষ বা তৃতীয় লিঙ্গের অনুভূতিরাশি নয়, এমনকি সমবিষমকামীর দারুন উত্তেজনাকর সংমিশ্রণও নয়, এটি হল এমন এক বদ্ধ ঘিনঘিনে সুখ যা ধারণ করে মানব ইতিহাসের সকল ব্যার্থ হাহাকারের জলো নিশ্বাস।
আমাদের কোন ঈশ্বর নেই এমনটা মধ্যবিত্ত কখনোই দাবী করতে পারেনা। আমাদের কোন সুনির্দিষ্ট দাবী করার প্রবণতাই নেই। সুনির্দিষ্ট হওয়াটাই মধ্যবিত্ত হবার পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক। এমনকি আমরা ঈশ্বরহীন এমনটাও আমরা মানতে নারাজ। আমরা সবকিছুর মাঝামাঝি এমনটা বললেও আমাদের পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। আমরা তরবারী উচানো নারায়ে তাকবীর বা রুদ্রাক্ষ পেচানো জয় মা তারার চাইতেও অশ্লীল। আমরা ভাবতে ভালবাসি আমাদের অনেক ক্ষমতা কিন্তু ক্ষমতার পাঠশালায় আমরা আসলে সুবোধ ভাল শিক্ষার্থী, সুললিত অশী্লল সমাজ। আমরা দিনরাত তন্ত্রফন্ত্র করি কিন্তু ক্ষমতাবানের উরুতে কবিতার উল্কি আঁকি। আমরা ঠিক করে অসৎ হতেও সক্ষম নই। ঠিকঠাকভাবে কোনকিছু করা আমাদের ধাতেই নেই। তাই আমরা উপদেষ্টা হই, বিচারপতি হই, সচিব হই, পরামর্শক হই কিন্তু ভুল করেও বিদ্রোহী হইনা। কোনকিছুর তীব্র অবস্থানে যাওয়ার অর্থ হল মধ্যবিত্ত পদবীকে হারিয়ে ফেলা। আমরা ভয়ানক লোভী হয়ে ক্ষমতা দখলও করতে পারি না। আমরা সারা জীবন দখলিকৃত আর দখলকারীর মাঝামাঝি থেকে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ বোঝার চেষ্টা করি। কিন্তু দ্বন্দ্বেধন্দে পুঁজির গন্ধে জগত মৌ মৌ করলেও আমরা পুঁজিপতিকে ছাড়িনা আবার পুরোপুরি পুঁজিপতিও হইনা। আর পুঁজির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো তো আমরা দূরহতম দু:স্বপ্নেও দেখিনা।
আজন্ম সংকটগ্রস্থ আমাদের এখন চলছে স্বপ্ন সংকটের কাল। যে সকল পিতামহী পিতামহের স্বপ্নকে ভাঙ্গিয়ে এতদিন দিন গুজরান হল সেগুলি ম্রিয়মান প্রায়। আমাদের মধ্যবিত্ত পদকে টিকিয়ে রাখবার জন্য প্রয়োজন নতুন স্বপ্ন, কেননা খুব উচ্চ আর খুব নিম্ন ইতোমধ্যে ঘটিয়ে চলেছেন অনেক নতুন নতুন কাজ। কিন্তু মাতামাতি করার জন্যও কোন স্বপ্ন কিন্তু এখন আমাদের নেই। নিম্নরা বুঝে গেছে যে নিজের যা প্রয়োজন তা নিজেদেরই করতে হবে, উচ্চরা জানে যে প্রয়োজনে অসীম সংখ্যক মধ্য'র জন্ম দেয়া কোন বিষয়ই না। কিন্ত হায়!! আমরা মধ্যরা তো ইতমধ্যেই নিজেদের পুরোনো করে ফেলেছি। 47', 52', 69', 71' বা মডারেটেড মুসলমান কিংবা গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেতা, মৌলবাদ, জঙ্গীবাদ, তত্ত্ববধায়ক, নির্বাচন কমিশন, ভোট ইত্যাদি, এর সবই এখন সংখ্যাগুরু আর ক্ষমতাবানেরা বোঝে। আমাদের অতি-যত্নে লালিত পথনির্দেশকের ভূমিকারও যে খুব প্রয়োজন হবে তাও তো মনে হচ্ছে না। তাহলে!!! ??? কি হবে আমাদের, কোন স্বপ্ন মেশিনের কাছে ধার করব কয়েকটা 'ব্রান্ড নিউ' টাটকা স্বপ্ন, নাকি দীর্ঘকালের সুবিধাজনক পদটিকে বাদ দিয়ে হয়ে উঠতে চাইব তীব্র, সুনির্দিষ্ট। সুস্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট হয়ে ওঠার চেষ্টা কি পরিণামে হয়ে উঠবে হবে আমাদের আত্মহত্যার পথ, নাকি আত্মশুদ্ধির অন্তিম প্রয়াসে এক ভিন্নরকম নতুনের সম্ভাবনা???!!!
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জানুয়ারি, ২০০৭ রাত ১২:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


