somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মে ডে গল্প : একটি নাম , দুইটি স্যান্ডেল

০১ লা মে, ২০১৬ রাত ৯:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



জামশেদ চৌধুরী প্যারেড কর্ণারে চারিপাশে মনিং ওর্য়াকে বেরিয়েছেন বেশ কিছুক্ষণ হল । মুডটা আজ তার বেশ ভালো তবে বেশিক্ষণ রইলো না । নোংরা মানুষটা তার পা মাড়িয়ে দিয়েছে । মুহুর্তের মধ্যে তার স্যান্ডেল ছিটকে পড়ে নালাতে । জামশেদ চৌধুরী বিরক্ত মুখে দিলেন কষে একটা চড় । এক কালের পেটানো এই শরীরের জোর এখনো সাংঘাতিক । চড় খেয়ে হালকা পাতলা মানুষটি ছিটকে পড়ে গেলো । জামশেদ চৌধুরী অবশিষ্ট স্যান্ডেলটিও ফেলে দিয়ে সোজা হাঁটা দিলেন । স্যান্ডেল গেলে যাক এই সব নোংরা মানুষগুলোকে উনি হাঁড়ে হাঁড়ে চেনেন । পরে হয়তো হাতে পায়ে ধরে ভিক্ষা খোঁজা শুরু করবে । ফিরে যাওয়ার সময় এক পলকের জন্য জামশেদ চৌধুরী পিছনে তাকালেন । নোংরা মানুষটি নালা থেকে তার স্যান্ডেলটি তুলছে ।
.
কাকতালীয় ভাবে পড়ে যাওয়া মানুষটির নামও জামশেদ । জামশেদ মিয়ার ঘরে ৫টা মেয়ে ১টা ছেলে । আর ৭ নাম্বারটা যেকোন দিন হতে পারে । সামনে অনেক খরচ । সেজন্য প্রতিদিনই তার কাজে বেরুতে হয় । আজকেও বেরিয়ে ছিল কিন্তু ভূলবশত এক ভদ্র (!) লোকের পায়ে পাড়া দেওয়াতে তার হাসিখুশি মুর্হুতের ছন্দপতন হল ।
.
জামশেদ মিয়া এর আগে বসতবাড়ি বিক্রি করে একখানা মোটর রিক্সা কিনছিলো । ভালোই ইনকাম হচ্ছিল কিন্তু সুখ বেশি দিন কপালে সইলো না । সরকার মোটর রিক্সা তুলে নিবার আদেশ দিলো । রাতারাতি সব গায়েব । একদিন লুকিয়ে চালাতে গিয়ে ধরা পড়লো আর রিক্সাখানা চালান হয়ে গেলো । তার মনে আছে বহু বছর পর সে অনেক কেঁদেছিল । কিন্তু করার কিছুই ছিল না । সে এখনো বুঝে উঠতে পারে না যদি মোটর রিক্সা নিষেধই থাকে তাহলে এতগুলো রিক্সা নামানোর আগে কেউ কিছু বলল না কেন । মাঝে মাঝে সে রূপকথার স্বপ্ন দেখে যেখানে হঠাৎই তার প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা । তার সমস্যা কথা , দুঃখের কথা বলতে চায় কিন্তু কিছু বলতে গেলেই গলা আটকে যায় ।
.
জামশেদ মিয়া কিছুদিন আগে একটি সরকারী কনট্রাকশনের লেবারের কাজ পেয়েছিল । আজও সেখানে সারাদিন গতর খেটে রোদে পোড়ে ঘরে এসে ডাক ছাড়লো '-রওশন ?' জামশেদ মিয়া অবাক হয়ে দেখলো যে তার ঘরে কেউ নাই । পুরো ঘর খাঁ খাঁ করছে । পাড়াপড়শীর মাঝে তার বন্ধু কিসমতের স্ত্রী থেকে জানতে পারলো যে আজ বিকেলে হঠাই তার স্ত্রী যমুনার প্রসব বেদনার উঠে । এই কারণে সে এখন সরকারী হাসপাতালে । জামশেদ মিয়া পড়িমড়ি করে ছুটলো ।
.
তার এই ছোট্ট জীবনে বছরের ১২টা মাস রোগে শোকে ভোগা এই মেয়েটাই তার কাছে সব । এই তার আনন্দের উৎস আর প্রশান্তির ছায়া । ডাক্তারের মতে এবারের অবস্থা খুব খারাপ । যে কোন কিছু হয়ে যেতে পারে । খরচও কম না । জামশেদ মিয়া কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না । অল্প কিছু টাকা হাতে আছে আশা করছে কালকের আরো কিছু টাকা হয়ে যাবে । তাই সকাল হতেই জামশেদ মিয়া সরকারী কাজে দৌড়ালো । গিয়ে থ । জায়গা আজ খাঁ খাঁ করছে । কি ব্যাপার !
.
তারমত এই রকম দু একজন থেকে জানলো আজ নাকি শ্রমিকের অধিকার রক্ষার দিবস । মে ডে । সরকারী ছুটি দিন । তাই কাজ বন্ধ । জামশেদ মিয়ার অশিক্ষিত মাথা এটা বুঝতে পারছে না যে তাদের না খাইয়ে রেখে শ্রমিকদের কি অধিকারটা পালন করা হচ্ছে ? একজন একটা বুদ্ধি দিল । শ্রমিকদের মিছিল মিটিং হচ্ছে । সেখানে গেলে কিছু টাকা পয়সা পাওয়া যাবে । তার টাকা দরকার । তার বউ হাসপাতালের বেডে । এখন যা করতে বলবে তার সবই সে করবে ।
.
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে । নেতার পিছে পিছে স্লোগান দিতে দিতে সে ক্লান্ত । মাথার উপরে আগুন , নিচে আগুন । তপ্ত রাজপথে নতুন স্যাডেল ফুঁড়ে যেন আগুনের আঁচ লাগছে । হঠাৎ তীব্র শব্দ । সবার সাথে জামশেদ মিয়াও দৌড়ালো । দৌড়াতে দৌড়াতে প্যারেড কর্ণারের মোড়ে এসে শরীর টলতে লাগলো । টের পেলেন তার কিছু যেন হচ্ছে । এরপর হঠাৎই শরীর সম্পূর্ণ অনুভূতিশূন্য হয়ে গেলো । নিচের পিচঢালা কালচে চাদরটা যেন ছ্যাশ করে তার মুখে আছড়ে পড়লো ।
.
.
.
.
পরের দিন খবর বেরুলো । "শ্রমিক দিবস পালন কালে একই দলের দুপক্ষের ক্যাডারদের গোলাগুলিতে জামশেদ নামে ১ জন শ্রমিক নিহত এবং ২ জন গুরুতর ভাবে আহত । মেয়র নিহতের পরিবারের জন্য ১ লাখ টাকা আর আহতদের জন্য ৫০ হাজার টাকা সাহায্য ঘোষণা করেছেন"
.
.
পার্কে বসে সাত সকালে খবরটা পড়লেন । নামটি খেয়াল জামশেদ চৌধুরী যাইপরনাই বিরক্ত হলেন । তার রাশভারী নামটাও এখন সস্তা হয়ে গেছে । একটা ফকিরন্নীর নামও তার নামে রাখা হয় । জামশেদ চৌধুরী উঠে দাড়ালেন , বাসায় যেতে হবে , এই বয়সে বেশি হাঁটা চলা করাও উচিত নয় । এতে শরীরের ফিটনেস বাড়ে না , উল্টো কম । দ্রুত হাঁটতে গিয়ে অদ্ভুত ভাবে জামশেদ চৌধুরী একজোড়া স্যান্ডেলের উপর ভীষণভাবে হোঁচট খেলেন । অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখেন স্যান্ডেলগুলো আসলে সেদিনের ফেলে আসা স্যান্ডেল জোড়া !!
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা মে, ২০১৬ রাত ৯:৩৮
৯টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ব্লগের ওসমান হাদী সৈয়দ মশিউর রহমানের ব্যান

লিখেছেন এল গ্যাস্ত্রিকো ডি প্রবলেমো, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:৫০

এ আমি কী দেখলাম! ব্লগের প্রতিবাদী মুখ, ভারতের যম, ওসমান হাদীর মুখপাত্র, একাত্তরকা গণ্ডগোলের ব্যাপারে সচেতন মুখ সৈয়দ মশিউর রহমানের ব্লগটি স্থগিত অথবা বাতিল করা হয়েছে। দেশে যখন সামান্য চুমু... ...বাকিটুকু পড়ুন

জেফরি আর্চারের A Prisoner of Birth....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:০০




জেফরি আর্চারের A Prisoner of Birth....

জেফরি আর্চারের A Prisoner of Birth মূলত এমন এক উপন্যাস, যেখানে বন্ধুত্ব, বিশ্বাসঘাতকতা, শ্রেণিবৈষম্য, বিচারব্যবস্থা, প্রতিশোধ এবং বুদ্ধিমত্তার লড়াই একসূত্রে গাঁথা হয়েছে। উপন্যাসটির... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাদ্রাসার মোল্লা হুজুর থেকে আপনার সন্তানকে নিরাপদ রাখুন

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:০৭

গতকাল রাতে একটা বাচ্চার পা**র ছবি দেখেছিলাম ফেইসবুকে, অনেকেই শেয়ার করেছেন। পা কেটে হাসপাতালে আসার পর ডাক্তার সাপোজিটরি দিতে গিয়ে দেখে গর্তের মতো হয়ে গেছে। মাদ্রাসার হুজুরে বিকৃত কাজ করতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপি’কে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল বলার কোনো কারণ নাই!!

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:২৩



জাতীয় সন্মাননা কি কোনো গোপন বিষয় । একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা’কে গার্ড অফ অনার দিতে এত অনীহা কেনো বর্তমান সরকারের ‼️

আজ বারবার আমার গোআ’র কুপুত্রের একটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

হাসিনা-বিভ্রাট: এটা ট্রল নয়, কূটনৈতিক সতর্কসংকেত

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:৫৮


হাসিনা-বিভ্রাট: এটা ট্রল নয়, কূটনৈতিক সতর্কসংকেত

জাপানের এক প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের একটি পোস্ট নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে হাসাহাসি চলছে। আমার মনে হয়, হাসির আড়ালে আসল প্রশ্নটা চাপা পড়ে যাচ্ছে।

ঘটনাটা কী
প্রধানমন্ত্রী... ...বাকিটুকু পড়ুন

×