যে সমাজে টেলিভিশন খুললেই ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি, পন্ডস কিংবা অন্য কোন বহুজাতিক কোম্পানির রঙ ফর্সাকারী দ্রব্যের বিজ্ঞাপন দেখানো হয় দিনের পর দিন; শহরের আকাশ ঢেকে যায় তাদের বিলবোর্ডে; সাহিত্যে যেখানে শ্যামলা নারীদের করা হয় অবজ্ঞা; সিনেমা হল-দেয়ালে শোভা পায় ফর্সা স্লিভলেস নারীদের মুভি পোস্টার; মার্কেটের দোকানে দোকানে দেদারসে সাজিয়ে রাখা হয় চামড়া ঘষার পণ্য; ছবি-সেলফি ভরে যায় আটা-ময়দার বাহুল্যে; ফর্সা হওয়ার এহেন নিরন্তর আপ্রাণ প্রচেষ্টা যে সমাজে- সে সমাজে নির্লজ্জ বর্ণবাদ জিতবে সেটাই স্বাভাবিক।
বাঙালি জাতির অভাব শিক্ষায়। আর বাহুল্য হিপোক্রিসিতে। বৈষম্য ফর্সা-শ্যামলা’র মাঝেই শুধু সীমাবদ্ধ নেই। লম্বা-বেটে, মোটা-চিকন সবকিছুরই বৈষম্য সমাজে খুব নির্মম। ফর্সাকে ভালোবাসবে সবাই। বিয়ের বাজারে লম্বা-ফর্সার জয় হবে সর্বত্রই। শৈশব থেকেই সমাজে শিখিয়ে দেয়া হবে, পাত্রী সুন্দর হতেই হবে, ফর্সা হওয়া চাই। পাত্র লম্বা হওয়া চাই, মাথাভরা চুল থাকা চাই ইত্যাদি ইত্যাদি। এরপর বড় হতে হতে সে শিক্ষাগতভাবেই বর্ণবাদ শিখে। ভালবাসতে শিখে ফর্সাকে। অবজ্ঞা করতে শিখে শ্যামলাকে। আমরা সবাই এ নির্মম সত্যতা জানি, বুঝি, দেখি, অন্তরে ধারণ করি। আমি, আপনি, সবাই এরকম। তবুও এর মাঝে যখনি কেউ মনের সরলতায় সত্য কথাটা বলে উঠে, তখনি ছিঃ ছিঃ রব উঠে- তুমি এত খারাপ!! খালি বাইরের সৌন্দর্য দেখো। ভিতরেরটা দেখো না... ব্লা ব্লা ব্লা। এমন একটা ভাব করি সবাই, যেন আমরা বিপরীত দিকে দৌড়াচ্ছি। আরো দুঃখের বিষয় হল, খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, এই দ্বিতীয় ব্যক্তি কিন্তু ঠিকই নিজের জন্য খুঁজে নিয়েছে দৈহিকভাবে ফর্সা-লম্বা (সমাজের দৃষ্টিতে সুন্দরের ডেফিনেশনের) কাউকে। আর মুখে ঠিকই সমালোচনা করতে ভুলে না।
আহ! হিপোক্রিসি।
স্রষ্টা সমাজের সক্ষমতা অনুযায়ী সবকিছু দেন। সমাজের মানুষ যেটা বইতে পারবে না, তাদের সেটা দেন না। ভাগ্য ভালো, আমাদের সমাজে আফ্রিকার নিগ্রো জাতি বর্ণের মানুষ নেই। নাহলে, জন্ম থেকেই হয়তো কথা শুনতে শুনতে মারাই যেত তারা। অন্তত আত্মিক মৃত্যু ঘটত। আর যদি ঘুণাক্ষরে কন্যা সন্তান এমন হত, তবে আইয়ামে জাহেলিয়াতের মত মাটির নিচেও হয়তো পুঁতে ফেলতে দ্বিধা করতনা এখানকার মানুষ। নির্লজ্জ এ সত্যটা আমাদের সমাজে বিরাজমান- তা মানতে চাই বা না চাই। বাঙালি জাতি আমরা বাইরে ঠিকই যতই রাজা-উজির মারি, ভিতরে ভিতরে মারাত্মক ধরনের রেসিস্ট, তা বরাবরই সত্য।
সেলেউকাস! বড় বিচিত্র এ দেশ!!
ভাগ্য ভালো, এদেশে ন্যালসন মেন্ডেলা, ডেস্মন্ড টুটু, ম্যালকম এক্স, মায়া এঞ্জেলিউ, অপরাহ উইনফ্রে, মোহাম্মদ আলি ক্লে, কফি আনান, পেলে, মাইকেল জ্যাকসনের মত মানুষ জন্মগ্রহণ করেননি। নাহলে, কুঁড়িতেই সমাজের সমালোচনায় তাদের বিনাশ ঘটত। এক ‘Invictus’এর বিজয় দেখা থেকে বিশ্ব বঞ্চিত হত। দেখতে পারত না 'The Louisville Lip' এর হারমোনিক বক্সিং, হারাতো পপ গডের সুর মূর্ছনা থেকে। আরো সুখের কথা, মার্টিন লুথার কিং এদেশে জন্ম নেননি। তাহলে হয়তোবা ‘I had a dream’ কালজয়ী বক্তব্যের আবির্ভাব ঘটত না।
নিজের গায়ের রঙ নিয়ে পরিবার-সমাজ-মানুষের রেসিস্ট কথা শুনতে শুনতে হয়তো একদিন তিনি ঘোষণা দিতেন "I didn't have a dream. Because, I myself was a nightmare!!! ”
২৯ ০৮ ১৫
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে আগস্ট, ২০১৫ সকাল ৯:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


