রেমিটেন্সের বাহক! পাথরের বালিশে যাদের প্রিয়ার আলিঙ্গন
একবার এই মরুতে ভয়ঙ্কর বালি ঝড়ের কবলে পড়েছিলাম। বালি ঝড়ের মধ্যে ৮০ মাইল যাওয়ার পরে পুলিশের বাধা এসে হাজির। পুলিশ জানায় বালি জমতে জমতে রাস্তার উপর বালির পাহাড় হয়েছে ফলে রাস্তা উদ্ধার করতে পারছেনা। কিছুক্ষণ পর পুলিশ এসে জানায় এভাবে রাস্তায় অপেক্ষা করা বিপদজনক তাই সকল গাড়ীগুলোকে বনী খালিদ নামক গ্রামের দিকে চলে যেতে হবে। বনী আবু খালিদ বিশাল মরুভূমির পাশে অবস্থিত পর্বতরাজির পাদদেশে অবস্থিত ওমানের একটি গ্রামের নাম। সেখানে পৌঁছার পর মনে হল গরমের প্রকোপে প্রতিটি বালি কণা যেন আগুনে ভাজা হচ্ছে। কাঁচা-পাকা রাস্তা আছে, তবে বিদ্যুৎ নাই। পাহাড় থেকে নির্গত পানিই এখানে জীবনের একমাত্র উৎস। উট, গাধা, ছাগলে ভরপুর এই গ্রাম। প্রত্যন্ত এই জনপদেও বিদ্যুৎ না থাকলেও স্কুল আছে। বেশীর ভাগ মানুষ গাধায় চলাচল করে, স্কুলের ছাত্র-শিক্ষকেরাও গাধায় চড়ে স্কুলে আসে। স্কুলের পিছনে বিরাট গাধাখানা আছে। এমন সময় একজন দেশী ভাইয়ের দেখা পেলাম। তিনি জানালেন আবহাওয়া ঠিক হবেনা তাই এখানেই রাত্রি যাপন করতে হবে। আরো বলল এদেশে জুন-জুলাই’য়ের গরমের কারণে স্কুল দুই মাস বন্ধ থাকে। গরমকালে আরবিরা এ এলাকায় থাকেনা, সামুদ্রিক এলাকা কিংবা শহরে চলে যায়। এবার এখনও স্কুল বন্ধ হয়নি, অথচ অগ্রিম গরম পড়া শুরু হয়েছে যা খুবই ভয়ানক ও অসহ্য।
তাদের একজন বলা শুরু করল, আমরা বাংলাদেশ থেকে বাপের টাকা খরচ করে আগত চরম হতভাগা যুবক। আমরা এসি কক্ষের ঠাণ্ডার কথা শুনেছি, কোনদিন চোখে দেখিনি। এই গ্রামের বেশীর ভাগ মানুষ, বিভিন্ন কোম্পানি ও আরবির বাসা থেকে পালিয়ে আসা। যারা দুটি বেশী টাকা কামাতে চায় তাদের সকলের আজ একই দশা। পাহাড়ের নীচে খেজুর গাছ ও কাঁটা গাছের জঙ্গল আছে, সেখানেই আমরা ঝুপড়ি ঘরে থাকি। পুলিশ আসা যাওয়া করে, তবে আমাদের কখনও দৌড়ায় না। আমরা অনেকে পুলিশের ক্ষেতে-খামারেও কাজ করি। পুলিশ জানে আমাদের অনেকেরই বৈধ ওয়ার্ক পারমিট নাই। তাছাড়া বৈধ মানুষ এ এলাকায় কাজ করতে কিংবা থাকতে চায়না। আরবিরা ভাল বেতন দিলেও কর্মঠ ও বিশ্বস্ত শ্রমিক পায়না। যার কারণে অবৈধ শ্রমিকেরা এই এলাকার কাজকে কিছুটা নিরাপদ ভাবে এবং কিছুটা দুঃচিন্তামুক্ত ভাবে ক্ষেতে খামারে কাজ করতে পারে। আমাদের এখানকার জীবন বড় কঠিন ও দূর্বিসহ। কাজ করলেই নগদ টাকা পাওয়া যায়; তাই এখানে থাকি। এখানকার আরবিরা বড় দয়ালু, নিজেরাই আমাদের ফল, সবজি, গোশত দিয়ে যায়। অনেকে ছাগল-উট জবাই করে আমাদের কাছে গোশত বণ্টন করে। কারো মানত থাকলে জীবিত ছাগল-উঠ আমাদের দিয়ে যায়, আমরা জবাই করে খাই। রোজার সময় ফিৎরা যাকাত পাই।
বনী খালিদে আমার রাত্রি যাপনের ইচ্ছার কথা জানতে পেরে, যুবক যে সমস্যার কথা বলল তা শুনে আমি ‘থ’ হয়ে গেলাম। যুবকটি বলতে রইল, আমরা এক ঝুপড়িতে ১২ জন থাকি, পালা করে প্রতি রাত্রে ১১ জন ঘুমাই, একজন জেগে থাকি। যিনি জেগে থাকেন তিনি ঘুমন্ত মানুষদের শরীরের উপর পানি ছিটিয়ে দেয়। পানির কারণে ঘুমন্ত মানুষের কাপড়, গেঞ্জি ভিজে গেলে পর কিছুটা আরাম বোধ হয়। ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে তা আবার শুকিয়ে যায়। আবারো পানি ছিটানো হয় এবং যথারীতি শুকিয়ে যায়; এভাবেই হতভাগাদের প্রতিটি রাত কাটে, আবার সকালের সূর্য উঠে। আমরাই যেখানে ভালভাবে থাকতে পারিনা, সেখানে আপনাকে আমরা কিভাবে রাখবো? তাই আমাদের শরম দিবেন না ভাই!
যুবকদের কথা শুনে আমার খু্বই খারাপ লাগল এবং আমি দৃঢ়তার সাথে তাদের বললাম; আপনাদের সাথে আপনাদের মত করেই আজ আমি রাত কাটাব। সমস্যার সাথে লড়াই করার অভ্যাস আমার আছে! যুবকটি আমার কথায় আরো লজ্জিত হয়ে বলল, ভাই অন্যদের কাছে পানি ছিটানোর একটি যন্ত্র আছে, আমাদের কাছে সে যন্ত্রটি নাই, আমরা এখানে নতুন তা যন্ত্রটি এখনও কিনতে পারি নাই। (এটি সেই যন্ত্র যা আমাদের দেশে হাত দিয়ে পাম্প করে জমিতে কীটনাশক ও মশা মারার ঔষধ ছিটানো হয়)। তাই আমরা বালতিতে পানি ভরে হাত দিয়ে সেই পানি ছিটিয়ে দেই। আপনার গায়ে যদি জোড়ে পানির ছিটা পড়ে তাহলে বার বার ঘুম ভেঙ্গে যাবে। কেননা আপনার সেই অভ্যাস গড়ে উঠেনি। আজকে যেহেতু আপনি আমাদের মেহমান! তাই আপনাকে মেশিন ওয়ালা কারো ঝুপড়ীতে থাকার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
আমি অনুনয় করে বললাম আপনারা এভাবে মাসের পর মাস কাটিয়ে দিচ্ছেন, আমি না হয় এক রাত ঘুমালাম? তারপরও আপনাদের কঠিন রাত্রির সাথী হতে চাই, আশা করি আমাকে আজকে রাত্রে আপনাদের সাথেই মেহমান বানাবেন! যাক, আমার দৃঢ় প্রত্যয়ে তারা খুশী হল এবং মেহমান বানাতে রাজি হল। লুঙ্গি-গামছা সহ এক সেট কাপড় সর্বদা গাড়িতেই থাকে, ফলে সমস্যা হয়নি। জেনারেটর যুক্ত দোকানের ফ্রিজ থেকে কিছু ফল নিয়ে তাদের মেহমান হবরা উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম।
জঙ্গলা কৃতির স্থানে তাদের বাসস্থানে পা রাখা মাত্রই বুঝতে পারলাম গরম কাকে বলে এবং গরমের পরিমাণ কেমন হতে পারে! আবহাওয়া এমনিতেই গরম। আরো মনে হল খেজুর গাছের প্রতিটি পাতা যেন রাতের আঁধারে গরম আমদানি করে ডাল নেড়ে তাপমাত্রা বায়ুতে মিশিয়ে দিচ্ছে। বুঝতেই পারছি বাহিরের চেয়ে জঙ্গলের ভিতরে এবং খেজুর বাগানের উষ্ণতা অতিমাত্রায় বেশী।
এসব যুবকেরা বাগানেই থাকতে বাধ্য, কেননা দিনের সূর্যতাপে খোলা যায়গার ঘরে থাকার অর্থ চুলায় উপরে থাকার সমান! কিছুক্ষণ পরই আমার মনে হল, এইমাত্র নিভে যাওয়া পোড়া বাড়ীর প্রজ্বলিত কয়লার স্তূপের উপর বসেছি। শুইতে যাবার অনেক আগেই নিজের গায়ে কয়েকবার পানি ছিটালাম, কিছুক্ষণ পরে আর মনে করতে পারছিনা না জীবনে ঠাণ্ডার অনুভূতি কেমন ছিল? মনে হচ্ছিল সাধারণ উষ্ণতার এক লোটা পানি যদি পেতাম, তাহলে সারা শরীরে রাজ্যের শান্তি বয়ে যেত!
বনী আবু খালিদের হতভাগ্য দুর্ভাগাদের হাতের অর্জিত টাকা দিয়েই আমাদের দেশের রেমিটেন্সের সমৃদ্ধি বাড়ছে। আমরা সংসদে বসে যথাযথ দায়িত্ব পালন করছি না। দেশে জিডিপির হার বেড়েছে বলে অহংবোধ করছি! এই রেমিটেন্সের টাকায় ভর করে দেশ আজ সম্মুখের দিকে তাকিয়ে আছে! অথচ রেমিট্যান্স প্রেরক এই যুবকদের দিনগুলো কত নির্মম, রাতগুলো কত কঠিন তা কতজন পিতা-মাতা জানে! দীর্ঘ পথের পানে অসহায় স্ত্রী যখন চাদরের নীচে শুয়ে, একাকীত্বের বেদনায় তুলোর বালিশে মুখ চেপে ধরে। তখন তাঁদের হতভাগা প্রিয়তমেরা রূঢ় মরুর তপ্ত উষ্ণতায় অসহায়ত্বের বন্ধনে পাথরের বালিশকে আলিঙ্গন করে উত্তাল যৌবনের রাতগুলো কাটায়...........
Click This Link
সর্বজনীন পেনশন: সুবিধা বাড়ছে, ভবিষ্যৎ কতটা নিশ্চিত ?

সরকারের মনোভাব সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা কঠিন। ফ্যাসিস্ট আমলের বিতর্কিত 'সর্বজনীন পেনশন' প্রকল্পটি বাতিল না করে বর্তমান সরকার উল্টো নতুন নতুন স্কিম চালু করছে এবং এর সুযোগ-সুবিধা দিন দিন... ...বাকিটুকু পড়ুন
১৯৭১ এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে পাকিস্তান কি বাংলাদেশে জঙ্গি নেটওয়ার্ক গড়ছে?

পাকিস্তানের জঙ্গি গোষ্ঠী লস্কর-ই-তৈয়বার সহযোগী সংগঠন জামাত-উদ-দাওয়ার কয়েকজন নেতা দাবি করেন, হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পেছনে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এই জঙ্গি সংগঠনটির নেতা সাইফুল্লাহ কাসুরি বলেন, তারা ১৯৭১ সালে... ...বাকিটুকু পড়ুন
অচেনা মাটিই আমার শেষ ঠিকানা !
অচেনা মাটিই আমার শেষ ঠিকানা !

পাথর বা গ্রানাইটে বেঁধো না তো আমার শেষ শয্যা,
নাম খোদাই করে রেখো না আমায়, দিতে একা থাকার লজ্জা।
চাই না উপাধি, চাই না তারিখ, ধূসর... ...বাকিটুকু পড়ুন
নৈতিক অবক্ষয়ের দায় কার?
ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের দায় কার?
সমাজে যখন অপরাধ বাড়ে, পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়, সন্তান বাবা-মাকে সম্মান করে না, মানুষ মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারায়, দুর্নীতি-প্রতারণা-সহিংসতা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে- তখন... ...বাকিটুকু পড়ুন
কাতুকুতু'র কাহিনীনামা
কাতুর সাথে কুতু দিয়ে হচ্ছো পগারপাড়,
ফের যদি আসো কাছে বলবো- 'খবরদার!'
একটু হেসে, কাছে এসে, দিচ্ছো বুঝি কাশি,
ঝুলিয়ে দাড়ি, যাচ্ছো বাড়ি, যেথায় আছেন মাসি।
তোমার সাথে, দুধে-ভাতে, গপ্প করছি কত,
তবু কেন, ঘন... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।