বাংলাদেশে নিরীহ বাঙ্গালী ঘরের কাঙ্গালী ছাত্র বলতে যাদেরকে বোঝানো যায় বদর আলীকে তাদের কাতারে অনায়াসে ফেলা যাবে।টেনেহিচরেও তাকে কাতারের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে পর্যন্ত দেখা যাবে না।কারও সাতেও থাকে না কারও পাচেও থাকে না।বাপ মায়ের কথা মত ওঠ,তাদের কথা মত বস,দিন রাত খালি পড় আর কাধে করে বয়ে ভাল ফলাফল ঘরে এনে দেখাও।এই হল তার কাজ।"জীবনে সম্মানজনক কিছু করে তারপর না হয় গঙ্গার জলে ডুবে মরতে যাও"-বাপের এই কথা জন্মের পরপরই বদর আলীর মাথার মগজকে ৩৬০ ডিগ্রী কোনে ঘুড়িয়ে উলটা পথে বসিয়ে দেয়।তাই তার রীতিনীতিও আজকাল গজ ফিতা দিয়ে মেপে বের করা যাবে।
কলেজ জীবনে শেষ ধাপে এসে একবার তার মা তাকে কাছে ডাকিয়া মাথায় হাত বুলিয়ে জানতে চাইলেন,"কি গো খোকা,ইরাম বড় ইন্টার পাস দিয়া তুমি কি নিয়ে পড়তে চাও?" বদর আলী মুখ খুলে নিঃশ্বাস টুকু পর্যন্ত নিতে পারল না।তার আগেই তার মা বললেন,"ও ছেলে আমার ডাক্তার হতে চাও,তাই তো? এই তো আমার সোনা ছেলে।আমি আর তোমার বাবা জানতাম আমাদের ছেলে ডাক্তারি পড়বেই।সামনেই তোমার ইন্টার পরীক্ষা।এতে তো ভাল রেজাল্ট করতে হবে।যাও,আর দাঁড়িয়ে থেকো না,পড়তে বস।রাত দশটা পর্যন্ত পড়ে তারপর খেতে আসবা।" বদর আলী ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখল মাত্র ছয়টা বাজে।সে এবারে তার অর্ধ নিক্ষিপ্ত নিঃশ্বাস টা ছেড়ে তার রুমে পড়তে গেল।
ইন্টার পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই তাকে মেডিকেলের ভর্তিযুদ্ধে নেমে যেতে হল। এ যেন ঠিক তৃতীয় মহাযুদ্ধ।আগে যেখানে দিনে বই নিয়ে টেবিলে সেটে থাকত দশ ঘন্টা সেখানে এখন তাকে বই নিয়ে টেবিলে,খাটে,বারান্দায় সেটে থাকতে হয় টানা ষোল ঘন্টা।তার বাবা মায়ের হুকুম এটাই।তো যাই হোক,একদিন তার ইন্টার রেজাল্ট বের হল।রেজাল্ট যথারীতি ভাল হইল।পরিবারের মুখ ১০০ ডিগ্রী বাল্বের মত উজ্জ্বল হইল।কিন্তু বাপ মায়ের মন তখনও প্রাপ্তিতে ক্ষান্ত দেয় নাই।ছেলেকে যে সরকারি কোন মেডিকেলে পড়তে হবে।দিন রাত বদর আলীর কানের সামনে তারা ঘ্যানর ঘ্যানর করতে থাকল,"জীবনে যদি কিছু করে খেয়ে পড়ে বাচতে চাও তাহলে সম্মানজনক কিছু করবা।নাহলে এখনি যাও রিক্সা চালাতে।ডাক্তারি পেশার চেয়ে সম্মানজনক আর কিছুই নাই।ইঞ্জিনিয়ার হইয়া কি খালি ঘুষ খাইবা?"
টানা তিন মাস নিরলস পরিশ্রম করার পর অবশেষে বদর আলী মেডিকেলে ভর্তি পরিক্ষা দিতে গেল।তার মাথায় রাজ্যের সব চিন্তা এসে ভর করেছে কেননা তার বাবা মা তাকে অন্য কোথাও পরীক্ষা দিতে দিবে না।অন্যদিকে যদি সে এখানে চান্স না পায় তাহলে একদিকে যেমন সে বাবা মার কাছে মুখ দেখাতে পারবে না অন্যদিকে বাবা মা তার মুখ দেখতেও চাইবে না।অন্য কোথাও ভর্তি হবার সুযোগ নেই কেননা সে অন্য কোথাও ভর্তির ফর্ম কিনেই নি।তার বাবা মায়ের কড়া হুকুম,অন্য কোথাও পরীক্ষা দেয়া লাগবে না।প্রাইভেট এ তাকে তো পড়তেই দিবে না কারন তার বাবা মার মাথায় সরকারি ভুত ভর করেছে।সরকার এখন একদিকে যেমন দেশ চালাচ্ছে অন্যদিকে মানুষের মগজকেও চালিয়ে নিচ্ছে।
শেষমেষ সকল চিন্তাকে জলাঞ্জলি দিয়ে,অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে কচু দেখিয়ে বদর আলী ঢাকার এক নামজাদা সরকারী মেডিকেলে চান্স পেল।এবার তার বাবা মা খুশিতে আটখানা।ছেলে তাদের যেন চান্স পেয়েই ডাক্তার হয়ে গেছে।ওইদিকে বদর আলীর মাথায় তখন বসে আছে তার বন্ধু মহলের টিটকারি,"মেডিকেলে পড়লে তো তোকে সারাদিন পড়তে হবে।তুই তো মরেই যাবি।এমনকি তোকে সারাজীবন পড়তে হবে।সারাদিন খালি কলুর বলদের মত খাটবি কিন্তু নিজে কোন আরাম করবি না।"
বদর আলীর আর কিছুই করার থাকে না।বাবা মার ইচ্ছা পূরন করতে গিয়ে এখন তাকে তার সকল ইচ্ছাকে বিসর্জন দিতে হবে।সে এখন তাকিয়ে আছে তার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে।
চলবে.........

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


