বছরের সেরা মাস আসতে আর বেশি বাকি নেই। এই মুহূর্তে খুব জানা কথাগুলোও আবার মনে করা দরকার, ধূলোবালি পড়ে বিস্মৃত হচ্ছে। নিজেকে মনে করানোর দায় নিয়েই লিখছি, কারও উপকার হলে ভালো লাগবে।
'সব মানুষের মুসলমান হয়ে জন্ম হয়, তারপর ওরা বড় হয়ে নিজেদের ধর্ম বেছে নেয়'--এই কথাটা আমাদের সমাজে খুব প্রচলিত কথা। কিন্তু যেই হাদীস থেকে কথাটা বলা হয়, সেখানে বলা হয়েছে, সবার জন্ম হয় 'ফিতরার' উপর, তারপর তারা বড় হয়ে নিজেদের ধর্ম বেছে নেয়।
'ফিতরা' হচ্ছে ভালো আর খারাপ আলাদা করার জ্ঞান, বোধ, চেতনা। মিথ্যা বলা ঠিক না, সেটা জানতে হলে বিশাল আলেম হওয়া লাগবে না, ছোটবেলা থেকেই মানুষ জানে, বুঝে। এটাই ফিতরা। সমস্যা হচ্ছে, সমাজে অনেক সময় খারাপকে খারাপ বলা হয় না। সমাজে একজন দ্বিমুখীচরিত্রের মানুষ যত সহজে উন্নতি করতে পারে, পুরাপুরি সৎ মানুষ তা হয়তো পারে না। এসব দেখে দেখে আমরা ভিতরের সেই ভালো মন্দ বুঝে নেয়ার ক্ষমতাটা ব্যবহার করা আস্তে আস্তে ভুলে যাই। প্রথমবার মিথ্যা বলার সময় চোখের পাতা নড়ে যায়, দ্রুত হার্টবিট হয়, খুব কষ্ট হয়। মিথ্যা বলে ফেলার পর ভিতরের খচখচানি যেতে চায় না। দ্বিতীয়বারও সেরকম হয়। কিন্তু আস্তে আস্তে ভিতরের খচখচানিতে অগ্রাহ্য করতে থাকলে, ভিতরের সেই আর্তনাদ শোনার কান বধির হয়ে যায়। তখন নির্লিপ্ত ভাবে মিথ্যা বলা যায়, উঠতে বসতে, নিজের দ্বিতীয় সত্ত্বার মত সহজাত ভাবে।
পাপের ব্যাপারে রাসুল (সা) এর দেয়া সংজ্ঞাটা আমার দারুণ লাগে--যখন একজন জিজ্ঞাসা করলেন পাপ অর্থ কি, তখন তার জবাবে তিনি বলেছিলেন, 'তোমার বিবেক যাতে সায় দিবে না, তাই পাপ, সেটা থেকে দূরে থাকো।' (তিরমিজী)
এবার নিজের দিকে তাকানো যাক। প্রতিদিন কত ছোটখাট ঘটনা হয় যাতে আমাদের বিবেক সায় দেয় না, কিন্তু আমরা বিবেকের দরজা বন্ধ করে রাখি।
রাস্তায় কাউকে দেখে খুব খারাপ লাগলেও, 'কতজনকে আর সাহায্য করতে পারব' বলে বিবেকের দংশন নিয়ে পালাই। চোখের সামনে বাসে একটা মেয়ের গায়ে হাত দেয়া হলো, দেখি না। কোথাও ঘুষ দিলে কাজ একটু তাড়াতাড়ি হবে, বিবেককে মুখ খোলারও সময় দেই না… আর টেকনিক্যাল সত্য কথা? যেই কথাগুলো আক্ষরিক ভাবে মিথ্যা না, কিন্তু কথাগুলো এমন ভাবে সাজানো হয়, যেন শ্রোতা বিভ্রান্ত হয়? আপনার ব্যাংক একাউন্টে যদি কেউ ভুল করে টাকা জমা দিয়ে দেয় নিজের একাউন্টের বদলে, তখন কি করবেন? টাকাটা টেকনিক্যালি আপনার, আইন আপনাকে ধরতে পারবে না। কিন্তু বিবেকের খচখচানি কি যাবে? সামনে বসেই একজন আরেকজনের বদনাম করছে, শুনতে ভালো লাগছে না, তবু কিছু বলি না, শুনে যাই। এরকম অসংখ্য ঘটনা হয় প্রতিদিন, আমরা ক্রমাগত বিবেককে শাসাই, চুপ থাকতে বলি, রক্তাক্ত হতে দেই, নিজেরা নির্লিপ্ত থাকার চেষ্টা করি।
সবচেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে, যখন আল্লাহর কোন অধিকারের ব্যাপারে ভিতরের খচখচানিকে বধ করা হয়। শুনেছি, যাকাত ফাঁকি দিতে নাকি অনেকে মুখে মুখে গয়না ভাগ করে দিয়ে রাখে। তাতে ক্ষতিটা কার হয়? টেকনিকেল নিয়ম পার হওয়া যায়, কিন্তু এর বাইরে কি আর কিছু নেই? মুহাম্মদ (সা) একবার আয়েশা (রা) কে একটা খাসী রাঁধতে দিয়ে গেলেন। দিনের শেষে বাড়ি ফিরতেই আয়েশা (রা) জানালেন রাসুল (সা) কে জানালেন, 'আমি সব বিলি করে দিয়েছি, শুধু মাথাটাই বাকি আছে'। শুনে রাসুল (সা) হেসে বললেন, 'বলো, শুধু মাথাটা নেই, আর সব আছে।' বিশ্বাস দৃঢ় না হলে, শুধু মুখে বিশ্বাসের কথা বলে, আবার তাকে ফাঁকি দেয়ার ফিকিড় খুঁজলে কি লাভ?
যারা বিবেকের কথা শুনে, তাদের সাথে একটু মিশলেই বুঝা যায়, কথায়, কাজে, ভীষণ রকমের স্বচ্ছতা। অনেকের কাছে ঠকে যায় হয়তো অনেক সময়ই, কিন্তু নিজের কাছে ঠকে না একদম।
রোজার সময় মোক্ষম সুযোগ বিবেকের কথা শোনার। জানেন তো, এই সময়ে শয়তানেরা বন্দী থাকে, তাই ব্যাক গ্রাউন্ড নয়েজ কম। চেষ্টা করলেই শুনতে পারবেন বিবেকের আওয়াজ। এই রোজায় চেষ্টা করুন--
১. নিজের বিবেকের কথা শুনতে।
২. আল্লাহর কথা বেশি করে মনে করতে। ("তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। আশা করা যায়, তোমরা আল্লাহর ভয় অর্জন করতে পারবে (সূরা বাকারা) )। আমরা অনেকেই আল্লাহকেই ঠিক মত চিনি নি, তাকে ভয় করবো কি করে? কি অসম্ভব সুন্দর সুন্দর গুনাবলী আছে আল্লাহর--'আল ওয়াদুদ'--যিনি এতটাই ভালোবাসেন, যতটা ভালোবাসা পাওয়ার বা দেয়ার কথা আমরা ভাবতেই পারি না। 'আল আফ'য়ূ'--যিনি সব খারাপ কিছুর শেষ চিহ্ন পর্যন্ত এমন ভাবে মুছে নিয়ে যান, যাতে একদম বুঝা যায় না সেখানে অন্য কিছু ছিল। 'আল মুজিব'--যিনি সব চাওয়ার উত্তর দেন। এরকম নিরানব্বইটা দারুণ দারুণ নাম। আল্লাহকে চেনার চেষ্টা করতে পারেন। আল্লাহর চিঠি, কুরআন, এখন আপনার ঘরেই আছে। কুরআন বুঝার চেষ্টা করতে পারেন এই মাসে।
৩. মাঝে মাঝে ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুন বা এরকম কোন আবেগঘন ঘটনা ঘটলে বুঝা যায়, আমাদের খুব ভিতরে রাসুল (সা) এর প্রতি তীব্র ভালোবাসা আছে। কিন্তু ভালোবাসার আসল প্রকাশ হওয়া চাই! তার সম্পর্কে আরও বেশি জানতে হবে, আর তিনি যা করতে ভালোবাসতেন, তা করতে হবে। রাতে তাহাজ্জুদ, প্রতিবার ওজু করার সময় দাঁত ব্রাশ, ইত্যাদি কয়েকটা উদাহরন।
৪. একটা ভালো কাজের অভ্যাস করুন। আইডিয়া: ঘরের কোণে একটা মাটির ব্যাংক রাখুন, সারা মাসের খুচরা পয়সা জমিয়ে ভালো কিছুতে দিন। রোজার পর থেকে প্রতি মাসে তা-ই করুন।
৫. একটা খারাপ অভ্যাস দূর করুন। সেটা আড্ডায় বসে চুপচাপ কূটনামী শোনা বন্ধ করাই হোক আর ব্লগাতে বেশি সময় খরচ করা হোক!
শেষ করছি ইমাম শাফী' (রহঃ) এর কথা দিয়ে:
"যাদের জ্ঞান আছে, তারা ছাড়া অন্য সবাই মৃত।
যাদের জ্ঞান আছে এবং ভালো কাজ করে, তারা ছাড়া অন্য সবাই ঘুমন্ত।
আর যাদের জ্ঞান আছে, এবং ভালো কাজ করে নিষ্ঠা এবং সততার সাথে, তারা ছাড়া অন্য সবাই ধোঁকায় আছে।"

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

