বই চুরি করা খারাপ যারা এইসব ফাউল কথা বলে তাদেরকে নিন্দাবাদ জানিয়ে শুরু করছি।
আমাদের দেশে বইমেলা দুইটা। কিন্তুক গ্রন্থ-মেলা তেমন জমেনা, আর একুশে বই-মেলায় লোকে লোকারন্য হয়। এর মুল কারন বই চোরাদের জন্যে একুশে বই-মেলায় পরিবেশ অনেক সহজ থাকে।
বই চুরিতে ওস্তাদ হতে হলে প্রথমে আপনাকে আপনার পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।
১। কোথা থেকে চুরি করবেন কি চুরি করবেনঃ
একদল লোকের ধারনা যেখানে সবচেয়ে বেশি ভীর থাকে সেখান থেকেই বই চুরী করা সহজ। সাধারনত হুমায়ুন আহমেদ, জাফর ইকবাল এদের বই ওয়ালা স্টল গুলোতে ভীর বেশী হয়। নর্মালী, অবসর (ইদানিং মননশীল বইয়ের দিকে বেশী ঝুকেছে), মওলা ব্রাদার্স, কাকলী, সময় এদের স্টলেই ভীরটা বেশি থাকে। কিন্তুক একটু খেয়াল করলেই দেখবেন এদের স্টলের লোকজনও বেশী থাকে। এবং এরা খুব ধারালো চোখের হয়। বই হাতে নিয়ে পাতা উল্টানোর সময় চোখ গুলো সুপার গ্লু দিয়ে আটকে রাখে ক্রেতার দিকে। বই নিয়ে ভিরের মধ্যে হারিয়ে যাওয়াটা কঠিন, তবে যদি টিমওয়ার্ক ভালো থাকে এবং হাতের কাজ ভালো জানেন, খুব সহজে বই পিছে পাচার করে দেয়া যায়, কিংবা বই নিয়ে পড়তে পড়তে ভীরের মাঝে হারিয়ে যাওয়া যায়।
তবে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র (কম দামে ভালো বই), সন্দেশ এরাও ভালো পরিবেশ মেইনটেইন করে। আমি ব্যাক্তিগত ভাবে আজিজ মার্কেট বেসড লাইব্রেরী গুলো পছন্দ করি (যখন বই মারতাম তখন, আর এখন বই কিনি এখনো)। সেবা প্রকাশনীতে কিশোর বয়সী পাঠকদের ভীরটা বেশী হয় তাই এখান থেকে বই মারা সবচেয়ে সহজ।
২। কি বই মারবেনঃ হুমায়ুন আহমেদ, জাফর ইকবাল, আনিসুল হক এদের বইয়ের উপর ভীর বেশী, এবং দোকানদারেরা এদের বইকে বেশী চোখে চোখে রাখে। আমি বলবো, এদের বইয়ের ব্যাপারে সতর্ক থাকবেন। তবে এই বইগুলো মারা একটু কঠিন হলেও অসম্ভব না। অনেক বছর বই মারি না দেখে গত বইমেলায় পরীক্ষামুলক ভাবে চেষ্টা করে আমি হুমায়ন আহমেদের একটা অমনিবাস হাপিশ করে দিছিলাম। মনে রাখবেন যেই স্টলে ব্যাবসা সবচেয়ে খারাপ সেই স্টল খালি করে দেয়া সবচেয়ে সোজা।
৩। সময়ঃ বইমেলায় বই মারার জন্যে সময় একটা ফ্যাক্টর। বিকেলের পরে ভীর বেশী হয়। আর দোকানদারেরাও সতর্ক থাকে । তবে অসম্ভব নয়। সাধারনত ১১/১২টার দিকে বইয়ের দোকানদারেরা একটু অসতর্ক থাকে, ক্রেতাও কম থাকে। এসময় একটু চেষ্টা করলেই আপনি আপনার পার্সোনাল লাইব্রেরীর সংগ্রহকে দ্বিগুন করতে পারেন।
৪। টিম-ওয়ার্কঃ বই মারার ক্ষেত্রে এটাই সবচেয়ে জরুরী কাজ। আপনার টিমকে কয়েকভাগে ভাগ করুন। কম অভিজ্ঞ কিংবা বই পড়ায় কম আগ্রহ শুধু ঘুরতে আসছে এরকম সদস্যদের পিছে রাখুন ভীর বাড়াতে, এরা আপনার ব্যাক আপ টিম। একান্ত খারাপ মুহুর্তে এরা গলাবাজি করে আপনার ইজ্জত রক্ষা করবে (এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা নাই, কোনদিন ধরা পড়ি নাই)। অতিদক্ষ কিংবা অভিজ্ঞ বই চোরাদের মিডফিল্ডার হিসাবে রাখুন। এদের হাতে অল্প কিছু বই থাকবে (কেনা) এবং এরাও ভীরের অংশ। এদের কাজ হবে একটু পর পর ভাব করা যে লোকের ভীরে নিবিষ্ট বই প্রেমী হিসাবে বিরক্ত, কিংবা লোকজনের ভালো বইয়ের প্রতি আগ্রহ নেই (এরা আতেঁল চেহারার হবে), স্ট্রাইকার হিসাবে যারা থাকবে তারা মোটামুটি বই চোর (এরা মিডফিল্ডারদের মতো দক্ষ না)। এদের চেহারা সুরত ভালো হবে। অবশ্যই কিছু মেয়ে বন্ধু সাথে রাখবেন। সুন্দরী মেয়ে হলে দেখবেন দোকানদার আর সবার লক্ষ তার দিকে, তার হাত কোন বই কোথায় পাচার করবে কেউ দেখবে না। স্ট্রাইকারেরা খুব অসহিষ্ণু পাঠক হবে। একটা বই নেবে, একটু দেখেই চেঞ্জ করে আরেকটা নেবে, ঐটার প্রাইস ট্যাগ দেখে চোখ মুখ কুচকে আরেকটা নেবে। পুরুষ স্ট্রাইকারেরা দোকানদারের সাথে পারলে গল্প করার চেষ্টা করবে (বেশী ভীর না হলে), প্রশ্ন গুলো মননশীল হলে ভালো, যেমনঃ কাফকার ঐ বইটার বাংলা অনুবাদ অমুক ভাই করছিলেন, ভালো হয় নাই। সমারসেট মমের মুল বই এত টাকায় পাওয়া যায়, অনুবাদের এত দাম কেন। চেষ্টা করবেন বিখ্যাত লেখকদের নামের শেষে ভাই প্রত্যয় যোগ করতে এবং দুর্গম লেখকদের নিয়ে কথা বলতে। এক্ষেত্রে একসাথে কয়েকটা বই হাতে নিয়ে ঘাটতেও আপনাকে কেউ বাধা দেবেনা। দোকানদার অন্যমনষ্ক হলেই আপনি বই মিডফিল্ডারের হাতে পাচার করে দেবেন।
কিছু লক্ষ্যনীয়ঃ বই মেলায় কিছু বই কিনবেন। একদোকানে পাঁচটা বই নাড়লেন, সেখান থেকে ৩টা হারালো ১টাও কিনলেন না, খালি ফাউল প্যাচাল পারলেন দোকানদারের সাথে, এমন করলে ধরা পড়ার সম্ভবনা আছে। কোন বই খুব পছন্দ হইছে, দোকানদার সতর্ক, কিছু বই কিনলে দোকানদার আপনার প্রতি শ্যেন দৃষ্টি দেবেনা এই ফাঁকে আপনি বই হাপিশ করে দেবেন।
বই মেলায় যাবার আগে গতদিনের কেনা বইগুলোর প্যাকেট সাথে নেবেন। কিছু কেনা বই, আর চোরা বইগুলো প্যাকেটে ভরে দিলে কেউ বুঝবেনা। সবচেয়ে কঠিন কাজ বই চুরি করে সরে আসাটা। এক্ষেত্রে পুরা দল একত্রে সরে আসবেন না। আস্তে আস্তে প্রথমে মিডফিল্ডার, পরে স্ট্রাইকার, এরপরে ব্যাক-আপ টিম সরবে। তবে মেয়ে স্ট্রাইকারেরা সবার শেষে সরবে।
ধরা পড়লেঃ আমি কখনো ধরা পড়ি নাই। কিন্তু কয়েকজন ধরাখাওয়া লোকের অভিজ্ঞতা শুনেছি। এক্ষেত্রে অস্বীকার করার চেয়ে বইএর দাম দিয়ে দেয়াটা সবচেয়ে নিরাপদ। কখনো দোকানদারকে হুমকি দেবার চেষ্টা করবেননা, কিংবা ঝগড়া করবেন না। শান্ত থাকবেন। ভদ্র গলায় বলুন, ভাই ভুল হয়ে গেছে। কিংবা মনে ছিল না। এইসব হাবিজাবি বুঝিয়ে আস্তে আস্তে মান সম্মান বাঁচান।
আমার অভিজ্ঞতাঃ ন্যাশনাল লাইব্রেরী আমার বাড়ির কাছে। তখন নাইন-টেনে পড়ি।বই পড়তেছিলাম। এক আপুকে দেখি টিফিন বক্সে করে বই পাচারের সময় ধরা খেল। কৌতুহুলী হয়ে নিজের কৌশলে কিছু মোটা বই (বিভুতিভুষন অমনিবাস) মেরে দিয়ে প্রাকটিস করলাম। কিছুদিনের মধ্যেই স্থানীয় এক লাইব্রেরীর কয়েকটা শেলফ খালি করে দিলাম। লাইব্রেরীয়ান বললো, আপনি আর আসবেন না। আপনাকে কিছু করতে দেখি না, কিন্তুক আপনি আসলে বই এর সংখ্যা কমে যায়। বিশ্বসাহিত্যের গাড়িতে চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে কয়েকশ বই মেরে কলেজে থাকতে বিশ্বসাহিত্যের মুল লাইব্রেরীতেও ঘন ঘন হামলা চালালাম। এরপরে কলেজের দল বেধে বইমেলায় নিয়মিত হামলা চালাতাম। কলেজ জীবন শেষ হলে বই চুরী থেকে সফল অবসর নেই। এর পরে অনার্স জীবনের একদম প্রায় শেষের দিকে গতবছর বই মেলায় পরীক্ষামুলক হামলা চালিয়ে দেখলাম অনভ্যাসে বিদ্যায় জং ধরে নি। মোটামুটি বইয়ের রুচি পাল্টেছে, নেটে অবারিত দরজা, ফ্রি ডাউনলোড। তাই ইচ্ছা আছে এবারে নিজেকে কন্ট্রোল করবো। বই মারবো না।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১০ রাত ২:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



