
নানুবাড়ীর পথে পথে
প্রচন্ড শীত পড়ছে। যাকে বলে হাড় কাপুনি শীত। না ঢাকা শহরে নাই। নিজ মফস্বল শহরের বাইরে নানাবাড়ীর কাছে (কাছে বললাম এই কারনে যে, নানু বাড়ী গ্রামে সেখানে এখন আর কেউ থাকে না) নানু বাড়ীর কাছেই এক অখ্যাত মফঃস্বল শহরে আছি খালা বাড়ীতে। এটা এমনই এক শহর, নামেই শহর। যেখানে দিনের তিন/ চার ঘন্টা বিজলী বাতি থাকে। শহরে চলে না কোন রিক্সা, শুধু ভ্যান গাড়ী। তবে এগুলো কোন অভিযোগ না, এগুলো উপভোগ করার জন্যই এই শীতে সন্তানদের সহ খালা বাড়ী আসছি।

ভ্যানে করে নানুবাড়ী যাওয়া
বাবা সরকারী চাকুরী করত। সেই ৭০/৮০ র দশকে যখন স্কুলে পড়তাম চাতক পাখির মত তাকিয়ে থাকতাম ডিসেম্ভর মাসের দিকে কবে স্কুল ফাইন্যাল দিয়ে নানু বাড়ী যাব। প্রতি ডিসেম্ভর মাসে আমাদের এক মাস রুটিন ছিল মাকে নিয়ে নানুবাড়ী বেড়াতে আসা। সব মামাতো খালাতো ভাই বোনেরা চলে আসত নানু বাড়ী। আসলে তখন সময়টাই ছিল এমন। এখন যেমন শীত পড়লে সবাই কক্সবাজার, কুয়াকাটা, কিংবা সাজেক গিয়ে তিন চার দিন থেকে “বুড়ী ছুয়ে আসে” ( বুড়ী ছুয়ে আসা একটা গ্রাম্য খেলা আমাদের সময় বেশ প্রচলন ছিল ছোটদের মাঝে)। মানে কোন রকম কোন হোটেলে নিজ পরিবার নিয়ে তিন চার দিন কাটিয়ে কি সব দেখে দুখে আবার ঢাকা ফিরে এসে জঞ্জালের নগরীতে সপে দেয়। আমাদের সময় এই সব দেখানো জিনিস ছিল না।

প্রায় ভেঙ্গে যাওয়া নানু বাড়ী
শীতে নানু বাড়ী যাওয়া মানে সব মামাতো খালাতো ভাই বোনেরা আর না হলেও ১৭/ ১৮ জন এক জায়গায় হতাম আমার নানুর ৮ ছেলে মেয়ে। ছোট মামা তখনো বিয়ে করেনি সেও ঢাকা ভার্সিটি দিয়ে গ্রামে হাজির হত। হয়ত কোন দিন রাতে ঘুমিয়ে আছি হঠাৎ রাত তিনটার দিকে মায়ের ডাক “এই ওঠ ওঠ, রাইত্তা শিন্নী হইছে” মানে রাত বারোটার দিকে বাড়ীর কামলাদের ( যারা বাড়ীতে কাজ করত) দিয়ে খেজুর গাছে উঠিয়ে রসের হাড়ি নামিয়ে সেই সময় শিন্নী রান্না করত। রাত তিনটায় আমাদের মত ভাইগ্না ভাগ্নিদের মামা খালা বা মা উঠিয়ে হ্যারিকেনের আলোতে সে শিন্নী খেতে দিত। আহ কি স্বাধ সেই রাইত্তা শিন্নীতে, কি যে মজা বোজানো যাবে না।

খেজুর গাছের সারির মধ্য দিয়ে হেটে যাওয়া
তবে সব থেকে মজা পেতাম নতুন ধান উঠলে সামনের ঊঠানে সব ঘরের (ওই বাড়ীতে ছয়টা ঘর ছিল, এরা সবাই আবার আমার নানার আপন ভাই না হয় চাচাতো ভাই) ধান মেই দেয়া হত (মেই মানে এক জায়গায় সুন্দর করে ডীপ করে রাখা )। বাড়ীর প্রতিটা ঘরের আবার নাম ছিল যেমন উত্তরের ঘর, মধ্যের ঘর, ন’মেয়ার ঘর, ডাক্তারের ঘর এই টাইপের আর কি। সেই ধান পাহারা দেবার জন্য ওই সব মেইর মধ্যে কি এক দারুন কৌশলে ছোট ছোট “কুইড়া” (পুরাটাই খড় দিয়ে বানাত, নীচে চাটাই তার ওপর তোষক দিয়ে আরামের সু ব্যাবস্থা থাকত) বানাত কামলারা। আমার নানার চার জন কামলা ছিল তাদের সর্দার ছিল উজ্জ্বল ভাই (কিছু দিন আগে মারা গেছে)

উঠানে ধান শুকা দেয়া
এই কুইড়া গুলোর মধ্যে মাঝ রাত পর্যন্ত গরু দিয়ে “মই” (গরুর মুখে ঠুলি পড়িয়ে তিনটা বা চারটা গরুকে এক জায়গায় কিছু ধান ছড়িয়ে ঘন্টার পর ঘোরানো হত আর গরুর পায়ের নীচে ধানের শীষ থেকে ধান গুলো আলাদা হতে থাকত।) আমরা ছোটরা ওই মেই, কুইড়া কেন্দ্র করে “পলাপলি” খেলতাম। তবে বেশী দূরে যেতাম না কারন নিকষ অন্ধকার, এর মাঝেই একটু দূরে ছিল বাদাম তলা, বকুল তলা, তার নীচে শান বাধানো বসার সিড়ি থাকত। কিন্তু একলারা ওই দিকে পা বাড়াতাম না। তবে রাত ৯/১০ টা পর্যন্ত মামারা ওখানে গুল তাপ্পি মারত।
কোন কোন দিন সকাল মানে অন্ধকার থাকতে থাকতে ঘুম দিয়ে উঠে পা টিপে টিপে দোতালা (নানার ঘর ছিল কাঠের সিড়ি কাঠের পাঠাতন দেয়া দুই তলা চারিদিকে ইটের গাথুনি) দিয়ে নেমে আসতাম। আগে থেকেই ঠিক করা থাকত কে কে যাব। সূর্য্য ওঠার সাথে সাথেই “কোলা”য় (ধানের মাঠ) গিয়ে ধানের শীষ (অনেকটা এখনকার কোকের বোতলে যে ষ্ট্র দেয় সেই রকম) তুলে এনে ছোট খেজুর গাছ পেলে হাড়িতে সেই ধানের শীষ ডুবিয়ে পেট ভরে রস খেয়ে রসের হাড়িতে পানি দিয়ে আসতাম। পরে “গাছ কাটুনী” এসে যখন রসের হাড়ি নামাত তখন তার চিৎকারে গোল বেধে যেত। ধরা পড়লে মার হাতের মাইর থেকে রক্ষা ছিল না, কিন্তু নানু থাকতে কার এত বড় সাহস আমাদের গায়ে হাত দেয়! মাঝে মাঝে নৌকা নিয়ে বেড়িয়ে পড়তাম।

ট্রলারে করে আবার খালা বাড়ী ফেরত যাওয়া নানু বাড়ী থেকে
শীতের দিনে ধান খাওয়া হাসের মাংসের সোয়াদই আলাদা, তাই ওই এক মাসে অন্তত দুই দিন হাসের মাংস চালের গুড়ার রুটি পিঠা সহযোগে উদরপূর্তি হত। এখন সেই ধান খাওয়া হাস কোথায়? দুপুর বেলা খাস পুকুরে (বিরাট পুকুর অনেক টা দীঘীর মত, তখন এর পানি খাওয়া হত, কারন বাড়ীতে বাড়ীতে টিউব ওয়েল ছিল না) লাফালাফি। হি হি করতে যখন উঠতাম তখন আম্মার রাগারাগি গালাগালিতে একশেষ। কিন্তু ওগুলো ধর্ত্যব্যের মধ্যে আসত না।

এই সেই খাস পুকুর।
বড় মামী আর মেজ মামী ছিল খাবার ডিষ্ট্রিবিউশানের দায়িত্বে এই আমাদের ১৭/১৮ জন ভাগ্না ভাগ্নির। ঘরে তখন সব মিলিয়ে ৩০ জন মানুষ। হাইল্লা, কামলা, কাজের মহিলা মিশিয়ে ৩৬/৩৭ জন। তিন বেলা ভাত, সকালে ভাতের সাথে দুই তিন ধরনের ভর্তা আর ডাল, দুপুরে মাছ সব্জি (নিজেদের বাগানের)। রাতেও ওই রকম। পাতের শেষে পড়ত খেজুরের গুড় আর নারিকেল মিশিয়ে ভাত। আহ যে না খেয়েছেন খেজুরের ঘন গুড়, নারিকেল কোড়ানো আর ভাত তাকে অমৃতের স্বাধ বোজানো যাবে না।
দোতালায় দক্ষিনের “কোডা”য় ( রুম) আম্মা আমাদের দুই ভাইকে নিয়ে থাকতেন পাশের খাটে থাকত খালামনি। রাতে পেশাব পায়খানা আসলে এক ভয়াবহ ব্যাপার ছিল। টয়লেট ছিল ঘর থেকে বেশ খানিকটা দূরে। চারিদিকে বিভিন্ন গাছ গাছালি তার মাঝে টয়লেট। এর মাঝে প্রায়ই শুনতাম ওই বাড়ীতে কারে যেন জ্বীনে ধরছে, মোল্লা বাড়ীর চালে ঢিল পড়ছে, তালুকদার বাড়ীর কারে জানি রাতে উড়িয়ে নিয়ে গেছে। সে এক বিতিকিচ্ছিরি ভয়াবহ ব্যাপার। রাতে টয়লেট চাপা মানে দুইজন হ্যারিকেন নিয়ে সাথে যেত আর বদনা ভরে সেই টিনের টয়লেট ঘরে ঢোকা আর সব বিভীষিকা মনে পড়া।
গ্রামে প্রত্যেক বাড়ীর সামনে বাড়ীর গোরস্থান। আমরা শহরে মানুষ, বাড়ীর সামনে গোরস্থান দেখতে অভ্যস্থ নই, দিনে অসুবিধা হত না রাত বাড়লেই সব ভুত পেত্নী গুলো নেমে আসত! সব কাজিনরা গাদাগাদি করে এক জায়গায় ঘুমাতাম। সে যে কি সব দিন খুব ফিরে পেতে ইচ্ছে করে অথচ সেই কাজিনের একজন আমার ঢাকার বাসা থেকে ১৫ মিনিটের পথ তার সাথে মাসে এক দিন দেখা হয় কিনা সন্দেহ আর যার একটু দূরে তার সাথে বছরেও না।
যাই হোক শীতের রাত খালা বাড়ীর টিনের চালে টুপ টাপ শিশির পড়ছে, মাঝে মাঝে হাল্কা অপার্থিব একটা পরিবেশ। নিজেকে ফিরিয়ে নিয়ে গেলাম ছোট বেলায়। নানুবাড়ী ঘুরে আসলাম, নানা তো সেই কবে মারা গেছে, নানুও ৯০ বছর বয়সে ২০০৫ এ মারা গেছে। সেই গম গম করা ৩৬/৩৭ জন মানুষের ঘরে এখন দুজন কেয়ার টেকারের মত স্বামী স্ত্রী থাকে কোন রকম দেখে রাখে মামা, খালা সবাই দেশে বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় সেটেল। বাড়ীর ছয়টা ঘরের দুইটা ঘরে তালা মারা। সারা বাড়ীতে ছয় সাত জন মানুষ থাকে কিনা সন্দেহ, তাও নিজেদের আত্মীয় স্বজন বেশী না। সেই গাছটা ছুয়ে দেখলাম যে গাছে দোলনা বেধে দোল খেতাম, দোতালায় দক্ষিনের কোঠায় গিয়ে দেখি খাটগুলোতে ঘুনে ধরছে অথচ এক সময় এখানে আমরা ঘুমাতাম। মাস শেষে বাপী আসত, এসে আবার নিয়ে যেত।
আমার সন্তানদের আমি দেখাতে নিয়ে আসছি কোথায় কেটেছে আমার সোনালী শৈশব কৈশোর, তাতে তাদের খুব একটা মজা পাবার কথা না তবে খাস পুকুরে নেমে তারা যখন গোসল করছে আর মাছ ধরছে ভালো লাগছে দেখে, কাসার গ্লাসে পানি খেতে গিয়ে অনভ্যস্থতায় খেতে পারে নি বাধ্য হয়ে কাচের গ্লাসের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। ওদেরকে দেখালাম “দ্যাখ বাবারা এখানে তোদের মত সময়ে, আমরা কত কি করছি," তারা শুনছে মাঝে মাঝে প্রশ্ন করছে।
সবাই ঘুমে, আমার ঘুম নেই এমনি শীতের সময় এক সময় আমার স্বার্নালী সময় কেটেছে। আমি আবার ফিরে যেতে চাই। বুকের কোথায় যেন দলা বাধা কষ্ট।।
ছোট বেলার কিছু খেলার স্মৃতি চারন হারিয়ে যাওয়া ছোটবেলার খেলাগুলো
অনেক বছর আগে একটা কবিতা ছবি ব্লগ আমার নানু বাড়ী নিয়ে আমার দেখা পৃথিবীর সুন্দরতম জায়গা ( একান্ত ব্যাক্তিগত মতামত। একটি ছবি ব্লগ)
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে ডিসেম্বর, ২০১৯ রাত ৯:০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



