
বই পড়ার অভ্যেস এই প্রজন্মের মাঝে প্রায় চোখেই পড়ে না, অথচ আমাদের সময় বই পড়াই ছিল শৈশব কৈশোরে সব থেকে মারাত্মক নেশা। সেকালে আমরা পড়ার বইর নীচে গল্পের বই পড়তাম আর ধরা পড়লে বাবা, মার হাতে মিনিমাম এক গাদা দাত খিচুনি, ম্যাক্সিমাম তাল পাখার ডান্ডার বাড়ী প্রায় অবধারিত, পাঠ্য পুস্তকের বাইরে অন্য বই একটা নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে পড়তে দেখলে স্যারদের মন্তব্যে আসত এ ছেলেকে দিয়ে আর কিছু হবে না। নভেল পড়েই উচ্ছন্নে যাবে। আপনাকে বুজতে হবে মোবাইল সেট তো দুরের কথা সে সময় মফস্বল টাউনে টেলিভিশন, ডায়াল টেলিফোন ছিল হাতে গোনা কয়েকটি বাসায়।
ক্লাশ ফাইভে বসেই সে সময়ে প্রকাশিত বিশ্বের ম্যাক্সিমাম ক্ল্যাসিক বই (বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া থেকে বাংলায় প্রকাশিত অনুবাদ) পড়া হয়ে গিয়েছিল। উল্লেখ্য করা অপ্রাসাঙ্গিক হবে না যে আমার মায়ের পরিবারের সবাই গল্পের বই পড়তে উৎসাহী, আমার ৭৪ বছরের বৃদ্ধা মা, ৭৯ বছরের বৃদ্ধা খালা, ৭৭ বছরের বৃদ্ধ মামা এরা এখনো রহস্য পত্রিকা থেকে হালের শীর্ষেন্দু নিয়ে চোখের সামনে মেলে পড়ে। টম সয়্যার, হাক ফিন, রবিনসন ক্রুশো, প্রফেসর শঙ্কু, ফেলুদা, অলিভার টুইষ্ট, লা মিজারেবল, চিলড্রেন অভ দ্য নিউ ফরেষ্ট, টু সিটিজ, ট্রাজেডি অভ শেক্সপীয়র, রবিনহুড, দস্যু বনহুর, দস্যু বাহরাম, শার্লক হোমস এদের বা এদের সমগোত্রীয়দের সাথে ওই ক্লাশ ফাইভ সিক্সেই পরিচয়ের হয়ে গিয়েছিল, ললিতা কে চিনেছিলাম ক্লাশ এইটে, এমিলি জোলার উপন্যাসগুলো গোপনে ততদিনে এক রাউন্ড পড়া হয়ে গিয়েছিল। এখন আমার কাছে প্রায় হাজার ৫০০০ বই আছে নিজের কালেকশানে। আত্মচরিত বাদ দেই। মুল লেখায় আসি।

একটা নির্জন দ্বীপে একজন মানুষ সহায় সম্বলহীন ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে কোন সঙ্গী সাথী নেই, কথা বলার মত কোন আত্মীয় স্বজন নেই, শুধু আছে “পোলো” নামে এক কথা বলা কাকাতুয়া। দীর্ঘ ২৮ বছর সে ওই নির্জন দ্বীপে একা একা কাটায় কিছু কুকুর বিড়াল ছাগলকে সঙ্গী করে। পরে অবশ্য ফ্রাইডে নামক এক আধিবাসীকে পায়। এর পর উদ্ধার পায়। এই হল ড্যানিয়েল ডিফোর বিখ্যাত “রবিনসন ক্রুশো”র কাহিনী। হয়ত বিশ্ব ক্ল্যসিকের “রবিনসন ক্রুশো” অনেকেই পড়েছেন, কিন্তু ক’জনে জানি যে একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে এই ঘটনা ডিফো লিখছিলেন। চলুন ৩১৬ বছর পেছনে।

প্রশান্ত মহাসাগরে তখন অনেক জলদস্যুদের জাহাজ ঘুরে বেড়াত। এই জাহাজগুলো সুযোগ পেলেই অন্য জাহাজ আক্রমন করে টাকা পয়সা লুটে নিত। এই সব জাহাজের ক্যাপ্টেন থেকে নাবিক কুক পর্যন্ত সব কয়টা সাধারনতঃ এক একটা খুনে বদমাস হত। এ রকম একটি জাহাজের নাবিক ছিল আলেকজান্ডার সেলকার্ক নামক এক স্কটিশ তরুন। ১৭০৩ সালে যে জাহাজে সে চাকুরী নেয় তার ক্যাপ্টেন ছিল সে কালের প্রসিদ্ধ জলদস্যু (একটা সময় জলদস্যুদের সরকারীভাবে সহায়তা দেয়া হত) এবং নাবিক উইলিয়াম ড্যাম্পিয়ের। তার জাহাজটি ছিল সিঙ্ক পোর্ট অঞ্চলের। ইংল্যান্ডের দক্ষিনের পাচটি বন্দর ডোভার, হাইদ, রমনি, স্যানউইজ এবং হেষ্টিংস কে একত্রে “সিঙ্ক পোর্টস” নামে ডাকা হয়।
প্রশান্ত মহাসাগরে যখন ড্যাম্পিয়েরের জাহাজ ভেসে বেড়াচ্ছে তখন তার সাথে সেলকার্কের ভীষন রকম ঝগড়া হয়। দু’জনেই ছিল রগচটা টাইপের। ঝগড়ার চরমে সেলকার্ক তার ক্যাপ্টেনকে বললেন সে আর তার সাথে এক পাও যাবে না তাকে যেন কোথাও নামিয়ে দেয়। বলতে যা দেরী ড্যাম্পিয়ের সামনে যে দ্বীপ দেখতে পায় সেখানে সেলকার্ক কে নামিয়ে দেয় জামা কাপড়, বিছানাপত্র, গাদা বন্দুক, বুলেট, বারুদ, কুঠার, কম্পাস, বাইবেল এবং কিছু বই সহ। সেলকার্ককে যখন ওই দ্বীপে নামিয়ে দেয়া হয় ততক্ষনে সেলকার্ক বুজে গেছে ক্যাপ্টেনের সাথে ঝগড়া করে নিজের কত বড় বিপদ ডেকে এনেছে, তাই তাকে অনুরোধ করল সে যেন সেলকার্ককে মাফ করে দেয়। কিন্তু জলদস্যু জাহাজের ক্যাপ্টেন এত অল্পতে মন নরম হবার কারন নেই। ড্যাম্পিয়ের, সেলকার্ককে ওই নির্জন দ্বীপে ফেলে জাহাজ ঘুরিয়ে চলে গেল। এই ঘটনা ১৭০৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে।

আলেকজান্ডার সেলকার্ক স্কটল্যান্ডের মানুষ তার ওপর নিজেও জলদস্যু এত অল্পতে সেও ভেঙ্গে পড়ার পাত্র না। ১৬৭৬ সালের স্কটল্যান্ডের ফাইফ সমুদ্র উপকুলের লারগো নামক জায়গায় তার জন্ম। বাবার ছিল জুতো তৈরীর ব্যাবসা, কিন্তু যার রক্তে আছে জলদস্যুর হিংস্রতা আর নীল সাগরের ডাক সে কিভাবে জুতা তৈরী করে? ১৬৯৫ সালে জলদস্যুদের জাহাজে নাবিক হিসাবে যোগ দেয় ১৭০৩ সালে ড্যাম্পিয়েরের জাহাজে এবং ১৭০৪ সালে নির্বাসিত হয় নির্জন দ্বীপে। সেলকার্ক দেখতে পেলেন দ্বীপে কিছু ছাগল, শুকর ঘুরে বেড়াচ্ছে, তার মনে প্রশ্ন দেখা দিল তবে কি এই দ্বীপে কেউ বসবাস করত? কিন্তু ঘুরে ফিরে ওই দ্বীপে যা দেখছে তাতে সে তো একাই তবে কিভাবে এই সব গৃহ পালিত জীব গুলো আসল?

Map of Robinson Crusoe Island, Archipelago Juan Fernández, Chile. Shaded relief.
জুয়ান ফার্নান্দেজ একজন স্প্যানিশ অভিযাত্রী জন্ম ১৫৩৬ সালে। ১৫৬৩ সালে দক্ষিন আমেরিকার পেরুর কালাও থেকে পাল তোলা নৌকায় যাত্রা শুরু করে মাত্র ৩০ দিনে প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে চিলির ভ্যালপারাইসোতে পৌছেন। তার এই দুঃসাহসিক অভিযাত্রার জন্য তাকে তার দেশে “জাদুকর” নামে ডাকত। আনুমানিক ১৫৬৩ থেকে ১৫৭৪ সালের মধ্যে জুয়ান তৎকালীন স্পেনের রাজার সহায়তায় প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে একটি দ্বীপমালা আবিস্কার করেছেন। এই প্রদেশ গুলো চিলির অন্তর্গত ভ্যালপ্যারাইসো প্রদেশের পশ্চিমে ৪০০ মেইল দূরে অবস্থিত। তিনটি দ্বীপ নিয়ে গড়ে ওঠা এই দ্বীপগুলোর নাম মাস এ তিয়েরা, মাস অফুয়েরা এবং সান্তা ক্লারা। জুয়ান ফার্নান্দেজ এই দ্বীপমালা আবিস্কার করছেন বলে তার নাম অনুসারে এ দ্বীপমালার নামকরন করা হয় “জুয়ান ফার্নান্দেজ আইল্যান্ডস।” আলেকজান্ডার সেলকার্ক যে দ্বীপে নির্বাসিত হন তার নাম মাস এ তিয়েরা। স্পেনের রাজার সহায়তায় জুয়ান ওই সব দ্বীপে লোকজন নিয়ে বসবাস করেন ১৫৮০ সাল পর্যন্ত। পরে তিনি চলে গেলেও প্রানীগুলো দ্বীপে থেকে যায়।

সেলকার্কতো এসবের কিছু জানতেন না, প্রানীগুলো দেখে তার মনে আশা জাগলেও তিনি কাউকে খুজে পেলেন না। আত্মরক্ষায় প্রথমে তিনি গাছ লতা পাতা কেটে একটি কুটির বানালেন, এবং ফলমুল এবং সমুদ্রের মাছ, কাকড়া, শামুক খেয়ে জীবন ধারন শুরু করলেন। এর মাঝে বন্দুকের গুলিও ফুরিয়ে গেল। কিন্তু ততদিনে তিনি বুনো ছাগল পোষ মানানো শিখে গেছেন। মাস এ তিয়েরা দ্বীপটি দক্ষিন গোলার্ধে হওয়ায় এখানে শীত পড়ত জুন এবং জুলাই মাসে। শীতের প্রকোপও তেমন ছিল না, তাই সেলকার্ককে তেমন অসুবিধার সন্মুখীন হতে হয়নি। তার পোষাক ও ছিল ছাগলের চামড়ায় তৈরী। গ্রীস্মকালেও তেমন একটা গরম পড়ত না। সারাদিন প্রচন্ড পরিশ্রম করত বিধায় তার দেহ ও মন সবল ছিল। সে জানত না কবে এ থেকে মুক্তি পাবে। এভাবে চার বছর চার মাস কেটে গেছে।

হঠাৎ একদিন তার চোখে পড়ল দ্বীপের পাশ দিয়ে একটি জাহাজ যাচ্ছে। সেলকার্ক পাগলের মত চিৎকার করে নাবিকদের দৃষ্টি আকর্ষন করল। সেদিন ছিল ৩১শে জানুয়ারী ১৭০৯ সাল। “ডিউক” নামে ওই জাহাজের ক্যাপ্টেনের নাম ছিল উডস রজার্স। তিনি আদেশ দিলেন নৌকা নামিয়ে লোকটাকে উদ্ধার করতে। শেষ হল সেলকার্কের চার বছর চার মাসের নির্জনবাস।

১৭১১ সালের অক্টোবর মাসে “ডিউক” ইংল্যান্ডে এসে পৌছাল। পরের বছর রজার্স প্রকাশ করলেন, “ক্রুজিং ভয়েজ রাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড”। যার মাঝে বর্ননা ছিল সেলকার্কের নির্জনবাসের ইতিহাস। এই ঘটনা চারিদিকে সাড়া পরে গেল। ১৭১৩ সালে ৩ রা ডিসেম্বর “দ্য ইংলিশম্যান” পত্রিকার প্রাবন্ধিক রিচার্ড ষ্টিল আলেকজান্ডার সেলকার্কের সেই নির্জনবাস বিস্তারিত বর্ননা করেন।

সাহিত্যিক ড্যানিয়েল ডিফো এই কাহিনী পড়ে সেলকার্কের বিস্তারিত সংগ্রহ করেন, লেখেন তার অমর উপন্যাস “রবিনসন ক্রুশো" যা প্রকাশ হয় ১৭১৯ সালে ডিফোর ৫৯ বছর বয়সে। দুই খন্ডে তিনি রবিনসন ক্রুশো উপন্যাসটি প্রকাশ করেন। প্রথম খন্ড “দ্যা লাইফ এ্যান্ড ষ্ট্রেঞ্জ সারপ্রাইজিং অ্যাডভেঞ্চার্স অভ রবিনসন ক্রুশো, অব ইয়র্ক, মেরিনার” দ্বিতীয় খন্ডটি “দ্যা ফারদার অ্যাডভেঞ্চার্স অভ রবিনসন ক্রুশো, বিইং দ্য সেকেন্ড এ্যান্ড লাষ্ট পার্ট অভ হিজ লাইফ” নামে।
মাস এ তিয়েরার বর্তমান নাম “রবিনসন ক্রুশো দ্বীপ” এবং মাস অফুয়েরার বর্তমান নাম “ আলেকজান্ডার সেলকার্ক দ্বীপ”। এই দ্বীপ দুটোর আয়তন যথাক্রমে ৩৬ বর্গমাইল এবং ৩৩ বর্গমাইল। ১৭২১ সালে ব্রিটিশ জাহাজের উচ্চ পদস্থ অফিসার হিসাবে জাহাজে চাকুরীরত অবস্থায় ৪৬ বছর বয়সে সেলকার্কের মৃত্যু হয়।

১৮৫৮ সালে কিছু নাবিক মাস এ তিয়েরা বা বর্তমান রবিনসন ক্রুশো দ্বীপে সেলকার্কের স্মরনে একটি স্মৃতিফলক রেখে আসেন। সেলকার্ক অমর হয়ে আছেন “রবিনসন ক্রুশো” উপন্যাসের মাধ্যমে। ২০০৫ সালে এক আর্কিওলজিক্যাল এক্সপেডিশনের মাধ্যমে একটি ক্যালিপারের অংশ বিশেষ আবিস্কার করেন যা আঠারো শতকের প্রথম দিকের অথবা সতেরো শতকের শেষ দিকের বলে ধারনা করা হয় এবং যেখানে সেলকার্কের কুটির ছিল তার কাছেই এই আবিস্কার প্রমান করে এটা সেলকার্কেরই ছিল।
সূত্রঃAlexander Selkirk
The Real Robinson Crusoe
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে ডিসেম্বর, ২০১৯ রাত ১:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



