
মাঝে মাঝে বড় অস্থির লাগে। কোন কিছু ভালো লাগে না, নিজেকে নিজে ঘন্টার পর ঘন্টা এক রুমে আটকে রাখি, না আটকে রাখা মানে নিজের রুম বন্ধ রাখা না, আমার আশে পাশে সংসারের মানুষ গুলো আসা যাওয়া করছে, আমার প্রিয়জন তারা। আমার মা, আমার সন্তান, আমার স্ত্রী। কিন্তু কেমন যেন অপরিচিত লাগে। এরা কারা? এদের কারো গর্ভে নয় মাস অবস্থান করে আমি এই পৃথিবীতে এসেছি! এদের কেউ কি আমার একটা শুক্রানুর বর্ধিত অংশ? নাকি ওই ধ্রুব সত্য যার সাথে আমি মিলিত হবার পর চুড়ান্ত আনন্দ অনুভব করে নিজ দেহকে হালকা তুলোর মত মেঘের দেশে ভাসিয়ে দেই? আমি এদের কাউকে চিনি না। নিজেকে নিয়ে মগ্ন এক স্বার্থপর অস্থিরতা আমাকে গ্রাস করে। নিজেকে চিনতে গিয়ে আমি খেই হারিয়ে ফেলি।
বিষাদে আক্রান্ত হয়ে যায় মন। আমি কেন মনের ওপর নিয়ন্ত্রন আনতে পারি না? তবে কি আমি অত্যন্ত নিম্ন শ্রেনীর প্রবৃত্তি দ্ধারা আক্রান্ত এক পশু? আজ শীতের মাঝে সকালে এক অদ্ভুদ জায়গায় গিয়েছিলাম, যেখানে মনুষ্যত্ব খাচায় বন্দী পশু। কি বিষাদ! কি কষ্ট। প্রতিটা মানুষ আলাদা আলাদা ভাবে বেচে আছে, কেউ কারো না। মন কি? আমি মানুষের মনের কথা বলছি। কি অসীম তার ক্ষমতা অসীম দুঃখের মাঝেও নিজেকে সে মানিয়ে নিতে পারে আবার সুখের চুড়ান্ত রূপেও নিজেকে সংযত করে জীবন কে তুরীয় আনন্দে ধ্বংস করে না।
মনটা কেন এত আবীল হয়ে আছে? মনের আর্দ্রতা আর ব্যাথাগুলো কোথা থেকে যেন অবিরত গুমড়ে যাচ্ছে। নারীদের অনেক সুবিধা আছে, মন খারাপ লাগলে চোখের পানি ফেলতে পারে কিন্তু পুরুষদের তো তা নেই। তাও আমার মত মধ্য বয়স্ক কোন মানুষ যার কিনা কিশোর বয়সী সন্তান থাকে। পুরুষের কাঁদতে নেই তাদের ব্যাথা গুলো বুকের মাঝে জমাট করে পাথর বানিয়ে কষ্টের মর্মর প্রাসাদ তৈরী করতে হয়। শাহজাহান হয়ত অর্থের জোরে তাজমহল বানিয়ে তার দিকে তাকিয়ে নিজের কষ্ট নিবারন করত, কিন্তু প্রতিটা পুরুষ যে বুকের মাঝে অর্হনিশি তাজমহল বানিয়ে চলছে তার খোজ এক মাত্র সে ছাড়া আর কেউ জানে না।
আমার মনটা ভরাক্রান্ত। আচ্ছা মন জিনিসটা কি? মন কি কোন বস্তু? তবে তো তার একটা মাত্রা থাকা উচিত, আমাদের জ্ঞাতব্য তৃতীয় মাত্রার বাইরে কি কোন চতুর্থ মাত্রা, পঞ্চম অথবা ষষ্ঠ, সপ্তম বা আরো অধিক কোন মাত্রা? আমার মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে হয় মনের আনন্দ, বেদনা, কষ্টগুলো কে এক লহমায় ঝেড়ে ফেলে সেগুলোকে বস্তুর আকারে দেখি। মানুষের কাছ থেকে অপমানগুলোকে যদি দু হাতের তালুবন্দি করে দেখতে পারতাম? যে অপমান করছে তার কাছে নিয়ে দেখাতে পারতাম তবে কি অপমান গুলো আনন্দে ঝলমলিয়ে উঠত না? তাকে দেখাতাম খুশীতে চোখ চিক চিক করে, দেখ দেখ এই যে তোমার দেয়া অপমান, লজ্জা, শ্লেষ যা দিয়ে তুমি আমাকে আঘাত করছ আমি তা দু হাতে ধারন করে তোমাকে দেখাতে এসেছি।
কখনো কখনো নিজের ছোট ছেলের দিকে সম্মোহনের মত তাকিয়ে থাকি, জড়িয়ে ধরি, ভাবি এই ছেলেটি যদি আমার না হত তবে কি আমি তাকে এত ভালবাসতে পারতাম? নিজের জিনিস না হলে তাকে বুজি ভালোবাসা যায় না? কি স্বার্থপরতা এই ভালোবাসায়? কি নিদারুন লজ্জা! আধুনিক মানুষ এখন আর নিজের আত্মজাকে নাকি একটা বয়সের পর ভালোবাসতে পারে না, এটা নাকি সন্তানকে স্বয়ং সম্পূর্ন হতে বাধা দেয় অথচ আমি দিন দিন আমার সন্তানদের আরো বেশি ভালোবাসছি। কি লজ্জা, একি স্বার্থপরতার চুড়ান্ত। আমি বোধ হয় তোমাদের মত আধুনিক হতে পারিনি, নিজ স্ত্রী, মা সন্তান দের আকড়ে ধরি কি এক চুড়ান্ত আতংকে।
মনটা কি এক চুড়ান্ত কারনে অস্থির হয়ে আছে, মার দিকে তাকিয়ে ছিলাম আনমনা হয়ে, আমার বৃদ্ধা মা, নিজ সন্তানের মঙ্গল কামনায় আজো কি কারনে যেন রোযা রেখেছে। অথচ তার নিয়ম করে খাওয়া পরা উচিত। মা পৃথিবীর এক মহান সৃষ্টি। সমস্ত সেরা শিল্পীদের সারা জীবনের তপস্যায় একজন মার একটা চুলের আঁক কষতে পারবে না। যে চপল, চটুল অথবা মুখরা মেয়েটা যেই মুহুর্তে মা হল সেই মুহুর্তে তার সমস্ত পৃথিবী ওলট পালট হয়ে গেল। নিজ সন্তানের ভালো করার জন্য মুহুর্তে সে সব কিছু ত্যাগ করতে পারে। আমি মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছি, আমি খুব ভালো ভাবে উপলদ্ধি করি এই বৃদ্ধা মা আমার বাবা মারা যাবার পর এক জোড়া কাপড় পরে বছরের পর বছর কাটিয়ে আমাদের দু ভাইকে পড়ার খরচ যুগিয়ে গেছে। কিভাবে এই মাঝ বয়সী চুলে পাক ধরা ছেলের দিকে তাকিয়ে এখনো মা বুজে নেয় ছেলেটি কষ্টে আছে! আচ্ছা আধুনিক পৃথিবী থেকে সম্পর্কের ভাঙ্গচুরে এই “মা” শব্দটা উঠে যাবে? সন্তান জন্ম নেবে ইনকিউবিটারে, নাড়ীর সাথে নাড়ীর বন্ধন কাটাকাটি জোড়া দেবার কোন সিষ্টেম যদি উঠে যায় তবে কে বুজবে মানুষের কষ্ট?
চিন্তার সুতো গুলো ছিড়ে যাচ্ছে, অনেক আগে যখন সদ্য যৌবনে উত্তীর্ন এক যুবতীকে নিজের সংসারে আনলাম সেই অবুজ যুবতী এত দিনে বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাত সামলে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে আমাকে আগলে রাখতে। কোন এক অদৃশ্য সুতা দুজনার মাঝে কি এক বন্ধন তৈরী করছে। আচ্ছা মানুষ কিভাবে বছরের পর বছর এক সাথে থাকার পর কি নিষ্ঠুরতায় সে বাধন এক লহমায় ছিড়ে ফেলে! এত নিষ্ঠুর মানুষের মন কিভাবে হয়। এক গভীর মমতায় তাকিয়ে থাকি আমার সন্তানদের মায়ের দিকে।
আমার একটা বিন্দু আছে, সেই বিন্দুটার একটা নামও আছে “স্বস্তি”। এই স্বস্তি থাকে আমার মনের খুব গভীর গোপনে। সব সময় তাকে বের করিনা, যখন মনটা ভীষন খারাপ থাকে যখন কোন ক্ষুদ্রতা, নীচতা আমাকে অনেক নীচে নামিয়ে অন্ধকারে টেনে নামাতে চায়, খুব সাবধানে আমি স্বস্তিকে বের করি, ওই এক বিন্দু যার নাম স্বস্তি তার মাঝে আমি বিশ্ব সংসার দেখতে পাই, পৃথিবীর প্রতিটা মানুষের প্রতিফলন ওই স্বস্তির মাঝে ছায়াছবির মত চলন্ত দেখি, সময় সেখানে স্থির। হয়ত মুহুর্ত মাত্র কিন্তু এর মাঝেই আমি দেখে ফেলি মানুষের মহত্ব, মানুষের ক্ষুদ্রতা। দুই বিপরীত মেরু। ভালোবাসা অপমান। সম্পদ দারিদ্রতা। রাগ প্রশান্তি। স্বস্তি আমাকে কখনো নিরাশ করেনি, কিন্তু খুব সাবধানে রাখতে হয় একে। একটু এদিক ওদিক হলেই আমি হারিয়ে ফেলব এই মহামুল্যবান বস্তটিকে যা আমি কখনো চাই না।
ইদানিং মাঝে মাঝে নিজেকে মৃত্যুর কথা জিজ্ঞেস করি? আমি কি প্রস্তুত সেই মহা রহস্যের মুখোমুখি হবার জন্য? এই দুনিয়ার লোভ ভোগ বিলাস কি সব আমার দেখা হয়েছে? উত্তর জানি না। তবে মৃত্যুভীতি বলে যে জিনিসটা জীবনের প্রতি লোভীদের প্রতি তাড়িয়ে বেড়ায় তা থেকে নিস্কৃতি পেয়েছি বলে মনে হয়। শরীরটা ইদানিং প্রায়ই বেগড়বাই করে পুরাতন ইঞ্জিন বোধ হয় আর টানতে পারছে না, ওষুধ দিয়ে আর কত চালিয়ে রাখা যায়? কিন্তু এত কষ্ট কেন? নিজেকে না বোঝার কষ্ট। মানুষের আরোপিত লজ্জার কষ্ট। মনটা যদি একটু স্বাভাবিক হয়! হোয়েন আই মীট মাইসেলফ আমি নিজেকে যে নিজেই চিনি না।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জানুয়ারি, ২০২০ রাত ৮:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




