somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রাজকুমারী রিয়া - ২য় পর্ব

২৯ শে এপ্রিল, ২০১১ সন্ধ্যা ৭:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আজকাল আমার আচরণে সবাই একটু বিরক্ত হচ্ছে । অথচ আমি চুপচাপ বসে থাকি , একা একা ঘুরে বেড়াই, আকাশের সাথে কথা বলি, দিঘির পারে গিয়ে বসে থাকি । তাতেও অনেকের সমস্যা হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে , তাও আবার আমার কাছের মানুষদের । এমনি ভাবে অনেকদিন চলে গেল ।রিয়ার কথা আমি কাউকে বলতে পাড়ি নি । বন্ধুদের যখনি বলতে চেয়েছি , তখনি মনে হত কে যেন আর্তনাদ করে উঠে । আমাকে বলতে থাকে অমিত, তুমি আমার কথা কউকে বল না । তাহলে আমি চিরতরে হারিয়ে যাব । আর কোনদিন তোমার কাছে ফিরে আসতে পারব না । তাই কেউ জানে না আমি কার জন্য অস্থির হয়ে থাকি, কার কথা ভাবি ,কেইবা আমার মনের করিডোরে সবসময় হেঁটে বেড়ায় ।

আজ আকাশের চাঁদটাকে অনেক বেশি কাছে মনে হচ্ছে, চারিদিকে জোছনা ছড়িয়ে আছে । আজ পূর্ণিমা । এমন রাতেই রিয়ার দেখা পেয়েছিলাম , এই ভেবে আজও গেলাম দিঘির পাড়ে । কোথাও কেউ নেই, নিস্তব্ধ পৃথিবী । রাত প্রায় শেষের দিকে । কেন জানি আজ একটু ভয় ভয় লাগছে । তবুও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে নিচে নেমে এলাম । পানিতে পা ডুবালাম । ওমনি মৃদু একটা শব্দ হল , যেন কারো বহু প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে । আমি চমকে উঠলাম । আর তাকিয়ে থাকতে পারছি না , চোখ বন্ধ করে স্থির দাঁড়িয়ে রইলাম। হঠাৎ শুনতে পেলাম রিয়ার কণ্ঠ । রিয়া আমাকে বলছে , অমিত তুমি ভয় পেয়েছ কেন? তোমার তো ভয় পেলে হবে না । তুমি তো জানো, আমি রিয়া । তোমার অপেক্ষাতেই ছিলাম এতদিন । আজ এত দেরি করে আসলে কেন? তুমি কি জানতে না আজ তোমার সাথে আমার কথা হবে । তুমি হয়ত আমাকে খুঁজে বেড়াও কিন্তু পাও না । আর আমি পেয়েও পাই না। জানো, আমিত তুমি প্রতিদিন যখন দিনের বেলায় আকাশের সাথে কথা বল, আবার রাতের বেলায় দিঘির পাড়ে এসে দাঁড়াও তখন আমি তোমাকে দেখতে পাই , তোমার কথা শুনতে পাই। কিন্তু আমি কিছুই করতে পারি না । খুব কষ্ট হয় তখন, অথচ কাউকে বলতে পারি না । আমিত, আমি এই গ্লানিময় জীবন থেকে মুক্তি চাই । আবার তোমাদের মতো করে পৃথিবীর বুকে হেঁটে বেড়াতে চাই, পানিতে সাঁতরে বেড়াতে চাই, বৃষ্টিতে ভিজতে চাই , ছোট্ট একটা উপহার নিয়ে প্রিয় মানুষদের সামনে দাঁড়াতে চাই । বল আমিত, আমি কি পাবর আবার সাধারণ জীবনে ফিরে আসতে ?

আমি তন্ময় হয়ে শুনছিলাম রিয়ার কথাগুলো । মনে হচ্ছিল রিয়া বার বার আমার মুখের দিকে তাকাচ্ছে । আমার কথা শুনতে চাইছে কিন্তু আমি ওকে কীভাবে বুজাব ওর কথা শুনতেই আমার অনেক বেশি বাল লাগে । তবু বললাম, রিয়া আমার মাঝে মাঝে মনে হয় আমি স্বপ্ন দেখছি । তুমি শুনে অবাক হবে তোমাকে নিয়ে আমি অনেক আগে থেকেই ভাবতাম, তোমার একটা কল্পিত ছবিও আছে আমার কাছে ।আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে, আজ সেই তোমাকেই আমি আমার সামনে উপলব্ধি করতে পারছি , আমি নিশ্চিত সেই তুমিই আজ ফিরে এসেছ আমার জীবনে । কিন্তু তুমি এমন করে একটা পাথরের মাঝে থাক কেন? কেন তোমার শরীরে অদৃশ্য শিকল ? কেন তুমি আমার সামনে আসতে পার না ?

আমি বুঝতে পেলাম আমার কথা শুনে রিয়া মুখ আড়াল করে কাঁদছে , কান্নার শব্দ আমার কানে আসছে । আমারও খুব বিষণ্ণ লাগছে রিয়ার কান্না দেখে । রিয়া হঠাৎ কান্না থামিয়ে বলল, অমিত আর বেশিক্ষণ হয়ত তোমার পাশে থাকতে পারব না । চেয়ে দেখ আকাশে চাঁদটা আস্তে আস্তে জোছনাহীন হয়ে পড়ছে । যখন সব জোছনা ঝরে শেষ হয়ে যাবে তখন আমিও হারিয়ে যাব । আর তুমি যা জানতে চেয়েছ তাও বলব, যা জানতে চাও নি তাও বলব । তোমাকে বলতেই বলে । মনে হচ্ছে যে প্রকৃতি আমাকে শাস্তি দিয়েছে সেই আজ তোমাকে আমার কাছে নিয়ে এসেছে , আমাকে মুক্ত করবে বলে । বল অমিত, তুমি কি পারবে না আমাকে মুক্ত করতে এই গ্লানিময় জীবন থেকে । আমি আর সহ্য করতে পারছি না নিষ্ঠুর প্রকৃতির এই কঠিন শাস্তি ।
আমি সবসময় রিয়ার কথা তন্ময় হয়ে শুনতে থাকি, তাই ওর কথার উত্তর দিতে একটু দেরি হচ্ছিল । রিয়া তাতে যে খুব অস্থির হয়ে আছে তা দিঘির জলের এলোমেলো ঢেউ দেখেই বুঝা যাচ্ছিল । তাই আমি দেরি না করে বললাম, কথা দিচ্ছি আমার যা কিছু আছে তার সবটুকু দিয়ে আমি চেষ্টা করে যাব তোমাকে প্রকৃতির এই কঠিন কারাগার থেকে মুক্ত করতে । এবার তাহলে বল কেন তুমি বিশ্ববিধাতার রোষানলে পড়েছ ? কি পাপ তুমি করেছিলে ? আমাকে বল, অযত্ন বা অবহেলা কোনটাই হবে না ।

একটা আজানা কষ্টের দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রিয়া বলতে শুরু করল, “আসলে অমিত, বিশ্ববিধাতা বল আর প্রকৃতিই বল তাকে কোন দোষ দেওয়া যায় না । বরং আমিই একা একা সুখী হতে চেয়েছিলাম । প্রকৃতি আমাকে সুখের একটা নিশানা খুঁজে দিয়েছিল । খুব ভাব ছিল আমাদের মাঝে । কিন্তু আমি স্বার্থপরের মত একা একা সেই সুখের স্রোতে অবগাহন করতে চেয়েছিলাম । তাই বিশ্ববিধাতার কাছে অপারাধী হয়ে বেঁচে আছি । কিন্তু এই বেঁচে থাকার চেয়ে হয়ত মৃত্যু অনেক ভাল ছিল । আমি ভুল করেছি । মানুষতো ভুল করবেই এটাই স্বাভাবিক । সবাইত এক সময় না এক সময় ক্ষমা পায় । আমি কি ক্ষমা পাব না । বল অমিত, চুপ করে থেক না । আমার খুব কষ্ট হচ্ছে ।

তুমি ভয় পেও না রিয়া । আমি তোমার পাশেই আছি । তুমি অবশ্যই মুক্তি পাবে । তুমি তো ভুল করেছ মাত্র, পাপতো করনি । দেখবে তুমি যেমন চেয়েছিলে তেমনি একদিন হতে পারবে । তুমি হবে প্রকৃতির বিশুদ্ধতম মানিবী । আর তোমার শুদ্ধতায় – শুভ্রতায় আমিও পরিপূর্ণ হবো । কিন্তু কি করে তোমাকে মুক্ত করবো? কোন উপায় কি তোমার জানা আছে? রিয়া চুপ করে রইল । তবে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলছে সেটা অনুমান করতে পারছি । কণ্ঠে একটা বারতি মাধুর্য ছড়িয়ে রিয়া কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, “অমিত, আমায় শুধু তোমাকে ভালবাসতে দাও। দেখবে তোমার আমার ভালবাসার পরশে প্রকৃতি কত অবলীলায় তার রুদ্ধদ্বার খুলে দিবে ।”

আমি জানি না কি কারনে আমার মনটা হঠাৎ আনন্দে নেচে উঠল । এমন অনাবিল আনন্দ আর কোনদিন আসে নি আমার মনে । বুঝতে পারলাম, আমি যাকে নিয়ে কল্পনা করি, যাকে নিয়ে স্বপ্ন সাজাই সে আর কেউ নয়, সেই রিয়া, এই রিয়া ।। এই মুহূর্তে রিয়াকে এক নজর দেখতে খুব ইচ্ছা হচ্ছে । কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব । নিজের মধ্যে বেড়ে উঠা অবেগটুকু আড়াল করে রিয়াকে বললাম, “ভালবাসার মানে আমি হয়ত তত বুঝি না । তবু বলছি, ‘তোমাকে ভালবাসি ! অনেক ভালবাসি !’ ভালোবাসা যে যাকে তাকে বিলিয়ে দেওয়া যায় না তা তোমায় দেখার আগ পর্যন্তও আমার জানা ছিল না ।

রিয়া হঠাৎ খুব জোরে শব্দ করে বলল, অমিত । চাঁদের আলোতো নিভে যাচ্ছে, আমাকে এক্ষণি চলে যেতে হবে । নাহয় হয়ত আমি মরেই যাব । কিন্তু আমি বাঁচতে চাই অমিত, তোমার জন্য হলেও বাঁচতে চাই । আমি চলে যাচ্ছি ।তুমি কি কিছু বলবে?
আমি অপ্রস্তুত থেকেই বললাম, রিয়া তুমি ভয় পেও না , আমি আছি তোমার পাশে। প্রকৃতি তোমার ডাকে সাড়া না দিলেও আমি তোমার বাসনাকে প্রকৃতির কাছে হার মানতে দিব না । কথা দিলাম, “তোমাকে প্রেমের পতাকা করে সুখের কপোত উড়াব”।
রিয়া এতক্ষণে হয়ত লুকিয়ে পড়েছে দিঘির জলে । আবার চারপাশ নিরব হয়ে আসলো । রাত শেষ হয়ে গেছে, কয়েকটা নাম না জানা পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে । পিছনে তাকিয়ে দেখি মা দাঁড়িয়ে আছে দিঘির পাড়ে । ভয়ে আমার হাত পা কাঁপছে ।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×