সাধারণ জীবন যাপনের বাইরে যে ক’জন মানুষের পথ চলা তাদের মাঝে ইরফান একজন । অন্যদিকে অতি বাস্তবতার মোহে আচ্ছন্ন যারা তাদের দলেই ভিড়েছে সৈকত । আজকাল রক্ষণশীলদের পাল্লা হালকা হলেও দু’চার জনের দেখা পাওয়া কঠিন কিছু নয় । নাফিস তাদেরই একজন । এরা তিনজনই খুব ভাল বন্ধু । আধুনিকমনা হওয়ার সুবাদে সৈকতের মেয়ে বন্ধুও আছে । ওর নাম স্রাবন্তি । নাফিস যদিও মনে মনে নীরাকে খুব ভালবাসে তবুও সে এ কথা মুখ ফোটে বলতে পারে না । ইরফানের এ ধরনের কোন পিছুটান নেই । ছোটবেলা থেকেই ওর যে স্বভাবটা সবার চোখে পড়ে তা হল ও অনেক বেশি কৌতূহলী । ইরফানের এই বিষয়টা নিয়ে ওদের এলাকায় কিছু গল্পও প্রচলিত আছে । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই নিলক্ষেতের একটা বাড়িতে থাকে ইরফান । বাবা কলেজ শিক্ষক । মধ্যবিত্ত পরিবার ।
কিছুদিন ধরে তার মাথায় এসে ভর করেছে আদৃশ্য প্রাণী মানে জিন ভূত বিষয়ক চিন্তা ভাবনা ।আর তার পিছনে মূল কারন হচ্ছে এফ এম রেডিও তে প্রচারিত “ভূতের আড্ডা” শিরোনামের একটা প্রোগ্রাম । বাংলাদেশে বিশেষ করে ঢাকায় এফ এম রেডিও এখন তরুণ সমাজের কাছে এক অতি আদরের বস্তু । ইরফান এফ এম খুব্ একটা পছন্দ করে না । তবে দু-একটা প্রোগ্রাম খুব আয়োজন করে উপভোগ করে । এদের মাঝে ভূতের আড্ডা সবচেয়ে পছন্দ করে । ইতিমধ্যে ইরফান মনে মনে একটা প্ল্যান দাড় করিয়েছে ভূত কিংবা অশরীরী প্রাণীদের সত্যিকারের রহস্য উদ্ঘাটনের । প্রথমে ও ওর প্ল্যানের কথাওর খুব ভাল কয়েকজন বন্ধুদের বলে । প্রথমে সবাই আনাগ্রহ দেখালেও কিছুদিন পর নাফিস এসে বলে বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ১ম বর্ষের পরীক্ষা শেষে আমি দেশের বাড়িতে যাব । ওখানে ভূতের বিরাট আস্তানা । যদি ওখানে যেতে চাও তাহলে আমি যাব। যদিও আমি ভূত নামটা শুনলেই ভয়ে আঁতকে উঠি, তবুও এবার কেন জানি খুব ইচ্ছা করছে ভূত শিকারে যেতে । এরা আমাদের শুধু শুধু ভয় দেখায় , এদেরকে আর ছেড়ে দেওয়া যায় না । আমি তোমার সাথে যাবই । ইরফান নাফিসের অগ্রহ দেখে খুশি না হয়ে পারল না । নাফিস আর ইরফান যদিও খুব ভাল বন্ধু , তবুও এরা একজন আরেকজনকে তুই বলে ডাকতে পারে না । নাফিসের জন্যই এটা সম্ভব হয় না। ও কারো সাথেই খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে মিশে না । ইরফান বলল , তোমার দেশের বাড়ি কোথায় ? গ্রামের নাম আলিপুর । মফস্বল এলাকা কেন্দুয়ার একটা ছোট গ্রাম। তবে দেখতে অনেক সুন্দর । ইরফান বলল, সৈকতকে কি কোন ভাবে রাজি করানো যায় না ? আমার মনে হয় শ্রাবন্তিকে বললে কাজ হবে । মানে কি? ও কে বললে কি হবে? আরে ইরফান তোমার মাথায় বুদ্ধি নেই । শ্রাবন্তি যদি যেতে রাজি হয় তাহলে সৈকত এমনিতেই যাবে । কি বল? আমাদের সাথে মেয়েদেরও নিতে চাও । খুব ঝামেলা হবে তো । ঠিক আছে । তাহলে তুমি একা একা গোস্ট হান্টিং এ যাও । শেষে নিজে হান্ট হয়ে আস । আচ্ছা ঠিক আছে, রাগ করো না । তুমি শ্রাবন্তিকে বলে দেখ ।
নাফিস শ্রাবন্তিকে বলল তারা আলীপুর এ ঘুরতে যাবে ।নাফিসের দাদার বাড়ি । আসল ঘটনা বলে নি । শ্রাবন্তি সাথে সাথেই রাজি হয়ে গেল । নাফিস শ্রাবন্তিকে বুজিয়ে বলল যেন ও সৈকতকে রাজি করায় । সৈকত রাজি হল । শ্রাবন্তির কথা সে ফেলতে পারে নি । শুধু রাজি হতে পারছে না নীরা । নাফিস খুব আশা করে ওকে বলল গোস্ট হান্টিং এ যাওয়ার জন্য । কোন কারন ছাড়া নাফিস কখনো নীরাকে এভাবে কোথাও যাওয়ার কথা বলতে পারত না। নীরার খুব ইচ্ছা আছে । কোন বিশেষ মিশনে যাওয়ার জন্য নয় । নাফিসকে একটু কাছে পাওয়ার জন্য । কিন্তু ওর পক্ষে তা কোনদিন সম্ভব নয় । তার কারন ওর পরিবার একেবারেই রক্ষণশীল ধরনের । মেয়েকে কেটে নদীতে ভাসিয়ে দিবে তবুও কোন অপরিচিত ছেলের সাথে মেয়েকে যেতে দিবে না ।এমনটাই বলল নীরার মা যখন নীরা সাহস করে বলেই ফেলল নাফিসদের সাথে ঘুরতে কথা ।
পরীক্ষা শেষ হল । ইরফান এরই মধ্যে ভূত –জিন বিষয়ে অনেক তথ্য সংগ্রহ করে ।মিশন এর নাম দিল গোস্ট হান্টিং । সৈকত আর ইরফান মিলে একটা নতুন ওয়েবসাইট তৈরি করেছে । এখন এই ওয়েবসাইটকে ঘিরেই এরা প্রস্তুতি নিচ্ছে । একটা প্রাথমিক দলও গঠন করা হয়েছে । ইরফান সেই দলের লিডার । অন্য সদস্যরা হল নাফিস, সৈকত, শ্রাবন্তি । তবে সবাই সমান অধিকার প্রাপ্ত ।ওয়েবসাইটটিকে ভাল ভাবে কাজে লাগানোর কাজে ভীষণ ব্যস্ত ইরফান আর সৈকত । নাফিস অন্য দিকগুলো দেখছে । শ্রাবন্তির তেমন কোন কাজ নেই । সে এই ভ্রমণের আসল কারন এখন জানে । রাগ করে নি বরং সবার সাথে সেও সাহায্য করে যাচ্ছে । সবার মধ্যে আস্তে আস্তে প্রবল আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে । ওয়েবসাইটটি সার্ভারে যোগ হয়েছে । সবাই মিলে ওয়েবসাইটটির নাম দিয়েছে http://www.ghosthunting.com . সোমবার আলীপুরে রওনা দিবে গোস্ট হান্টিং টিম । নাফিসের মন কিছুটা বিষণ্ণ নীরার জন্য । তবুও সে শেষবারের মতো নীরাকে বলল যে তারা সোমবার সকালে ট্রেনে করে রওনা করবে কমলাপুর স্টেশন থেকে ।
সোমবার সকালে সবাই এক এক করে এসে পরল কমলাপুর স্টেশনে । নাফিস এসেছে সবার আগে । তবুও সে বিষণ্ণ মনে দাঁড়িয়ে আছে । নীরার জন্য অপেক্ষা করছে । কিন্তু কাউকে কিছু বলছে না । ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার সময় হয়েছে । সবাই উঠে যাচ্ছে । নাফিস দাঁড়িয়ে আছে । সবাই ডাকছে । নাফিস ট্রেনে উঠে যাচ্ছে । তবুও একবার পিছনে তাকাল । নীরা দাঁড়িয়ে আছে । সত্যি নীরা চলে এসেছে ।নাফিস দৌড়ে গিয়ে নীরাকে টেনে নিয়ে আসে । ট্রেনে উঠে পড়ে । ট্রেন ছেড়ে দেয় । সবাই অবাক হয় নীরাকে দেখে । কিন্তু আনন্দের ভিড়ে হারিয়ে যায় অন্য সব বোধ ।সবার মাঝে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে । গল্প গানে মেতে উঠে সবাই । শুধু নীরা চুপ করে বসে আছে নাফিসের পাশে । মুখে বিষণ্ণতার ছাপ স্পষ্ট হয়ে আছে । বাবা মার অমতে বাড়ি থেকে চলে এসেছে নীরা । সে জানে তার আর ফিরে যাওয়া সম্ভব নয় । কেননা সে ভেবে নিয়েছে তার এই পালিয়ে আসা শুধু গোস্ট হান্টিং এ যাওয়া নয় । নাফিসের অব্যক্ত ভালবাসার প্রতিদান দেওয়ার, ওর সাথেই সাড়া জীবন থেকে যাওয়ার । ট্রেন এগিয়ে যাচ্ছে মাঝারি গতিতে । নীরার অনুভূতি আস্তে আস্তে নাফিসকে স্পর্শ করছে । ইরফানের মাঝে বেড়েই চলেছে কৌতুহল, অশরীর রহস্যময়তা । অন্যদিকে গানে –গল্পে ডুবে আছে সৈকত আর শ্রাবন্তি । তাদের গান সবার মাঝে আরও আনন্দ ছড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে অনবরত ।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা মে, ২০১১ রাত ১২:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


