গোস্ট হান্টিং ১ম পর্ব
সোমবার সকালে সবাই এক এক করে এসে পরল কমলাপুর স্টেশনে । নাফিস এসেছে সবার আগে । তবুও সে বিষণ্ণ মনে দাঁড়িয়ে আছে । নীরার জন্য অপেক্ষা করছে । কিন্তু কাউকে কিছু বলছে না । ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার সময় হয়েছে । সবাই উঠে যাচ্ছে । নাফিস দাঁড়িয়ে আছে । সবাই ডাকছে । নাফিস ট্রেনে উঠে যাচ্ছে । তবুও একবার পিছনে তাকাল । নীরা দাঁড়িয়ে আছে । সত্যি নীরা চলে এসেছে ।নাফিস দৌড়ে গিয়ে নীরাকে টেনে নিয়ে আসে । ট্রেনে উঠে পড়ে । ট্রেন ছেড়ে দেয় । সবাই অবাক হয় নীরাকে দেখে । কিন্তু আনন্দের ভিড়ে হারিয়ে যায় অন্য সব বোধ ।সবার মাঝে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে । গল্প গানে মেতে উঠে সবাই । শুধু নীরা চুপ করে বসে আছে নাফিসের পাশে । মুখে বিষণ্ণতার ছাপ স্পষ্ট হয়ে আছে । বাবা মার অমতে বাড়ি থেকে চলে এসেছে নীরা । সে জানে তার আর ফিরে যাওয়া সম্ভব নয় । কেননা সে ভেবে নিয়েছে তার এই পালিয়ে আসা শুধু গোস্ট হান্টিং এ যাওয়া নয় । নাফিসের অব্যক্ত ভালবাসার প্রতিদান দেওয়ার, ওর সাথেই সাড়া জীবন থেকে যাওয়ার । ট্রেন এগিয়ে যাচ্ছে মাঝারি গতিতে । নীরার অনুভূতি আস্তে আস্তে নাফিসকে স্পর্শ করছে । ইরফানের মাঝে বেড়েই চলেছে কৌতুহল, অশরীর রহস্যময়তা । অন্যদিকে গানে –গল্পে ডুবে আছে সৈকত আর শ্রাবন্তি । তাদের গান সবার মাঝে আরও আনন্দ ছড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে অনবরত ।
ট্রেন, বাস, রিক্সা করে ভাঙ্গা রাস্তা-ঘাট পাড়ি দিয়ে বিকেলের দিকে এরা এসে পৌছাল আলীপুর গ্রামে । আলীপুর খুব ঐতিহাসিক কিংবা প্রাচীন গ্রাম নয় । তবে দেখতে অনেক সুন্দর ।গ্রামের মাঝামাঝি জায়গাটা ঘন জঙ্গলে ঘেরা, পরিবেশটাও ভূতুরে । সবার ধারনা জঙ্গলের পাশে একটা জনমানবহীন বাড়িতে ভুত-জিন বাস করে । আর এর পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যেই গোস্ট হান্টিং টিমের আলীপুরে আসা । সবাই প্রথমে উঠে নাফিসের দাদার বাড়িতে । একদিন রেস্ট নিয়ে পরদিন থেকে শুরু হয় এদের ইনভেস্টিগেশন । গ্রামের কয়েকজন বিজ্ঞ ব্যাক্তি এবং দুজন কবিরাজও যোগ দেয় তাদের দলে । ইরফান সবাইকে সিরিয়াস হয়ে কাজ করতে অনুরুধ জানায় । অন্যদিকে সৈকত আর শ্রাবন্তি মেতে উঠে আনন্দ- উল্লাসে ।
জন- মানবহীন বাড়িটা দেখতে ভারী সুন্দর । গোস্ট হান্টিং টিম এই বাড়ির কেয়ার-টেকারের কাছ থেকে চাবি নিয়ে বাড়িটাতে এসে উঠল । সবাই অবাক হল বাড়ির ভিতরটা দেখে । তারা রাতেও এখানে থাকবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ।বাড়িটা এত সুন্দর হওয়ার পরও কেউ যখন থাকেনা তার মানে অবশ্যই এর পিছনে কোন রহস্য আছে । এ কথা ভেবে নাফিস একটু ভয় পেয়ে যায় । আস্তে আস্তে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে আসে ।নাফিসের ভয়ও বাড়তে থাকে । ইরফান ব্যস্ত গোস্ট হান্টিংটিম এর সাথে আলোচনায় । জিন ভূত বলতে আসলে কিছু আছে কিনা, থাকলে এরা কেমন, কি ভাবে এরা মানুষের সংস্পর্শে আসে এসব বিষয় নিয়ে সবার সাথে বিশেষ করে গ্রামের যে কজন এদের দলে যোগ দিয়েছে তাদের সাথে আলোচনা করছে ইরফান ।কারন এসব বিষয়ে কোন বই-পুস্তকে বিস্তারিত বর্ণনা নেই বললেই চলে । এমন সময় দরজায় শব্দ হল । কবিরাজ খোকন আলী দরজা খুললেন । একজন লাল টুকটুকে শাড়ি পড়া মহিলা ঘরে প্রবেশ করে । মহিলা আর কেউ নয়, কবিরাজ সাহেবের প্রতিবেশী । কিন্তু এমন টুকটুকে লাল শাড়ি এর আগেতো এ গ্রামের কাউকে বিয়ের দিনেও পড়তে দেখা যায় না । কবিরাজ খোকন সাহেব তাই একটু চমকে উঠলেন ।মহিলা কিছুই বললেন না । ঘরটা ঘুরে ঘুরে দেখল আর ভারী গলায় কয়েকবার বলল সুন্দর- খুব সুন্দর । ঘুরতে ঘুরতে ঘরের পিছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে গেল ঐ মহিলা । সবাই একটু অস্বস্তিবোধ করে মহিলাকে দেখে । কবিরাজ তখন নিজের ভয় আড়াল করে সবাইকে বলেন মহিলা তার প্রতিবেশী । ঘরটা অনেকদিন পর খুলেছে বলেই হয়ত দেখতে এসেছে । এ কথা শুনে সবার মাঝে একটু সস্তি ফিরে আসে । কিন্তু নাফিস আরও ভয় পেয়ে যায় । একটা অজানা ভয় তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে । এই ভয়টা তাকে অনেকদিন ধরেই ঘিরে রেখেছে । কিন্তু আজ মনে হচ্ছে ভয়টা সত্যিকারের কোন ভয়ানক ঘটনায় রূপ নিতে যাচ্ছে । ঘাম ঝরছে নাফিসের কপাল থেকে । ওর পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল নীরা । ওড়নার আচল দিয়ে নাফিসের ঘাম মুছে দেয় নীরা । নাফিসকে এতটা কাছে আর কখনো পায় নি নীরা । তাই নাফিসকে সাথে পেয়ে সব ভুলে যায় নীরা । কোন ভয় – কিংবা অস্বস্তি কাজ করছে না নীরার মাঝে । মনে মনে ভাবে এখনি মনের সব কথা নাফিসকে খুলে বলবে , ভালবাসবে । কিন্তু পারে না । নাফিসের কাছ থেকে শুনার জন্য অপেক্ষা করে । বেশির ভাগ মেয়েরাই এরকম হয়ে থাকে বলে শুনা যায় ।
সৈকত আর শ্রাবন্তি বারান্দায় গিটার বাজিয়ে গানে গল্পে মেতে উতেছে । অন্যদিকে ইরফান ব্যস্ত কবিরাজ সাহেবকে নিয়ে । রাতের বেলায় অনেক কিছু ঘটবে বলে সবার ধারনা ছিল কিন্তু তেমন কিছুই ঘটল না । তবে জঙ্গল থেকে এক ধরনের আর্তচিৎকার শুনতে পেয়েছিল নাফিস । খুব ভয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে নাফিস পাশেই বসে থাকা নীরাকে জড়িয়ে ধরে । কাউকে কিছু বলে নি । নীরা নাফিসকে পেয়ে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে । সবটুকু আবেগ আর ভালোবাসা জড়িয়ে ভয়ার্ত নাফিসকে আঘলে রাখে ও । এরই আড়ালে হয়ত দুজনেই দুজনের মনের কথা ওদের স্নায়ু কোষের মধ্য দিয়ে বলে দিয়েছে ।
পরদিন রাহমান খা গোস্ট হান্টিং টিমের সবাই কে ডেকে বলল ওরা যেন এখান থেকে চলে যায় । না হয় আজ রাতে অনেক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে বলে সবাইকে সতর্ক করে রাহমান খাঁ । কিন্তু ইরফান তাকে বলল, আমরা সবাইত আছি , আপনিও থাকবেন । যাই ঘটুক , সবাই একসাথে থাকলে কিছুই হবে না ইনশাআল্লাহ্ । রাহমান খাঁ কিছু না বলে বের হয়ে যায় । সম্ভবত সেও চায় একটা কিছু দেখার জন্য ।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই মে, ২০১১ ভোর ৫:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


