সে বছর ময়মনসিংহ অঞ্চলের গনিত অলিম্পিয়াড হয়েছিল কিশোরগঞ্জে- বিরঙ্গনা সকিনার দেশে । একটু আগেই জানলাম এই তথ্য। যদিও বইয়ে বীর সকিনা লেখা হয়েছে । অবশ্যই প্রিন্টিং মিস্টেক হবে । লেখক ইমদাদুল হক মিলন তো আর এই রকম ভুল করবে না । আমি আর আমার বন্ধু হাসান কিবরিয়া একসাথেই অনেক চরাই উৎরাই পেরিয়ে কিশোরগঞ্জে আমার এক স্কুলের বন্ধুর বাসায় গিয়ে উঠলাম ।
হাসান কিবরিয়ার কথা বিশেষ করে বলার তাগিদ বোধ করছি । কারো যখন কোন ন্যাশনাল কিংবা ইন্টারন্যাশনাল ফিগার টাইপের বন্ধু কিংবা পরিচিত কেউ থাকে তাদের কথা তারা খুব আয়োজন করে বলতে শুরু করে । আমিও তাই করার চেষ্টা করছি । কিবরিয়া ২০১০ সালের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২য় হয়েছিল ।১ম জন ভর্তি না হাওয়ার সেই সেরা ছাত্র মানে ১ম । আমিও স্বপ্ন দেখতাম যদি কোনদিন ১ম হতে পারতাম । কিন্তু তা আর হয়নি, ভর্তি পরীক্ষা দিতে গিয়ে কার্জন হলের সামনের চত্বরে বসে ছিলাম । পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই আরেক জনকে পেলাম ,নাম মেহিদি । বলল পরীক্ষা চোখ বন্ধ করে দিয়ে এসেছে । আমিও বললাম আমিও পরীক্ষা দিয়ে আসলাম । ভাল পরীক্ষা হয়েছে , তবে গনিত তা শেষ করতে পারি নি । কমন পরেনি, তাই চলে আসলাম । কিন্তু দেখলাম ওর মধ্যে পরীক্ষায় কোন গন্ধ নেই । আমরা সাধারনত পরীক্ষা শেষে প্রশ্ন নিয়ে কথা বলি, কিন্তু ও দেখলাম গান টান নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছে । হাতে আবার একটা গীটার । তখনি সন্দেহ হল ঐ ব্যাটাও মনে হয় আমার মত পরীক্ষার নাম করে এসে পরীক্ষা দেয় নি । আমাদের সন্দেহের অবসান হল । দু জনেই দু জনের সামনে উন্মোচিত হলাম । তখন মনের আনন্দে ক্যাম্পাস ঘুরে বেরিয়েছি । একটা হলের বাথ রুমে গিয়ে ১ নম্বর , ২ নম্বর করেছি কয়েকবার ।অনেকেই ভাবছিল আমরা বোধ হয় কোন দলের উঠতি নেতা হব । আমরাও একটা বিরাট মাস্তান মাস্তান ভাব নিয়ে ঘুরে বেরিয়েছি । যদিও ভিতরে ভিতরে অনেক ভয় কাজ করছিল । শুনেছি আজকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে কেউ কোন বিষয়ে পড় জানতে চায় না, কোন দল করো জানতে চায় । ঠিক মত উত্তর দিতে না পারলে সাইয করে দেয় ।
পরীক্ষা শেষ হল , সবার সাথে আমরাও খুব চিন্তিত মনে বাসায় ফিরে আসলাম, ভর্তি হতে পারবো তো ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়য়ে কোন ভাল ডিপার্টমেন্টে ?? কিবরিয়া আর আমি এক সাথেই ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় গিয়েছিলাম ভর্তি পরীক্ষা দিতে । কে জানত কিবরিয়া ১ম হয়ে যাবে আর আমি পরীক্ষাই দিব না !! আমি ফিরে আসলাম ময়মনসিংহে মেহিদির সাথে । কিবরিয়া ফিরে আসেনি । কারণ তার ফিরে আসার প্রয়োজন ছিল না , কারণ সে হয়ত ধরেই নিয়েছিল সে একটা কিছু করেই ফেলবে । করে দেখিয়েও দিয়েছে । যদিও অনেকে নানান মন্থব্য করে কিবরিয়ার এই অর্জন নিয়ে । তবে এসব বলে আর কোন কিছু হবে না। কিবরিয়া এখন এসবের ধরাছোঁয়ার অনেক উপরে । কিছুদিন আগে শুনলাম ও ব্যাকটেরিয়া নিয়ে কাজ করছে , কোন রোগের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যাবহার করার একটা গবেষণা প্রোজেক্টে । শুনে অনেক ভাল লাগলো । কারণ যে কিবরিয়া কোনদিন বইয়ের বাইরে কোন পড়া কিংবা চিন্তাকে পাত্তা দিত না , সে নিজেই এখন গবেষণায় ব্যাস্ত । আর চেয়ে বড় অর্জন একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আর কি হতে পারে !!
মানুষ যে কিছুটা সুবিদাবাধী তার প্রমাণ আমি নিজেই । স্কুল ছাড়ার পর আমার ঐ বন্ধু দিনারের আর কোন খুঁজ খবর নেই নি । অথচ তখন ঠিকই বাসায় গিয়ে উঠলাম । আমারা স্কুলে সবচেয়ে ভাল বন্ধু ছিলাম । অনেক দিন পরও ওর বাসায় গিয়ে মনে হল আমাদের বন্ধুত্তে এতটুকুও চির ধরেনি । ঐ রাতের কথা । পরদিন গনিত অলিম্পিয়াড । ভাবলাম একটু প্রস্তুতি নেওয়া যাক । আমি আর কিবরিয়া খুব সিরিয়াসলি গনিত নিয়ে ঘাটাঘাটি শুরু করলাম । আমি গনিত খুব একটা জানি না ।কলেজের পরীক্ষায় ‘এ প্লাস’ পাওয়া ছিল বিরাট সৌভাগ্যের ব্যাপার । গনিতের সাইফুল স্যার আর বসাক স্যারকে দেখলে খুব ভয় লাগত । একদিন বসাক স্যারের কাছে বিন্যাস এর সংজ্ঞা বলতে গিয়ে সমাবেশের সংজ্ঞা বলাতে যে ভয়ানক একটা চড় খেয়েছিলাম তা কোনদিন ভোলার মত না । তবে গনিত নিয়ে ভাবতে ,খেলা করতে কিংবা ঘাটাঘাটি করতে অনেক ভাল লাগত । এই জন্যই গনিতের ভাল ছাত্র না হাওয়ার পরও গনিত অলিম্পিয়াডে গিয়েছিলাম । আমি সোডিয়াম নামের যে ছেলেকে আশ্রয় করে এই গল্পটা লিখছি সেও কিন্তু গিয়েছিল ওখানে । দিনার খুব একটা আগ্রহ না দেখিয়ে শুয়ে পরল । কিবরিয়া আর আমি পড়তে লাগলাম । এক জায়গায় এসে আটকে গেলাম । কোন বহুভুজের কর্ণের সংখ্যা কত ? কীভাবে নির্ণয় করা যাবে ? আমাদের কারো জানা ছিল না । আবার এই প্রশ্নটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ । কিছু বইয়ে খুঁজাখুঁজি করে দেখলাম এ ধরনের কোন টার্ম নেই । ভাবলাম এটা বোধ হয় এখনো আবিষ্কারই হয় নি । তাই দুজন খুব আগ্রহ নিয়ে গবেষণা শুরু করলাম । অনেক চেষ্টা প্রচেষ্টার পরও কোন টার্ম আবিষ্কার করা গেল না । কিবরিয়া ঘুমিয়ে পরল । আমি জেগে রইলাম । আমার ঘুম আসছিল না । কোন পড়া কিংবা কাজ শুরু করে শেষ না করা পর্যন্ত আমার অন্য কোন কাজ করতে ইচ্ছা হয় না । ভালও লাগে না । আমার খুব ভাল লাগছিল কর্ণের কারুকাজ দেখতে । রাত প্রায় শেষের দিকে । হঠাৎ দেখলাম আমার বানানো একটা টার্ম কাজ করছে ।টার্মটা হল- ½{ n(n-3)}. যে কোন বহুভুজের কর্ণ আমি নির্ণয় করতে পারছি । আমি বিস্মিত হলাম । নব অবিস্কারের স্বাদ পেলাম । কিবরিয়াকে ডেকে তুলে বললাম । ও ঘুমের ঘোরে আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ঘুমিয়ে পরল । আমিও পরম আনন্দ নিয়ে ঘুমিয়ে পরলাম ।
পরদিন পরীক্ষা হল । যথারীতি গনিত পরীক্ষার মত ঐ পরীক্ষাও ঐরকমই হল । কিবরিয়ার মুখে হাসি নেই । সম্ভবত ওর পরীক্ষাও ভাল হয় নি ।দিনার কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না । আমরা ভাবলাম ও তো আমাদের সাথে এসেছে । নাম মাত্র পরীক্ষা দিয়েছে । ওর পরীক্ষা কেমন হয়েছে তা দিয়ে কোন কাজ নেই । এর চেয়ে বরং কিশোরগঞ্জ শহরটা ঘুরে দেখা যাক । এই সময় ছামি দৌড়ে এল । পরীক্ষা যে আমাদের চেয়ে বহুগুণ ভাল হয়েছে তা ওর ছুটাছুটি দেখেই অনুমান করা গিয়েছিল ।কেমন জানি একটু গনিতবিদ গনিতবিদ টাইপের আচরণ করছিল । একটু পর আরও অনেক বন্ধু চলে এল । কিছুক্ষণ পর এল সোডিয়াম । ও গণিত আমাদের সবার চেয়ে ভাল জানে এবং বুঝে । তাই সোডিয়ামকে বললাম তুমি কি জান আজ রাতে আমি গণিতের একটা নতুন সূত্র আবিষ্কার করেছি ? ও বলল কি? আমি একটু ভাব নিয়ে বললাম এখন না পরে বলছি । ভাবলাম কি ভাবে একটু ভাব নিয়ে বলা যায় ? বুদ্ধি করলাম আগে জিজ্ঞেস করি, যখন বলতে পারবে না তখন আমি বলব । একটু পরে অনেকের সামনে সোডিয়ামকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি বহুভুজের কর্ণ নির্ণয়ের সূত্র জান ? ও হর হর করে বলে দিল, n(n-3)/2. আমি ওর কথা শুনে আকাশ থেকে পরলাম । ইচ্ছা হচ্ছিল বেটাকে একটা শক্ত মাইর দেই । কিন্তু তা না করে একটু আড়ালে গিয়ে ভাবলাম এটা কি হল? আমি এত কষ্ট করে একটা জানা সূত্র আবার বের করলাম । খুব বিষণ্ণ লাগছিল তখন ।আর কাউকে কিছু বলি নি । সম্ভবত কিবরিয়াকে বলেছিলাম । কিবরিয়া আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিল, এটাইতো অনেক অর্জন । হোক সেটা অবিস্কৃত, তুই আবার অবিস্কার করেছিস । অন্তত আমিতো সেটা জানি । কিবরিয়ার কথা সেদিন আমাকে খানিকটা স্বস্তি দিয়েছিল ।
কিছুক্ষণ একা থাকার পর সবাই মিলে যোগ দিলাম আলোচনা এবং প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠানে । উপস্তাপক এবং প্রধান বক্তা মুহাম্মদ জাফর ইকবাল । শুরু হল প্রশ্ন- উত্তর এবং পুরস্কার গ্রহণ । এইটাই আমার দেখা একমাত্র অনুষ্ঠান যেখানে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে নয় উল্টো প্রশ্ন করে পুরস্কার পাওয়া যায় । তাই আমিও একটা প্রশ্ন করলাম । আমিতো এমনিতেই প্রশ্নের কারবার করি । তাই খুব ভারি একটা প্রশ্ন করলাম । যাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে বক্তাদের একটু বেগ পেতে হচ্ছে । তারাই বেশির ভাগ পুরস্কার পাচ্ছে । আমি তো শুধু প্রশ্ন নয় বরং ইলেকট্রন কনা না তরঙ্গ তা নিয়ে জাফর ইকবাল স্যারের সাথে কয়েক মিনিটের একটা আলোচনা করে ফেললাম । তাই পুরস্কার পেতে দেরি হল না । পুরস্কার হিসেবে পেলাম আবদুল্লাহ আল মুতির “ রহস্যময় বিজ্ঞান” নামের একটা বই । পুরুস্কার আনতে যাওয়ার সময় একজন মহিলা অতিথি আমাকে বলেছিল “ এভাবে সবসময়য় চেষ্টা করে যেও, ছেড়ে দিও না । তুমি ভাল করতে পারবে ।” ম্যাডামকে বলতে চাই, ভাল না করতে পারলেও আমি কিন্তু এখনো একে ধরে রেখেছি্ , আশা করি রাখব বাকি দিনগুলোতে । কিছুক্ষণ পর পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করল,আমি আর কিবরিয়া ফেল মারলাম । ছামি পাস করল । কিন্তু একটা ফলাফল শুনে স্তব্ধ হলাম ।আমার বন্ধু দিনার, সে পাস করেছে । একেবারে চুপ হয়ে গেলাম । আমরা এত আয়োজন করে এসে কিছুই করতে পারলাম না । অথচ দিনার হেলা খেলা করে আমাদের ছাপিয়ে গেল । মনের মধ্যে একটা হাহাকার বেজে উঠেছিল সেদিন । এখন বুঝতে পারছি আমার ঐ হাহাকার ভুল ছিল । আসলে ওটাই তো স্বাভাবিক । এত আয়োজন করে আসলে ভাল কিছু হয় না । যা কিছু ভাল তা হেলা খেলার ছলেই হয় । ঘোষণা দিয়ে হয় না ...।।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


