
সাগরে চলা সাম্পান জাতীয় নৌকা - এগুলোতে করে জেলেরা মাছ ধরে সাগরে
এর বেশ কয়েক বছর পর কক্সবাজারে যাই। ঢাকা থেকে এ সি নাইট কোচে চট্টগ্রাম। সকাল বেলা বাসের কাউন্টারে পৌঁছাই। সেখানে ফ্রেস হয়ে কাছের রেস্টুরেন্টে নাস্তা খেয়ে ফ্রেস হয়ে নেই। একই পরিবহনের অন্য বাসে করে কক্সবাজারের উদ্দেশে যাত্রা করি কিছুক্ষণ পর। শহর ছাড়িয়ে কর্ণফুলী নদীর উপরের কালুরঘাট সেতু পার হয়ে কক্সবাজারের পথে। সে সময় নতুন ব্রিজটি হয়নি এবং কক্সবাজারের রাস্তা তেমন প্রশস্ত ছিল না। ড্রাইভিং বেশ বিপদজনক ছিল। তবে এই লাইনের বাস ড্রাইভাররা বেশ অভিজ্ঞ হওয়ায় দুর্ঘটনা এড়ানো যেত। দিনের বেলা দুপাশের জনপদ দেখতে দেখতে চলছি। মাঝে মাঝে রাস্তার পাশে বিশাল খোলা প্রান্তর, মৌসুমে সেখানে চাষ হয়। বাজার এলাকা চিরাচরিত নিয়মে বেশ ব্যস্ত ও জনবহুল। বাসের গতি এসব জায়গায় কমে আসে। কক্সবাজারের কাছাকাছি লবন চাষের জমি দেখলাম। সেখানে সাগরের পানি আটকে রেখে লবন তৈরি করা হয়। এটা এলাকার একটা গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উদ্যোগ। সাগরের পানি জমতে ঢুকে যাওয়ার ফলে মাটি লোনা হয়ে যায় ও সাধারণ চাষাবাদ হয় না। সেসব জমিতে লবন উৎপাদন একটা ভাল উদ্যোগ। প্রায় সারাদিন কেটে গেল বাস ভ্রমনে। সন্ধ্যা ৭ টার পর কক্সবাজার বাস স্ট্যান্ডে নামলাম। মালপত্র নিয়ে রিক্সায় করে আমাদের গেস্ট হাউজে এলাম। ফ্রেস হয়ে রিক্সা নিয়ে সাগরের পাড়ে গেলাম। এবার কক্সবাজারের চিত্র আগের চেয়ে আলাদা। অনেক উন্নয়ন হয়েছে। মানুষের সমাগম আগের চেয়ে বেশী। আমরা বিচের কাছেই পর্যটনের রেস্টুরেন্টে ডিনারের জন্য গেলাম। সে সময় পর্যটনের রেস্টুরেন্টে বেশ ভাল মানের খাবার পরিবেশন করত। পরিচ্ছন্নতা ও চাকচিক্যও ছিল। পরের বার যখন আসি তখন অনেক লাক্সারি হোটেলের ভিড়ে এর জৌলুস ম্লান হয়ে গেছে। ডিনার শেষে বাজার সাগর পারের লাবনী পয়েন্টের বাজারে কিছুক্ষণ ঘুরে রেস্ট হাউজে ফিরে আসি। মেরিন ড্রাইভ রাস্তার কাজ তখন চলছিল। সেই রাস্তা ধরে ইনানি বীচ ঘুরে আসি। কক্সবাজারে আমার এক সিনিয়র কলিগের বাসায় বেড়াতে গেলাম এক বিকেলে। তারা মেরিন ড্রাইভের কাজ করছিলেন। সে সময় থেকে সাগর পাড়ের রিসোর্ট বানানোর চিন্তা ভাবনা চলছিল। এবার ও হিমছড়িতে ঘুরতে গেলাম শুকনা মৌসুম থাকায় পানির ধারা ছোট হয়ে গেছে, তবে অনেক মানুষ এখানে ঘুরতে এসেছে। রাস্তার পাশে এসে একজন কৃষকের দেখা পেলাম। তাঁর গাছের কলা নিয়ে এসেছে। গাছ পাকা কলা, অপূর্ব স্বাদ। এই কলা খাবার আশায় আমি কক্সবাজার গেলেই হিমছড়ির পাশে দাঁড়াই, তবে আর সেই স্বাদের কলা পাইনি।

সাগরের বুকে সূর্যোদয়
কক্সবাজার তার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, সমুদ্রের মিলন আর বৈচিত্র্যময় প্রকৃতির সৌন্দর্যে ভ্রমণকারীদের এক বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। এখানে প্রতিটি স্থানের অনুভূতি আলাদা, কোথাও উত্তাল ঢেউ, কোথাও পাহাড়ের শান্ত সবুজ পরিবেশ। কিছু জায়গায় প্রানচঞ্চল পরিস্থিতি অনেক মানুষের আনাগোনা আবার অনেক নির্জন ও শান্ত জায়গা। কক্সবাজারের মূল আকর্ষণ হলো তার দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত এর বিশালতা মানুষের মনকে উদার করে। একবার কক্সবাজারে গিয়ে খুব ভোরে বীচে হাঁটতে ইচ্ছা হল।

বীচে সাগর দেখার সুন্দর আয়োজন
আস্তে আস্তে মানুষের কোলাহল দূরে ফেলে ঘণ্টা খানেক হেঁটে চললাম। সব জায়গায় বীচ একরকম না, মাঝে মাঝে পানির ধারা নেমে ছোট ছোট নালাও তৈরি হয়েছে কিছু জায়গায়। চলার পথে দুই একজন স্থানীয় লোকজনের সাথে দেখা হল, তারা কেউ কলাতলি বা লাবনী পয়েন্টের দিকে যাচ্ছে, কয়েকজন সাগরে মাছ ধরার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। সূর্যের তাপ বাড়ছে তাই ফেরার জন্য ঘুরলাম, তাছাড়া একা এতদুরে ভাল লাগছিল না। লাবনী পয়েন্টে যখন ফিরে এলাম তখন অনেক পর্যটক সেখানে সাগরে সূর্যোদয় দেখতে চলে এসেছে। সাগরে সাঁতার ও কাটছে অনেকে।
এরপর কক্সবাজারে যখন আসলাম তখন মেরিন ড্রাইভ হয়ে গেছে। সেই রাস্তায় মাইক্রোবাসে করে টেকনাফ ঘুরতে গেলাম। সেখানে বি জি বি ব্যাটালিয়নে গেলাম। তারা নাফ নদীতেও টহল দেয়। টেকনাফ নদী বন্দরে ঘুরতে গেলাম, এই বন্দর দিয়ে মিয়ানমারের সাথে বাণিজ্য চলে। দূরে মিয়ানমারের মংডু শহর ও বন্দর দেখা যায়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এক দিনের অনুমতি নিয়ে মংডু দিয়ে আবার বিকেলে ফিরে আসতে পারে। দোভাষীর কাজ করার জন্য অনেক রোহিঙ্গাকে পাওয়া যায় দুপাশেই। টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন যাওয়ার জাহাজ ছাড়ে। দুই থেকে তিন ঘণ্টা লাগে সাগরের বুক চিরে এই জাহাজ ভ্রমণ। বেশ কয়েকবার এই ভ্রমণের সুযোগ হয়েছিল। জাহাজ দ্বীপের জেটিতে থামে। সেখান থেকে হেঁটে বা রিক্সায় দ্বীপ ঘুরে বেড়ানো যায়।
কক্সবাজার থেকে মিয়ানমার সীমান্তের ঘুনধুম বি ও পি’র পাশ দিয়ে যাওয়া বাংলাদেশ মিয়ানমার ফ্রেন্ডশিপ রোডে ভ্রমণের সুযোগ হয়েছিল। রাস্তাটি সীমান্তের কাঁটা তারের বেড়ার পাশের একটা ছোট সেতুর পাশে থেমে গেছে। এই রাস্তাটা চালু হলে সড়ক পথে মিয়ানমারের সাথে বাণিজ্য ও পর্যটন বহুগুনে বেড়ে যেত। এটা চালু হলে হয়ত ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা সংকট না ও হতে পারত যদি ও তা ছিল মিয়ানমারের বহুদিনের পরিকল্পনা। এরপরও কক্সবাজারে গিয়েছি অনেক বদলে গেছে, অজস্র হোটেল হয়েছে সাগর পাড়ে। খোলামেলা পরিবেশ কিছুটা কমে গেলেও দেশের মানুষ এখানে এসে কিছুটা সময় আনন্দ খুজে নেয়।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




