somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার বন্ধু রমিজে ঈদ

০৬ ই অক্টোবর, ২০১৪ রাত ১২:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার বন্ধু রমিজ। একেবারে দুর্দান্ত যোগ্য ছেলে।
তার যোগ্যতার উদাহরণ দেই-
ক্লাশ ওয়ানে পড়ি। ঈদের দিন, আব্বার হাত ধরে ঈদগাহ্ এ যাচ্ছি। মাইল তিনেক পথ। পথের দুই ধারে পাটি বিছায়ে মানুষজন ভিক্ষা করছে। ভিক্ষা চাওয়ার নানান মজার ফন্দি। দুই জন মিলে সুর করে ভিক্ষা করার একটা পেয়ার ছিলো। একজন আল্লা আরেকজন বলতো হু। এমন নানান রকম ভিক্ষুক দেখছি, হাত ভরা কয়েন, ছিটায়ে ছিটায়ে যাচ্ছি। একটা ভিক্ষুকের দিকে নজর পড়তেই আমি অবাক। আব্বাকে চিল্লান দিয়ে বল্লাম, আব্বা এইটাতো আমার বন্ধু, রমিজ। রমিজ আমাকে দেখে ফিক করে হেসে দিয়ে বল্লো - তুই যা, নামাজ শুরুর আগে আগে আমি আইতাছি।

যাত্রাদল এলাকায় এসেছে, আমদের যোগ্যতা ছিলো এই খবরটা জানা পর্যন্তই। রমিজের যোগ্যতা ছিলো, যাত্রার পেন্ডেলের বেড়ার ফাঁক দিয়ে ভিতরে ঢুকে গোপনে যাত্রা দেখে পরের দিন আমাদেরকে তা জানানো পর্যন্ত। রমিজের কাছে যাত্রদলের ঘোড়া, হাতি, বাঘ এইসবের গল্প শুনতাম। চোখ বন্ধ করে ছুড়ি মারার গল্প শুনতাম। একটা বামন বেটা আছে, তার আবার সুন্দরী দুইটা বউ, এই গল্প শুনতাম। আরেকদিন রমিজ এসে যা বললো তার সরমর্ম হলো নৃত্য এবং সাথে কাপড়ের একটা ইস্যু জড়িত। যাত্রা শেষ হওয়ার পর কি হয় তা দেখার জন্য সে টেবিলেন নিচে বসে ছিলো একদিন তখনই নাকি সে এই কান্ড দেখেছে।

আমার প্রাইমারী স্কুলের নাম - সাহেবাবাদ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, স্থাপিত ১৯৩৮ ইং। সরকারী স্কুল, সকলের সমান অধিকার। আমার মত শিক্ষকের ছেলের যেমন পড়তাম তেমনি বড়লোকের ছেলেপেলে, জেলে, দিনমজুরের ছেলেপেলেও পড়তো। কার বাবা কি করে তাতে আমাদের আগ্রহ ছিলো না। আগ্রহ ছিলো, কার যোগ্যতা বেশী। এই বিচারে রমিজ বেশ যোগ্য ছেলে। আমি মারামারিতে পটু ছিলাম, আমার যোগ্যতাও কমনা। পলাশ নামের একটা ছেলে বরাবর ফারষ্ট হতো, এইটা আমাদের বিচারে কোন যোগ্যতাই না। ওর দাম ছিলো দুই পয়সা।

একবার কুরবানীর ঈদ। সবার গরু কেনা হচ্ছে, শুধু আমাদের গরু কেনা হচ্ছে না। বড় ভাইকে বল্লাম, ভাইছা এইবার কি আমরা ঈদ করবো না? বড় ভাই উত্তর দিলেন - না, করবো না। আমার ভয়ানক মন খারাপ। এদর গরু কিনে, ওদের গরু কিনে। আমি কারু গরু দেখতে যাইনা। আমাদের গরুর নাই তো অন্যের গরু দিয়ে আমি কি করবো? বাড়ীর বড়দের মনে কোন কষ্ট নাই। আমার কষ্টের কথা কেবল আমি জানি। আর জানে রমিজ। একদিন রমিজের কাছে কেঁদে ফেল্লাম
-রজিম আমাদের এবার ঈদ হবে না।
- তোর আবার ঈদ অয় না ক্যামনে! আমি আছি না?

অতদিনে ক্লাম টু তে উঠে গেছি। রমিজরা নিতান্তই গরিব, এই বিষয়টা বুঝে গেছি। ওর বাবা মাছ ধরে, জেলে। রমিজদের বাড়ীতেও আমি একদিন গিয়েছি। ওদের একটাই শনের ঘর। তার উপরে আবার পলিথিন দিয়ে বৃষ্টির পানি ঠেকানো। রমিজরা অনেকগুলো ভাইবোন, সবাই একটা ঘরেই থাকে। ও আমার পাশে থেকে করবে টা কী?

ঈদ ঘনায়ে আসছে, স্কুল বন্ধ হয়ে গেলো। আমাদের গরু কেনা হয়নি এখনো। রাত পোহালে ঈদ। রমিজদের বাড়ী আমাদের বাড়ী থেকে প্রায় মাইল খানেক দূর। অতদূর আমি একা যেতে পারি না। ঈদের আগের দিন সন্ধায় দেখি রমিজ আমাদের বাড়ীর গেটের বাইরে থেকে উঁকি দিচ্ছে। আমি দৌড় দিয়ে রমিজের কাছে গেলাম। রমিজ খুব ব্যস্ত। এর মধ্যেও সে আমার খোঁজ নিতে এসেছে, আমাদের গরু কেনা হয়েছে কি না। আগামী দিন তার অনেক কাজ। সকাল বেলা ঈদগাহ্ এর রাস্তায় ভিক্ষা করবে। পরে নামাজ পড়েই বের হয়ে যাবে মাংস টোকাতে। বিকাল বেলা মাংস আর সকালের পাওয়া চাওল বিক্রি করে যে টাকা হয় তা থেকে নিজের জন্য শুধু সিনেমা দেখার টাকা রাখবে। বাকীটা দিয়ে দিবে তার মা'র হাতে।

ঈদের দিন সকাল বেলা দেখি আমাদের লাল রং এর গরুটাকে গোসল দেওয়া হচ্ছে। বড় ভাইকে জিজ্ঞাসা করলাম
- ভাইছা, এইটারো গোসল করাইতেছেন কেন?
- এবার তো এইটারেই কুরবানী দেওয়া হইবো।
এই কথা বলে বড় ভাই খিক খিক করে হাসতে থাকলো। উনি বুঝতেও পারলেন না তার এই ছলচাতুরীর জন্য এই কয়টা দিন আমার কত মন খারাপ হয়েছে। কত ছোট মন নিয়ে আমি বাড়ীতে লুকায়ে ছিলাম, কারো সাথে মিশি নাই। একা একা কেঁদেছি। আর এর স্বাক্ষী কেবল ঐ রমিজ।

ঈদের দিন আব্বার পাশে বসে আছি। আব্বাকে বল্লাম, আব্বা আমার বন্ধু রমিজ মাংস নিতে আসবো। কিন্তু আবার টেনশানে পড়ে গেলাম, রমিজ যদি সময় না পায় আমাদের বাড়ী আসতে? আব্বাকে একটু পরপর জিজ্ঞাসা করি, আব্বা রজিম যদি দেরী করে? পরে রমিজের জন্য আলাদা করে মাংস রাখা হলো। অন্য বছর গরু কাটার সময় গেট তালা দেওয়া থাকে। এবার গেট খুলে রাখা হলো, কারন রমিজ যেন এসে ফিরে না যায়। গেট খোলা দেখে যারা যারা হুরহুর করে ঢুকে গেলো তাদের কাউকেউ খালি হাতে ফেরত দেওয়া হলো না।
-০-
বছর পাঁচেক আগে গ্রামের বাড়ীর বাজারে দাড়িয়ে আছি। সিএনজির জন্য অপেক্ষা, আসবো ঢাকা। খুব তাগড়া টাইপ একটা যুবক আশপাশ দিয়ে ঘুরঘুর করছে। পান খেয়ে মানুষ জিহ্বা লাল করে, সে একেবারে ঠোঁট সহ লাল করে বসে আছে। বিড়ি খাচ্ছে খুব, কাঁধে একটা গামছা। লুঙ্গিটা অর্ধেক করে হাটু বড়াবড় আরেকটা গিট দেওয়া। চিনি চিনি মনে হলো, কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারলাম না। একবার ভাবলাম ডাক দিয়ে জিজ্ঞাসা করি। পরে ভাবলাম, কী জিজ্ঞাসা করবো? সি এনজিতে উঠে গেছি। ছেলেটা দেখলাম আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সি এনজি ছেড়ে দিয়েছে, হুট করে মনে হলো, ছেলেটা রমিজ।
-০-
আগামী দিন কুরবানীর ঈদ। সবাই যে আপনাদের দ্বারে ভিখারী হয়ে দুই টুকরা মাংস চাইতে যাবে তা না। এদের মধ্যে আমার যোগ্য বন্ধু রমিজও আছে। যাদের জন্ম হয়েছে শরৎচন্দ্রে শ্রীকান্ত উপন্যাসে ঈন্দ্র হওয়ার জন্য। যাদের জন্ম হয়েছে আমার মত হবু লেখকের স্মৃতি কথায় রজিম হওয়ার জন্য। তারা যেন বাস্তবেও একটুকুন সম্মান আপনাদের কাছে পায়। এক টুকরা মাংসের সাথে যেন দানের চাইতে মমতার ছোঁয়া বেশী থাকে।
ঈদ মোবারক।হ্যাপি কুরবানী।
৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ব্লগের ওসমান হাদী সৈয়দ মশিউর রহমানের ব্যান

লিখেছেন এল গ্যাস্ত্রিকো ডি প্রবলেমো, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:৫০

এ আমি কী দেখলাম! ব্লগের প্রতিবাদী মুখ, ভারতের যম, ওসমান হাদীর মুখপাত্র, একাত্তরকা গণ্ডগোলের ব্যাপারে সচেতন মুখ সৈয়দ মশিউর রহমানের ব্লগটি স্থগিত অথবা বাতিল করা হয়েছে। দেশে যখন সামান্য চুমু... ...বাকিটুকু পড়ুন

জেফরি আর্চারের A Prisoner of Birth....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:০০




জেফরি আর্চারের A Prisoner of Birth....

জেফরি আর্চারের A Prisoner of Birth মূলত এমন এক উপন্যাস, যেখানে বন্ধুত্ব, বিশ্বাসঘাতকতা, শ্রেণিবৈষম্য, বিচারব্যবস্থা, প্রতিশোধ এবং বুদ্ধিমত্তার লড়াই একসূত্রে গাঁথা হয়েছে। উপন্যাসটির... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাদ্রাসার মোল্লা হুজুর থেকে আপনার সন্তানকে নিরাপদ রাখুন

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:০৭

গতকাল রাতে একটা বাচ্চার পা**র ছবি দেখেছিলাম ফেইসবুকে, অনেকেই শেয়ার করেছেন। পা কেটে হাসপাতালে আসার পর ডাক্তার সাপোজিটরি দিতে গিয়ে দেখে গর্তের মতো হয়ে গেছে। মাদ্রাসার হুজুরে বিকৃত কাজ করতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপি’কে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল বলার কোনো কারণ নাই!!

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:২৩



জাতীয় সন্মাননা কি কোনো গোপন বিষয় । একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা’কে গার্ড অফ অনার দিতে এত অনীহা কেনো বর্তমান সরকারের ‼️

আজ বারবার আমার গোআ’র কুপুত্রের একটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

সাড়ে হাজার বিজ্ঞানী এবং একটি স্ক্যামের গল্প

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:২৮


জুলাইয়ের কোটা আন্দোলনের পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে। সেই সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের অংশ হিসেবে পাকিস্তান বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘নলেজ করিডোর’-এর আওতায় আল্লামা ইকবাল বৃত্তি চালু করে। ২০২৫... ...বাকিটুকু পড়ুন

×