একটা সময় হয়ত ছিল যখন ভালোবাসা নামক টপিক টা আজকের মত উন্মুক্ত ছিল না বরং সীমাবদ্ধ ছিল … সীমাবদ্ধ ছিল লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা করা, চিঠির খাম, হাতের লেখা কিংবা মসৃন পিচের দিকে তাকিয়ে দুটো মানুষের পথ চলার মধ্যে। তখনো মানুষ দুটো পরষ্পরের দিকে খুব বেশি সময় ধরে তাকিয়ে থাকতে পারত না …মানুষদুটো ভাবতো তারা হয়ত লজ্জা পাচ্ছে। কিন্তু সেটা ছিল আসলে সম্মান, লজ্জা নয়। সেটাই আসলে স্বার্থক ভালোবাসা যখন ভালোবাসার মানুষটির সামনে নিজেকে অনেক ছোট মনে হয়। ক্লাসের প্রথম বেঞ্চে বসা চুল বেণী করা পড়ুয়া টাইপের মেয়েটাকে যখন পঞ্চম বেঞ্চে বসা উস্কোখুস্কো চুলের ছেলেটিকে ভাল লেগে যেত তখন সে প্রথমে নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা চালাত। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আনমনে চুলে সিথিটা পালটে অন্য দিকে নিয়ে দেখত তার রূক্ষ চেহারায় পরিবর্তন আসছে কিনা। পঞ্চম বেঞ্চের বন্ধুগুলোকে পাশ কাটিয়ে ছেলেটা আস্তে আস্তে তৃতীয় বেঞ্চে বসতে নিজেকে অভ্যস্ত করত, ক্লাসে রেস্পন্স দিয়ে হয়ত মেয়েটার দৃষ্টি আকর্ষনের চেষ্টা করত। যেদিন সিদ্ধান্ত নিত মেয়েটাকে প্রোপোজ করবে তার এক সপ্তাহ আগ থেকে চলতে থাকত রিহার্সেল… শাওয়ারের নিচে, আয়নার সামনে কিংবা অন্ধকারে একা রাস্তায় । সেযুগে Messanger বলতে কোন এপ্লিকেশান নয় বরং খাকি পোশাকের মার্ডগার্ড বিহীন সাইকেল ওয়ালা পোষ্ট ম্যান টিকের বোঝাত। পরিবারের বদলি হবার পর থেকে দুটো মানুষ হয়ত এই চিঠি লিখেই নিজেদের ভাললাগা কিংবা মান অভিমান প্রকাশ করত। ভালোবাসার মানুষটির হাতের লেখার উপর ঠোটের স্পর্শ করতেও যেন আত্ত-সমালোচনায় ভুগত তারা। অবশ্য আমি সেই জেনারেশানের প্রতিনিধিত্ত্ব করিনা, আমি এই জেনারেশানেরই ছেলে। তবে নেহাৎ আমার কল্পনাশক্তির জোরেই কথাগুলো লিখলাম।
সমাজ পাল্টেছে, জগৎ পাল্টেছে, রাজনীতি পালটেছে… মানুষগুলো পাল্টেছে আর পাল্টেছে ভালোবাসাও। আর ভার্চুয়াল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এনে দিয়েছে তাতে অন্য একটি মাত্রা। এযুগেও আমাদের ভাল লাগে, আমরা ভালবাসি…তবে প্রেমে পড়লে আমরা প্রথমে মেয়েটির ফেসবুক আইডি কিংবা ফোন নম্বর নিতে ব্যস্ত থাকি। বেশির ভাগ সময়ই মেয়েটিকে ইম্প্রেস করি চ্যাটিং উইন্ডোতে, পড়াশুনো কিংবা কোন এক্সট্রা কারিকুলাম দিকে নয়। এখানেই একটা পরিরর্তন ঐ ৩০ বছর আগের জেনারেশানের পঞ্চম বেঞ্চের বসা ছেলেটির সাথে। ভালোবাসার মানুষটির উপরে যখন অভিমান হচ্ছে আমরা স্টাটাস দিয়ে জগৎ সুদ্ধ মানুষকে জানিয়ে দিচ্ছি আমি খারাপ আছি, কিন্তু সেই মানুষটিকে জানাতে পারছি না যার কাছে একটি নত হলেই সে আমাকে সকল ফ্রাস্টেশান থেকে সরিয়ে নিতে পারবে। প্রযুক্তি থেকে আমরা যেমন রোজ অনেক কিছু পাচ্ছি, ঠিক তেমনে আমরা অনেক কিছু হারিয়ে ফেলছি… অবশ হতে থাকছে আমাদের আবেগ- অনুভুতি, ভুলে যাচ্ছি ভালোবাসা প্রকাশ করার ভাষাটা, অভিধানের যুক্ত করছি “বস্তাপচা সেন্টিমেন্ট” টাইপের নতুন নতুন শব্দ। এই প্রজন্মের পোস্ট ম্যান গুলোর কিন্তু আর আগেকার মত ব্যাস্ততা নেই, তারা আজ সরকারী কাগজ বয়ে বেড়ায়… সেকালের মতন কাগুজে অনুভুতি গুলোকে আর নয়। যেই কাগুজে অনুভুতিগুলোকে একসময় লুকিয়ে রাখা হত বিছানার নিচে আজ সেগুলো জমা হচ্ছে সাইটগুলোর সার্ভারে। আর আমরা Chatting এর মাধ্যমেই মুক্তি দিয়ে দিয়েছি ঐ খাকি পোষাকের পোস্টম্যানকে। কেন মুক্তি দিবনা ?? সে চিঠি পৌছাতে সাত দিন সময় নিত, আর তো মেসেজ পাঠাতে সাত সেকেন্ডও সময় লাগছে না। কিন্তু…
কৃত্তিম ইমো গুলো কি সত্যিই আমাদের মনের অবস্থাকে তুলে ধরতে পারে ? যখন আমার ফুপিকে কান্না আসবে তখন কি ইমো ইউজ করব ওপাশের মানুষটিকে বোঝাব ? আচ্ছা, চ্যাটিং এর সময় আমাদের স্ক্রিনের ওপাশের মানুষটির মনিটরে কতগুলা চ্যাটিং উইন্ডো খোলা সেটা কি আমরা কখনো জানতে পারব ? জানতে পারব ওপারে মূল্যবান মানুশটির মনোযোগ কতগুলো উপাংশে বিভক্ত হচ্ছে ? আর সেই বিভাজিত উপাংশের কতটুকুই বা আমার চ্যাটিং উইন্ডোতে রিপ্লাই হিসেবে আসছে ?
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই অক্টোবর, ২০১৫ রাত ৮:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



