somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অনুগল্পঃ"মায়া"

১৫ ই অক্টোবর, ২০১৫ দুপুর ২:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বছর তিনেক আগের কথা,সেবার কুরবানির গরু কেনার জন্য হাটে গিয়েছি আমি আর আমার ছোট চাচা।গ্রামের গরুর হাট,প্রায় সব গরুগুলিই এসেছে গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের ঘড় থেকে।সারি সারি করে সাজানো প্রত্যেকটা গরুর সাথেই দুই একজন করে দাঁড়ানো, হাতে ধরা গরুর রশি, সবগুলি চেহারার মাঝেই ছুঁয়ে গেছে মলিনতা।সবাই যখন গরু বেচাকেনা নিয়ে হাট সরগরম করে ফেলেছে ঠিক তখনি আমার চোখ হাটের এক কোনায় দাড়িয়ে থাকা এক মুরুব্বীর উপর।বয়স সত্তর-পঁচাত্তর ছারিয়ে গেছে, পরনে পুরনো রংচটা লুংগি আর সাদা পাঞ্জাবী।সারাদিনের অমানুষিক রোদের অত্যাচারে গলা থেকে পুরো শরীর অব্দি ঘামে ভিজে গেছে,ভেজা ঘামে তিলে ধরা পাঞ্জাবির বয়স অনেকটাই স্পষ্ট।পায়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেল, সত্তর বয়সি পায়ের দৃঢ় নখগুলি গর্ত খুড়ে জায়গা করে নিয়েছে স্যান্ডেলের গর্ভে।

তখন সন্ধ্যে প্রায় নিভুনিভু, আমি মুরুব্বীর দিকে এক পা দুই পা করে এগিয়ে গেলাম।মুরুব্বী কে সালামদিলাম, আমার সালাম শুনে মুরুব্বী পান খাওয়া লালচে দাঁত বের করে একগাল হেসে আমার সালামের উত্তর দিলেন। সালাম শুনে তার চোখেমুখে কেমন যেন উদভ্রান্তীর ছাপ, মনে হয় হাট-বাজারে আজকাল কেউ আর সালাম কালাম দেয়না।তো আমি মুরুব্বীরে জিজ্ঞাস করলাম, ক্যা বাহে চাচামিঞা,গরুকোনা কি ঘড়ের?? চাচামিঞা আবার হাসি দিয়ে গরুর ঘাড়ে হাত বুলাইতে বুলাইতে কইলেন,আমার চান্দ মিয়া বাহে,পান্নার ঘড়ের ছোড পোলা !!!!

আমি ক্ষাণিকটা চোখ কপালে তুলে এদিক ওইদিক চাইলাম।না,আশে পাশে আর কেউ নাই।তখন বুঝলাম গরুটার নাম চান্দ মিয়া,আর ওর মায়ের নাম পান্না।তখনো মুরুব্বী চান্দমিয়ার ঘাড়ে হাত বুলিয়েযাচ্ছেন,আর চান্দমিয়া গভীর মমতায় মুরুব্বীর গায়ের সাথে মাথা ঠেসে ধরে উষ্ণতার ঘ্রান নিচ্ছে।আমি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম, আমার মনে হচ্ছিল চান্দমিয়া আমাদের কথোপকথন এর সবটুকুনই বুঝে গেছে।পরে মুরুব্বীর সাথে দামদর ঠিক করে নিলাম,আমাদের ও গরু পছন্দ হয়েছে। কিন্ত সমস্যা হইলো যখন টাকা লেনদেন করব তখন, মুরুব্বী হাটের মধ্যে একা একা এত টাকা নিবে না,টাকা তার বাড়িতে গিয়ে দিয়ে তারপরে গরু নিতে হবে।তার বাড়িও কমছে কম চার-পাঁচ কিলোমিটার এর কম না,তবে মুরুব্বীর বাড়ির রাস্তা আর আমাদের গন্তব্যএকই দিকে হওয়ায় আমরা রাজি হয়ে গেলাম। মুরুব্বী চান্দমিয়া কে নিয়ে রওনা হয়ে গেল।

ঘন্টাখানেক পর আমরা যখন মুরুব্বীর কুঁড়েঘরের কাছে পৌছে গেলাম,দেখি মুরুব্বী চান্দমিয়ারে ভুসি আর পানি খাইতে দিয়ে ঘাড় মাথায় হাতবুলিয়ে দিচ্ছে।কিন্ত চান্দমিয়া কিছুই খাচ্ছেনা, শুধু মুরুব্বীর দিকে তাকিয়ে আছে, আর মুরুব্বী ও চান্দমিয়ার দিকে।
তারা যেন চোখে চোখে কথা বলছে,কথা বলছে অন্তরে অন্তরে।চান্দমিয়ার চোখ গলে ঝরে পরছে সাদা পশমের উপর কালো রেখার চিহ্ন দিয়ে,আর মুরুব্বী গা-মাথা বুলিয়ে দিচ্ছে।চান্দমিয়া কিছুই বলছে না,আজকে মনে হয় চান্দমিয়া আর কিছুই বলবে না।চান্দমিয়া যে মুরুব্বীর দারিদ্র আর কষ্টের সব কথাই জানে।যখন চান্দমিয়ার রশি আমাদের হাতে তুলে দিল,তখন মুরুব্বীর চোখজোড়া ছলছল করছে।আমি যেন বুঝতে পারছিলাম তার ভিতরের পাড় ভাংগার শব্দ,বুঝতে পারছিলাম কতটা মমতায় চান্দমিয়া কে তিল তিল করে বড় করে তুলেছে।

আমরা চান্দমিয়া কে নিয়ে রওনা হচ্ছি কিন্তু চান্দমিয়া আর মুরুব্বীর দিকে তাকাচ্ছে না,মাটির দিকে তাকিয়ে ক্লান্ত শরীরে হেটে চলেছে অভিমানে। আর মুরুব্বী কুঁড়েঘর এর এককোনায় দাড়িয়ে দেখছে চান্দমিয়ার চলে যাওয়া।দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে,আর মায়া-মমতার বাঁধন ছিন্ন করে হেটে চলেছে চান্দমিয়া। দীর্ঘ হচ্ছে সাদা পশমের উপর ঝরে পরা নোনা জলের চিহ্ন।।।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই অক্টোবর, ২০১৫ দুপুর ২:৫৪
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এগারটি বছর পার হয়ে গেল…. কিছু পরিসংখ্যান নিয়ে একাদশতম বর্ষপূর্তি পোস্ট

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৪১



পূর্বের বর্ষপূর্তি পোস্টের লিঙ্কঃ দশম বর্ষপূর্তি পোস্ট

সামহোয়্যরইনব্লগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখ রাত ১১টা ২৬ মিনিটে প্রকাশিত হয় আমার প্রথম কবিতা, বক্ষমাঝে থাকবে তুমি। বলা যায় খুব দ্রুতই, মাত্র তৃতীয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুঃখ খচিত পতাকা আমার

লিখেছেন এম ডি মুসা, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:২৪


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র প্রাঙ্গণে
আজ হঠাৎ কার ছায়া নামে?
কার দুঃসাহসী কালো হাত
ইতিহাসের বুকের ওপর আঁকে পরাধীনতার নাম?

যে নাম একদিন ভাষার কণ্ঠ রুদ্ধ করতে চেয়েছিল,
যে শাসন একাত্তরে ছড়িয়েছিল মৃত্যুর অন্ধকার
আজ কেন তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ হতো হায়দ্রাবাদ

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৫

।।হায়দারাবাদের নিজাম।।


১৯৪৭ সাল ভারতবর্ষের মুসলমানরা যখন নির্যাতনের শিকার অনেকগুলো গণহত্যা হয়েছিল দাঙ্গা হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে বা তারও আগে এই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রাজনীতি শুরু করেছিল কংগ্রেসের রাজনীতি দিয়ে তিনি কংগ্রেসের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ: ইসলামপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষ, নাকি রাজনৈতিক বাস্তববাদী?

লিখেছেন Sujon Mahmud, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৮

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত প্রশ্নগুলোর একটি হলো—তিনি কি সত্যিই ইসলামপন্থী ছিলেন, নাকি ইসলামকে মূলত রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগীটি মারা গেলো

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৩৩



বাংলাদেশে ডাক্তারদের অবহেলায় কি পরিমাণ প্রাণ অকালে ঝরে গিয়েছে তা কল্পনাতীত। এবং আমাদের দেশের ডাক্তার এই অপরাধে নূন্যতম অনুশোচনা বোধ করে না।

ডাক্তারদের অবহেলার কারণে দেশের পাঠ্য বই ইংরেজি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×