বাংলাদেশের মৌলবাদীরা তসলিমা নাসরিনের মুণ্ডর দাম ধার্য করেছিল ৫০ হাজার টাকা। বলা হয়েছিলো তসলিমা নাসরিনের মুণ্ড যিনি কেটে আনবে, তাকে ওই অর্থ প্রদান করা হবে। এ কথা অবশ্য ১৯৯৩-১৯৯৪ সালে। অর্থাৎ আজ থেকে ২১/২২ বছর আগে।
শুরুটা ছিলো ১৯৯৩ সালে তসলিমা নাসরিনের পঞ্চম উপন্যাস ‘লজ্জা’ প্রকাশের পর। এ উপন্যাসে লেখক বেশ নিখুঁতভাবে বর্ণনা করেছিলেন, বাংলাদেশে মুসলিমদের দ্বারা একটি সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারের ওপর নির্মম নির্যাতনের চিত্র। বইটি প্রকাশের পরপরই একই বছর অক্টোবর মাসে ‘কাউন্সিল অব ইসলামিক সোলজার্স’ নামক এক মৌলবাদী সংগঠন লেখকের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন। এবং একই সংগঠন লেখকের বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করে।
এর পরের বছরটি ছিলো লেখকের জন্য আরও ভয়াবহ! অর্থাৎ ১৯৯৪ সালের মে মাসে যখন দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকায় তসলিমা নাসরিনের একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়। সেই সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত সাহসিকতা নিয়ে তিনি কোরান সংশোধনের দাবী তুলছিলেন। ব্যস, এরপর শুরু হলো মৌলবাদীদের আস্ফালন। তসলিমার ফাঁসির দাবীসহ তাঁর মুণ্ডর দামও ধার্য করা হলো।
শুধু তাই নয়, তসলিমার শাস্তির দাবীতে দেশ জুড়ে সাধারণ ধর্মঘটেরও ডাক দেয়া হয়। এমনকি মৌলবাদীদের পক্ষ হয়ে বাংলাদেশ সরকারও তসলিমার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরসহ গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। যা ছিলো জামিন অযোগ্য। ওই মামলায়, জনগণের ধর্মীয় ভাবনায় আঘাত করার অভিযোগ আনা হয়েছিলো সরকারের পক্ষ থেকে। যা ছিলো চরম মৌলবাদী আচরণ এবং বাংলাদেশি হিসেবে আমাদের জন্য চরম লজ্জার একটি দিক।
মৌলবাদী গোষ্ঠী আর সরকারের ওই মৌলবাদী আচরণে এটাই স্পষ্ট ছিল যে, স্বাধীন রাষ্ট্র হলেও মানুষের বাক স্বাধীনতা বলতে কোনো স্বাধীনতা নেই। মৌলবাদ গোষ্ঠী তথা ভোট ব্যাঙ্কটাকেই রাজনৈতিকদের কাছে মুখ্য। তাই মৌলবাদী শ্রেণীর পক্ষাবলম্বনই করে তারা।
তবে ২১/২২ বছর আগের সেই ঘটনাটি আমরা অনেকেই ভুলে গিয়েছিলাম। হয় তো কারো কারো মনে আছে। তারপরও বিষয়টা ইতিহাস। কিন্তু সেই অতীতটাকে আবারও মনে করিয়ে দিলো ভারতের কট্টরপন্থী মৌলবাদ গোষ্ঠী হিন্দু মহাসভা ও শিবসেনার আচরণ।
যারা প্রকাশ্যেই শাহরুখ খান ও আমির খানের মুণ্ডর দাম ধার্য করেছেন ১ লাখ রুপী। শুধু তাই নয়, একটি মাত্র মন্তব্যের কারণে একের পর এক হয়রানির শিকার হচ্ছে আমির। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে থেমে থেমে সভা-সমাবেশ ও বিক্ষোভ দেখাচ্ছে মৌলবাদীরা।
তাহলে কি বিষয়টি এমন, একদিকে ইসলামি মৌলবাদী গোষ্ঠীর প্রতি সমগ্র মানুষ জাতী যখন ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে তখন হিন্দু মৌলবাদ গোষ্ঠী মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে? যার কারণে এই একবিংশ শতাব্দীতে তথা তথ্য-প্রযুক্তি নির্ভর যুগে এসেও এই শ্রেণীটা মধ্যযুগীয় কায়দায় মুণ্ডর দাম ধার্য করছে! একি সভ্যতার লক্ষণ, নাকি অসভ্যতার আস্ফালন?
হিন্দু হোক আর মুসলিম হোক। বাংলাদেশ হোক আর ভারত হোক। মৌলবাদী গোষ্ঠীর আচরণ একই হয়। যেমন কথায় আছে, ‘ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান বানবে’। মৌলবাদীরাও ঠিক এমনই, তারা কি হিন্দু আর কি মুসলিম।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে নভেম্বর, ২০১৫ বিকাল ৫:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




