ভূমিপুত্র (গল্প) পর্ব-২ ভূমিপুত্র (গল্প) পর্ব-১
হিজলী খালের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়ে মাথা বোঝাই রূপ নিয়ে জলভর্তি খালের বেশে প্রাপ্ত যৌবনা উদাসী কোন নারী সাঁপের মতো এঁকেবেঁকে এ পথেই চলছে শতবছর ধরে। তারই দেহের ভাঁজে ভাঁজে অলংকার হয়ে গেঁথে আছে ঘন বাঁশ ঝাড়, কাশবন, ঝাউবন, তালখেজুরের সারি, আর তার হৃদয়ের বারতা নিয়ে ছুটে চলে ছান্দসিক জলরাশি। সবই প্রেমের আধার। তাল খেজুরের সারি যেখানে শেষ, সেখানেই বারীগ্রামের শুরু। উদয়াস্তের ক্লান্তি শ্রান্তির বিবর্ণ অথচ কাঁচা তাজা পানের বাগানগুলো খালের দুপাড়ে গ্রামেরই অলংকার হয়ে। মাঝে মাঝে পুরোনো বাগান ভেঙ্গে গড়ে ওঠা কিছু ঘর বাড়ি। সেখানটায় কৃষ্ণমহুরির দেহে পড়লো কলংকের দাগ। কাচাবাড়ির বাসিন্দাদের কৃতকর্মে ওই স্থানেই যত দু:খ কৃষ্ণমহুরীর। বক্ষে ধারণ করা সেই প্রকৃতির রসে ছড়ায় দুর্গন্ধ। পাড়ার এই খালের উপর মানব চাহিদায় গজিয়েছে ছটে ঘেরা গোটা বিশেক ঝুলন্ত মলঘর। হায়রে কৃষ্ণমহুরী! বোবা অথচ জন্মের পর থেকে আজ অবধি যা দেখেছে, যা শুনেছে-বুজেছে, যত ঘা সহ্য করেছে, যা দিয়েছে, বিনিময়ে যা পেয়েছে সবই যদি বলতে চায় তবে জন্ম থেকে আজ অবধি যত সময় সে বয়ে গেছে, তারও, ঢের বছর, যুগ কিংবা শতাব্দী পার হয়ে যাবে সুনিশ্চিত।
সেই একাত্তরের সময় বা তারও অনেক পরে বাবরী মসজিদ নিয়ে দাঙ্গার সময় অসহায় ভেবে নিজেকে কুলীন করে শব্দহীন পায়ে দেশত্যাগ করলো কতো হিন্দু। একবার দেশ বিমূখ হলেই আর ফেরার নাম গন্ধ থাকে না। যেন এদেশ তাদের খালি কেড়েই নিলো! ৭১ এর এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধ যখন গ্রামের দিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলো তখন হিন্দুরা দল বেঁধে গ্রাম ত্যাগ করতে লাগলো। বটেশ্বরী ঘাটে তখন প্রিয়লালদের প্রস্তুতি দেশ ত্যাগের জন্য। নৌকায় ওঠার আগে দলের সবার সম্পত্তির দলিলপত্রাদি তুলে দিয়ে যান দাসবাড়ির তন্ময় দাসের হাতে। যে তন্ময় দাসকে প্রিয়লাল তার নিজের হাতে পত্তন করা গ্রামে ঠাঁই দিয়েছিলেন। তন্ময়দাসের পরিবার বাদে পাড়ার বাঁকি সবাই দেশ ত্যাগ করেছিলো। আর মাটির টানে রয়ে গেলেন তন্ময় দাস। সশস্ত্র না হলেও যুদ্ধে শামিল হয়েছিলেন। ইস্ কতো দেশপ্রেমই না ছিলো। কিন্তু যুদ্ধের পর যখন দেশটা শান্ত হলো এবং যখন দেখলেন, কেউ ফিরে আসছে না, তখনই তার সবপ্রেম উবে গেলো। সবার সম্পত্তিও তখন মা লক্ষীর হয়ে গেলো। গয়া-কাশীতে গেলেন, আবার গেলেন গঙ্গা স্নানে। লক্ষ্মীর দানকৃত সম্পত্তির ভোগ দিলেন।
যুদ্ধের পর দেড় বছর পার হলো । ’৭৩ এর মাঝামাঝিতে গ্রামে এলেন প্রিয়লাল। অবস্থা খুবই খারাপ। দেশত্যাগের পর গৃহিনী আর সন্তানের নানান বিমারে নগদ সব শেষ হয়ে গেছে। এখন তার অবস্থাও ভূমিহীন তন্ময় দাসের মতো। পুরোনো ভক্তি আর বিশ্বাস নিয়ে এলেন তারই আশ্রয়ে থাকা পাড়ার একক অধিপতি ১০ সন্তানের পিতা তন্ময় দাসের বাড়ি। বাড়িতে ঢুকেই চোখ ছানাবড়ো হয়ে গেলো। এ যে প্রিয়লালের বাড়ির সাথে জোড়া লাগানো রাজ বাড়ি! চার কড়া জমির বাড়িতে এখন পুরো দেড় একর সম্পত্তি। প্রিয়লালের গলা শুকোতে আর বেশি দেরী হলো না। অজানা এক শংকায় শংকিত হয়ে ক্লান্ত দেহটাকে ঘামের সাথে মিতালী ঘটিয়ে একটু শান্ত হতে দিলেন। কিন্তু বুকের ধড়পড়ানি তখন আর বুকের ভেতর থাকতে চাইছে না। নাক-মুখে একসাথে নি:শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে কুঁজো শরীরটাকে নিজ আয়ত্বের বাইরে নিয়ে ছেড়ে দিলেন দাসবাড়ির বারান্দায়। পুরো গ্রামের স্রষ্টা হলেও পরে বিলিয়ে দিতে দিতে নিজের কাছে যৎসামান্যই ছিলো প্রিয়লালের। তবুও তাকে দেখে শ্রী শ্রী তন্ময়দাসের মুখের শ্রী উদাও হয়ে গিয়েছিলো। নামের আগের জোড়া শ্রীও তখন স্থানচ্যুত হয়ে যাচ্ছিলো। অথচ মনটাকে কিঞ্চিৎ বড়ো করে একমুঠো মুড়ি আর দুটো গুড়ের সন্দেশ খেতে দিলেন প্রিয়লালকে। খেতে খেতে জমির প্রসঙ্গটা আনতেই খানিকটা উত্তেজিত হয়ে গেলেন তন্ময়দাসের মেজো ছেলে চিরন্ময় দাস। অবাক হননি প্রিয়লাল, সাথে কিছু চড় থাপ্পড়ও আশা করেছিলেন। হাওয়া খেতে তো আর বড় হননি, বাড়ির আয়তন দেখেই বুঝে গিয়েছিলেন কি হবে আর কি হতে যাচ্ছে। এরকম কতো জোরদারের সালিশ একাই করেছিলেন প্রিয়লাল। তখন সেই দাপটও ছিলো। পালকীতে করে এসে নিয়ে যেতো দুর পথ থেকে আসা মানুষেরা। তারপর সালিশ শেষ হলে আবার পালকীতে করেই দিয়ে যেত। কিন্তু আজ? আজ এই জোরদারের সালিশ কে করবে? পুরো বিষয়টা ক্ষণে ক্ষণে স্বপ্নের মতো ঠেকে অসহায় এক রাজার কাছে। আবার ভাবে কোনরূপ রসিকতা নয়তো? কারণ প্রিয়লাল খুবই রস করতেন সবার সাথে। দাসপুত্রের ক্ষেপে যাওয়া দেখে জল খেয়ে আর গলা ভেজানোর সাহস হলো না প্রিয়লালের। জলের পরিবর্তে হালকা একটু ঘাড় ধাক্কা খেয়েই সন্তুষ্ট রইলেন। পরিস্থিতির আকস্মিতায় মনের অজান্তেই দু’চোখে জল চাড়লেন। কে জানে সেই অশ্র“ কোন ফাঁকে মুখের ভেতর গেল কি না? তবে নোনা জলেই যদি তৃষ্ণা মেটে!
খুব ইচ্ছা করছিলো কিছু কথা বলতে। স্ত্রীর মৃত্যুশয্যা, বেকার দুটো ছেলে, অবিবাহিত মেয়ে কিংবা অপরের জমিতে বসবাসের কথা, নিজ অসহায়ত্বের কথা। কিন্তু সেই বলাটাই এখন তার জন্য অসম্ভব একটি বিষয়। ইচ্ছে করেছিলো তন্ময়দাসের পা ধরে বলতে, “আমাকে একটু জমি দাও, ও দেশে আমি রিভুজির মতো, আমার স্বদেশ আমাকে টানে, কৃপা করো... আমাকে কৃপা করো। ছেলে দু’টা চাষবাস করে খাবে, মেয়েদের বিয়ে দিতে হবে, তারাতো আইবুড়ো হয়ে গেছে। তুমি তো আমার দয়ায় এই গ্রামে এসেছো, এখন আমিই তোমার কাছে দয়া ভিক্ষা চাইছি, তোমার আত্মায় একটু গঙ্গার জল ঢেলে দেখো, আমাকে বিবেচনা করো...” এরকম আরও অনেক কথাই বলা যেতো, কিন্তু প্রিয়লাল তার কিছুই বলেনি। বলবেই বা কিভাবে? তারও অনেক আগেই বোবা হয়ে গিয়েছিলেন শুকিয়ে যাওয়া রাজত্বের রাজা। সবশেষে এই কথাও বলা হয়নি যে, “ আমার কাছে ভারত যাবার বাড়াটাও নেই, এক কানাকড়ি নেই। আমাকে অন্তত সেই টাকাটা দাও!”
কোন কিছু না বলেই দাসবাড়ি থেকে বেরিয়ে রাত পর্যন্ত গ্রামের আনাচে কানাচে ঘুরলেন। কেউই চিনতে পারলো না। অবশ্য সবাই নতুন। তন্ময় দাসের দেয়া আশ্রয়ে এখানে বসবাস করছে। সুতরাং প্রিয়লাল সেনকে চেনার কোন কথাই নেই। কিন্তু পাশের গ্রামের রমিজ মিয়া, সে তো চেনার কথা। বাল্যকালের বন্ধুও দেড় দু’ বছরের ব্যবধানে ভুলে গেলো! দুর্দশার কি দান! বিণয়, বিণয়, জীবনের প্রতিই খালি বিণয়। রাত যখন গভীর হলো, তখনই সুযোগ বুঝে মন্দিরের দানবাক্সের টাকা চুরি করে সে যাত্রায় গ্রাম ত্যাগ করে আবার ভারতেই চলে গেলেন প্রিয়লাল সেন। তার সাথে এক মানুষের বীরত্বের শ্রাদ্ধ হলো, যে বীর কিনা একটি গ্রাম সৃষ্টি করে সেই গ্রামেই অসহায় মানুষগুলোকে ঠাঁই দিয়েছিলেন জীবনযন্ত্রনা থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য। অথচ আজ সেই বীরই অসহায়দের ছোবলে সর্ব শান্ত হলেন।
সেই প্রিয়লালের নাতি এখন এই পাড়াতে এসেছে গবেষনার জন্য। আজ এতোদিন পর তাই হয়তো কৃষ্ণমহুরীর নাব্যতা বেড়ে গেছে, বেড়েছে জলের উচ্চতাও । তরুরা এখন অনেক সবুজ, মেঠোপথের ঘাসেরাও আজ ঢের হরিৎ। কোন আনন্দে? ঐ দিকে পানের বরজগুলো কেমন নেতিয়ে পড়ছে, খালি নেতিয়ে পড়ছে। কিন্তু কোন বিষাদে? তবে কি ভূমিপুত্রের বরণে আয় আয়-যায় যায় অবস্থা? সে যাই হোক জয় কিন্তু বেশ খোশমেজাজে আছে। সে এখন বরাবরের মতোই নৌকা নিয়ে কৃষ্ণমহুরীর বুকে। এখানে আসার পর যে ছেলের সাথে তার ভালো সখ্যতা জমে গেছে, তাকে নিয়েই এই জলবিলাস।
আনাড়ী হাতে বৈঠা নিয়ে নৌকাটাকে নিয়ে গেলো পালবাড়ির বাগানের ভিতর। সাথে থাকা সঞ্জয় তখনও খুব হাসছে, যে হাসির শুরু হয়েছিলো বাগানের শুরুতে। বাগানের গাছের দূরত্ব বেশ আছে, তাই নৌকা চালাতেও অসুবিধা হেচ্ছ না। কিন্তু এবার যে বৈঠাটিই হাত ফসকে পড়ে গেলো। কোথা থেকে যেন একটা পেয়ারা জয়’র মাথায় এসে পড়লো। তা অবশ্য এখন নৌকাতেই পড়ে আছে। কিন্তু বৈঠা পড়লো পানিতে। পেয়ারার আগমন স্থলের সন্ধান না মিললেও একটা হাসির শব্দ জয়’র কানের কাছে এসেই মিলে গেলো।
চলবে...
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ডিসেম্বর, ২০০৯ ভোর ৪:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


