somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প: ঈশ্বরের ইচ্ছেপূরণ

০৬ ই ডিসেম্বর, ২০১৭ রাত ৯:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



মেঘালয় থেকে ফিরছিলাম আমরা ক’জন, হঠাৎ পথে দেখা হয়ে গেলো আমাদের পুরোনো সেই গল্পবলা হরিপদ কাকার সাথে। দেখলাম তিনি নদীর ধারে আপন মনে বসে আছেন। কাছাকাছি যেতেই তিনি বললেন আজ একটা নতুন গল্প শোনাবো তোদের। আমরা টপাটপ বসে পড়লাম সবুজ দূর্বার উপর।
তখনও সন্ধ্যে হয়ে আসেনি বলে নদীর ঘাটে মানুষের আনাগোনা কমেনি। যে কারণে খুব কাছাকাছি বসতে হলো। হরিপদ কাকা গল্প বলার শুরুতে মুখভার করে ফেলেন। যথারীতি সে মুখভার করতেই আমরা আগ্রহী হয়ে কান পাতলাম গল্পে।
মিনিট খানেক চুপ থাকার পর মুখ উচিয়ে বলতে তিনি শুরু করলেন-
আজ যে গল্পটা বলবো সেটা কতো-শতো কাল আগের কোন গল্প নয়। খুবই সাম্প্রতিক গল্প। মেঘালয়ের পাদদেশে বাস করতো এক সহায় সম্বলহীন যুবক। যার নাম ছিলো দৈন্যকুমার। সে রুপকথার রাজকুমার বা ডালিম কুমার নয় সে এই যুগের দৈন্যেভরা দৈন্যকুমার। তার দিন কাটতে সামান্য কাজ করে আর শান্তিভরা ঘুম দিয়ে। সে ঈশ্বরের উপর ভরসা না রাখলেও ঈশ্বর তার প্রতি ছিলেন সহায়। তার জীবন ছিলো নিরুত্তাপ।

তেইশ বসন্ত এভাবেই সূর্য উঠে সয়ে গেছে সকল যাতনা। সন্ধ্যে তারাটি আকাশে নিরব দর্শক হয়ে জেগে জেগে ঘুমিয়ে গেছে রাতের সাগরে। পথের সবুজ দূর্বা থেকে থেকে উঁকি দিয়েছে বাতাসের জয়গানে। মধ্যরাতের রূপময়ী চাঁদ গেয়ে গেছে গান, আনন্দহীন সুরমালতীতে। স্নিগ্ধ ভোর প্রতিটি দিনের মতো ছবি একে দিয়ে গেছে আপন মনে। এভাবেই ছন্দে-বিরহে-অপেক্ষায় কেটে গেছে তেইশটি বসন্তের দিন। হয়তো চলে যেতো এভাবেই, কিংবা একসময় মানব জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়ার সুর বাজতো।
কিন্তু তার নিরাসক্ত জীবন দেখতে দেখতে ঈশ্বর একদিন মাথাচাড়া দিয়ে উঠলেন। তিনি চাইলেন ছেলেটির জীবনে বন্ধন আসুক, মোহ আসুক, প্রেম আসুক। প্রেমে পড়ুক। কিন্তু দৈন্যকুমার এতটাই বাস্তববাদী যে, প্রেম তার কাছে অসহায়। মোহ তার কাছে নিস্ফল। অগ্যতা ঈশ্বর তার নিজের ইচ্ছে পূরনে দৈন্যকুমারের ভেতরই উপবিষ্ট হলেন।
সেই মেঘালয়ের কালো পাহাড় জানতো, যার নেই কিছু বলবার, নেই কিছু দেখাবার তার জীবনে নারীপ্রেম একটু আশ্চর্যই বটে। জনপদের মানুষগুলো একদিন অবাক চোখে দেখলো, কুমারের জীবনপথে প্রেম এসে গেছে উত্তাল হাওয়ার মতো। প্রেমে এসেছে সর্বনাশা বৃষ্টির মতো।
যার দৈন্যের ভাগ্য তেইশ বছরেও এতটুকু বদলে যায়নি, যে মানুষটি দু-বেলা ভাতের মতো করে মানুষের উপহাস গলাধঃকরণ করতো তার জীবনে কিভাবে উড়ে এমন প্রেমের সুবাস!
কিন্তু লোকের কথায় ঈশ্বর তো দমে যাবার পাত্র নন। তিনি মোহিত করা রুপে যুবককে তাঁতিয়ে তুললেন।
দূরের এক জনপদের মোহময়ী তার সাথে প্রেমের সুরে ভেসে চললো দিনের পর দিন।
দৈন্যকুমারের বুকে জমিয়ে রাখা হাজার শব্দভাণ্ডার, প্রেম এসেছে বলে বিস্ফোরিত হতে লাগলো। শব্দময় কথাগুলো প্রেমময় রূপ নিয়ে প্রকাশ হতে লাগলো। অনেক দিনের জমানো মনকথার ঘুড়িটি প্রেমের সুতোয় পড়ে উড়তে লাগলো আকাশ জুড়ে। প্রেমের সুতো ঘুড়িকে দিল দীর্ঘ পথের সন্ধান।


এই অবদি বলে থেমে গেলেন হরিপদ...
আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম, হঠাৎ গল্প থেমে যেতেই সমস্বরে বলে উঠলাম, তারপর...কী হলো?
একটু থেমে নিয়ে হরিপদ কাকা আবার বলতে শুরু করলেন, প্রেম চলতে-চলতে প্রায় দীর্ঘ তিনশত দিন পর মেয়েটি যুবক দৈন্যকুমারকে আস্তে আস্তে এড়িয়ে যেতে শুরু করলো। কথা না রাখার বাহানাগুলো তখন প্রজাপ্রতির মতো উড়তে শুরু করেছে, অজুহাতের পর অজুহাতগুলো শুধু অকারণেই ভাসছে। এই দীর্ঘবাসের পর মেয়েটি বুঝতে পেরেছে নির্মল মনের দৈন্যকুমার যেনতেন কোন মানুষ নয়, সে একজন নিমগ্ন কবি। কে যেন বলেছিলো- চঞ্চলা, চপলা হরিণী নারীর জীবনে যদি কোন কবিপ্রেম আসে তাহলে তাকে ভালোবাসা যায় কিন্তু তার সাথে ঘর করা যায়না।
এই পর্যন্ত বলেই, আবারও “গল্পমানুষ হরিপদ থেমে গেলেন... আমরা চেয়ে রইলাম মুখের পানে। তিনি মুখটা নামিয়ে নিয়ে বললেন, এরপর ঈশ্বরের হয়েছিলো করুণ অবস্থা।
তিনি মানুষরূপে ছিলেন বলে কোন কলকাঠি নাড়তে পারছিলেন না। শুধু মনে হচ্ছিল তিনি নারীর মনের আকাঙ্খার কাছে হেরে গেছেন। দৈন্যকুমার হয়ে একটি করজোরে প্রণিপাতও করেছিলেন মেয়েটির কাছে। ঈশ্বর শান্ত হয়ে এলেও দৈন্যকুমার ততদিনে জেগে উঠেছে, মোহ আর আর বন্ধনের সাগরের ডুবে গেছে সে। পণ করে বসলো এই মেয়েকেই বিয়ে করবে, ঈশ্বরের কোন শক্তিই তাকে ফেরাতে পারবে না।
দৈন্যকুমারের এমন কথায় ঈশ্বর রাগ করতে পারলেন না। মানুষ যে মোহে পড়লে এমন হয়ে যায়, এটা তো তার অজানা নয়। এরপর কেটে গেলো বেশ কিছু রাত। শব্দহীন রাত। নক্ষত্রভরা রাত। নির্ঘুম রাত। এক প্রভাতের কালে ঘুমন্ত দৈন্যকুমারকে রেখে ঈশ্বর চললেন স্বর্গের পথে। এখন যা করার দৈন্যকুমারই করবে, পরাজিত হলে ঈশ্বরকে দোষ দেবে। তিনি চৌকাঠ পেরিয়ে কাঁদলেন। পরিশেষে বুঝতে পারলেন এই মানব ভূমিতে ইচ্ছের হাত ধরেও তিনি নিজেও অসহায়!

সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই ডিসেম্বর, ২০১৭ রাত ৯:২১
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সামু একটি ছোট নৌকা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:২৫



একটা ছোট নৌকা, পাল তুলে, পাড়ি দিচ্ছে -
অন্তহীন তারার রাস্তা পেরিয়ে।
পেরোচ্ছে গ্রহ, ধূমকেতু, ছুটন্ত আগুনের টুকরো,
দূরে কোথাও ধাক্কা লাগে, তারপর শব্দটা মিলিয়ে যায়।
ধীরে, খুব ধীরে এগোয় নৌকা;
তবু এগোয়।

নৌকায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

পোর্টাল – ২ গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৭


তখন বেশ ঠান্ডা পড়ে গেছে। সেপ্টেম্বরের রাত।
বরফ পড়া শুরু হয়নি। মন্ট্রিয়লের রাস্তা জনাকীর্ণ। বাড়ি থেকে বের হলে কো-দ্যেনিশ রাস্তার শেষ প্রান্তে একটা লাইব্রেরি আছে। তার পরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগে ১০ টি বছর পার করলাম

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:০২



ব্লগে ১০ বছর পার করে দিলাম। কত সময় কেটে গেছে এখানে, কত পরিচিত মুখ রয়ে গেছে এখানে। তবুও ভালোবাসার বন্ধন যেন শেষ না হয়।

যে কবিতাটা দিয়ে ব্লগিং শুরু করেছিলাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিন্নাহকে জানতে হলে পাকিস্তান আন্দোলনের ইতিহাস জানতে হবে। পর্ব-১

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:১৩



পাকিস্তান সৃষ্টির বছরখানেক আগে ১৯৪৬ সালে বোম্বে শহরের দুই নামকরা পার্সি ডাক্তার বুঝতে পেরেছিলেন যে ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ এবং আইনজীবী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর আয়ু আর বেশিদিন নেই। ডা.... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৯৭১ ডিসেম্বর ১০-১৬: বিশ্ব বাংলাদেশকে নিয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ছিল

লিখেছেন কলাবাগান১, ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:১১


লিখা টির ইতিহাস ভিত্তিক ইনফো এআই থেকে সংগৃহীত

আমরা সবাই জানি যে ১৯৭১ সনের ১৬ই ডিসেম্বর বিকেলে পাকিস্হান হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পন করে মিত্রবাহিনীর কাছে। কিন্তু আমরা অনেকেই হয়তো জানি না,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×