বর্তমানে দেশের প্রধান বন্দর চট্টগ্রামে কন্টেইনারবাহী আমদানি-রফতানিমুখী পণ্যসামগ্রীর ওঠানামার ব্যস্ততা থাকে সারাবছর জুড়ে। সমান কর্মব্যস্ততা বন্দর-শিপিং নির্ভর সবক’টি খাতেও। প্রায়ই কার্গোসহ কন্টেইনার জট এবং মাঝেমধ্যে জাহাজজটে অচলদশার মুখে পড়ে বন্দর। জেটি-বার্থ, ইয়ার্ড-শেডগুলোর স্বাভাবিক ধারণক্ষমতা প্রতিনিয়তই উপচে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম শহর ও বাইরের বেসরকারি আইসিডিগুলোতেও (অফডক) ঠাঁই নেই অবস্থা। বন্দরমুখী ও বহির্মুখী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, মুভার, ট্রেলার চলছে দিনে-রাতে সারি সারি। চট্টগ্রাম বন্দর ও বহির্নোঙর থেকে হরেক পণ্য বোঝাই দেশের বিভিন্ন নৌ-বন্দর, ঘাট অভিমুখী শত শত লাইটার কার্গো জাহাজ, কোস্টার, নৌযান ছুটে চলেছে। শুধুই তাই নয় বন্দর-শিপিং-কাস্টমস নির্ভর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তথা স্টেক হোল্ডার যেমন- স্টিভিডোর, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার, ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়ার্ডিং এজেন্টস, শিপিং এজেন্টস, মেইন লাইন অপারেটর (এমএলও), ডেলিভারী পরিবহন প্রভৃতি খাত-উপখাতওয়ারি অপারেশন কর্মচাঞ্চল্য প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। সমগ্র এই শিপিং বাণিজ্যের ব্যাপক বিস্তৃততে এই খাতকে ঘিরে বার্ষিক ব্যবসায়ের আকার এখন প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার। উপরোক্ত চালচিত্র বাংলাদেশে শিপিং বাণিজ্যের ক্রমবর্ধমান গতিশীলতার সূচক ও প্রমাণ বহন করে। বর্তমানে বাণিজ্যের বিশ্বায়নের ফলে বিশ্বব্যাপী শিপিং পরিবহনের দিকে ঝোঁক বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর পেছনে মূল কারণ শিপিংযোগে পণ্য পরিবহন ব্যয় সাশ্রয়ী, নিরাপদ, সহজতর। তাই বিশ্বায়নের প্রভাবে বাংলাদেশেও শিপিং বাণিজ্যে সুদিনের ঢেউ এসেছে। দেশে শিপিং খাতে প্রবৃদ্ধির হার এখন ১৫ শতাংশেরও উপরে। বিশেষ করে খরচ সাশ্রয় করার জন্য নৌপথ ব্যবহার তথা শিপিংয়ে আমদানি ও রফতানি কার্যক্রম পরিচালনার ঝোঁক অনেকাংশেই বেড়ে গেছে। আর এক্ষেত্রে দেশের ৯০ শতাংশ আমদানি-রফতানি কার্যক্রমই সম্পন্ন হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। এ বন্দরে গত ২০১৬ সালে ৭ কোটি ৭২ লাখ ৫৫ হাজার ৭৩১ মেট্রিক টন কার্গো এবং ২৩ লাখ ৪৬ হাজার ৯০৯ টিইইউএস কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়েছে। ২০১৬ সালে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং খাতে প্রবৃদ্ধির হার ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ। আর সাধরণ খোলা কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে প্রবৃদ্ধি ১৭ শতাংশ। বন্দরে জাহাজ গমনাগমনও বেড়েছে। আগের বছরের তুলনায় ২০১৬ সালে জাহাজের সংখ্যা ৩০৫টি বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ১৪ টিতে। উল্লেখ্য, সমুদ্র বিজয়ের ফলে মোট ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটার বিস্তীর্ণ সমুদ্রসীমা এবং ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলের (ইইজেড) উপর বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর ফলে জ্বালানি তেল, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, নিত্য ও ভোগ্যপণ্য সামগ্রী যদি আরও বেশি পরিমাণে বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজবহরের জন্য যোগান দেয়া যায়, তাহলে এক্ষেত্রেও বাংলাদেশের প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা আহরিত হবে। অন্যদিকে দেশের ব্যাপক আয়তনের সমুদ্রসীমা বা মেরিটাইম বাউন্ডারি স্বীকৃত হওয়ার ফলে আন্তঃদেশীয়, আন্তঃমহাদেশীয় এবং দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথেও জাহাজ, ট্যাংকার, ফিডার জাহাজ, কার্গোজাহাজ, কোস্টার, বার্জ, ফেরিসহ বিভিন্ন ধরনের ছোট-বড়, মাঝারি আকারের নৌযানের চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাবে। এ কারণে জাহাজ নির্মাণ শিল্পখাতের কর্মচাঞ্চল্যও ব্যাপক পরিসরে পৌঁছে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় দেশের শিপিং খাতে সুদিন আসছে। আর সময়োপযোগী ও দুরদর্শী উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের সুযোগ্য নেতৃত্ব শিপিং খাতের এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে পৌঁছে দিবে এক অনন্য উচ্চতায় – এটাই সকলের প্রত্যাশা।

সর্বশেষ এডিট : ২২ শে জুন, ২০১৭ বিকাল ৫:০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




