যথা নিয়মে যথাস্থানে কোনো বস্তু রাখার নামই হচ্ছে আমানত। সুতরাং কোনো ব্যক্তিকে এমন কোনো পদ প্রকাশ করা, সে যার উপযুক্ত নয়, সেটা খেয়ানত। কোনো ব্যক্তিকে এমন কোনো পদে বসানো, যেই পদের সে উপযুক্ত নয়, নবী করীম (সাঃ) একে কেয়ামতের আলামত বলে আখ্যায়িত করেছেন। অর্থাৎ বিশ্বস্ততার দিক থেকে অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও দলীয় গোত্রীয় স্বজনপ্রীতি বা অন্য কোনো স্বার্থদুষ্ট বিবেচনায় কাউকে কেনো দায়িত্বপূর্ণ পদে বসানো ইসলামের দৃষ্টিতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। একদা জনৈক ব্যক্তি রসূল (সাঃ)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে জানতে চাইল যে, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কেয়ামত কবে হবে? হযরত (সাঃ) বললেন, যখন আমানত খেয়ানত হতে দেখবে, (ক্ষমতার অপব্যবহার হবে) তখন একে কেয়ামতের লক্ষণ বলে ধরে নিবে। বরং কোনো পদের জন্য অন্য গুণাবলীর দিক থেকে কেনো ব্যক্তি কিছুটা কম হলেও আমানতদারী, বিশ্বস্ততার গুণ তার মধ্যে অপরিহার্য শর্ত হিসাবেই থাকতে হবে, যেন তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সে যোগ্যতা ও বিশ্বস্ততার সাথে যথাযথ পালন করতে পারে। মহানবী (সাঃ) সব সময় এ বিষয়ের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখতেন। একদিনের একটা ঘটনা। যাকাত উসূলকারী জনৈক কর্মচারী কোনো এক এলাকার কাজ শেষ করে হযরত সমীপে এসে উসূলকৃত অর্থসম্পদ জমা দিতে গিয়ে বলল, হুযূর, ‘এগুলো হচ্ছে যাকাতের মাল আর ঐগুলো মানুষ আমাকে উপঢৌকন হিসাবে দিয়েছে। একথা শুনে মহানবী (সাঃ) ভিতরে ভিতরে অসন্তুষ্ট হলেও তা তার স্বভাব সুলভ কারণে তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকেন। অতঃপর নামায শেষে মদীনার মসজিদে মিম্বরে দাঁড়িয়ে এ সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণী বক্তব্য প্রদান করতে গিয়ে বলেন,-- কোনো কর্মচারী রাষ্ট্রীয় কোনো দায়িত্বে থাকাবস্থায় যদি জনগণের পক্ষ থেকে তাকে কেউ কোনো হাদিয়া-তোহফা, উপহার-উপঢৌকন প্রদান করে, সেটা বায়তুল মাল বা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের সম্পদ। ঐ উপহার উপঢৌকনের মালিক সংশ্লিষ্ট কর্মচারী নয়। হযরত (সাঃ) ক্ষোভ বশতঃ এ ঘটনা উপলক্ষে যা বলেছিলেন তার সারমর্ম হলো এই যে,-- সরকারি দায়িত্বে থাকাতেই কোনো ব্যক্তি জনগণের উপহার পায়। অন্যথায় এ পরিচয় ত্যাগ করে নিজ বাড়িতে বসে থাকলে, কেউ তাদের জিজ্ঞেসও করতো না,-- উপহার-উপঢৌকন দেয়াতো দূরের কথা।
বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবুযর গিফারী (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একদিন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সমীপে এ মর্মে আরয করেছিলাম যে, হযরত! আমাকে কোনো এলাকার আসিল (গবর্নর) নিয়োগ করবে না? ‘‘একথা শুনে হুযূর (সাঃ) বললেন, আবুযর! তুমি দুর্বল মানুষ। এ দায়িত্বভার একটি আমানত। এটি কেয়ামতের দিন অপমান ও যিল্লতীর নিমিত্ত হবার (মতো) একটি পদ। তবে যে সকল লোক এই পদটির হক ঠিকভাবে আদায় করবে এবং বিশ্বস্তার সাথে এ পদে বসে যথাযথ দায়িত্ব পালন করবে, তারা অপমান-যিল্লতী থেকে রক্ষা পাবে।’’ এছাড়া সঠিক দায়িত্ব পালনকারীদের জন্যে অন্য হাদীসে বিপুল পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। কারণ, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব কর্তব্য ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে আল্লাহর খেলাফত চালনারই একটি অংশ হিসাবে ইবাদতের কাজরূপে গণ্য, যদি সেরূপ নিয়ত করা হয়।
উল্লেখিত হাদীস থেকে প্রতীয়মান হয়, তাকওয়া পরহেযগারী ছাড়াও কাউকে কোনো পদে নিয়োগ দিতে হলে সংশ্লিষ্ট পদের সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব কতর্ব্য পালনেও ঐ ব্যক্তির পূর্ণযোগ্যতা দক্ষতা থাকতে হবে। কারণ, সততা বিহীন যোগ্যতার যেমন বিপদ তেমনি যোগ্যতা বিহীন সততাও বিপজ্জনক। যেমন : ইংরেজিতে বলা হয়, Sincerity without efficincy and effieincy without sincerity both are dangerous. সুতরাং যদি কোনো ক্ষমতাধর অথরিটি কোনো অন্যায় বিবেচনায় যোগ্যতর ব্যক্তিবর্গকে বাদ দিয়ে ঐ পদে কোনো অযোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দেন, তাহলে সেটা হবে ক্ষমতারূপ আমানতের অপব্যবহার জনিত খেয়ানত। তাই নিয়োগ কর্তা অথোরিটির কর্তব্য হবে সালেহিয়াত এবং সালাহিয়াত তথা সততা ও যোগ্যতা উভয় গুণাবলীকেই নিয়োগদানের পূর্বশর্তরূপে গণ্য করা এবং তা পূরণে কঠোর থাকা।
‘‘যিনি নিছক স্বজনপ্রীতিবশত কাউকে কোনো পদে নিয়োগ দেন, অথচ সেখানে এমন যোগ্যতর ব্যক্তি রয়ে গেছে, সততা, নিষ্ঠা ও যোগ্যতার দিক থেকে যে আল্লাহর প্রিয় ব্যক্তি, তা হলে ঐ নিয়োগকর্তা আল্লাহ এবং তার রসূল ও সকল মুসলিম জনতার সাথে খেয়ানত করলেন।’’ (হাদীস) বিশ্বাসঘাতকতা করলেন গোটা জাতির সঙ্গে।
ইবনে আবু সুফিয়ান বলেন, ‘‘খলীফা আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) যখন আমাকে সিরিয়ার গবর্নর করে পাঠালেন, তখন এই মর্মে আমাকে উপদেশ প্রদান করেছিলেন যে, হে ইবনে আবু সুফিয়ান! তোমার বহু আত্মীয়স্বজন রয়েছে; কেউ কোনো পদের ব্যাপারে আবদার করলে, তুমি প্রভাবিত হয়ে যাওয়া অসম্ভব কিছু নয়। এখন থেকে তোমার ব্যাপারে আমার অধিক আশংকা দেখা দিয়েছে। কেননা, আল্লাহর রাসূল বলেছেন,-- কাউকে কোন নিয়োগকর্তার পদে মুসলিম জনতার দায়িত্বশীল হিসাবে নিয়োগ দেয়া হলে, সে স্বজনপ্রীতিবশতঃ কাউকে কোন (সরকারি) পদে নিয়োগ দিলে, তার প্রতি আল্লাহর লা'নত। তার কোনো নেকী কোনো ইনসাফ ন্যায় বিচার আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে না। এমনকি অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।’’
উল্লেখিত হাদীসের মর্ম এটা নয় যে, যোগ্যতাসত্ত্বেও নিজ আপনজনদের দ্বারা কাজ আদায় না করে এবং তাদের কোনো দায়িত্ব না দেয়া অথবা রাষ্ট্রীয় কাজ থেকে তাদের দূরে রাখা। যুক্তিপ্রমাণ উভয় দিকেরই এটি পরিপন্থী। যুক্তির দিক থেকে এজন্যে যে, মানুষ নিজ আপনজদের নিকট থেকে যেই নির্ভর যোগ্যতা ও জোর দিয়ে কাজ আদায় করতে পারে অনেক সময় অপরজন থেকে সেভাবে কাজ আদায় করা সম্ভব হয় না। আর দলীল প্রমাণের দিক থেকে এজন্য যে, খোদ প্রিয় নবী (সাঃ) অনেক ব্যাপারে আপন নিকটতম ব্যক্তি হযরত আলী (রাঃ) কে দিয়ে রাষ্ট্রীয় কাজ আদায় করেছেন। হযরত ওমর ফারুক (রাঃ) চূড়ান্ত ন্যায়-নীতি ও তাকওয়ার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও আপন পুত্র হযরত আবদুল্লাহ বিন ওমরের দ্বারা রাষ্ট্রীয় কাজ আদায় করেছেন। এদিক থেকে স্বজন দ্বারা রাষ্ট্রীয় কাজে সাহায্য সহযোগিতা নেয়া অপরাধ নয়। তবে এক্ষেত্রে আসল মন্দ দিকটি হলো, যোগ্যতর লোক থাকাসত্ত্বেও আপন অযোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেয়া এবং ক্ষমতার অপব্যবহারে নিজেকে সকল নিয়ম-রীতির ঊর্ধ্বে জ্ঞান করা। সেই স্বেচ্ছাচারিতা আজকাল অধিকাংশ ক্ষেত্রে এমন প্রাধান্য পেয়ে গেছে যে, এটা যে একটি মহাঅপরাধ এ ধারণাই যেন অধিকাংশ মানুষ থেকে চলেছে।
অতএব নিয়োগের ক্ষেত্রে যেমন সালেহিয়াত ও সালাহিয়াত তথা সততা ও যোগ্যতার গুণাবলীর প্রতি লক্ষ্য দেয়াকে মৌলিক বিষয় হিসেবে গণ্য করবে এবং নীতিগত দিক থেকে উভয় গুণকে সমানভাবে দেখবে, তেমনি আইনানুগ কর্মকান্ডে যাতে আত্মীয়তার বন্ধন ও স্বজনপ্রীতি ন্যায়-ইনসাফের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে না দাঁড়ায় সেটাও লক্ষ্য রাখা কর্তব্য। আমানত ও বিশ্বস্ততার এটাই দাবী যে, যাকে যেই পদে নিয়োগ দেয়া হয় সে কখনও স্বজনপ্রীতি, গোষ্ঠীপ্রীতি ও দলীয় স্বার্থবশত ঐ কাজ ও পদের অপব্যবহার করতে পারবে না।
বর্তমান গণতান্ত্রিক বিশ্বে হালকাভাবেও যদি বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সরকারের পর্যালোচনা করা যায়, এমন ব্যক্তি খুব কমই পাওয়া যাবে যে, উল্লেখিত ও জাতীয় আমানতের ক্ষেত্রে খেয়ানতে জড়িত হয়নি। সাধারণভাবে আজকাল তো সরকারও ক্ষমতায় যাবার পর স্বজনপ্রীতি, দলীয় স্বার্থ রক্ষা ও আত্মীয়তার প্রাধান্য দানই যেন অনেকটা বড় হয়ে দেখা দেয়। এই ত্রুটি ও দুর্নীতি শুধু সরকারী আধাসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতেই সীমিত নয়, প্রাইভেট ব্যক্তি পর্যায় ও পরিমন্ডলের প্রতিষ্ঠানসমূহেও লক্ষ্য করা যায়। শিক্ষা-সাংস্কৃতিক, শৈল্পিক, ধর্মীয় যত ধরনের প্রতিষ্ঠানই স্থাপিত হয়, এগুলোতেও স্বজনপ্রীতি, দলপ্রীতির সেই দৃশ্যই লক্ষ্য করা যায়। অথচ ইসলাম রাষ্ট্রীয়, জাতীয়, সামাজিক, শৈল্পিক, সাংস্কৃতিক এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রসমূহকে সম্পূর্ণরূপে খেয়ানত, দুর্নীতি-অসাধুতা ইত্যাদি কলুষতা থেকে পবিত্র রাখতে চায়। মহানবী (সা
এই হাদীস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, খেয়ানত বা আত্মসাৎ তাও জাতীয় সম্পদে- সেটা কত কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ ও অবমাননাকর ব্যাপার! ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে যদি কেউ সরকারি কর্তৃত্বের অধিকারী, দেশের প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট হন এবং বিদেশ ভ্রমণকালে তাকে যেসব বস্তু উপঢৌকন উপহার হিসেবে প্রদত্ত হয়, তিনি ঐসব উপহার সামগ্রীর মালিক হতে পারেন না। কেননা, তাকে ওসব উপঢৌকন ব্যক্তিগত হিসাবে দেয়া হয়নি, বরং তিনি যেই রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় পদে সমাসীন, সেই পদে থাকার কারণেই এগুলো পেয়েছেন। জাতীয় তহবিলই এগুলোর মালিক। একটি ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্যদিয়ে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখন খলীফা ওমর (রা)-এর শাসনকাল। সিরিয়া বিজয়ের পর কায়সারের সাথে খলীফার সম্পর্ক বৃদ্ধি পায়।
একদা সরকারের জনৈক রাষ্ট্রদূত সম্রাট কায়সারের নিকট কোনো একটি পয়গাম নিয়ে যাচ্ছিলেন। হযরত ওমরের পত্নী সম্রাট কায়সারের পত্নীর কাছে রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে কয়েকটি আতরের শিশা উপঢৌকন হিসাবে প্রেরণ করেন। জবাবে কায়সার পত্নী সম্রাজ্ঞী অতি মূল্যবান জওহর দ্বারা এ সকল শিশি ভর্তি করে ফারুকে আযমের স্ত্রী সমীপে উপঢৌকন হিসেবে প্রেরণ করেন। খলীফা হযরত ওমর একথা জানতে পেরে নিজ স্ত্রীকে বললেন, নিশ্চয়ই প্রেরিত আতর তোমার ছিল কিন্তু তা নিয়ে যেই রাষ্ট্রদূত গিয়েছিল সে নিশ্চয় তোমার ছিল না ছিল জাতির প্রতিনিধি। কাজেই তুমি আতরের মূল্য পেলেও জওহারের মূল্যের অধিকারী তুমি নও। এটি জাতির মালিকানা। সুতরাং খলীফা ওমর সম্রাট কায়সার পত্নীর প্রেরিত সকল জওহার জাতীয় কোষাগার-বায়তুলমালে জমা দিয়ে দেন।’’
ইসলামী শাসন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপ্রধান জাতীয় সম্পদের রক্ষক- আমানতদার, মালিক নন। নিজ খেয়াল খুশিমতো একটি বীজ দানাও ব্যয় করার তার অধিকার নেই। অপর একটি অতুলনীয় ঘটনা দ্বারাও একথার পোষকতা মিলে। একবার খলীফা ওমর (রা) অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসক প্রতিষেধক হিসেবে মধু সেবনের পরামর্শ দেন। তখন বাজারে মধু দুর্লভ ছিল। তবে সরকারি কোষাগার বায়তুলমালে মধু ছিল। কিন্তু অনুমতি ব্যতিরেকে খলীফা ওমর তা ব্যবহার করতে পারে না। মসজিদে নববীতে গিয়ে খলীফা ওমর (রাঃ) জনগণকে লক্ষ্য করে বললেন,- আপনারা অনুমতি দিলে বায়তুলমাল থেকে সামান্য মধু নিতে পারি। খলীফা তার অনুসৃত আচরণ দ্বারা এটা স্পষ্ট করে দিলেন যে,- জাতীয় কোষাগারে খোদ রাষ্ট্রপ্রধানেরও অনিয়মের মাধ্যমে হস্তক্ষেপের অধিকার নেই, যদি সেটা সামান্য মধুও হোক না কেন।’’
মোট কথা, ইসলামে রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার প্রধান ও মন্ত্রীমন্ডলী প্রমুখ সকলে জাতীয় সম্পদের আমানতদার ও রক্ষক, মালিক নন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


