
আমি বাংলাদেশের মানুষ। বাংলাদেশেই বড় হয়েছি জীবনের প্রায় অর্ধেকটা সময়। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে দেশের বাইরে পা রাখা মানে ওই আশে-পাশের দেশ ভারত-নেপালের কিছু অংশে ঘোরাঘুরি আরকি। এর বেশি কিছু নয়।
যখন ছোট ছিলাম, আকাশে প্লেন গেলে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতাম। ভাবতাম, ওই প্লেনে চড়ার সৌভাগ্য হবে কি আমার কখনো? কিংবা আমেরিকা বা কানাডা থেকে কোন বন্ধু বা পরিচিত দেশে এলে তাদেরকে দেখতে যেতাম। ভাবতাম, বাপরে বাপ! ফার্স্ট ওয়ার্ল্ডের মানুষ তারা। বড় মানুষ। বড় মানুষদেরকে দেখাও ভাগ্যের ব্যাপার। আবার কেউ লণ্ডন বা আমেরিকা থেকে গিফট কিনে এনে দিলে সেটাকে প্যাকেট সুদ্ধো যত্ন করে রেখে দিতাম। ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড কান্ট্রির গিফট বলে কথা!
পাঠক হয়তো আমাকে ইতিমধ্যেই অতি উচ্চ মার্গীয় 'ক্ষ্যাত' বলে ভাবতে শুরু করে দিয়েছেন। আর না দেবারই বা কি আছে? এরকম ক্ষ্যাতের মতো আচরণ করলেতো 'ক্ষ্যাত' ভাবাটাই স্বাভাবিক। তাইনা?
কিন্তু পাঠক, একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারবেন, একেবারে অজপাড়া গাঁ থেকে উঠে আসা, মাথায় তেল দিয়ে নিপাট পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুলের সদ্য কৈশোরে পা রাখা ছোট ছেলেটির জন্যে ঢাকা শহর যেমন তাজ্জবের ব্যাপার ছিল, তেমনি এই শহরের গাড়ি, সুউচ্চ অট্টালিকা আর সুপার ফাস্ট মানুষজনের তামশা দেখাটাও ছিল অবাক করা বিষয়। জীবনে কখনো দেশের বাইরে যাবো, সেটেল হবো, এগুলো ছিল আমার মতো মফস্বলে বেড়ে ওঠা মানুষের জন্যে অলীক কল্পনা মাত্র। তার ওপরে একবার খুব নামকরা এক জ্যোতিষিকে আমার হাত দেখানোর সৌভাগ্য হলো। খুব আগ্রহভরে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, "কাকু, হাতটা একটু ভালো করে দেখে বলুনতো কখনো কী বিদেশ যাত্রা আছে কিনা আমার?" তিনি খুব গম্ভীরভাবে ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে আমার হাতটা নেড়েচেড়ে পরীক্ষা করলেন। তারপর বললেন, "নাহ্ বাবা, তোমার ওই বিদেশ টিদেশ যাওয়া হবেনা কোনদিন, বুঝলে? দেশেই কিছু একটা করার চেষ্টা করো।"
জ্যেতিষী কাকুর কথাটাই মাথার মধ্যে গেঁথে গিয়েছিল। আমার আর বিদেশ যাত্রা হচ্ছেনা। কাজেই, 'দেশেই যেভাবে পারো মাটি কামড়ে পড়ে থাকো' - এই নীতি অবলম্বন করে কাজ-কর্ম করা শুরু করলাম।
কিন্তু জ্যেতিষী কাকুর অব্যর্থ ভবিষ্যতবাণীকে একেবারে পদদলিত করে আমার পাসপোর্টে কানাডা'র ইমিগ্রেশন ভিসা কিভাবে কিভাবে যেন লেগে গেল। নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিনা। এ-ও সম্ভব?
যাক, ভিসা যখন লেগে গেল, তখন বাক্স-প্যাটরা বেধে-ছেদে চোখের জল নাকের জল এক করে দেশবাসীকে বিদায় জানিয়ে দু'টো স্যুটকেস আর এই আমি এসে পড়লাম এই টরন্টো শহরে। আবারও এক অজানা, অচেনা শহরে আমি। মনে পড়ে গেল, প্রথমবার ঢাকা শহরে এসে ওই শহরের চাকচিক্য দেখে যেমন বেকুব বনে গিয়েছিলাম, টরন্টোতেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো। হাঁ করে তাকিয়ে বড় বড় বাড়িঘর আর সাদা মানুষজন দেখছিলাম। এই মেগা সিটির একমাত্র পরিচিত বন্ধুবর নাজমুল তার কাজ বাদ দিয়ে এসেছিলেন আমাকে ঘরে নিয়ে যেতে। আমার কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা দেখে একটা কড়া ধমক দিয়ে বললো, "কি রে, তুই কি এই এয়ারপোর্টের বাইরে ঠাণ্ডায় থাকবি? নাকি আমার সাথে গাড়িতে উঠবি?" সম্বিত ফিরে পেয়ে তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে বসলাম। কিন্তু চোখে মুখে ঘোর কাটলোনা। লাইফে প্রথমবার ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড কান্ট্রিতে এসেছি। এই দেশের কথা আর ছবি শুধু দেখেছি টেলিভিশন আর সিনেমার পর্দায়। এখন একেবারে সামনাসামনি সব দেখে নিজের চোখ আর কানকে বিশ্বাস-ই করতে পারছিনা।
বন্ধুবর নাজমুল আমাকে বাসায় নিয়ে এলেন। এরপর তার সাথে গল্প করতে করতে দেখলাম আরও কিছু পরিচিত-অপরিচিত মানুষ এসেছেন এই বাসায়। উদ্দেশ্য আমাকে তারা দেখবেন। দেশ থেকে মাত্র এসেছি। কাজেই দেশের গন্ধ গায়ে লেগে থাকা মানুষটাকে তারা এক ঝলক দেখতে চান। আমিও তাদেরকে দেখে পুলকিত। টরন্টো শহর আর কানাডা সম্পর্কে তাদের উচ্চমার্গীয় সব কথাবার্তা আমার মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল পুরো রাত জুড়ে তাদের আলোচনা আর শেষ হবেনা। বাংলা ভাষায় 'পালাক্রমে', 'উপর্যুপরি', 'রাতভর' - এই শব্দগুলোতে আমার একটু অ্যালার্জি আছে। কিন্তু এই মুহূর্তে সত্যিটা স্বীকার করতেই হবে। সেইসব জ্ঞানী মানুষগুলো আমাকে রাতভর পালাক্রমে উপর্যুপরি জ্ঞান বিতরণ করলেন। কিভাবে হাঁটবো, কিভাবে খাবো, কিভাবে টয়লেট করবো, কিভাবে ... । থাক। বাকীটা আপনারা নিজ দায়িত্বে বুঝে নিন।
জ্ঞানী মানুষগুলোর মধ্যে আবার একজন আমার অতি হিতাকাঙ্খী হয়ে বললেন, "খবরদার! এখানে কোন বাংলাদেশী মেয়ের সাথে ফস্টি-নস্টি করবিনা। চারিদিকে নষ্ট আলু। তোকে আমরা দেখে-শুনে বিয়ে দেবো। এমনভাবে বিয়ে দেবো যেন একেবারে সতী-সাবিত্রী আসে তোর ঘরে। এ জন্যে তোর হবু বউয়ের ফেসবুক প্রোফাইল, সোশ্যাল মিডিয়া আর দু-নম্বর যত ওয়েবসাইট আছে, সেগুলো ভালো মতো খুঁজে, ঘেঁটেঘুঁটে দেখতে হবে। মেয়ে ভার্জিন কিনা, সেটা জানা খুব ইম্পর্ট্যান্ট। বুঝলি?" আমিও ভদ্র ছেলের মতো মাথা ঝাঁকালাম। কেবল দেশ থেকে এসেছি। টরন্টোর জ্ঞানী মানুষদের কথার ওপরে কোন কথা আছে?
যে সময়টাতে আমি এসেছিলাম, যদ্দুর মনে পড়ে তখন বেশ ঠাণ্ডা ছিল। কাজেই ঠাণ্ডায় কি করতে হবে, কি করতে হবেনা, সেগুলো নিয়েও ব্যাপক জ্ঞান দেওয়া হলো আমাকে। এক ভাবী বললেন, "এই ঠাণ্ডায় থুতু ফেললে থুতুও জমে যায়। বুঝলেন ভাই? আপনি মোটা পুলওভার, জ্যাকেট, গরম জামা কাপড় এনেছেনতো?" আমি একটু বিষম খেলাম। কানাডা যে ঠাণ্ডার দেশ সেটা জানতাম। কিন্তু থুতু সুদ্ধো জমে যায়, এটাতো জানতাম না! কি ভয়ঙ্কর ব্যাপার! আর এক সিনিয়র ভাই বললেন, "এখানে কিন্তু বরফ পড়লে খুব খারাপ সিচুয়েশন হয়। বাইরে একেবারে বেরই হতে পারবেনা।" তাহলে কী বরফ পড়লে পুরো কানাডাবাসী ঘরে বসে থাকে? নাকি পুরো দেশ অচল হয়ে যায়? বোকার মতো প্রশ্নগুলো করবো কিনা ভাবতে ভাবতে আমি প্রশ্নগুলো গিলে ফেললাম। মাত্র দেশ থেকে এসেছি। গায়ে গন্ধ লেগে আছে। জ্ঞানী মানুষদের সামনে কি বলতে আবার কি বলে ফেলি!
এরপর বেশ আরও অনেকদিন ধরে টরন্টো শহরে চলা-ফেরার তরিকা শেখার ট্যাবলেট গিলতে থাকলাম এখানকার সব জ্ঞানী-গুণী মানুষদের থেকে। এক এক জনের এক এক ফতোয়া। এটা এভাবে করতে হবে, ওটা ওভাবে করা যাবেনা। বিশেষ করে বাংলা পাড়া ড্যানফোর্থে যখন গেলাম, কিছু জ্ঞানী মানুষতো আমাকে তাদের জ্ঞান বর্ষন করতে করতে প্রায় অর্ধমৃত করে ফেললেন। আমিও মনে মনে এটাই বিশ্বাস করে নিলাম যে, নতুন যারা দেশ থেকে আসবে, তাদের জন্যে টরন্টোতে একটু বেশি সময় থাকা এইসব জ্ঞানী মানুষের জ্ঞানগর্ভ আলোচনা আর তথ্যের বন্যায় ভেসে যাওয়াটাই বুঝি এখানকার রীতি।
এরপর অনেকগুলো দিন, মাস, বছর পার হয়ে গিয়েছে। টরন্টো এখন আর আমার কাছে আনকোড়া নতুন নয়। এখানকার কায়দা কানুন-ও অপরিচিত নেই। কিন্তু দু:খের বিষয় আমার দেখা সেইসব জ্ঞানী মানুষদের মতো আমি জ্ঞানী হতে পারিনি। আর সেজন্যেই নতুন কোন মানুষ এখানে বাংলাদেশ থেকে এলে তাদেরকে টরন্টো শহরের নিয়ম-কানুন নিয়ে জ্ঞান বর্ষণ করে জর্জরিত করার দক্ষতা আমি অর্জন করতে পারিনি। তাদেরকে ঠাণ্ডা নামক জুজুর ভয় দেখিয়ে কিভাবে বোকা বানাতে হয়, সেটাও শেখা হয়ে ওঠেনি। তবে হ্যাঁ, পরিচিত নতুন কোন মানুষ এই শহরে এলে তাদের সাথে এক কাপ কফি একসাথে বসে খাবার একটা অদম্য ইচ্ছের কাছে আমি বারবারই পরাস্থ হই। দেশ থেকে সদ্য আগত সেই মানুষের চোখের বিস্ময়, উচ্ছ্বাস আর আনন্দ দেখে মনে পড়ে বহুকাল আগে আমিও ক্ষণিকের জন্যে তাদের মতোই ছিলাম। নতুন স্বপ্নের জাল বোনা সুখের ঘোরে বুঁদ হয়ে থাকা আনন্দে বিভোর সেই দেশান্তরী মানুষগুলোকে দেখতে আমার বড়ই ভালো লাগে।
ছবি সূত্র: ইন্টারন্টে
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা ডিসেম্বর, ২০১৭ সকাল ১০:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




