somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রবাসজীবন এবং আমার মা'য়ের মমতা

০২ রা ডিসেম্বর, ২০১৭ সকাল ৯:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বাংলাদেশে থাকতে আমার লাইফ-স্টাইল ছিল উরাধুরা। 'উরাধুরা' শব্দটা একটি চলিত বাংলা যেটিতে কিছুটা খামখেয়ালীপনা এবং মেজাজি ভাব রয়েছে। ইংরেজিতে যেটাকে বলে 'রাফ এ্যাণ্ড টাফ'। আমার জীবন-যাত্রা ওরকমটাই ছিল বলেই সঠিক শব্দচয়ন করার চেষ্টা করলাম। ঠিক কী রকম ছিল তার কিছু নমুনা দেওয়া যাক।

ছুটির দিন বেলা দু'টোয় ঘুম থেকে আধো জাগরণে বিছানায় হেলান দিয়ে খবরের কাগজ হাতে নিয়ে হয়তো কাজের মেয়ে অণু'র তৈরি করা চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছি। মা' এসে জিজ্ঞেস করলেন, "কী ব্যাপার! লাঞ্চ করবিনে?" সেই লাঞ্চ করতে করতে বিকেল পাঁচটা। এর মধ্যে অণু, মানে আমাদের কাজের মেয়ে এসে বার দশেক রিকোয়েস্ট করে গেল "ভাইয়া, ডিম ভাজি কিন্তু শুকায় যাইতাছে। তাড়াতাড়ি আসেন।" ফাইনালি মা এসে যখন হাতের খবরের কাগজটা হাত থেকে কেড়ে নিয়ে কড়া ধমক দিয়ে বিছানা থেকে তুললো, তখন আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে আমি নবাব সাহেব টেবিলে গিয়ে বসলাম।

টেবিলে বসেও সেই কি আমার নখরা। যদি সত্যিই আপনারা দেখতেন! চিৎকার করে বললাম, "খিচুড়ি এরকম ল্যাদা ল্যাদা হয়েছে কেন? আর আমি ডিম এ্যাত কড়া ভাজি খাই? এই অণু, আবার ডিম ভাজি কর্! আমি 'লাইটলি ডান' খাই কতবার বলবো? আর আমার গরুর কলিজা কই? এইসব ফালতু তরকারী দিয়ে কে খাবে?"

আমার চিৎকারের শব্দে মা আর কাজের মেয়ে পড়িমরি করে গরুর মাংস, মুরগির মাংস আরও যত রসনা বিলাসের খাদ্যদ্রব্য আছে, আমার সামনে এনে হাজির করতো। হেলেদুলে দুপুরের খাওয়া শেষ করে এঁটো প্লেটটা ওভাবেই টেবিলের ওপরে ফেলে রেখে কষ্ট করে আবার গিয়ে কোনমতে বিছানায় পড়ে টিভিটা অন করে ভারত-পাকিস্থান ক্রিকেট ম্যাচ দেখা শুরু করতাম।

আর আমার কাজের দিনগুলোতে ফিরতাম অনেক রাত করে। কখনও কখনও রাত বারোটা-একটা বেজে যেত। ঘরে ঢুকে দেখি সবাই বেঘোরে ঘুমুচ্ছে। কিন্তু ঠিকই আমার জন্যে আমার মা'মণি রাতের খাবারটা টেবিলের ওপরে জালি দিয়ে ঢেকে রেখেছে। ক্ষুধার্থ পেটে কোনমতে হাত-মুখ ধুয়ে খাবারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তাম। গোগ্রাসে গিলতাম মায়ের হাতের রান্না। এরপর এঁটো প্লেটগুলো ওভাবেই ফেলে রেখে সোজা বিছানায়। রোদেলা অপেক্ষা করছে ফোনে। ওর সাথে রাতে ফোনে কথা বলে তারপর ঘুমোতে হবে।

এই-ই ছিল আমার প্রায় প্রতিদিনের রুটিন।

মায়ের কথা কেন মনে পড়লো আজ? মনে পড়ার কারণ হলো কিছুক্ষণ আগে রান্না করছিলাম। পিঁয়াজ ছিলতে গিয়ে চোখের পানি-নাকের পানি এক হয়ে যাচ্ছিল।

এখন যদিও আমি পাকা রাঁধুণী। প্রায় সব পদের রান্নাই চটজলদি রাঁধতে তেমন একটা বেগ পেতে হয়না। কিন্তু যখন প্রথম এসেছিলাম এই ঠাণ্ডার দেশে, এই টরন্টো শহরে, প্রথম দিনই পিঁয়াজ কাটতে গিয়ে আমার বাম হাতের বুড়ো আঙ্গুলটা প্রায় দু'ভাগ করে ফেলেছিলাম। আর একদিন আলু কাটতে গিয়ে নিজের হাত ক্ষতবিক্ষত করে ফেললাম। নিজের অজান্তেই চোখের কোল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়েছিল সেই দিনগুলোতে। এরপর যে খাবার আমি রান্না করতাম, সেগুলোকে খাদ্যবস্তুর পর্যায়ে কোনভাবেই ফেলা যেতোনা। আর খাবার শেষে নিজের প্লেটসহ হাড়ি-পাতিল কে ধুবে? এখানে কী মা আছেন? নাকি অণু আছে? কাজেই ডিশ-ক্লিনিং থেকে শুরু করে সব ধরণের ক্লিনিং কাজ শেষ করে তবেই আমার ছুটি।

অবশ্য দেশ ছাড়ার আগে আমি কিছুদিন মায়ের স্টুডেন্ট হয়ে গিয়েছিলাম। জীবনে কোনদিন যেই আমি হেঁসেলে ঢুঁ পর্যন্ত মারিনি, সেই আমাকেই মা রান্নাঘরে নিয়ে গিয়ে শেখালো কিভাবে কড়াইতে তেল ঢালার আগে চুলার আঁচ কমিয়ে নিতে হয়। কিভাবে মাংস, মাছ আর সব্জির বিভিন্ন পদ রান্না করতে হয়। ঢাকা শহরের নীলক্ষেত থেকে সিদ্দিকা কবীরের রান্নার বইটা পর্যন্ত মা-ই কিনে দিয়েছিলেন যত্ন করে। কিন্তু যতই সিদ্দিকা কবীরের বই কিনে দেখে দেখে রান্না করিনা কেন, আমার মায়ের হাতের সেই অমৃতের স্বাদ কী বই দেখে পাওয়া যাবে?

এখনও যতই নিজে নিজে রান্না করিনা কেন, প্রায়ই রান্নার ফাঁকে মা'কে দেশে কল দিয়ে বসি। 'মাটন বিরিয়ানী' রান্নায় আমি সেই রকম পাকা। ওটার রেসিপিটা আমার ঠোটস্থ। তারপরেও ফোনে মা'কে জিজ্ঞেস করি, "মা, বলতো মাটন বিরিয়ানীতে কী কী মসলা দিব? মা হাসেন। বলেন, তোকে একই রেসিপি আর কতবার বলবো, বলতো? তোর মেমরি বলে কিছু নেই নাকি?" উত্তরে আমি বলি, "যতই রান্না করিনা কেন, তোমার মতো তো আর হয়না কোনদিন।" আমার কথা শুনে মা খিলখিল করে হাসেন আর হাসেন। এরপর খুব আগ্রহভরে আমাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে রেসিপি বলেন। আমি হয়তো মন দিয়ে রেসিপি শুনিনা। কিন্তু আটহাজার মাইল দূর থেকে আমার জন্মদাত্রী মায়ের দরদভরা কণ্ঠের আওয়াজ শুনে নিজের অজান্তেই চোখ ভিজে ওঠে।

ফেসবুকে আমি
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জুন, ২০১৮ সকাল ৭:১৩
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সামু একটি ছোট নৌকা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:২৫



একটা ছোট নৌকা, পাল তুলে, পাড়ি দিচ্ছে -
অন্তহীন তারার রাস্তা পেরিয়ে।
পেরোচ্ছে গ্রহ, ধূমকেতু, ছুটন্ত আগুনের টুকরো,
দূরে কোথাও ধাক্কা লাগে, তারপর শব্দটা মিলিয়ে যায়।
ধীরে, খুব ধীরে এগোয় নৌকা;
তবু এগোয়।

নৌকায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

পোর্টাল – ২ গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৭


তখন বেশ ঠান্ডা পড়ে গেছে। সেপ্টেম্বরের রাত।
বরফ পড়া শুরু হয়নি। মন্ট্রিয়লের রাস্তা জনাকীর্ণ। বাড়ি থেকে বের হলে কো-দ্যেনিশ রাস্তার শেষ প্রান্তে একটা লাইব্রেরি আছে। তার পরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগে ১০ টি বছর পার করলাম

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:০২



ব্লগে ১০ বছর পার করে দিলাম। কত সময় কেটে গেছে এখানে, কত পরিচিত মুখ রয়ে গেছে এখানে। তবুও ভালোবাসার বন্ধন যেন শেষ না হয়।

যে কবিতাটা দিয়ে ব্লগিং শুরু করেছিলাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিন্নাহকে জানতে হলে পাকিস্তান আন্দোলনের ইতিহাস জানতে হবে। পর্ব-১

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:১৩



পাকিস্তান সৃষ্টির বছরখানেক আগে ১৯৪৬ সালে বোম্বে শহরের দুই নামকরা পার্সি ডাক্তার বুঝতে পেরেছিলেন যে ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ এবং আইনজীবী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর আয়ু আর বেশিদিন নেই। ডা.... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৯৭১ ডিসেম্বর ১০-১৬: বিশ্ব বাংলাদেশকে নিয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ছিল

লিখেছেন কলাবাগান১, ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:১১


লিখা টির ইতিহাস ভিত্তিক ইনফো এআই থেকে সংগৃহীত

আমরা সবাই জানি যে ১৯৭১ সনের ১৬ই ডিসেম্বর বিকেলে পাকিস্হান হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পন করে মিত্রবাহিনীর কাছে। কিন্তু আমরা অনেকেই হয়তো জানি না,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×