
সাড়ে পাঁচজন লেখক গেল দাওয়াত খেতে এক ভক্তের নিমন্ত্রণে তার বাড়িতে। সাড়ে পাঁচজন বললাম কারণ তাদের মধ্যে একজন এখনো পুরোপুরি লেখক হয়ে উঠে নি। টুকটাক ছড়া, কবিতা লিখছে। বিবিধ রকম জ্যামজট এবং ঝক্কি ঝামেলা পেরিয়ে ভক্তের গ্রামে পৌঁছাতে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা বেজে গেল । ব্লগ এবং স্যোসাল মিডিয়ায় লেখালেখির মাধ্যমে এই ভক্তের সাথে তাদের সখ্যতা গড়ে ওঠে । তাদের লেখায় নিয়মিত লাইক কমেন্ট দিয়ে অনুপ্রেরণা যোগায় এবং শেয়ার করে বিভিন্ন পেজে। তারপর ব্লগ থেকে ফেইসবুকে সেখান থেকে চ্যাটে । মূলত তাদের এই পাকাপোক্ত লেখার হাতের জন্য এই ভক্তের অবদান অস্বীকার করা যায় না । নানা রকম মন্তব্য মিথস্ক্রিয়ায় তাদের লেখাগুলো আলোচিত করে তোলে সে । অনেকদিন ধরে তাদের এই ভক্ত তাদেরকে ইমোশনালি এক বেলা তার বাড়িতে খাওয়ার জন্য দাওয়াত দিয়ে আসছিলো কিন্তু সময় সুযোগ হচ্ছিলো না । অবশেষে সুযোগ আসলো । ভক্তের ইমোশনকে মূল্য দিয়ে প্রত্যন্ত গ্রামের এক শীতের সন্ধ্যায় তারা ভক্তের বাড়ির দরজায় হাজির হলো । কনকনে শীত এবং কুয়াশা পড়া শুরু হয়ে গেছে । সেই চৌরাস্তার মোড় থেকেই লেখকদের নাকে বিবিধ রকম সুস্বাদু খাবারের মিশ্র ঘ্রাণ আসছিলো । বাড়ির উঠোনে এসে দেখে ভক্ত খাবার দাবার নিয়ে ব্যাস্ত সময় কাটাচ্ছে । তাদেরকে দেখে ভক্ত এগিয়ে আসলো। তাদের সামনে এসে ভক্ত এতো এক্সাইটেট হয়ে উঠলো যে কী বলবে খুঁজে পাচ্ছিলো না ! অভ্যর্থনা জানিয়ে তাদেরকে ঘরে নিয়ে গেল। রাতের খানাপিনা শেষ করে লেখকরা বসলো বিশ্ব শিল্প সাহিত্য উদ্ধার করতে। আর এদিকে ভক্ত কিছুক্ষণ পরপর বিভিন্ন রসালো ডেজার্ট আনছে আর যাচ্ছে। আর মাঝে মাঝে মন্ত্রমুগ্ধের মত লেখকদের দেশ, জাতি, সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি সম্পর্কে জ্ঞানগর্ব আলোচনা শুনছে এবং মনে মনে ভাবছে এমন জ্ঞানী লোকগুলোর সাথে দেখা না হলে হয়তো জীবনটাই বৃথা হয়ে যেত । লেখকরা তাদের ঝুলি অদল বদল করতে করতে কখন যে গভীর রাত হয়ে গেলো কেউ টের পেল না । কিন্তু সাবাইকে আজই ফিরতে হবে। তাই আর দেরী না করে ভক্তের রাত্রিযাপণ আবদারের প্রতি ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে লেখকরা রাস্তায় নেমে পড়লো । বাইরে আবছা আলো আবছা অন্ধকার, চাঁদ উঠেছে কিন্তু মেঘেদের পাল তাকে ঘিরে ধরেছে । তাই জ্যোৎস্না সেভাবে ফুটছে না, কুয়াশার তীব্রতা বেড়েছে, আলতো বাতাস বইছে । এমন কাব্যিক পরিবেশে কবি মনে মনে কবিতা রচনা করে চলছে,
আমি এই রাতকে আজীবন আপন করে চাই,
শীতাগ্র চোখে উড়ে যেতে চাই মেঘেদের পালে...
ও সে কোন প্রিয়তম যে ঢাকে আমায় এই জ্যোৎস্না ঘরে ?
আমি যাবো না ফিরে বিগত প্রহরে
জীবন থেমে যাক এখানে- নীরবে
এই হলদে রাত্রির জীবনের কাছে...
এমন সময় ধপাস করে পড়ার এক বিকড় শব্দ হলো । সবাই তাকিয়ে দেখে ছড়াকার কুয়াশায় ভেজা রাস্তায় আছাড় খেলো ! সবাই তাকে ধরে উঠানোর চেষ্টা করছে আর সে মনে মনে ছড়া কাটা শুরু করে দিয়েছে,
এক জ্যোৎস্না রাতে, ধরলো মোরে ভূতে
শুকনো কাঁদায় খেলাম আছাড়,
হলো আমার কোমর অসাড় !
এদিকে রম্য লেখক মিটিমিটি হাসছে তার রম্যের অন্যতম একটা উপাদান সে পেয়ে গেছে ! ছড়াকারকে উঠিয়ে তারা আবার হাঁটতে লাগলো গ্রামের ভেজা ধূলার কাঁচা মেঠোপথ ধরে। এক অদ্ভুত শিহরণ, মৃত্তিকার ঘ্রাণ, আলো আঁধারী, বাঁশঝাড়, শ্মশান ঘাট, পুরনো বটগাছ, সারি সারি তালগাছ, কালো কুকুরের পাল, বিড়ালের গোঙ্গানো, শিয়ালদের হুক্কা হুয়া ডাক। ভৌতিক গল্প লেখক সবকিছুকে মনের পকেটে বন্দি করছে । তার মনে গল্পলেখার এক অদ্ভুত নেশা খেলা করছে ! এভাবে নিশ্চুপে বিস্তৃত বনজ গ্রাম পেরিয়ে সবাই এসে উঠলো চার রাস্তার মোড়ে । ছড়াকার গেল হাত পা পরিষ্কার করতে চৌরাস্তার পুকুরে । অন্যরা তার জন্য অপেক্ষা করছে। ছড়াকার ফিরে এসে দেখে সবাই মূর্তির মত দাঁড়িয়ে আছে, কোন নড়ছড়া নাই । ছড়াকার এগিয়ে যেতেই সেও রোবটের মত দাঁড়িয়ে গেলো ।
কালা ভূত ! কী বিদ্ঘুটে চেহারা ! গায়ে কালো কালো চোখা চোখা লোম, চোখ সাদা, মোটা পেট, আষ্ঠেপৃষ্টে বেশ নাদুসনুদুস, সাদা লম্বা লম্বা দাঁত কেলিয়ে সবার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ! সেও যেন মানবকূল দেখে অবাক ! এদিকে কবি তার কবিতার পংক্তিতে ভূতের ব্যাপারটা মেনে নিতে পারছে না, মনে মনে এই ভেবে খুব আফসুসে পুড়ছে পরী কেনো আসলো না আর ভূতকে ধিক্কার দিচ্ছে শালার কালা ভূত ! অন্যদিকে ছড়াকার মনের আনন্দে ছড়া কাটা শুরু করেছে,
চৌরাস্তার মোড়ে,
আমার মাথা ঘোরে
চোক্ষের সন্মুখে কালা ভূত
কী অদ্ভুত ! কী অদ্ভুত !
ছড়াকার বেশ খুশি ছড়ার জন্য অনেকগুলো উপাদান পেয়ে গেছে, এগুলো দিয়ে বেশকটা ছড়া রচনা করা যাবে ! ভৌতিক গল্প লেখক তার প্রধান উপকরণ হাতে পেয়ে অপলক দৃষ্টিতে কালা ভূতের দিকে তাকিয়ে আছে। আর ভাবছে কীভাবে এই অদ্ভুতুড়েকে গল্পের মধ্যে পুরে দেয়া যায় ! এদিকে বিজ্ঞানমনস্ক লেখক বার বার চোখ কচলাচ্ছে, সে ভাবতে চাইছে এটা হ্যালোসিনেশান। সারাদিনের জার্নির ধকল, ঘুম না হওয়া, রাত্রির ঘোমট পরিবেশ সমেত আরো অনেক কিছুকে দায়ী করছে এই হ্যালোসিনেশানের জন্য। সে বিবিধ বৈজ্ঞানিক যুক্তি দাঁড় করাতে চাইছে যা দিয়ে সে ভুত দেখা কুসংস্কার নিয়ে একটা গবেষণালব্ধ লেখা লিখবে । রোমান্টিক গল্প লেখক থ হয়ে আছে । সে ভাবছে একই থিম দিয়ে ঘুরিয়ে পেঁছিয়ে আর কত রোমান্টিক গল্প লিখবো? ছেলে মেয়ে, মেয়ে ছেলে ! এবার সে ভিন্ন গল্প ভাবছে 'এক কালা ভূতের প্রেম কাহিণী' । তাই সে কালা ভূতের দিকে তাকিয়ে আগাগোড়া দেখছে কিভাবে গল্পের মধ্যে তাকে রোমান্টিক রূপ দিয়ে উপস্থাপণ করা যায় । হঠাৎ আধা লেখকের দিকে চোখ যেতেই সবাই দেখে সে বেহুশ হয়ে পড়ে আছে। এই দেখে রম্য লেখক বেশ রোমাঞ্চিত অনুভব করছে আরেকটা পাকাপোক্ত উপকরণ পাওয়া গেছে ভেবে ! আধা লেখকেকে ধরাধরি করতে গিয়ে সবাই দেখে কালাভূত উধাও! এদিকে বিজ্ঞানমনস্ক লেখক যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো ! আধা লেখকের মুখে জল দিয়ে হুঁশ ফিরিয়ে কোনভাবে সে রাত্রিতে তারা সবাই বাড়িতে ফিরে গেলো।
পরদিন রাতে...
ব্লগার 'নিশাচর খবিশ' প্রফুল্লচিত্তে গতকালের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নিয়ে গল্প লিখছে আর পাশাপাশি বিভিন্ন পোস্টে মন্তব্য করছে । কারণ তার পোস্ট হিট হতে হবে, দ্রুত লাইক কমেন্ট আসতে হবে, দ্রুত আলচিত ব্লগ পাতায় জায়গা করতে হবে! এমনিতেই কবি আর ছড়াকারের যন্ত্রণায় প্রথম পাতায় লেখা বেশিক্ষণ টিকতে পারে না । তাই এই আলোচিত ব্লগই ভরসা । এভাবে কয়েকটা পোস্ট পড়ার পর হঠাৎ নিশাচর খবিশের মুখ কালো হয়ে গেল । সে তার দীর্ঘ সময় ধরে লেখা অভিজ্ঞতালব্দ গল্পটাকে ড্রাফট করে দিলো । আর রাগে শুধু দাঁতে দাঁত ঘষছে এবং মনে মনে বলছে, শালার এই কবি আর ছড়াকার বুঝি ওরা ছিলো ! তখন যদি জানতে পারতাম তাহলে নিশ্চিত ঘাড়টা খুলে এখানেই রেখে দিতাম ! কথায় কথায় তাদের কবিতা ছড়া পয়দা হওয়া একদম ছুটাইয়া দিতাম । এখন আমাকে নিয়েও কবিতা ছড়া লিখছে শালারা! চুন থেকে নুন খসতেই এদের কবিতা ছড়া বের হয়। একটা লেখাও কিছুক্ষণ শান্তিমত প্রথম পাতায় থাকতে পারে না এদের যন্ত্রণায় । গগণবিদারী আফসুস নিয়ে ব্লগার 'নিশাচর খবিশ' চার রাস্তার মোড়ের দিকে হাঁটতে বের হয়েছে । তার রাত্রিকালীন একা একা হাঁটতে ভাল লাগে। আর ভাবছে এইবার চৌরাস্তায় কারো সাথে দেখা হলে অবশ্যই জিজ্ঞেস করে নেবে, এখানে কোন কবি কিংবা ছড়াকার আছে কীনা !
ছবি বন্ধু- গুগল ইমেইজ ।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই ডিসেম্বর, ২০১৭ রাত ৯:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




