শেকল ভাঙা সংস্কৃতি (পর্ব - ১)
শুধু জাতিভেদ নয়। আমরা যতই গণতন্ত্রের কথা বা সমাজতন্ত্রের কথা বলি না কেন, মানুষকে সমদৃষ্টিতে দেখতে যে মন লাগে সেই মন এখনো আমাদের আয়ত্তের অনেক বাইরে। সমাজবিজ্ঞান অনুসারে সমাজের শ্রেণীবিভাগ নানাভাবে করা হয়ে থাকে-যেমন বুর্জোয়া, প্রলেটারিয়েট, ক্ষেত-মজুর ইত্যাদি। কিন্তু ব্যবহারিক জীবনে আমাদের দেশে আমরা সকলেই মানুষকে দু-ভাগে দেখতে এবং তাদের সঙ্গে দুইভাবে আচরণ করতে অভ্যস্ত। একভাগ ‘ভদ্রলোক’, একভাগ ‘ছোটলোক’। ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণীভুক্ত ব্যক্তিদের অনেকই সতেন মনে দ্বিতীয়ভাগ লোকদের নিজেদের চেয়ে নিম্নস্তরের বলে মনে করে না, কিন্তু তা না করলেও তাদের আচরণ যে মনোভাব প্রকাশ পায় তা বৈষম্যমূলক। একটি নিদর্শন-তথাকথিত ভদ্রলোকেরা তথাকথিত ছোটলোকদের ডাকে নাম ধরে, ‘তুই’ বা ‘তুমি’ বলে। তথাকথিত ছোটলোকেরা তথাকথিত ভদ্রলোকদের ডাকে ‘বাবু’ বা ‘হুজুর’ বলে, সম্বোধন করে ‘আপনি’ বলে।
(উদাহরণ যে কয়টি দিলাম তা আমাদের সমাজ থেকে নিয়েছি, কিন্তু বলাই বাহুল্য যে কুসংস্কার, বর্ণবিদ্বেষ, নারীনিগ্রহ, অগণতাণ্ত্রিক মনোভাব ইত্যাদি দুষ্ট ভাবধারা অন্যান্য সব দেশের সমাজেই কম-বেশি পরিমাণে বিদ্যমান।)
মনোগত বৈরী শক্তিদের আরেকটি হলো তাত্ত্বিক মতান্ধতা। এই বিশেষ মানসিক দোষটি হয় মননচর্চাকারীদের মধ্যে। জড়জগত, সমাজ, রাষ্ট্র প্রভৃতি যে কোন জিনিসকেই যদি পরিবর্তিত করতে হয় তো তার জন্য প্রাথমিক প্রয়োজন তার সম্বন্ধে জ্ঞান। সেই জ্ঞানকে হতে হয় তথ্যভিত্তিক এবং তথ্যের তাতপর্য অনুধাবন করার জন্য প্রয়োজন হয় এক তত্ত্বের কাঠামোর। তথ্যের আহরণ ও তার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ-জ্ঞান অর্জনের এই দুইটি পরস্পরনির্ভর আবশ্যিক পন্থা। কিন্তু এক ধরনের মনোবৈকল্য আছে যা চায় কোন এক তত্ত্বকে আকড়ে ধরে রাখতে-ধর্মীয় বিশ্বাসের মতোই। তথ্যের সঙ্গে যখন তত্ত্বের অমিল হয় তখন জ্ঞানের খাতিরে যা করা প্রয়োজন তা হলো তত্ত্বকে বাতিল করা বা তাকে পরিবর্তিত করে নেয়া। কিন্তু এরকম ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক মতান্ধ ব্যক্তিদের রাগ গিয়ে পড়ে তথ্যের উপর। মানুষের মুক্তির প্রয়াসে এই মতান্ধতা এক প্রচন্ড বড় বাধা।
এই যে চতুর্বিধ শৃঙ্খলের কথা আলোচনা করা হলো তাদের বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা পাশ্চাত্য জগতের সমাজ-দার্শনিকদের মধ্যে বলবত আকারে হয়ে আসছে ইউরোপীয় রেনেসাঁসের সময় থেকে। সমাজ সংস্কারক বিপ্লবীদের ক্রিয়াকলাপও সেই চিন্তার সঙ্গে তাল রেখে এগিয়েছে। আমাদের দেশে ঐ চিন্তা ও ক্রিয়াকান্ডের ঢেউ এসে লাগে গত শতাব্দীতে। একথা আজ স্বীকৃত যে, ওই চতুর্বিধ শৃঙ্খল মোচনের জন্য প্রয়োজন চতুর্বর্গের আন্দোলন বা বিপ্লব। প্রাকৃতিক শক্তিদের যুক্তি ও বুদ্ধির দ্বারা অনুধাবন করে তাদের বশে আনার প্রচেষ্টা ব্যাপক আকার ধারণ করার ঘটনাকে ইতিহাসে বলা হয়ে থাকে ‘বিজ্ঞান বিপ্লব’, যে বিপ্লবের পুরোধাস্থানীয় ব্যক্তিরা ছিলেন গ্যালিলিও, নিউটন, ফ্রানসিস্ বেকন প্রভৃতি মনীষীরা। রাষ্ট্রগত বা রাজনৈতিক বন্দীদশা থেকে মানুষকে মুক্ত করার যে আদর্শের জন্য আন্দোলন করা হয়েছে এবং কোন কোন দেশে বিপ্লব ঘটেছে তার নাম ‘গণতন্ত্র’। এই আদর্শের মূল কথা সাংবিধানিকভাবে প্রতিটি মানুষকে সমান নাগরিক অধিকার প্রদান করা, ব্যক্তি-মানুষের উপর রাষ্টের প্রভাবকে সংকুচিত করা। অর্থনৈতিক অভাব ও বন্টন-বৈষম্যজনিত বন্দীদশার থেকে মানুষকে মুক্ত করার জন্য যে জাতীয় আন্দোলন ইতিহাসে গতি সঞ্চার করেছে তার মূল চেহারা শ্রেণীসংগ্রামের। এই সংগ্রাম যখন বৈজ্ঞানিক চিন্তা ও সংগঠিত আন্দোলনের আকার নিয়েছে তখন তার লক্ষ্য হয়েছে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। চতুর্থ পর্যায়ের যে দাসত্বের কথা বলেছি (আমাদের কুসংস্কারাচ্ছন্ন মন ও মানবতাবিরোধী ভাবধারা) তার জন্য যে আন্দোলন এযাবত করা হয়েছে তা থেকে গিয়েছে খন্ড ও বিচ্ছিন্ন আকারের। আমাদের দেশে গত শতাব্দীতে সতীদাহ নিবারণ, বিধবা বিবাহ প্রচলন, স্ত্রীশিক্ষার প্রসারণ এবং এই শতাব্দীতে অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ প্রভৃতি নিয়ে যেসব আন্দোলন করা হয়েছে তারা এই বর্গের অন্তর্ভুক্ত পাশ্চাত্ত্য জগতে হাল আমলে যে শক্তি শালী নারী আন্দোলন চলমান রয়েছে তাও এই একই পর্যাভুক্ত। সংগঠিতভাবে এই চতুর্থ পর্যায়ের দাসত্ব থেকে মানুষকে মুক্তি দেওয়ার সুচিন্তিত ও সংগঠিত প্রচেষ্টাকে কখনো কখনো নাম দেওয়া হয়েছে ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’।
শুধু আমাদের দেশে নয় এমন কোন দেশই নেই যেখানে এই চতুর্বিধ শৃঙ্খলের সবগুলিকে মোচন করে মানুষ হয়ে উঠতে পেরেছে। কম-বেশি পরিমাণে প্রগতি খানিকটা সর্বত্রই হয়েছে। চারটি ক্ষেত্রের কোন কোনটিতে কিছুদূর অগ্রসর হয়ে, অন্য ক্ষেত্রগুলিতে পশ্চাতপদ থেকে যাওয়াটাই যেন হয়েছে মনুষ্যসমাজের নিয়ম। ইংল্যান্ড, আমেরিকা প্রভৃতি কিছু দেশে সাংবিধানিক গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত, কিন্তু অর্থনৈতিক শোষণ সেইসব দেশে ধারণ করেছে দানবাকার; শুধু নিজেদের মানুষকেই নয় বিশ্বশুদ্ধ শ্রমজীবী মানুষের শোষণ সাধিত হচ্ছে তথাকার সাম্রাজ্যবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কল্যাণে। পূর্ব ইউরোপের অনেক দেশে সম্পত্তিতে ব্যক্তিগত মালিকানার ভিত্তিতে শোষণের অবসান ঘটানো হয়েছে। কিন্তু সেইসব দেশের অধিবাসীরা নানাবিধ অধিকার থেকে বঞ্চিত, রাষ্ট্রের ক্ষমতার দ্বারা তাদের স্বাধীনতার পরিসর অত্যন্ত খন্ডিত। অর্থনৈতিকভাবে উন্নত অথবা নাগরিক-অধিকার-সমন্বিত অনেক সমাজের উদাহরণই দেওয়া যায় যেখানে মানুষ থেকে গিয়েছে চিন্তার জগতে শৃঙ্খলিত।
বৈজ্ঞানিক বিপ্লব, রাজনৈতিক বিপ্লব, শ্রেণীসঙগ্রামভিত্তিক সমাজবিপ্লব এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লব-এই চার ধরনের বিপ্লবের প্রত্যেকটিরই হওয়া প্রয়োজন, যদি মানুষকে তার চতুরঙ্গ বন্দীশালা থেকে মুক্তি পেতে হয়। কিন্তু ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে দেশে ঝোঁক পড়েছে ঐ চারটি বিপ্লবের কোন একটি বা দুইটির উপর। বৈজ্ঞানিক বিপ্লবে যাঁরা অংশগ্রহণ করেন তাঁরা অনেকেই সমাজ ও অর্থনৈতিক বিপ্লবের বিষয়ে উদাসীন থেকেছেন। রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে যাঁরা অংশগৃহণ করেছেন তাঁরা অনেকেই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কথা চিন্তাই করেন নি।
লৌকিক অর্থে মানুষের মুক্তির বিষয়ে চিন্তাভবনা করেছেন ও সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন যাঁরা তাদেঁর মধ্যে যিনি অবিসংবাদিত ও তুলনাহীনভাবে সর্ব্বোচ্চস্থান গ্রহণ করেন তিনি কার্ল মার্ক্স। মানুষের মুক্তি সম্পর্কিত চিন্তা তথা ক্রিয়াকান্ডকে আধুনিক বিজ্ঞানের অংশীভূত করার কৃতিত্ব এই সর্বোতমুখী প্রতিভাধর অগাধ পান্ডিত্যের অধিকারী মানবদরদী সংগ্রামী মানুষটির। কার্ল মার্ক্সের চিন্তায় খুব স্পষ্টভাবেই দেখা যায় যে, তিনি মানুষের মুক্তিসংগ্রামে বৈজ্ঞানিক, রাজনৈতিক, সমাজ-অর্থনৈতিক ও সাঙস্কৃতিক-এই চর্তুবর্গের বিপ্লবকেই সমপরিমাণ গুরত্ব দিয়েছেন। কিন্তু মার্ক্সবাদী বলে নিজেদের দাবি করে যেসব রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী তাদের অনেকের মধ্যেই লক্ষ্য করা যায় এই বিষয়ে এক চরম ভ্রান্তি। এই ভ্রান্তি হলো-প্রাথমিক গুরুত্ব দেওয়া অর্থনৈতিক সংগ্রামের উপর, তারপর গুরুত্ব দেওয়া রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াইয়ের উপর। বৈজ্ঞানিক বিপ্লব এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লব এই ভ্রন্ত-মার্ক্সবাদীদের চিন্তায় ও কর্মকান্ডে একবারে স্থান গ্রহণ করে না। ব্যাপারটা অনবধানত-প্রসূত বলে মনে হয় না, কারণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের অনেকেই বলে থাকেন যে, বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের জন্য এখনই করার কিছুই নেই। বৈপ্লবিক গোষ্ঠীর হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা এসে গেলে এবং অর্থনৈতিক শোষণের অবসান ঘটলে সাংস্কৃতিক বিপ্লব আপনা থেকেই ঘটে যাবে, মানবতাবিরোধী ভাবধারাগুলি তিরোহিত হবে, নতুন মানুষ জন্ম নেবে। একথাগুলি অবশ্য একেবারেই মানা যায় না। ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বলা যায় যে, বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের উপর জোর না দিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখন করে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন করলে সেই দুই ক্ষেত্রেও মুক্তি বেশিদিন স্থায়ী হয় না, রাষ্ট্র-পরিচালনায় অনুপ্রবেশ করে বিভিন্ন অগণতান্ত্রিক ব্যভিচার। অর্থনীতিতে ছদ্মবেশ ধারণ করে প্রত্যাবর্তন করে শোষণ।
অপরদিকে অর্থনৈতিক শোষণের অবসান না ঘটিয়ে, কেবলমাত্র শিক্ষার প্রসার ও বিজ্ঞাচর্চার দ্বার মানুষের উন্নতি করা সম্ভব বলে যে উদারনৈতিক বিশ্বাস, তাও সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই ও গণতান্ত্রিক অধিকারের লড়াই চালাতে হবে। তারই সঙ্গে সঙ্গে করে যেতে হবে বৈজ্ঞানিক ভাবধারা প্রচারের চেষ্টা এবং মানবতাবিরোধী ধ্যানধারণার বিরুদ্ধে সংগ্রাম।
ফেব্রুয়ারি, ১৯৮২।
(চলবে)
(লেখাটি উৎস মানুষ সংকলন এর “শেকল ভাঙা সঙস্কৃতি” বই থেকে নেয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে পুরো বই-টি তুলে ধরব। কারণ, এ বইটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের সবার জন্য খুবই প্রয়োজনীয় একটি বই বলে আমি মনে করি।)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


