এই সব ব্যাপার গুলো ছোটখাটো হোক আর যা-ই হোক কি যে কষ্ট দিত আমাকে! বিধাতার কাছে নালিশের ঝাপি খুলে বসতাম। কাঁদতাম গোপনে। তবুও মুখ ফুটে বাবা-মাকে কিছু বলিনি। ওনাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হবার পর-ও কোন অভিযোগ করিনি কখনও। স্কুলজীবনে কোনদিন কোনও বন্ধুর বাসায় গেছি বলে মনে পড়েনা। এমনকি বন্ধুর জন্মদিনেও যেতে পারিনি কোনদিন। জানতাম যেতে দিবেনা, তাই আব্দার-ই করিনি।
কলেজে ভর্তি হবার পর ভাব্লাম, যাক, এইবার বুঝি ইচ্ছেমত ঘোরাঘুরি করা যাবে! আমার সেই আশার গুড়ে বালি। সময় বেধে দেওয়া ছিল বাসায় ফেরার জন্য। কিন্তু তারমাঝেই বন্ধুদের জন্মদিন গুলো সেলিব্রেট করার সুযোগ পেয়েছিলাম কারণ তখন জন্মদিন গুলো বাসার পরিবর্তে ফাস্ট ফুড শপে পালন করা হতো। ফোনের নিষেধাজ্ঞা অবশ্য বলবত ছিল। বাসায় উঠতিবয়সি মেয়ে থাকলে উড়াধুড়া ফোন আসতেই পারে। তাতে আমার দোষটা কথায় শুনি!
সম্পর্কে ভ্রাতৃ স্থানীয় কিছু মানুষ আমার প্রেমে মশগুল হয়ে আমার জীবনটাকে আরও দুর্বিষহ করে তুললেন। নজরদারির পরিমাণ যেন আরও বেড়ে গেল। আর সেই সাথে আসতে থাকা একের পর এক বিয়ের প্রস্তাব। ভাগ্য ভাল মা বা বাসার অন্যরা বিয়ের ব্যাপারে মোটেও আগ্রহী না হওয়ায় আমি আমার পড়াশোনা শেষ করতে পেরেছি প্রাচ্যের অক্সফোড হিসাবে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। যাই হোক, পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে আমার প্রায় রোজ-ই অন্তত একবার করে মনে হতো 'মেয়ে হয়ে জন্মে কি তবে আমি অন্যায় করেছি?'
কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে আমার খুশি সীমা ছাড়িয়ে আকাশ ছুল। এ বার?? হায়রে আমার খুশি! এতদিনে বুঝতে পারলাম বাবা-মা কেন এত আগলে রাখতেন। পদে পদে দেখি বিপদের ঘনঘটা। পলিটিকাল ভাইজানরা দেখি ওঁত পেতে আছেন নতুন এডমিশন নেওয়া মেয়েদের মধ্যে থেকে নিজের পছন্দের মেয়েকে বেছে নেবার জন্য। শুধু তাই নয়, ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র ভাইয়েরাও এই ইদুর দৌড়ে পিছিয়ে থাকেন না। নোট চাইতে গেলেই কেউ কেউ বলে বস্তেন, 'সন্ধ্যার পর বটতলায়, মধুর ক্যান্টিনে, ডাস অথবা টি এস সি তে দেখা কর, নোট পেয়ে যাবা'। বুঝতে বাকি থাকেনা নোট বিনিময়ের সাথে আরও কিছু বিনিময়ের ইচ্ছে তিনি মনে মনে পোষণ করছেন। সযত্নে এড়িয়ে চলতে শুরু করি সেই ভাইজানকে।
ভার্সিটিতে ভর্তির আগ অব্দি মায়ের সাথেই সব কেনাকাটা করেছি মার্কেটে যেয়ে। কিন্তু অনার্সে ভর্তি হয়ে ডানা গজাল আমার নতুন কিছু বন্ধু পেয়ে। তাই যত কেনাকাতা, তা সে জামা-কাপড়ই হোক অথবা একটা চুলের ক্লিপ কিংবা বইপত্র। দলবেঁধে নিউ মার্কেট, গাউসিয়া, নীলক্ষেতে যাওয়া, ফুচকা খাওয়া। আহা! কিন্তু আনন্দে করল্লার তেঁতো ভাব এসে মিশে যেত যখন কিনা মার্কেটে কোন অল্প/বেশি বয়সী ছেলে/পুরুষ ইচ্ছে করেই গায়ে ধাক্কা দিয়ে দাঁত ক্যালাতে ক্যালাতে পাশ কাটিয়ে ছলে যেত। লজ্জায় কোনও প্রতিবাদ করতে পারতামনা। প্রথম প্রথম অপমানে কেঁদে ফেলতাম ভার্সিটির কমনরুমে ফিরে।
যাই হো্ক, দিনে দিনে এই ধরণের পরিস্থিতি সামাল দিতে শিখলেও এমন অনেক অপমানজনক ব্যাপার আছে এখনও যা-র প্রতিবাদ করার ভাষা আমি রপ্ত করতে পারিনি অথবা সেচ্ছায় মুখ বুজে থাকি, সমাজে বসবাস করি বলে হয়ত চাইনা এমন কোন পরিস্থিতি উদ্ভূত হোক যার জন্য আমার পরিবারের লোকজনের সম্মানহানি ঘটে।
ঢাবিতে অনার্স পড়ার সময়-ই কপাল গুণে একটা ভাল চাকরি পেয়ে যাই এবং ডিপার্টমেন্টের টিচারদের সহায়তায় শ্রদ্ধেয় ডীন স্যারের অনুমতিক্রমেই আমি চাকরিতে জয়েন করি। এখানে বলে রাখা ভাল যে আমার মা সেই ১৯৬৮ সালে ঢাবি থেকে তার মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন এবং ১৯৭২ সাল থেকে কিছুদিন আগ অব্দি নানবিধ কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত ছিলেন। হয়ত তাকে দেখেই আমার সেই ছোট বয়স থেকেই খুব স্বাবলম্বী হবার শখ হয়েছিল। তাই এইচ এস সি পাসের পর থেকেই আমি টুকটাক কাজের সাথে যুক্ত করে ফেলেছিলাম। সেই ধারাবাহিকতায় যখন একটা ভাল চাকরি পেলাম মনে হল যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছি। তাই দেরি না করে ছুটলাম আমার প্রথম ফুলটাইম জবে জয়েন করতে।
কিন্তু এ কি! যতই দিন যাচ্ছে ততই দেখি অদ্ভুত ধরণের বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছি। অভিজ্ঞতার ঝুলিতে দেখি একের পরে এক বিশ্রী অভিজ্ঞতা জমা পড়তে শুরু করল। বিধাতা, আমার কপালে এ-ও ছিল! চাকরির প্রথম দিন-ই ভারতীয় বস ইনডাইরেক্টলি বাট ক্লিয়ারলি বুঝিয়ে দিলেন যে তিনি 'যা' বলবেন সেই মত যদি চলি তবে অতি কম সময়েই আমি অনেক 'তারাক্কি' করতে পারবো। সত্যি বলতে কি দুঃখ পাবার পাশাপাশি অনেক ভয়-ও পেয়েছিলাম যে বসের মনযোগীয়ে চলতে না পারার কারণে যদি 'ইনএফিসিয়েন্ট' এর লেবেল লাগিয়ে আমাকে চাকরি থেকে বিদায় নিতে হয় সেই অপমান সইবো কি করে! হুট করে জিদ চেপে গেল। এর শেষ দেখে তবেই আমি ছাড়ব!
আমার ইমিডিয়েট সিনিয়র যিনি ছিলেন সব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ঝেড়ে তাকে খুলে বললাম সব। তিনি ম্যানেজমেন্ট কে বুঝিয়ে কি করে যেন আমাকে সেই ভারতীয়র সুপারভিশন থেকে রিলিজ করিয়ে ওনার নিজের অধীনে নিয়ে এলেন। চলতে থাকল আমার চাকরি ভাল মন্দ মিলিয়ে। এক সময় চাকরী বদলের চিন্তা মাথায় এলো। স্বপ্নের জাল বুনতে বুনতে নতুন অফিসে জয়েন করলাম আমি। কিন্তু আমি সেই প্রবাদটা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম যে 'যায় দিন ভাল আসে দিন খারাপ।'
নতুন ভাবে হাতেখড়ি নিলাম আমি। নতুন অফিস আমাকে শেখালো রাজনীতি কাহাকে বলে, কত প্রকার ও কি কি। সেই সাথে অফিসে মহিলা সহকর্মীকে নিয়ে পুরুষ সহকর্মীরা কত রকমের উলটাপালটা আলাপ আলোচনায় মত্ত হতে পারে এবং অবিবাহিতা মহিলা সহকর্মীর ব্যক্তিগত বিষয় বলে যে কিছু থাকতে নেই তা বুঝতে পারলাম এই অফিসে এসে। মনে হল কড়াই থেকে সোজা উনুনে ঝাপ দিয়েছি আমি।
বলা যায় গায়ের মাংস কামড়ে ধরে পড়ে রইলাম দেশের এই স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানটিতে এই আশায় যে দুর্মুখের মুখে ছাই দিয়ে একদিন আমারই জিত হবে। সেদিনের দেখা এখনও না পেলেও দুর্মুখদের অনেকেই আজ নিজ কৃতকর্মের কারণে চাকরি খুইয়েছে এখান থেকে। কিন্তু আমার জন্য যে আরও বড় অগ্নিপরীক্ষা অপেক্ষা করছিল তা ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি।
নতুন বস এলো বছর দুয়েক আগে। বসের কাজের স্টাইল দেখে আমি তো মহাখুশি, যাক এইবার সবাই লাইনে আসবে বসের পেদানি খেয়ে। চরম ধাক্কা খেলাম অচিরেই। বসের কথায় কিসের যেন ইঙ্গিত। ভাবলাম আমার-ই হয়ত বুঝবার ভুল। ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায় কি না, তাই। যাই হোক, আমার বুঝায় যে ভুল ছিলনা তা বুঝতে পারলাম বেশ তাড়াতাড়ি-ই। প্রথমে ঘুরিয়ে পেছিয়ে এবং পরবর্তীতে সরাসরি-ই 'ইন্ডিসেন্ট প্রপোজাল' দিয়ে বসলেন আমার শ্রদ্ধেয় বস। মুখের উপরে না করায় কি পরিমাণ দুর্ব্যবহার যে আমায় সহ্য করতে হয়েছে যা লিখতে বসলে এই পোস্টের দৈর্ঘ্যই কেবল বাড়বে। এমন কি বিশ্বস্ত সুত্রে খবর-ও পেয়েছিলাম যে আমার ‘টারমিনেশন লেটার’-ও নাকি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ঐ যে কথায় আছে না, রাখে আল্লাহ্ তো মার, আমি-ও কি করে যেন বেচে গেছি চাকরীচ্যুত হবার হাত থেকে।
আমার বস 'একবার না পারিলে দেখো শতবার' এই থিওরিতে বিশ্বাসী। যতভাবে সম্ভব 'ট্রাই' তিনি করে গেছেন এবং যাচ্ছেন। আমি-ও বাঘা তেঁতুলের মত বুনো ওলকে শায়েস্তা করে টিকে আছি। আমার বস এমন-এ প্রতাপশালী এমং প্রভাবশালী যে তার সম্পর্কে কোথাও নালিশ করে কোনও ফায়দা নেই। এই মানসিক অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচার একমাত্র পথ হল অন্য জায়গায় জব খুজে সরে যাওয়া। কিন্তু যথেষ্ট যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও কেবল মাত্র দেখতে সুন্দর নই বলে এবং সাথে মামা-চাচার জোর নেই বলে ভাল কথাও যাওয়া হয়ে উঠছেনা। ওহ, অনেকে হয়ত ভাবতে পারেন চাকরির সাথে সুন্দর চেহারার সম্পর্ক কোথায়। তাদেরকে বলি, ইন্টারভিউ বোর্ডে আমাকে আমার চেহারা এবং স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন রেংকসটেল এর সাবেক সিওও জনাব জাকারিয়া স্বপন সাহেব।
প্রতিদিন রাস্তাঘাটে চলাচলের সময়, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে, অফিসে, শপিং মলে সবখানে কেন মেয়েদের-ই এত লাঞ্ছনা গঞ্জনা সইতে হয়? কেন আমাদেরকে মনোরঞ্জনের পণ্য ভাবা হয়? কেন আমরা কোন রকম ভয়-ভীতি ছাড়া ঘরের বাইরে বের হতে পারিনা? কেন রোজ মরার আগেই হাজার বার মরি আমরা বিপরীত লিঙ্গের কিছু অভদ্র হায়েনারূপী অমানুষের লালসার দৃষ্টির ছুরিকাঘাতে আর নোংরা কথার তীক্ষ্ণ বাণে?
ইভটিজিং নিয়ে যতই লেখালেখি হোক, আইন হোক আর কোম্পানি পলিসিতে যতই 'সেক্সুয়াল হেরাসমেন্ট' এর ক্লজ থাকুক না কেন কোনও ভাবেই এটাকে থামানো যাবেনা যতক্ষণ না আমাদের বাপ-ভাই- স্বামী তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না ঘটাবেন। অনুগ্রহ করে মেয়েদেরকে যথার্থ ভাবে মূল্যায়ন করতে শিখুন। তাদেরকে তাদের প্রাপ্য সম্মান দিন। ভুলে যাবেননা আপনার জন্মদাত্রি-ও একজন নারী। কবি দাউদ হা্য়দারের সেই বিখ্যাত কবিতার পংক্তিটা যেন কোন মেয়ের মনেই চিরস্থায়ী গাড়তে না পারে যে 'জন্মই আমার আজন্ম পাপ'।
আরও অনেক কিছুই লেখার ছিল কিন্তু লেখাটি ইতোমধ্যেই অনেক বড় হয়ে গেছে যা বেশির ভাগ মানুষের-ই বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে এবং খুব কম ব্লগার-ই পুরোটা পড়ে শেষ করবেন, আমি জানি। তাই এখানেই ইতি টানছি। তাছাড়া মনটা-ও ভাল নেই। দেখা যাবে লিখতে লিখতে অফিসের সব গোমর ফাঁস করে দিয়েছি রাগের বশে। তারচেয়ে বাকি কথাগুলো না হয় তোলা থাক অন্য এক দিনের জন্য।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জুন, ২০১১ রাত ৯:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



