“যে শত্রুকে আমরা সন্দেহ করি না তারাই বিপজ্জনক হয়ে থাকে”। দুর্নীতিগ্রস্ত ঘুনে ধরা সমাজ এখন ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। আর তা অসহায়ের মতো দেখতে হচ্ছে আমাদের। সুশীল দায়িত্বহীন রক্ষকরা রূপান্তরিত হচ্ছে ভক্ষকে। সামগ্রিকভাবে দেশের রাজনীতি, এবং সমাজে যে অধঃপতন ঘটছে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাম্প্রতিক ঘটনাই তার বড় প্রমাণ। শিক্ষক যে সম্মান নিয়ে সমাজে হাজির হয়, ধর্ষক পরিমলরা তাতে কালিমা দেয়।
রাজধানীর নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বসুন্ধরা শাখার দশম শ্রেণীর এক ছাত্রীর শ্লীলতাহানির বিষয়ে দেশব্যাপী আলোড়ন চলছে। কোচিং করতে গিয়ে শিক্ষক পরিমল জয়ধরের প্রতারণা ও পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয় ওই শিক্ষার্থী। কে এই জয়ধর, কি তার পরিচয়?
পরিমল জয়ধর।
পরিমল জয়ধরের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার কোটালিপাড়ার লাটেংগা গ্রামে। তার পিতার নাম ক্ষিতিশ জয়ধর। সে কোটালীপাড়া বঙ্গবন্ধু কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্যে অনার্স পাস করে। ২০০৩ সালে বিএল কলেজ থেকে বাংলায় মাস্টার্স পাস করার পরই ঢাকায় এসে টিউশনি করত পরিমল। ২০০৪ সালে উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষক হিসেবে চাকরি পায় সে। ওই বছরই গোপালগঞ্জ কোটালীপাড়ায় বিয়ে করে পরিমল। তার স্ত্রী ও সন্তানকে উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরের ২৬ নম্বর রোডের ৭ নম্বর ভাড়া বাসায় রাখত। নিজে একা থাকত বাড্ডা এলাকায়। ২৯ বিসিএস পরীক্ষায় প্রশাসন ক্যাডারে সে নিয়োগ পায় বলেও জানা গেছে। বর্তমান মহাজোট সরকারের আমলে ২০১০ সালে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে পরিমল জয়ধর, বরুন চন্দ বর্মনসহ ছয়জন শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়। এরা হলেন : পরিমল জয়ধর, বরুণ চন্দ্র বর্মণ, বাবুল কর্মকার, প্রণব ঘোষ, বিশ্বজিৎ ও বিষ্ণু চন্দ্র। এর আগে রাজধানীর উত্তরা মডেল স্কুল থেকে ছাত্রী নির্যাতনের অভিযোগে বহিষ্কৃত হন পরিমল। অনেকেই অভিযোগ করেছেন : দলীয় প্রভাবে নিয়োগ পাওয়ার পর তাদের প্রভাবে প্রতিষ্ঠানের অন্য শিক্ষক-শিক্ষিকারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে থাকতেন। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ হোসনে আরা বেগম এই সরকারের আমলেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান।
ঘটনার সূত্রপাত:
চলতি বছরের মে মাসের শুরু থেকে ওই ছাত্রী শিক্ষক পরিমল জয়ধরের কোচিংয়ে ১০ জনের ব্যাচে পড়া শুরু করে। স্কুলের কাছেই পরিমল জয়ধর, বাবুল কুমার কর্মকার, বিষ্ণুপদ বারুই, বরুণচন্দ্র বর্মণ ও বিশ্বজিৎ চন্দ্র মজুমদার বাসা ভাড়া নিয়ে কোচিং করাতেন। এর কিছুদিন পরই শিক্ষক পরিমল জয়ধর ওই শিক্ষার্থীর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে এবং আপত্তিকর ছবি তোলে। এ ঘটনা কাউকে বললে ছবি ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয়াসহ ওই ছাত্রীকে হত্যার হুমকি দেয় শিক্ষক পরিমল। এরপর ১৭ জুন আবারো নির্যাতনের শিকার হন ওই শিক্ষার্থী। ১৯ জুন বিষয়টি ওই ছাত্রী তার সহপাঠীদের জানায়। ২১ জুন শাখা প্রধান লুৎফর রহমানকে বিষয়টি জানানো হয়। এসময় তিনি ঘটনাটি দেখবেন বলে আশ্বস্ত করলেও কোন পদক্ষেপ নেননি বলে জানায় শিক্ষার্থীরা। ২২ জুন শিক্ষার্থীরা পূণরায় শাখা প্রধানের কাছে বিষয়টি তুলে ধরে। এরপরও অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় ২৮ জুন দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা সম্মিলিত ভাবে অধ্যক্ষের কাছে ঘটনাটি লিখিতভাবে অভিযোগ করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন সূত্র জানা গেছে : নিপীড়নের লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পরও অধ্যক্ষ অভিযুক্ত শিক্ষকের পক্ষ নিয়ে বলেছেন, মেয়েটি ভালো না। এ নিয়ে শিক্ষিকাদের মধ্যেই ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। শিক্ষিকারা এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানের গভর্নিংবডির কাছে পুরুষ শিক্ষক পরিমলসহ অন্যান্য অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিচার ও একই সঙ্গে তারা হোসনে আরার অপসারণও দাবি করেন। ৪ঠা জুলাই অধ্যক্ষ বরাবর লিখিত অভিযোগে তার ওপর যৌন হয়রানির বিস্তারিত বর্ণনা দেয় ওই ছাত্রী। এরপর গত ৫ জুলাই ওই খবরে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হলে হতবাক হয়ে পড়ে বিবেকবান মানুষ। আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। লিখিত চিঠির পর আন্দোলন আরো জোরদার হয়। এ আন্দোলনে যোগ দেয় অভিভাবকসহ বিভিন্ন সামাজিক ও নারী সংগঠনগুলো। এ ঘটনার পরপরই শিক্ষক পরিমল জয়ধরকে স্কুল থেকে বরখাস্ত এবং তার সহযোগী শিক্ষক বরুণচন্দ্র বর্মণ ও আবুল কালাম আজাদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এছাড়া বসুন্ধরা শাখার ভারপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক লুত্ফর রহমানকে দায়িত্বে অবহেলার কারণে তার পদ থেকে প্রত্যাহার করা হয়। গত ৫ জুলাই ভিকারুননিসা নূন স্কুলের সিদ্ধেশ্বরী মূল শাখায় গভর্নিংবডি বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়। অন্যদিকে ছাত্রীর বাবা বাদী হয়ে বাড্ডা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পরিমল জয়ধরকে কেরানীগঞ্জে তার বড় বোনের বাসা থেকে ৭ জুলাই ভোররাতে গ্রেফতার করা হয়।
ধারাবাহিক নাটকীয়তা:
স্থানীয় সংসদ সদস্য হিসেবে এ প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিরও সভাপতি রাজনীতিবীদ রাশেদ খান মেনন। ছাত্রী নির্যাতনে ঘটনায় তার কাছে অভিযোগপত্র পাঠানো হলেও কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে ধর্ষক শিক্ষকের গ্রেফতারের দিনই তিনি আমেরিকা চলে যান। নিউইয়র্কের পর গত ২১ জুলাই লন্ডনে কমনওয়েলথ সম্মেলনে যোগ দেন তিন।
ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রবল বিক্ষোভের মুখে ধর্ষক পরিমলের প্রশ্রয়দাতা অধ্যক্ষ হোসনে আরাকে অবশেষে বৃহস্পতিবার সরাতে বাধ্য হয় সরকার। জ্যেষ্ঠ শিক্ষিকা আম্বিয়া খাতুনকে প্রতিষ্ঠানির নতুন অধ্যক্ষ্য মনোনীত করা হয়। কিন্তু বিকেলে সেই গভর্নিংবডি তা বাতিল করে ঢাকা জেলা প্রশাসক মহিবুল হকের নেতৃত্বে ৪ সদস্যের একটি এ্যাডহক কমিটি গঠন করে সরকার । প্রতিষ্ঠানের গভর্নিংবডির দুটি অংশের বিরোধের কারনে কমিটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। ফলে বিষয়টি নিয়ে বির্তকের সৃষ্টি হয়। এ ঘটনার দ্রুত সমাধানের জন্য শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেন।
প্রতিষ্ঠানটির পরিস্থিতি শান্ত করতে মঞ্জুআরা বেগমকে প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষের দায়িত্ব (চলতি) দেয়া হয়। এরপর ভিকারুননিসার পরিস্থিতি তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়। কমিটির সদস্যসচিব হলেন নতুন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মঞ্জুআরা বেগম। অন্য দু’জন সদস্যের মধ্যে অভিভাবক প্রতিনিধি হলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মোশাররফ হোসেন এবং শিক্ষক প্রতিনিধি গণিত বিভাগের শিক্ষক নাসরীন আক্তার। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শককে প্রধান করে এ কমিটি গঠন করা হয়। ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ফাহিমা খাতুন জানান : পরিস্থিতি সামাল দিতে মঞ্জুআরা বেগমকে ভিকারুননিসার অধ্যক্ষের দায়িত্ব (চলতি) দেয়া হয়েছে। এর আগের দিন (বুধবার) অধ্যক্ষ আম্বিয়া খাতুনকে দায়িত্বে বসানো হলেও তা নিয়মতান্ত্রিক ছিল না। এদিকে অধ্যক্ষ হোসনে আরাকে তিন মাসের ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। তার অবর্তমানে ভারপ্রাপ্তের দায়িত্ব পালন করবেন প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মঞ্জুআরা বেগম। প্রয়োজনে এডহক কমিটি স্থায়ী অধ্যক্ষ নিয়োগ দেবেন।
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন :সমস্যা দ্রুত সমাধানের জন্য ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঢাকা বোর্ড ভিকারুননিসার গভর্নিংবডি ভেঙে দিয়ে নতুন এডহক কমিটি করেছে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কথা বিবেচনায় নিয়ে ঢাকা বোর্ড ভিকারুননিসায় ভারপ্রাপ্তের দায়িত্ব দিয়েছে মঞ্জুআরা বেগমকে। তিনি আরও জানান, ভিকারুননিসায় পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে এডহক কমিটি গঠন করে দেয়া হয়েছে। এ কমিটি ৬ মাসের মধ্যে নতুন কমিটি গঠন করবে এবং বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিরসনে পদক্ষেপ নেবে। প্রতিষ্ঠানটির স্বার্থ ও শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের মতামত বিবেচনা করেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে যাবেন তারা।
রিমান্ড এবং পরিমলের স্বীকারোক্তি:
এরপরই যৌন নির্যাতনকারী ভিকারুননিসা নুন স্কুলের বসুন্ধরা শাখার শিক্ষক পরিমল জয়ধর গুপ্তের ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। ঢাকা মহানগর হাকিম শামীমা পারভীন এই রিমান্ড মঞ্জুর করেন। মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা বাড্ডা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর সাহাদাত হোসেন পরিমলকে ১০ দিন রিমান্ডে নেয়ার আবেদন করেছিলেন। আসামিপক্ষে রিমান্ড আবেদন বাতিলপূর্বক অ্যাডভোকেট কিশোর রঞ্জন মন্ডল জামিনের প্রার্থনা করেন। ওই ছাত্রীর পক্ষে হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের আইনজীবী সাম্মী আক্তার, উম্মে কুলসুম স্মৃতি ও মাহমুদা আক্তার রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন। শুনানিতে তারা বলেন, যৌন নির্যাতনের কিছু তথ্য প্রমান এই আসামি মোবাইলের মেমোরি কার্ডে রয়েছে। যা উদ্ধার করলে পরিস্কার হবে সে কিভাবে যৌন হয়রানি করেছে। তাই তাকে রিমান্ডে নেয়া প্রয়োজন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বাড্ডা থানার পরিদর্শক (ওসি তদন্ত) এসএম শাহাদত হোসেন তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণের জন্য আদালতে আবেদন জানান। সে সময় পরিমল জয়ধর ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতে ছাত্রীকে যৌন নির্যাতনের কথা স্বীকার করে। তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষ হওয়ার একদিন আগেই তাকে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে আনা হয়। এদিকে অভিযুক্ত অধ্যক্ষ হোসনে আরা বেগম ধর্ষণ মামলার আসামি, অথচ তিনি এখনও গ্রেপ্তার হননি। তিনি এখনো ৩ মাসের ছুটি আছেন।
পরিস্থিতি শান্ত : নিরাপত্তাহীনতায় শিক্ষার্থীরা
নানা নাটকীয়তা, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বিক্ষোভ আর ধর্ষক পরিমল জয়ধরে গ্রেপ্তারের পর স্বাভাবিক হয়ে আসে ভিকারুনন্নেসা স্কুল এন্ড কলেজের পরিস্থিতি। নিয়মিক ক্লাস ও পরীক্ষা শুরু হয়। কিন্তু শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক এখনো কাটেনি । তাদের আশঙ্কা আবারো কারো মুখের শিকার হবে অন্য কোন ছাত্রী। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষকদের চালু করা কোচিং বাণিজ্যের শিক্ষা বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতি। তবে এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ এবং প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষায় শিক্ষার্থীদের যেমন পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে হবে, তেমনি কোচিংয়ের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের আরও চিন্তাশীল ও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

