তারেক মাসুদ। নামটির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল অনেক সম্ভাবনা খ্যাতি।আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই চলচ্চিত্রকারের ‘মুক্তির গান’ ও ‘মাটির ময়না’সহ অনেক চলচ্চিত্র জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মান অর্জন করেছে।তারেক মাসুদের বাল্যকালের অধিকাংশ সময়ই কেটেছে মাদ্রাসায়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় মাদ্রাসা শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে তাঁর। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ গ্রহন না করলেও নয়মাসের পুরোটা সময় কাটিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে। কিন্তু তিনি জানতেন না এতো দ্রুত তিনিও স্মৃতি হয়ে যাবে। তাকের মাসুদের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালবাসায় মনে পড়লো সেই দিনের কথা। কিছুটা সময় কাটিয়েছিলাম তার সঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন তার স্মৃতি জানতে কথা হয়েছিল...বলেছেন মুক্তিযুদ্ধের কাছে তার অনেক ঋন।
একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধে যাওয়ার যথেষ্ট বয়স ছিলনা তারেক মাসুদের। সে সময় তার বয়স ছিল ১৫ বা ১৬। তবে ওই বয়সে অনেকেই মুক্তিযুদ্ধ করেছে। কিন্তু যে কোন কারনেই অথবা মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য হিসেবেই হোক না কেন সরাসরি যুদ্ধে যোগদান করার সুযোগ তার হয়নি। যুদ্ধের প্রায় ৮ থেকে ৯ মাস তারেক মাসুদের কেটেছে ফরিদপুরের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে। তিনি জানান : আমাদের গ্রামের বাড়ি শহরের খুব কাছে ছিল বলে আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম আমার নানা বাড়িতে। ওই বাড়িটাই ছিল পুরোপুরি মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ক্যাম্প। পুরো সময়টাই ওই ক্যাম্পে আমার কেটেছে। আমার শৈশব কেটেছে মাদ্রাসায়। মাটির ময়না যারা দেখেছে তারা আমার স্মৃতিটা খুজেঁ পাবে। সেটা ছিল আমার দাগ কেটে যাওয়ার বয়স। অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করে, আপনার ছবিতে মুক্তিযুদ্ধ বারবার ফিরে আসে কেন : আমার ওই বয়সটা ছিল দাগ কেটে যাওয়ার বয়স। এজন্য বারবার আমার ছবিতে মুক্তিযুদ্ধের কথা ফিরে এসেছে। আমরা সবাই মুক্তিযুদ্ধের কাছে ঋনী। তবে মুক্তিযুদ্ধের কাছে আমার বাড়তি ঋন হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ না হলে বড় কিছু হওয়াতো দূরের কথা সাধারন একজন শিক্ষিত নাগরিক হওয়ার যে সুযোগ সেটাও আমার হতো না। আমার শৈশব মাদ্রাসার বোডিংয়ে কেটেছে। তখন মাদ্রাসায় আরবী, ফারসী ও উর্দূ ভাষায় পড়ানো হতো। সেময় ইংরেজীতো দূরের কথা আমি বাংলাও ঠিক মতো বলতে পারতাম না। যুদ্ধের কারনে আমি মাদ্রাসা থেকে ছিটকে পড়েছিলাম। চলে আসি বাড়িতে। মাদ্রাসা থেকে আমি বড় একটা জগতের সঙ্গে, ঘটনাবহুল একটা জগতের সঙ্গে সময় কাটিয়েছি। মুক্তযুদ্ধের অনেক আমার স্মৃতি রয়েছে। সেই স্মৃতি গুলোই আমি আমার ছবিতে উঠিয়ে আনতে চেষ্টা করেছি। আমার মায়ের করা নির্দেশ ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আমার ছেলেকে সন্ধ্যার মধ্যে ফেরত দিতে হবে। আমাকে কোন অপারেশনে নেয়া যাবে না। ট্রেনিংয়ে পাঠানো যাবেনা। কিন্তু আমার খুব ইচ্ছে ছিল আমি অপারেশনে যাব। পুরো একটি মেশিন গান কিভাবে চালাতা হয় মুক্তিযোদ্ধাদের দেখে দেখেই আমি শিখে ফেলেছি। একটা সময় তারা রাজী হলো, বললো চল, আজকে সিভিল অপারেশনে যাব। তখন আমি শব্দটা বুঝিনি। কিন্তু ভেবেছি মনে হয় অনেক বড় কোন অপারেশস। কিন্তু সেটা আসলে কোন মেলেটারী অপারেশন ছিলনা। সেটা ছিল রাজাকারদের বাড়িতে অপারেশন। তাদের লুট করা মালামাল উদ্ধার করে নিয়ে আসতে হবে। তবে পরর্বতীতে যুদ্ধের শেষের দিকে আমার একটা সুযোগ হয়েছিল : মৃত্যুর মুখোমুখি দাড়িয়ে ছিলাম। আমাকে মুক্তিযোদ্ধারা সেসময় একটি বাস ষ্টেশনের সামনে দাড় করিয়েছিলেন। কথা ছিল, রাজকারদের একিট বাস আসবে। আমি ওই বাসটটাকে থামিয়ে যাত্রী হিসেবে উঠবো। কিন্তু বাসটি যখন আসলো তখন দেখলাম সেটি রাজকারদের বাস নয় সেটি ছিল পাকিস্তানী মেলেটারীদের বাস। এই মুহুর্তে যদি গোলাগোলি হয় তাহলে আমি ক্রসফায়ারে চলে যাব। কিন্তু সেরকম কিছু হয়নি। এরকম অনেক স্মৃতি আমার রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমার মুক্তি ঘটেছে। মুক্তিযুদ্ধ না হলে আমাদের কোন পরিবর্তন হতো না। আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। এজন্য প্রায় ৫ বছর কাজ করে আমি আর ক্যাথরিন তৈরি করেছি মুক্তির গান। যারা মুক্তির গান দেখেনি তারা মুক্তির গানের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে অনুভব করতে পারবে। এজন্য আমি খুবই গর্বিত। যার মধ্য দিয়ে আমি মুক্তিযুদ্ধের জন্য সামান্য যে ঋন কিছুটা শোধ করার চেষ্টা করেছি। মুক্তিযুদ্ধ ছিল অপশক্তির বিরুদ্ধে। সেই সাম্প্রদায়িক অপশক্তি কিন্তু এখনো তৎপর রয়েছে। তাই যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। কারন গনতন্ত্রের মুক্তি এখনো হয়নি। সেজন্য আমাদের সোচ্চার হতে হবে।
সুদীপ দে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

