মায়া গো মায়া ! বেডিডার কি সাহস গো আফা ! পুলিশডির সামনে খাড়ইয়া গড় গড় কইরা কেমনে কতাডি কইল গো আফা ! আমি খালি তাজ্জব অইয়া চাইয়া রইলাম।
তোমাকে তাজ্জব হয়ে চেয়ে থাকতে কে বলেছে ? তুমি ওখানে গিয়েছো কেন ? তোমাকে না বলেছি দোকানে গেলে কাজ সেরে সোজা বাসায় চলে আসবে। এখানে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকবে না ?
আফা যে কি কন না ? আমি কি কাম থুইয়া ঐহানে খাড়ইয়া আছিলাম নাহি ? বাসায় আইতেছিলাম সামনে পইড়া গেল ঘটনাডা। হেইডা কি দেহুম না নি ? আমি ত আর অন্ধ না।
এবার সত্যি বিরক্ত বোধ করে মঞ্জুআরা। বলে
হয়েছে, হয়েছে। এবার থামো। কথা একটা বললেই হলো। অমনি চলতে শুরু করে তোমার লাগামহীন কথার ট্রেন। তাও যদি ভাষাটা একটু শুনার মতো হতো । আচ্ছা আম্বিয়া, তোমাকে কতদিন না বলেছি সুন্দর করে কথা বলতে, এসব ভাষা ছাড়তে ? অনেকদিন তো হলো এখানে এসেছো।
এইডা কি কন আফা ? নিজের বাষা কেউ ছাইরা দিতে পারে ? আমার বাষা আমি ছাইরা দিবাম ক্যায়া ? মায়ের পেট তে পইরাই এই বাষায় কতা কইতাছি। আর আফনে কন এই বাষা ছাইড়া দিতে। আফনের বাসায় কাম করতে আইছি দেইখা কি আমার নিজের বইলা কিছু থাহন নাই ?
মঞ্জুআরার বিরক্তি এবার চরমে উঠে।
হয়েছে, হয়েছে। কথার জাহাজ একেবারে ! একটা কথা মাটিতে পড়ার জো নেই। অমনি খই ফুটতে শুরু করে মুখে। যাও যাও। এবার কাজে যাও।
কথাগুলো বলে আবারও বইয়ের দিকে মনযোগ দেয় মঞ্জুআরা। আম্বিয়া দুপদাপ পা ফেলে সেখান থেকে চলে যায়। রান্নাঘরে গিয়ে নিজে নিজে গজরাতে থাকে।
আমরার কিচ্চু হেরার পছন্দ অয়না। মন খুইলা দুইডা কতা কমু হেইডাও দোষ। তাইলে রাখছুইন ক্যায়া কামে ? কয়বারই ত যাইতামগা চাইছি আমি। আফনেরাই ত যাইতে দেইন নাই। কতা কইতে দিবাইন না, বাড়িত যাইতে দিবাইন না। আমি কি দম ফাইটা মরবাম নাহি এইহানে ? হেরার লগে কতা কইতে অইব মাইপ্পা মাইপ্পা। অত মাইপ্পা মাইপ্পা কতা আমি কইতাম পারতাম না।
একাকী রান্নাঘরে আম্বিয়ার কথার আস্ফালন আর কতক্ষণ চলত কে জানে ? কিন্তু মাঝপথে সেটা থেমে যায় লাবণীর ডাক শুনে।
বুয়া শুনছো ?
এই বুয়া ডাকটা ভীষণ অপছন্দের আম্বিয়ার কাছে। যখনই কেউ তাকে এ নামে ডাকে তখনই আম্বিয়ার ভিতর প্রতিবাদের ঝড় উঠে। কিন্তু কিছু বলতে পারেনা সে। এমনিতেই বেশী কথা বলা বারণ ওর এই বাসায়। তাই ডাকটা কানে যেতেই আবার গজরাতে শুরু করে আম্বিয়া।
এই অইছে আর এক জ্বালা। বুয়া ! বুয়া !! আমার কি নাম নাইনি ? হেরার বাসায় কাম করতাম আইছি দেইখা কি নিজের বাপ-মায়ের ছডি দেওইননা নামডা মুইছা ফালানি লাগব ? এই শহরের কি যে বাও বুঝিনা ? এইডাই বুলে নিয়ম। লাত্থি মারি এমন নিয়মের মুহে।
এমন সময় আবার লাবণীর গলা শুনা যায়।
বুয়া কোথায় গেলে ? শুনতে পাওনা ডাকছি ?
আইতাছি আম্মা।
বলে শাড়ির আঁচলে ভেজা হাত দুটি মুছতে মুছতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে আম্বিয়া। এসেই ডাইনিং টেবিলের কাছে লাবণীর সামনে পড়ে যায় সে। তাড়াতাড়ি বলে
কি কইবেন আম্মা কওহাইন।
আম্বিয়ার মুখে এভাবে কথা শুনে রেগে যায় লাবণী। বলে
তোমার কথা শুনলে তো কিছুই বলতে ইচ্ছে করেনা। কি ভাষার ছিরি ! ‘কি কইবেন কওহাইন।’ যাও, এক কাপ চা নিয়ে এসো। আমার তাড়া আছে। বের হবো এক্ষুণি।
আম্বিয়া তেমনি আবার উত্তর দেয়
কিন্তু আম্মা। আইজ আফনের বার্সিটি না বন্ধ ? এহন তাইলে আফনে কই যাইবাইন ?
এবার আরও রেগে যায় লাবণী। বলে
কই যাব মানে ? সেটা তোমাকে বলতে হবে না কি ? ভার্সিটিতে যাওয়া ছাড়া কি আমার আর কোন কাজ থাকতে নেই বাইরে ? শুনো, বেশী মাতব্বরী করবেনা বুঝেছো ? তুমি এ বাড়ির কাজের বুয়া সেটা ভুলে যেওনা। আমি কোথায় যাই না যাই সেটা নিয়ে আমার বাবা-মাও প্রশ্ন করেনা মনে রেখো।
নিজের ঘরে চলে যায় লাবণী। রাগ ওর তখনও পড়েনি।
মা যে একটা কি ? কোত্থেকে যে এই গাইয়া ক্ষেতটাকে এনে বাসায় ঢুকিয়েছে ? না জানে কোন ম্যানার, না জানে ভালো করে কথা বলতে। শুধু জানে মাতবরী করতে। দেশে যেন আর কাজের মেয়ে নেই !
আম্বিয়া রান্নাঘরে এসে চুলা জ্বালিয়ে চায়ের পানি চাপিয়ে দিয়ে আবারও গজরাতে থাকে।
এক কতা পাইছে। কিছু কইলেই মনে করাইয়া দেয় আমি কামের বেডি। আরে কামের বেডি না থালহে তোমরার অত ডাটফাট থাকতনি ? হেইডা কুনু সময় চিন্তা কইরা দেহেনা কেউ। কামের বেডিরার যেন কোন স্বাধীনতা থাহন নাই। আমার গেরামের আলো বাতাসের তন যে বাষায় কতা কইতে হিখছি হেই বাষায় কতা কওন যাইব না। আরে এইডা কি অত সোজা ? নিজের বাষা ছাইড়া দেওন।
ঠিক তখনি রান্নাঘরের বাইরে ইকবাল সাহেবের গলা শুনা যায়।
আম্বিয়া রান্নাঘরে আছো ?
জ্বি বাইজান। কিছু কইবাইন ?
বলে মাথার ঘোমটা টেনে ঠিক করে দিয়ে বেরিয়ে আসে আম্বিয়া। ইকবাল সাহেব বলেন
আমাকে এক কাপ চা দিতে পারবে ?
এইডা কি কন বাইজান ? এক কাপ চা আফনেরে দিতারতাম না আমি ? আফনে একটু বওহাইন। চুলায় চা’র পানি ফুটতাছে। আমি আর এক কাপের আন্দাজ পানি দিয়া আই।
কথ ক’টি বলে যেতে উদ্যত হয় আম্বিয়া। ইকবাল সাহেব পেছন থেকে ডাক দেন।
আম্বিয়া শুনো।
ইকবাল সাহেবের ডাকে ঘুরে দাঁড়িয়ে আম্বিয়া বলে
হ বাইজান। কওহাইন। আর কিছু লাগব আফনের ?
না আর কিছু লাগবনা। চায়ের পানিও চড়াতে হবেনা।
এইনা চা চাইলেন আফনে ? পানি ত দিছি মাত্র এক কাপের আন্দাজ লাবণী আম্মার লাইগা। ঐহানতে ত আফনেরে দেওন যাইবনা।
ঠিক আছে, ঐটা তুমি লাবণীকে দিয়ে দিও। আমার চা লাগবে না।
ইকবাল সাহেবের কথায় আম্বিয়ার চোখে-মুখে একরাশ বিস্ময়ের ছাপ ফুটে উঠে। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে থাকে ইকবাল সাহেবের মুখের দিকে। ইকবাল সাহেব বলেন
আমি যখন তোমাকে ডাকছিলাম তখন তুমি যেন আপনমনে কি বলছিলে ?
থাহুক না বাইজান। ঐসব কতা আফনে হুইনা কি করবেন ? গরীবের দুঃখ-কষ্টের কতায় কার কি আয় যায় ?
তবু আমাকে তুমি বলো কি বলছিলে তখন।
এবার একটু আদেশের স্বরে বলেন ইকবাল সাহেব।
আম্বিয়া এ বাসায় আসার পর থেকে দেখে আসছে তার প্রতি এই কর্তাব্যক্তিটির ব্যবহার অনেকটাই নমনীয়। ঠিক যেন লাবণী আর তার মায়ের উল্টো। কাজের বুয়া বিবেচনায় নয়, মানুষ হিসেবে একটু হলেও সমীহ এই বাসায় আম্বিয়া যার কাছ থেকে পেয়েছে তিনি হচ্ছেন ইকবাল সাহেব। তানাহলে জীবনের এই মধ্য বয়সে সবকিছু হারিয়ে শুধুমাত্র কাজের বুয়ার পরিচয়ে এই বাসায় এখন পর্যন্ত থেকে যাওয়া হয়তো হতনা আম্বিয়ার। আম্বিয়ার মনে হয় ইকবাল সাহেব নিজেও তার স্ত্রী-কন্যার অতি আধুনিক জীবন যাপন প্রণালীর প্রতি বিরক্ত। কিন্তু যেহেতু তার সহজ-সরল আদর্শিক চিন্তা-ধারার প্রতি ওদেরকে আকৃষ্ট করতে পারেননি। তাই নিজকে গুটিয়ে নিয়েছেন নিজের মধ্যে। শান্তিপ্রিয় নির্বিরোধী মানুষ বলেই হয়তো এমন ব্যবস্থা করে নিয়েছেন ইকবাল সাহেব। তাইতো অবসরের এই জীবনটা পরিবারের সাথে মুখর আনন্দে কাটানোর পরিবর্তে নিজের তৈরী জগতে ডুবে থাকেন ইকবাল সাহেব। বিশেষ কোন প্রয়োজন না হলে সেই গন্ডী তিনি মাড়াননা।
কিন্তু আম্বিয়া এ বাড়িতে আসার পর থেকে তিনি যেন মাঝে মাঝে নিজের জগতের বাইরে উঁকি দিতে চেস্টা করেন। কারণ আর কিছু নয়। আম্বিয়ার সহজ-সরল গ্রামীণ ভাবালুতা তার ভালো লাগে। পড়াশুনা, কবিতা আবৃত্তি আর মাঝে মাঝে সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের জীবন-যাপন নিয়ে পত্রিকায় প্রতিবেদন লেখা-এই নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটে ইকবাল সাহেবের। তিনি যেন তার ব্যস্ত সময়ের অনুষঙ্গ হিসেবে এরকম একটা চরিত্রকেই খুঁজছিলেন। যে চরিত্রটি হবে শহরের জটিলতা ও কলুষতামুক্ত গ্রামীণ সহজ-সরল জীবনের প্রতিচ্ছবি। পাশাপাশি সে হবে নিজের অধিকারবোধ সম্পর্কে সচেতন।
আদেশ হোক, আর যা-ই হোক। ইকবাল সাহেব ছাড়া এই পরিবারের অন্য কেউ সেটা করলে আম্বিয়া মেনে নিত কি-না সন্দেহ আছে। কিন্তু ইকবাল সাহেবের কথা সে এড়িয়ে যেতে পারেনা। বলে
বাইজান, আফনেরে কি কয়াম ? আফনে ত সংসারের কোন সাত-পাচেই থাহেননা। আফা আর লাবণী আম্মা খালি আমার লগে বাষা লইয়া মসকরা করে। হেরা কুব বিরক্ত অয় আমি আমার মতন কইরা কতা কইলে। আচ্চা বাইজান, আফনেই কওহাইন। এই দুনিয়ায় আওনের পর থাইকা যেইরহম কইরা কতা কইয়া আইতাছি হেইডা আমি বদলাইবাম কেমনে ? আমরা গাও-গেরামের মানুষ। আমরার মুহের কতার লগে গেরামের গন্ধ লাইগা থাকব এইডাই ত স্বাভাবিক।
ইকবাল সাহেব মাথা নাড়েন আম্বিয়ার কথা শুনে। বলেন
তুমি একদম ঠিক বলেছো আম্বিয়া। আমি এটাই চেয়েছিলাম।
আম্বিয়া ইকবাল সাহেবের এ কথায় কোন প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে তার আগের কথার সূত্র ধরে বলে
আর আমার বাষা আমি ছাড়–ম কেরে ? হের লাইগা যদি আমারে পছন্দ না অয় আমি যাইবাম গা। আমি ত হুনছি খালি নিজের বাষারে বাচাইয়া রাহনের লাইগা এই দেশে কত মানুষ যুদ্ধ করছে, জীবন দিছে। আমি মূর্খ মানুষ যেডা জানি, বুজি, শহরের শিক্ষিত মানুষেরা কি এইডা বুজেনা যে মানুষ ছোডবেলা থাইকা যেমনে কতা কইতে শিহে হেইডা হের বুকের মধ্যে গাইথা যায়, রক্তের লগে মিইশা যায়। ইচ্ছা করলেই হেইডা ছাড়ন যায়না। বাইজান, আফনে কইলে আমি যাইবাম গা। যেহানে মন খুইলা কতা কইতে পারবাম হেইহানে কাম করবাম। নাইলে কাম করবাম না। আল্লাহর দুনিয়ায় বেহের লাইগা খাওন-পরনের ব্যবস্থা থালহে আমার লাইগাও থাকব।
এ পর্যন্ত বলে থামে আম্বিয়া। ওর শেষ কথাগুলো ইকবাল সাহেবের কানে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। কিন্তু এই মুহূর্তে আম্বিয়াকে কিছু একটা বলা দরকার। তানাহলে ওর এই উপলব্ধিকে অসম্মান করা হবে। তাই তিনি বলেন
তুমি কোথাও যাবেনা আম্বিয়া। তুমি এখানেই থাকবে আর নিজের মতো করে কথা বলবে।
তারপর নিজের ঘরের দিকে যেতে যেতে স্বগোক্তি করে বলেন
এই অশিক্ষিত গ্রাম্য মহিলার কাছ থেকে যদি একটু কিছু শিখতে পারতো আমার অতি আধুনিক স্ত্রী-কন্যা তাহলে আমি নিজকে একটু হলেও সফল মনে করতে পারতাম।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই এপ্রিল, ২০১৪ সকাল ৯:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




