শিউলি ও আমার ঈদ
ঈদ আসলেই আমার বুকের ভিতর একটা ব্যথা রিনরিনিয়ে বাজে। কারণ একটাই। আমার কোন পিছুটান নেই বাড়ি যাবার। না বাবার বাড়িতে, না শ্বশুর বাড়িতে। কেউ আমার জন্য অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকে না। কবে ছুটি হবে, কবে বাড়ি যাব ? - এই নিয়ে উদগ্রীব প্রতীক্ষায় দিন গুণে না কেউ। ঈদের আনন্দ তাই আজকাল আমাকে তেমন করে নাড়া দেয় না, যেন পানসে হয়ে গেছে ঈদের আমেজ।
এবারও তাই হলো, ঈদে বাড়ি যাওয়া হলনা আমার। একা একা ঢাকায় ঈদ করাটা আজকাল আমার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে কিংবা আমি নিজেই অভ্যাসে পরিণত করে নিয়েছি। তবে একটু মন খারাপ যে হয়না সেটা বললে ভুল বলা হবে। মা-বাবা, শ্বশুর-শ্বাশুড়ির কথা মনে পড়ে বার বার। উনারা বেঁচে থাকলে কিছুতেই আমাকে একা ঢাকায় ঈদ করতে দিতেন না। কোন না কোন বাড়িতে আমাকে যেতেই হতো, তাতে যত কষ্টই হোক না কেন। তখন হয়তো সেই কষ্টটাকে কষ্ট মনে হতনা। কিন্তু এখন ঈদে বাড়ি যাবার কষ্টটাকে অনেক বড় মনে হয়। কয়েকটা দিন হাতে নিয়ে আগে চলে যাব সেই উপায়ও নেই। শেষ দিন পর্যন্ত অর্থাৎ ১৬-০৭-২০১৫ তারিখ পর্যন্ত আমাকে অফিস করতে হয়েছে। এরপর আর মাত্র একটি দিন ছিল হাতে। শেষ মুহূর্তে ঈদমুখো মানুষের যে চাপ পড়ে যানবাহনের উপর সেটা সামলিয়ে রাস্তায় নামার চেয়ে একাকী ঈদ করাটাকেই বরং যৌক্তিক মনে হয়। কারণ একটাই। অগেই বলেছি। যে পিছুটানের কারণে এক সময় সবকিছুকে তুচ্ছ করে বাড়ির পাণে ছুটতাম, সেই পিছুটান আমার জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে।
যে কথা বলছিলাম। গত দুই/তিন বছর একা একা ঈদ করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি আমি। ঈদ এলে মা-বাবা, শ্বশুর-শ্বাশুড়ির জন্য বুকের ভিতর রিনিঝিনি কান্না ছাড়া আর কোন ভাবান্তর ঘটেনা আমার। কিন্তু এবার সেই কান্নাটার ভিন্ন একটা রূপ দেখেছি আমি। গত ১৬-০৭-২০১৫ তারিখের একটি ঘটনা আমার ভিতর এই ভাবান্তর সৃষ্টি করেছে। সেই ঘটনার কথাই বলছি এখানে।
রাজধানীতে শ্যামলছায়া ফাউন্ডেশন নামে একটি সংগঠন আছে অনেকে হয়তো জানেন। এই সংগঠনটি তাদের এলাকার বস্তির সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ভাগ্যোন্নয়নে কাজ করে। এই শিশুদেরকে বিনামূল্যে শিক্ষা-চিকিৎসা ও মাঝে মাঝে বস্ত্র ও খাদ্য সামগ্রি প্রদান করা হয়ে থাকে এই সংগঠনের পক্ষ থেকে। শ্যামলছায়া ফাউন্ডেশনের ব্যানারে শ্যামলছায়া বিদ্যালয়টি হচ্ছে এদের তীর্থকেন্দ্র। মূল খরচটা বহন করে উদ্যোক্তারাই। তার সাথে যোগ হয় বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অনুদান। আমি যেহেতু শুরু থেকে এই সংগঠনের সাথে যুক্ত আছি তাই মাঝে মাঝে আমার সীমিত আয় থেকে যতটুকু পারি অবদান রাখতে চেষ্টা করি এবং এদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে শিশুদের উৎসাহ দিতে চেষ্টা করি।
এবারও আমি যেহেতু ঈদ উপলক্ষে ঢাকা ছেড়ে কোথাও যাইনি তাই আমাকে ডাকা হলো শ্যামলছায়া বিদ্যালয়ের শিশুদের হাতে ঈদের পোষাক ও খাদ্যসামগ্রি তুলে দেয়ার জন্য। আমি সানন্দে রাজী হলাম। ১৬-০৭-২০১৫ তারিখে অফিস থেকে বের হয়ে সোজা চলে গেলাম শ্যামলছায়া বিদ্যালয়ে। শিশুদের কিচির মিচিরে তখন স্কুলটি সরগরম হয়ে আছে। সবার মুখে আনন্দ যেন ঝলকে উঠছে। সত্যি এই আনন্দের বর্ণনা দেয়া কঠিন ! ওদের প্রাত্যাহিক জীবনের অভাব-অনটন এখানে এসে যেন হার মেনে গেছে। প্রতিটি শিশুর দারিদ্রক্লিষ্ট মুখে সেদিন যে আনন্দ আমি দেখেছিলাম তার কোন তুলনা চলেনা। মহাআনন্দে ওরা আমার হাত থেকে জামা-কাপড় ও খাদ্য-সামগ্রি নিল। আমিও ওদের হাতে এগুলো তুলে দিতে পেরে একটু যেন পুলকিত হলাম।
বিতরণশেষে অফিসে বসে উদ্যোক্তাদের সাথে নানা আলাপচারিতায় মেতে উঠলাম। স্বাভাবিকভাবে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের প্রসঙ্গ চলে আসছিল বার বার। এক পর্যায়ে জানতে পারলাম শিউলি নামের যে মেয়েটি আমার হাত থেকে উপহার গ্রহণ করেছে সে এবারের বেশির ভাগ রোজা রেখেছে সেহরীর সময় শুধু পানি খেয়ে এবং অনেকদিন সন্ধ্যায় রোজা ভেঙেছেও একইভাবে। কথাটা শুনা মাত্রই আমার ভিতরে সমস্ত ভাল লাগার দোলা থমকে গেল। এ কি করে সম্ভব ! কতই বা বয়স হবে শিউলির ? দশ কিংবা এগার ! এই বয়সে অভাবের সঙ্গে এতবড় লড়াই করতে কি করে শিখল শিউলি ? শুধু শেখা নয়। এই লড়াইয়ে জিতেছে শিউলি। একটি রোজাও সে ভাঙেনি।
নিজকে ধীক্কার দিতে ইচ্ছে হলো আমার। এদের জন্য কয়টা টাকা সংগঠনে দিয়ে কিংবা আজ কাপড় বিতরণ করার মতো একটা কাজ করে মনে মনে ভাল একটা কিছু করার ঢেকুর তুলি আমি কিংবা আমরা অনেকেই। কিন্তু কই ? শিউলি নামের ছোট্ট মেয়েটি যে সারাটা রোজার মাস অভাবের সাথে যুদ্ধ করে অনাহারে কাটিয়েছে, তার খবর তো একবারের জন্যও রাখিনি। আমাদের একটা ভাল কাজ করার পেছনে আরও অনেকগুলো ভাল কাজ করার তাগিদ থেকে যায়, সেটা আমরা খুঁজে বের করিনা অথবা করতে চাইনা - বস্তির সুবিধাবঞ্চিত মেয়ে শিউলির সাথে তুলনায় এখানেই আমরা ছোট হয়ে আছি।
এরপর থেকে শিউলি আমার মনকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে আছে যে ঈদের বরাবরের অনুভূতি আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি আমার ভিতর।
২২-০৭-২০১৫
সকাল ১০.২০ মিনিট
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে জুলাই, ২০১৫ সকাল ১১:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




