পত্রিকায় টাওয়ার হ্যামলেটস নির্বাচন নিয়ে আবদুল গাফফার চৌধূরীর লেখা পড়লাম। পড়ে মনে হলো তিনি কিছু বিষয় ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে গেছেন। নীলনদের কবি হাফিয ইবরাহীমের একটা কবিতা পড়েছিলাম । কবি বলেছেন- কিছু লেখক আছেন যারা কালির পরিবর্তে লেখনীর মাধ্যমে বিষ ছড়িয়ে দেন। আগাচৌ'র এ লেখাটি তেমনি একটি লেখা। লেখা আমার পেশা নয়। প্রতিদিন ১৩ ঘন্টা কাজ করি। লেখার সময় কোথায়? ইমিগ্রেশন বান্ধব হিসেবে আমি নিজেও লেবার পার্টি করি। লেখার ভূমিকাতেই আগাচৌকে বলতে ইচ্ছা করছে। দাদা, অনেক হয়েছে এবার ক্ষ্যামা দেন। আওয়ামীলীগের ব্যর্থতায় রাগ উঠলে মুরি চানাচুর খান। কিবোর্ড টিপতে ইচ্ছা করলে ভিডিও গেমস খেলেন। প্রয়োজনে আপনার লেখার প্রতিভা স্বরূপ স্বর্ণবিহীন ক্রেস্ট গ্রহণ করুন। ড. ইউনুস যদি ৬০ বছরে অবসরে যায় তাহলে আপনি সে বৃত্ত অনেক আগেই শেষ করেছেন। আওয়ামী বুদ্ধিজীবিদের চরিত্র কোথায়ও জানি এরকম পড়েছিলাম। নিরপেক্ষতা এদের ছদ্মবেশ, দেশপ্রেম এদের ভন্ডামী, চতুরতা এদের কৌশল, অধার্মিকতা এদের যোগ্যতা, চেতনা এদের অস্ত্র, মিডিয়া এদের মাধ্যম।
আজ থেকে ২২ বছর আগে বিলেতের একটি কাগজে ছড়াকার দিলু নাসের একটি ছড়া লিখেছিলেন ...এতো দিন পর ছড়াটি আবার মনে পড়লো ...
লোকটার কথা খুব মিষ্টি
মুহুর্তে কাড়ে মন দৃষ্টি
সবখানে তাই তার ভক্ত
কিন্তু সে চুষে খায় রক্ত ।
কি ভাবে যে খায় হাড় গোস্ত
টের পায় যারা হয় দোস্ত।
সেই লোক খুব পাকা শিকারী
প্রতিদিন সেজে থাকে ভিখারী
সবখানে পাতে হাত ভিক্ষার
কেউ কেউ দেয় গালি ধিক্কার
কেউ আবার দেয় সিকি আধুলী
মিছা কথা লোকটার মাধুলী।
তার মতো নাম করা ভন্ড
সমাজটা করছে যে পন্ড......
আমি জানিনা ছড়াকার এটি আগাচৌকে নিয়েই লিখেছেন কিনা?
বিশ্বের বিখ্যাত মিডিয়া গুলো যেখানে লুতফুর বন্দনায় নত তখন আগাচৌ এমন এক বিতর্ক উসকে দিয়েছেন যা তার নিজেকেই হেয় করেছে। প্রভাবশালী ইংরেজী দৈনিকগুলো যথাক্রমে টেলিগ্রাফ বলেছে- লুতফুর একজন সফল মেয়র, যিনি এলাকায় বিপুল পরিবর্তন এনেছেন। ইকোনমিষ্ট বলেছে- সত্যিই লুতফুর একজন লোকাল চ্যাম্পিয়ন। এর বাইরে লুতফুর রহমান তার নির্বাচনী ইশতেহার দিয়েও মানুষকে আকৃষ্ট করতে পেরেছেন। লুতফুর রহমান জনগণের মেয়র তার জন্যে লেবার পার্টি, কনর্জাভেটিভ, লিবডেমসহ সকল পার্টির লোকজনই কাজ করেছে। সোমালী, বাঙ্গালীর তুলনায় হোয়াইট পিপলরাই তাকে ভোট দিয়েছে বেশী। লেবার পার্টির যারা লুতফুর রহমানের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলো তাদেরকে কমিউনিটি ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেছে। তাছাড়া লেবারের যারা আওয়ামীলীগকে সাপোর্ট করেন দেশের আওয়ামীলীগের দুর্নীতি, গুম, খুন, ক্রসফায়ার, যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্রুনালসহ সকল ব্যর্থতার দায়ভার আওয়ামী লেবারের উপর প্রয়োগ করেছে। ভোট দেয়ার সুযোগ পেলে সবখানেই জনগন আওয়ামীলীগকে এখন লালকার্ড দেখাবে। তাছাড়া আওয়ামীলীগকে জেতানোর জন্যে এখানে রকিব-মোবারক পরিষদের নির্বাচন কমিশনও ছিলোনা।
গত ৬ মাস আগে নির্বাচন প্রস্তুতির প্রাক্কালে লুতফুর একটি বাংলা মিডিয়াকে সাক্ষাতকারে বলেছিলেন- জনগনের সেবা ও সঠিক নেতৃত্ব দিতে কোন দলের প্রয়োজন নেই। যে প্লাটফর্ম থেকে ন্যায় ও নিজের সঠিক মতামত প্রকাশ করা যায়না সেই প্লাটফর্মে আমি থাকতে চাইনা। এটা ভুলে গেলে চলবেনা যে লুতফুর রহমান ২০০২ ও ২০০৬ সালেও লেবারের কাউন্সিলার ছিলেন।
টাওয়ার হ্যামলেটসে লুতফুর রহমান এর বিজয়ের কয়েকটি ঘটনার আমি প্রত্যক্ষদর্শী। ঘটনা-১, আমার নেক্সট ডোরে একজন লুতফুর রহমানের সমর্থক থাকেন। নির্বাচনী জনসংযোগে মেয়র ডোর টু ডোর যাচ্ছেন। একদিন আমার দরজায় তিনি উপস্থিত। হাই হ্যালোর পর দোয়া চেয়ে চলে গেলেন। সৌজন্যতা বশত আমি দরজার বাইরে অপেক্ষা করছি। মেয়র যখন আমার নেক্সট ডোর কয়েকবার নক করলেন, দেখলাম কেউ দরজা খুললোনা। মেয়র চলে যাওয়ার পরই দরজা খুলে একজনকে বেরুতে দেখলাম। কৌতুহলবশত: তাকে জিজ্ঞেস করলাম, মেয়র নক করার পর দরজা খোলে নাই কেন? প্রতিউত্তরে আমার টাশকি খাওয়ার দশা, তিনি বললেন- আমি এবং ফ্যামিলির সবাই লুতফুর রহমানের সার্পোটার। আমাদের ভোট তিনি পাবেনই তাই তার সময় নষ্ট না করে তাকে অন্য ভোটারের কাছে যাওয়ার সুযোগ করে দিলাম। আমি আশ্চর্য হলাম, মনে মনে ভাবলাম ভোট লাগবেনা এই রকম নিবেদিতপ্রাণ সার্পোটারের ভালোবাসাই লুতফুর রহমানকে আবার মেয়র বানাবে।
ঘটনা-২, ২২শে মে'১৪ ।
সময় তখন সন্ধ্যা ৯ টা। একজনকে হন্তদন্ত হয়ে ওয়াইফসহ কেন্দ্রে যেতে দেখলাম। কৌতুহল চেপে না রেখে জিজ্ঞেস করলাম ঘটনা কি? তিনি যা বললেন- তাতে আমার স্পীকার হওয়ার অবস্থা। তিনি তার হলিডেতে ছিলেন ফ্যামিলিসহ। ২৫০ কিলোমিটার জার্নি করে এসেছেন শুধুমাত্র লুতফুর রহমানকে একটি ভোট দেবার জন্যেই। প্রীত হলাম হলিডে উৎসর্গের কথা শুনে। ফাস্ট ওয়াল্ডের হলিডে তো। বুঝলাম ভোটারের নিখাদ ভালোবাসা তাকে দ্বিতীয় মেয়র বানাবেই।
ঘটনা-৩, লুতফুর রহমানের ছিলো একঝাক আত্মপ্রত্যয়ী ইলেকশন ক্যাম্পেইন টীম। যারা কমিউনিটির সকলের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রেখেছিলেন। তাদের একজনের সাথে কথা হলো, যিনি ২০১০ সালের মেয়র ইলেকশানেও তার টীমের মেম্বার ছিলেন। তাকে প্রশ্ন করলাম- তাদের টীমের সিক্রেট কি? তিনি বললেন- আমরা লেবারের অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছি। লুতফুর রহমানকে বিজয়ী করেই ঘরে ফিরবো। লুতফুর রহমান সিলেটের অধিবাসী। তিনি বাংলাদেশী এবং মুসলমান। তিনি নিজেই বলেছেন আমাকে আমার কাজ দিয়েই বিবেচনা করুন।
যে বিষয় গুলো আগাচৌ উল্লেখ করেননি-
ডেইলি টেলিগ্রাফের জরিপে বৃটেনের প্রভাবশালীদের তালিকায় লুতফুর রহমানের স্থান ৫৩তম। ২০১০ সালের মেয়র নির্বাচনেও লেবার পার্টির কর্মীদের নির্বাচিত মেয়র প্রার্থী ছিলেন লুৎফুর রহমান। পার্টির কাউন্সিলে তাঁর প্রাপ্ত পার্টি-ভোট ছিল ৪৩৩টি। তার প্রতিদ্বন্দ্বী হেলাল আব্বাস পান ১৫৭ ভোট এবং জন বিগস’র ভোট ছিল ২৫১টি। এর পরও লেবার পার্টি মিথ্যা অজুহাত তুলে লুৎফুর রহমানকে মনোনয়ন না দিয়ে হেলাল আব্বাসকে মনোনয়ন দেয়। তখন টাওয়ার হ্যামলেটসের জনগণ লুৎফুর রহমানকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করে দিয়ে লেবার পার্টিকে তাদের অন্যায় সিদ্ধান্তের জবাব দেয়।
সে নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী লুৎফুর রহমানের ভোট ছিল ২৩ হাজার ২ শ ৮৩। পক্ষান্তরে লেবার-প্রার্থী হেলাল আব্বাসের পান ১১ হাজার ২ শ’ ৫৪টি।যাতে দেখা যাচ্ছে লুতফুর দ্বিগুণ ভোটের বেশী পেয়ে মেয়র।
টাওয়ার হ্যামলেটসে হাউজিং সমস্যা প্রকট। নির্বাচিত হওয়ার পর লুৎফুর রহমানের প্রতিশ্রুতি ছিল নতুন চার হাজার ঘর নির্মাণ করবেন। তিনি সে প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন। কাউন্সিলের বর্তমান ঘরগুলোর সংস্কার করছেন। ইংল্যান্ডের যে কোনও কাউন্সিলের তুলনায় বেশি সংখ্যক সোস্যাল হাউজ নির্মাণ করায় সরকারের তরফ থেকে সর্বোচ্চ ‘হাউজিং বোনাস’ ৫০ মিলিয়ন পাউন্ড পেয়েছে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল। বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে মেয়র লুৎফুর রহমানের এ সাফল্য গোটা ইংল্যান্ডে নজিরবিহীন। আর কোন বরা তার ধারে কাছেও পৌঁছতে পারেনি। যদি ঘর প্রাপ্ত চার হাজার ফ্যামিলির ৪ জন মেম্বারও লুৎফুর রহমানকে ভোট দেন তাহলেই তিনি ১৬ হাজার ভোটে তিনি এগিয়ে থাকবেন এটাই স্বাভাবিক।
ড্রাগ ডিলারদেরকে আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে তার অবদান অপরিসীম। প্রতিদিন একাধিক ড্রাগ ডিলার গ্রেফতারের মাধ্যেমে লুতফুর রহমান এফেক্টেড ফ্যামিলি গুলোর মনের মনিকোঠায় স্থান করে নিয়েছেন।
লুতফুর রহমান বৃটেনের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টদের জন্য হায়ার এডুকেশন গ্রান্ট চালু করেছেন। যা একজন ছাত্রের জন্যে বড় সার্পোট।
টাওয়ার হ্যামলেটস বরায় প্রাইমারী স্কুলের রিসেপশন ও ইয়ার ওয়ান ক্লাসের শিক্ষার্থীদের জন্য ফ্রি স্কুল মিল এবং সারাদেশে বন্ধ করে দেয়া এডুকেশন মেনটেইনেন্স এলাউন্স (ইএমএএ)-এর বিকল্প ফান্ডিং চালু করে তিনি সকলের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। সেন্ট্রাল গর্ভমেন্টও এ পরিকল্পনা দেশব্যাপী চালুর ব্যাপারে পাইলট প্রজেক্ট চালু করেছে। যা ছিল মেয়র লুতফুর রহমানেরই ব্রেইন চাইল্ড। টাওয়ার হ্যামলেটসবাসী তাঁর এ সকল কাজের মূল্যায়ণ করুক বা করুক, তিনি এ জন্যে বৃটেনের ইতিহাসে নিজের স্থান করে নিয়েছেন।
বিবিসির প্যানারোমা- প্যানারোমার ইতিহাসে একটি লোকাল ইস্যু নিয়ে এই প্রথম অনুষ্ঠান। যা লুতফুর রহমানকে হেয় করতেই লেবারের প্ররোচনায় করা হয়েছিলো। প্যানারোমা যা দেখালো তাতে প্রকৃতই গণেশ উল্টে গেল। প্যানারোমার সুত্র ধরেই স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড নির্বাচনের ঠিক পূর্ব মুহুর্তে মেয়র অফিস তল্লাশি করা হলো। সার্চ শেষে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড প্রেস কনফারেন্সে ঘোষণা দিল- লুতফুর রহমান মেয়র থাকার সময়ে টাওয়ার হ্যামলেটসে কোন অর্থনৈতিক অনিয়ম হয়নি। অপমানিত হওয়ার বদলে প্যানারোমা মেয়রকে জিতিয়ে আনতে সহযোগিতা করলো।
লেবারের ভূল- জন বিগসকে মনোনয়ন লেবার পার্টির প্রথম ভুল। প্রশ্ন উঠলো ২০১০ সালের মেয়র নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হেলাল আব্বাস তাহলে কি পুতুল ছিলো? এটা কি বাংলাদেশী কমিউনিটিকে বিভাজনের জন্যেই করা হয়েছিলো? যার সদুত্তর লেবার দিতে পারেনি। অপরদিকে জন বিগস জিএলএ মেম্বারের লোভনীয় ৫০ হাজার পাউন্ডের জব তাকে ফুলটাইম মেয়র না হাফটাইম মেয়র এ সন্দেহের কোন কুল কিনারা পাওয়া যায়নি।
লেবারের নির্বাচনী প্রচারণা- লেবার এমপি রোশনারা আলী নিজেকে সেইফ করতেই মেয়র ইলেকশনে পাকিস্তানী বংশদ্ভুত লেবার এমপি সাদিক খানকে নির্বাচনী প্রচারণায় নিয়ে এসেছিলেন। বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে যখন সবখানেই পাকিস্তানীদের প্রতি নিরব ঘৃণা সেখানে রোশনারা আলী একঢিলে দুই পাখি মেরেছেন। লুতফুর রহমান মেয়র নির্বাচনে হেরে গেলে তিনি যদি পালার্েমন্ট নির্বাচনে এমপি প্রার্থী হন এ আশংকা থেকে তাকে নিরাপদ যাত্রার সুযোগ দিয়েছেন। এটা তার নিজের স্বার্থেই। পাকিস্তানী সাদিক খানের প্রচারণায় লেবারের ভোট কমে বৈ বাড়েনি।
অপরদিকে লেবার পার্টির হেভিওয়েট কয়েকজন মেম্বারও লুতফুর রহমানের জন্যে একচেটিয়া কাজ করেছেন। এদের মধে্য সাবেক লন্ডন মেয়র ক্যান লিভিংস্টন এর কথা উল্লেখ না করলেই নয়। লুতফুর রহমান এগিয়ে যাবেন এটাই সত্য। যদি কখনো তিনি লেবার পার্টিতে ফিরে আসেন তবে তাকে বড় কোনো আসন অলংকৃত করতে দেখলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। লেখা শেষ করছি লুতফুর রহমানের শুভকামনায়, যিনি বাঙ্গালী/ বাংলাদেশীদের এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা করে যাচ্ছেন নিরন্তর ।
সুঘ্রাণ কাদের
লন্ডন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

