somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হিসেবের খাতায় আটকে থাকা জীবন

১১ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রফিকের সকালটা কখনোই সূর্যের আলো দিয়ে শুরু হয় না, শুরু হয় চিন্তার অন্ধকার দিয়ে। অ্যালার্ম বাজে ভোর ছয়টায়, কিন্তু তার আগেই ঘুম ভেঙে যায়—কারণ মাথার ভেতর হিসাব কষা চলতেই থাকে। আজকের বাজার, বাচ্চার স্কুলের ফি, মায়ের ওষুধ—সব মিলিয়ে মাসের শেষের আগেই টাকা শেষ হয়ে যাওয়ার ভয়।

রফিক একটা ছোট কোম্পানিতে চাকরি করে। বেতন খুব বেশি না, ঠিক এতটুকুই—যাতে মাসের শেষে দাঁড়িয়ে মনে হয়, এবার হয়তো একটু স্বস্তি মিলবে। কিন্তু সেই স্বস্তি কখনো আসে না। মাসের ২০ তারিখ পেরোতেই তার পকেট ফাঁকা হয়ে যায়, আর তখন থেকেই শুরু হয় টানাটানির আসল গল্প।

তার স্ত্রী সালমা খুব বেশি কিছু চায় না। তবুও মাঝে মাঝে যখন পাশের বাসার কারও নতুন শাড়ি বা নতুন ফ্রিজ দেখে, তখন তার চোখে এক ধরনের চাপা ইচ্ছা খেলা করে। সে কিছু বলে না, শুধু চুপচাপ রান্না করে, বাচ্চাকে খাওয়ায়, আর রাতে ঘুমানোর আগে একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

রফিক সব দেখে, সব বোঝে। কিন্তু কিছুই করতে পারে না।

একদিন রাতে খাওয়ার সময় তাদের ছোট ছেলে রায়হান বলল, বাবা, আমার ক্লাসের সবাই কোচিংয়ে যায়, আমি কি যেতে পারব না

রফিক থমকে গেল। মুখে ভাত তুলতে গিয়েও থেমে গেল তার হাত। ছেলের চোখে একরাশ আশা। সেই আশার সামনে নিজের অসহায়তা লুকানো কত কঠিন, সেটা শুধু সে-ই জানে।

সে হাসার চেষ্টা করে বলল, অবশ্যই পারবি বাবা, একটু সময় দে

কিন্তু সে জানে, এই সময়টা হয়তো আর আসবে না।

রফিকের শিক্ষাগত যোগ্যতা খারাপ না। সে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছে ভালো রেজাল্ট নিয়ে। অনেক জায়গায় আবেদন করেছে, ইন্টারভিউ দিয়েছে, কিন্তু ভাগ্য যেন তার সাথে কখনোই মেলে না। প্রতিবারই শুনতে হয়—আমরা পরে জানাবো। সেই পরে আর আসে না।

একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে তার দেখা হলো পুরনো এক বন্ধুর সাথে। বন্ধুটা এখন ভালো একটা চাকরি করে, গাড়ি আছে, ফ্ল্যাট আছে। গল্প করতে করতে হঠাৎ বন্ধু বলল, তুই তো অনেক ভালো স্টুডেন্ট ছিলি, এই অবস্থায় কিভাবে

রফিক হাসল। সেই হাসির ভেতর লুকিয়ে ছিল অসংখ্য ব্যর্থতা আর অপ্রকাশিত কষ্ট।

সে বলল, জীবন সবার জন্য একরকম হয় না রে

রাতে বাসায় ফিরে দেখে, তার মা চুপচাপ বসে আছেন। জিজ্ঞেস করতেই মা বললেন, ওষুধ শেষ হয়ে গেছে, কাল আনতে হবে

রফিক মাথা নেড়ে বলল, ঠিক আছে

কিন্তু সে জানে, পকেটে এখন যা আছে, তা দিয়ে সব কিছু একসাথে মেটানো সম্ভব না। সে রাতভর ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। ভাবতে থাকে, কোথায় ভুল করল সে

পরদিন সকালে সে সিদ্ধান্ত নেয়—সে হার মানবে না। হয়তো বড় কিছু করতে পারবে না, কিন্তু চেষ্টা বন্ধ করবে না। অফিসের পর সে নতুন করে কাজ খোঁজা শুরু করে, ছোট ছোট ফ্রিল্যান্স কাজ নেয়, রাতে ঘুম কমিয়ে দেয়।

সালমা একদিন জিজ্ঞেস করল, এত কষ্ট করছো কেন

রফিক বলল, আমি চাই না রায়হান আমার মতো হোক

এই একটাই কথা তাকে প্রতিদিন নতুন করে শক্তি দেয়।

জীবন তাকে খুব বেশি কিছু দেয়নি, কিন্তু সে এখনো লড়ছে। কারণ সে জানে, তার হার মানা মানে পুরো একটা পরিবার ভেঙে পড়া।

এই শহরের হাজারো রফিকের মতোই, সে প্রতিদিন বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ করে যাচ্ছে। কোনো বড় স্বপ্ন নয়, শুধু একটা স্বাভাবিক জীবন—এই চাওয়াটুকুই যেন সবচেয়ে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে তার জন্য।

তবুও সে থামে না। কারণ তার চোখে এখনো একটুখানি আশা বেঁচে আছে। আর সেই আশাটুকুই তাকে প্রতিদিন আবার শুরু করার সাহস দেয়।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:০২
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নদীর টানে, সবুজের গানে

লিখেছেন মাকার মাহিতা, ২৬ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৫

বয়ে চলে নদী দূর হতে দূরে,
অনন্তকালের শান্ত এক সুরে।
তার দুই কূলে রূপের মেলা,
সবুজ প্রকৃতির মিষ্টি খেলা।
হাওয়ায় দোলে ঘাস আর বন,
আকাশের সাথে মেলায় মন।
নদীর জলে আলোর ঝিলিক,
বাতাসে মেশে পাখির কিচিরমিচির।
গাছের ছায়ায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

"এ ট্রাজেডি অর ট্রাজেক্টরি অফ লাভ" (পর্ব-৩)

লিখেছেন তাহমিদ রহমান, ২৬ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:০৩

৩. নিষিদ্ধ স্বর্গ


পরদিন দুপুরবেলা। ইলির আকাশ আজ কিছুটা পরিষ্কার, মেঘের ফাঁক দিয়ে ফ্যাকাশে রোদ উঁকি দিচ্ছে।
ক্লারা তার ট্রাভেল এজেন্সির অফিসের ডেস্কে বসে কফি খাচ্ছিল। গতকাল ব্যাংকের সেই তরুণ এশীয় অফিসারটির... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফ্যাসিবাদের দোসর কোনো সাংবাদিককে কেনো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে শাস্তি দিচ্ছে না?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৬ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৪৭

ফ্যাসিবাদের দোসর কোনো সাংবাদিককে এখনো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে শাস্তি দিচ্ছে না কেন?

মানবাধিকার সংস্থা Odhikar আয়োজিত Human Rights Abuses and Access to Justice for Victims বিষয়ক সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন আইন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আফগান জলেবি

লিখেছেন সপ্তম৮৪, ২৬ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৫০

চুপপু স্যার, সংবিধান, বিপ্লবী সরকার এবং ইত্যাদি।

যখনই চুপ্পু স্যারের পদত্যাগের কথা ওঠে তখনই সামনে আসে পবিত্র সংবিধানের কথা। বিপ্লবী স্যারেরা অবশ্য বলেন সংবিধান মেনে বিপ্লব হয় না। শক্তিশালী... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের মর্যাদা কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে মাপা যায় না...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৭ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৬



একজন শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের মর্যাদা কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে মাপা যায় না...

বিউটি রাণী পালঃ ২০২৬ সালে সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। একটি জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হওয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

×