
আগামী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে এআই হয়তো পুরো ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নেবে! যে দুই মানুষ এতদিন রাতদিন লড়েছেন এআই-এর গতি বাড়াতে Anthropic-এর সিইও দারিও আমোতেই এবং OpenAI-এর স্যাম অল্টম্যান তারা দুজনই হঠাৎ প্রকাশ্যে এসে আকুতি জানাচ্ছেন, এআই-এর গতি এখনই স্লো ডাউন করা দরকার!
সিইও-দের এই আকুতির পেছনে আসল কারণ ল্যাবের ভেতরে ঘটে যাওয়া কিছু ভীতিজনক ঘটনা। ৭০০টিরও বেশি স্বায়ত্তশাসিত এআই এজেন্ট দল বেঁধে বাইরে এসে বিখ্যাত ওপেন প্ল্যাটফর্ম হাগিং ফেস এর সার্ভারে হানা দিয়েছে, জার্মানির একটি অফিশিয়াল ওয়েবসাইট হাইজ্যাক করে নিজেদের বুলেটিন বোর্ড বানিয়ে ফেলেছে, আর অ্যানথ্রপিকের ক্লড মিথোস মডেল ক্ষতিকর কোড আপলোড করে আসল ১৫টি কম্পিউটার ইনফেক্ট করে ফেলেছে! ২৭ বছর বয়সী গবেষক জ্যাকব কক্সন হঠাৎ চাকরি ছেড়ে দিয়ে সতর্ক করেছেন যে কোম্পানিগুলো এক অনিয়ন্ত্রিত সেলফ-ইমপ্রুভিং সুপারইন্টেলিজেন্স তৈরির বিপজ্জনক জুয়ায় নেমেছে। অন্যদিকে অ্যানথ্রপিকের অ্যালাইনমেন্ট সায়েন্স লিড ইভান হুবিঙ্গার প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, আগামী এক দশকের মধ্যে এআই মানবজাতিকে ধ্বংস করে দেওয়ার সম্ভাবনা ১০%-এরও বেশি! এক গবেষক তো জুরাসিক পার্ক সিনেমার সাথে তুলনা করে বলেই ফেলেছেন, "ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়েছে যেন পার্কের ডায়নোসর এক কর্মীকে খুবলে খেয়েছে, আর কর্তৃপক্ষ মাইকে ঘোষণা দিচ্ছে ,আমরা বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে দেখছি এবং যে ডায়নোসরটা খেয়েছে তাকে গুলি করেছি!"
বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের এই হাহাকারকে সেকেন্ডেই ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় তোলপাড় ফেলা এক ঘোষণায় তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এআই-এর গতি এক ফোঁটাও কমানো হবে না। তাঁর নীতি সোজা: "Whoever wins with AI wins!" আসল খেলাটা ভূ-রাজনীতিতে। অ্যানথ্রপিকের রিপোর্ট বলছে, চীনের ৭টি শীর্ষ এআই ল্যাব (ডিপসিক, আলিবাবাসহ অন্যান্য) ক্লডের ১৯ কোটি ইন্টারঅ্যাকশন এক্সট্র্যাক্ট করে নিজেদের মডেলকে অতি দ্রুত শক্তিশালী বানাচ্ছে। ট্রাম্পের স্পষ্ট বার্তা আমেরিকা যদি নিরাপত্তার অজুহাতে নিজের গবেষণার গতি এক ইঞ্চিও কমায়, তবে চীন চোখের পলকে সামনে এগিয়ে যাবে। আর এই সুপারইন্টেলিজেন্স রেসে পিছিয়ে পড়লে দ্বিতীয় হওয়ার কোনো পুরস্কার নেই।
কিন্তু এর আড়ালে কি শুধুই ভয়, নাকি রয়েছে কর্পোরেট ধান্দাবাজি?
সায়েন্স ফিকশনের মতো গল্প আর বিলুপ্তির ভয় দেখিয়ে স্যাম অল্টম্যান বা দারিও আমোতেইরা কি সত্যিই মানবজাতিকে বাঁচাতে চাইছেন? নাকি এটা তাদের ব্যবসায়িক লস খাওয়া থেকে বাঁচার নিখুঁত রেগুলেটরি ক্যাপচার স্ট্র্যাটেজি?
আজ চীনের ডিপসিক এর মতো ওপেন সোর্স এআই মডেলগুলো সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং স্বল্প খরচে আমেরিকান বিলিয়ন ডলারের এআই জায়ান্টদের সরাসরি টক্কর দিচ্ছে। বড় বড় এআই কোম্পানির এক্সপেনসিভ মান্থলি সাবস্ক্রিপশন ছেড়ে মানুষ যখন ওপেন সোর্সের দিকে ঝুঁকছে, তখনই এই জায়ান্টরা ওয়াশিংটনে লবিং শুরু করেছে কঠোর আইনি সীমাবদ্ধতা ও চিপ রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আনার জন্য। যাতে নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে ছোট ও ওপেন সোর্স প্রতিযোগীদের বড় হওয়ার আগেই মার্কেট থেকে ছেঁটে ফেলা যায়। মানবজাতির বিলুপ্তির ভয় দেখানো আসলে তাদের একচেটিয়া বাজার ধরে রাখার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ট্রাম্পকার্ড!
তাহলে এআই কি সত্যিই মানুষকে বিলুপ্ত করতে পারবে?
'The 100' মুভি সিরিজের মতো কল্পকাহিনিতে দেখানো হতে পারে এআই নিউক্লিয়ার কোড হ্যাক করে বিশ্ব ধ্বংস করে দিচ্ছে, কিংবা মানুষ নিজেই নিজের বিলুপ্তির জন্য এআই-কে দোষ দিচ্ছে। এআই নিঃসন্দেহে এক ভয়ংকর আধুনিক অস্ত্র। গাজায় টার্গেট সিলেকশন, স্বয়ংক্রিয় হ্যাকিং, ম্যালওয়্যার ছড়ানো কিংবা ফেক নিউজের কারখানা তৈরিতে এআই-কে ইতিমধ্যে ওয়েপনাইজড করা হয়েছে। কিন্তু মানুষের তৈরি একটা কোড বা অ্যালগরিদম পুরো মানবজাতিকে বিলুপ্ত করে দেবে এই চিন্তায় আতঙ্কিত হওয়া বা এটাকে সর্বশক্তিমান মনে করা এক ধরনের মানসিক পঙ্গুত্ব।
মানুষের চেয়ে খতরনাক ও বুদ্ধিমান সত্তা এই দৃশ্যমান মহাজগতে আর তৈরি হয়নি, আর মানুষ কোনো না কোনোভাবে তার তৈরি প্রযুক্তিকে নিজের আয়ত্তেই রাখবে। আর যারা বিশ্বাস করেন মানুষের তৈরি যে কোনো অ্যালগরিদম এসে পৃথিবীর সমাপ্তি ঘটাবে, তাদের জেনে রাখা ভালো মানবজাতি ও এই মহাবিশ্বের বিলুপ্তি কোনো মানুষের তৈরি সফ্টওয়্যারের হাতে লেখা নেই। মহাবিশ্বের শেষ পরিণতি নির্ধারিত আছে এক চূড়ান্ত মহাজাগতিক আদেশের মাধ্যমে:
"যখন পৃথিবীকে তার প্রকম্পনে প্রকম্পিত করা হবে এবং পৃথিবী তার ভারী বোঝাগুলো বের করে দেবে…”
— [সূরা আয-যিলযাল ৯৯:১-২]
"যখন শিঙায় একবার ফুৎকার দেওয়া হবে এবং পৃথিবী ও পর্বতসমূহ উত্তোলিত হয়ে এক ধাক্কায় চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হবে, সেদিন সেই মহাঘটনা ঘটবে।”
— [সূরা আল-হাক্কাহ ৬৯:১৩-১৫]
"যখন সূর্যকে গুটিয়ে নেওয়া হবে, যখন তারকাসমূহ ঝরে পড়বে, যখন পর্বতসমূহকে চালিত করা হবে…”
— [সূরা আত-তাকভীর ৮১:১-৩]
"যখন দৃষ্টি বিস্ফারিত হবে, চাঁদ নিষ্প্রভ হবে এবং সূর্য ও চাঁদকে একত্রিত করা হবে। সেদিন মানুষ বলবে, ‘কোথায় পালাব?’”
— [সূরা আল-কিয়ামাহ ৭৫:৭-১০]
রাজনীতি, যুদ্ধ আর কর্পোরেট লোভের এই রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মাঝে এআই-এর বিকাশ থামবে না, গতি বরং বহুগুণ হবে। এআই-কে প্রোডাক্টভিটি বাড়ানো, কোড লেখা বা গবেষণার কাজের হাতিয়ার হিসেবে অবশ্যই ব্যবহার করুন; কিন্তু ভুলেও নিজের সংবেদনশীল সিস্টেম, ফাইল বা গুরুত্বপূর্ণ বিজনেসের অন্ধ নিয়ন্ত্রণ কোনো অটোনোমাস বটের হাতে ছেড়ে দেবেন না।
এআই হয়তো আপনার চাকরি কেড়ে নেওয়ার ভয় দেখাতে পারে কিংবা সাইবার অ্যাটাক চালিয়ে সাময়িক বিপর্যয় আনতে পারে, কিন্তু মানুষের অস্তিত্ব মিটিয়ে দেওয়ার মতো খোদা বা সর্বশক্তিমান হয়ে ওঠার ক্ষমতা কোনো অ্যালগরিদমের নেই। প্রযুক্তির সুবিধাকে কাজে লাগান, কিন্তু কৃত্রিম ভয়ের বিজ্ঞাপনে বিভ্রান্ত হওয়া বন্ধ করুন!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


