কালো মেঘ এবং অতঃপর..........
১.
আট আট টি ছেলেমেয়ের মধ্যে রইস মিয়ার সবচেয়ে আদরের সন্তান তাঁর ছোট ছেলে দীপু। পাঁচ বছর বয়সেই ছেলের এত বুদ্ধি দেখে রইস খুব অবাক হন। এই তো সেদিন পাশের বাসার নাছের জার্মানী থেকে দেশে ফিরে পূর্বপরিচিত রইস মিঞার বাসায় দেখা করতে এলে দীপু নাসেরকে জিজ্ঞেস করে - আচ্ছা কাকা আপনি কি প্লেনে করে এসেছেন? কেউ ত দীপুকে বলে দেয়নি নাছের বিমানে করে এসেছে তাহলে ও জানল কিভাবে? জিজ্ঞেস করতেই বলে যদি বিদেশে বিমানে করে যায় তাহলে তো বিমানেই আসবে। তারমানে দীপু জানে বিদেশে যেতে বিমান লাগে, কিন্তু ফিরে আসতেও যে বিমান লাগবে, দীপুর এই যুক্তিতে রইস খুব অবাক হন। নিজে তিনি মেট্রিক পাস, অভাবের সংসারে এর বেশী পড়াশুনা করা সম্ভব ছিলনা। মেট্রিক পাশ দিতেও তাকে বহুত শ্রম দিতে হয়েছে। অন্যের বাড়ীতে থেকে টিউশানি করে তবে না মেট্রিক দিতে পারলেন, আর সেই জন্যেই একটা ছোটখাট চাকরী যোগার করে দশজনের সংসারটা এখনও সামাল দিয়ে আসছেন। প্রথমে তিনটা মেয়ে হবার পর দুইটা ছেলে তারপর আবার দুইটা মেয়ের পর দীপুর জন্ম। রইস মিঞা ভাবেন তার আর সব ছেলে মেয়ের চেয়ে দীপুটা যেন আলাদা। ওর তীক্ষè বুদ্ধি আর আচার আচরণ থেকে রইছ মিঞার খুব আশা এই ছেলেটিকে নিয়ে। ছেলে বড় হয়ে একদিন ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হবে তাঁর পরিবারের গর্ব হবে এমনটিই রইস মিঞা ভাবেন।
২.
দীপু বয়সে ছোট হলেও তার খেলার সাথীরা কিন্তু তার চেয়ে ঢের বড়। তাদের সাথে দীপু নিয়মিত খেলাধুলা করলেও সেটা বাসার পাশেই, খুব বেশী দূরে যাবার অবকাশ নেই। তাহলে মায়ের বকুনি কিংবা মারও খেতে হতে পারে। তাই দীপু তারচেয়ে বয়সে বড় খেলার সাথীদের সাথে ঘুড়ি ওড়াতে যেতে পারেনা। প্রায়দিনই জাভেদ, রফিক, আশীষরা দীপুকে ফেলে কোথায় যেন চলে যায় খেলতে। দীপু যেতে চাইলে বলে বলে তুই তো ছোট আর তোর তো নাটাই ঘুরিও নেই, আর তুই যদি আমাদের সাথে যাস তোর মা আমাদের বকবে। কিন্তু ওরা চলে গেলে দীপুর খুব খারাপ লাগে। তাই একদিন সে জাভেদকে খুব অনুনয়ের সাথে বলে আমাকে তোমাদের সাথে নাও মা জানার আগেই চলে আসব, আর আমি তোমাদের নাটাই ঘুরিও ধরবনা আমি ত ঘুরি ওড়াতেই জানিনা। কি জানি কি ভেবে সেদিন জাভেদ রাজি হয়ে গেল। আর সবার অলক্ষ্যে দীপু বাসা থেকে অনেক দূরে অজানা কোন গন্তব্য দেখার উত্তেজনায় জাভেদদের সাথে রওনা দিল।
বাসা থেকে বের হয়ে একটা লম্বা সরু গলি পেরিয়ে গেলেই শহরের একটি ব্যস্ত রাস্তা, সেই রাস্তা ধরে দীপু জাভেদদের সাথে অনেক্ষণ হাটছে। যখন দীপুর পা প্রায় ব্যাথা করছে তখন দেখল হঠাৎ করেই বড় রাস্তার পাশেই সুবিশাল বিস্তৃত মাঠ। দীপু এর আগে এত বড় মাঠ এদিকে কখনও দেখেনি। ঈদের সময় গ্রামের বাড়ী গেলে অবশ্য দেখতে পেত। কিন্তু সেগুলো ত ধান ক্ষেত। এখানে এক অপূর্ব দৃশ্য - সুবিশাল জায়গা জুড়ে কেবল হলুদ আর হলুদ, তার সাথীরা বলল এগুলো সরিষা ক্ষেত। দীপুকে আর কেউ মনে না রেখে যার যার ঘুড়ি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সবাই।
দীপু কিছুক্ষণ ওদের ঘুুড়ি উড়ানো দেখল, নিজের ঘুড়ি নেই বলে এ ব্যাপারে আর তেমন আগ্রহ অনুভব করলনা। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রকৃতির অপরূপ শোভায় নিজেকে আত্মমগ্ন করল। ইতিমধ্যে কত সময় পার হয়েছে সেই খেয়াল তার একদমই ছিলনা, পায়ে হেটে আসার ক্লান্তিটাও আর বোধ না হওয়ায় সে জায়গাটাকে আরও ভালভাবে দেখবে বলে উঠে পড়ল এবং কাউকে কিছু না বলে না বলে ওর সাথীদের থেকে বেশ দূরে চলে গেল।
জাভেদ রফিকরা ঘুড়ি ওড়ানো শেষ করে বাড়ী চলে গেল, কিন্তু কারোরই মনে ছিলনা যে তাদের সাথে আজ প্রথমবারের মত নিয়ম ভেঙ্গে একটি ছেলে ঘুড়ি ওড়ানো দেখতে এসেছিল।
৩.
সেদিন বিকেলে রইস মিঞা একটু জ্বর জ্বর অনুভব করায় ছুটি নিয়ে লাঞ্চের পর বাসায় চলে আসলেন। শরীর খারাপ লাগায় তিনি এসেই শুয়ে পড়লেন এবং বললেন একটু জিরিয়ে নেই তারপর খাব। ইতিমধ্যে দীপুর মা খেয়াল করলেন অনেক বেলা হল অথচ দীপুটার বাসায় ফেরার নাম নেই। তিনি দীপুকে খুঁজতে বের হয়ে না পেয়ে কিছুক্ষণ ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে পাশে রফিকদের বাসায় গেলেন। রফিক বাইরে থেকে এসে গোসল সেরে মাত্র খেতে বসেছিল। দীপুর মার প্রশ্নে ওর যেন গলায় খাবার আটকে গেল।
রফিকের কথা শুনে রফিকের মা খাওয়ারত অবস্থাতেই ওর চুলের মুঠি ধরে ঝাকুনি দিয়ে দুটো চড় কষে দিলেন - দীপুরে নিয়া গেছিলি ক্যান?
শুরু হল দীপুকে খোঁজা - তাদের খেলার মাঠ ও আশপাশটা খোঁজে বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করেও কোন হদিস পাওয়া গেলনা।
রইস মিঞা ভীষন দুর্ভাবনায় পড়লেন, ছেলেধরা নিয়ে যায়নি তো? মাঠের কিছু দূরে ত একটা বড় পুকুর আছে, ওটাতে.....আর ভাবতে পারলেন না। তাঁর সমস্ত চিন্তা-চেতনা আচ্ছন্ন করে একটা ভয়ঙ্কর অশুভ আশংকা তাঁকে প্রায় বিবশ করে ফেলল।
ইতিমধ্যে জাভেদ,রফিক ও আশিষের মা-বাবারা বিভিন্ন পরামর্শ দিতে লাগলেন - মাইকিং করা, পুকুরে জাল ফেলা এবং থানায় জিডি করা ইত্যাদি। এসব শুনে দীপুর মা যথারীতি কান্না জুড়ে দিলেন।
৪.
সন্ধ্যা প্রায় হয়ে এসেছে, দীপুর বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন সম্ভাব্য সব চেষ্টাই করা হউক। মাইকিং এর জন্য মাইক ভাড়া করতে যাবেন জাভেদ এর বাবা, থানায় জিডি করতে যাবেন রফিকের বাবা এবং তিনি ও আশিষের বাবা জেলেপাড়ায় গিয়ে পুকুরে জাল ফেলার ব্যবস্থা করবেন।
এক অজানা আশংকায় দীপুর বাবার মুখ মেঘাচ্ছন্ন আকাশের মত থমথম করছে।
সবাই যার যার দায়িত্ব নিয়ে বাসা থেকে বের হবেন, এমন সময় দেখেন জার্মানী ফেরত নাছের কোলে করে দীপুকে নিয়ে বাসায় ঢুকছেন। হাসতে হাসতে বললেন এখান থেকে প্রায় মাইল দুয়েক দূরে এক গ্রামে তিনি এক আত্মীয়ের বাসায় দেখা করতে গিয়ে দেখেন দীপু একটি গাছের নিচে কাঁদকাঁদ অবস্থায় বসে আছে।
রইস মিঞা যেন হঠাৎ করে একটি উথলে উঠা আবেগকে খুব কষ্টে সংবরণ করলেন। আর কারও নজরে পড়ুক বা না পড়ুক দীপু কিন্তু ঠিকই খেয়াল করেছে তার বাবার মুখের উপর থেকে একটি ভয়ংকর কালো মেঘ যেন হাওয়ায় উড়ে গেল।
১৭.১০.২০০৯
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই অক্টোবর, ২০০৯ রাত ১:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


