somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শব্দদের ছুটি । সত্য ঘটনা অবলম্বনে মানবিক গল্প ।

২৮ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



নিয়ন সাইনটার আলো নিভে গেল।

কাঁচের ওপাশে তখনও শহর ব্যস্ত। গাড়ি চলছে। দূর থেকে মাঝে মাঝে হর্নের শব্দও আসছে। অথচ রেস্তোরাঁর ভেতরটা অদ্ভুত শান্ত।

টেক্সাসের মেসকিট শহরের নামকরা বার্গার শপ ‘দ্য গ্রিল জংশন’।

দরজায় আজ একটা কাঠের প্লেট ঝুলছে।

‘Private Event — Special Guest Only’

রেস্তোরাঁর ভেতরে সাধারণত এই সময়ে বেশ ভিড় থাকে। রান্নাঘর থেকে থালাবাসনের খটখট শব্দ আসে। ফ্রাইয়ারে তেল ফুটতে থাকে। ওয়েটাররা এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করে। কাউন্টারের টিল মেশিনের ক্যাশ ড্রয়ার কিছুক্ষণ পরপর খুলে আবার বন্ধ হয়।

আজ কিছুই হচ্ছে না।

রেস্তোরাঁর মালিক ডেভিড সকল কর্মচারীদের আগেই বলে দিয়েছে—

আজ বড় কোনো ফ্রাইয়ার চালানো যাবে না। চামচ কিংবা খুন্তি ভুল করেও ধাতব টেবিলে ঠোকানো যাবে না। হাঁটার সময়ও সাবধান থাকতে হবে। এমনকি জুতোর তলা যেন মেঝেতে ঘষা খেয়ে শব্দ না করে।

কারণ আজ তাদের একজন বিশেষ অতিথি আসবে।

তার নাম লুকাস।

বয়স মাত্র নয় বছর।

লুকাসের পৃথিবীটা আর দশটা শিশুর পৃথিবীর মতো নয়।

সে অটিজমে আক্রান্ত। তীব্র শব্দ তার কাছে শুধু শব্দ নয়। অন্য মানুষের কাছে যে শব্দ খুব স্বাভাবিক, লুকাসের কাছে সেটাই কখনো কখনো অসহনীয় হয়ে ওঠে। মনে হয়, ধারালো কাঁচের টুকরো এসে তার মাথার ভেতর বিঁধছে।

একটা বার্গার শপের কাউন্টারের শব্দ, পাশের টেবিলে কারও জোরে হেসে ওঠা কিংবা বাইরে হঠাৎ বেজে ওঠা গাড়ির হর্ন—এমন সাধারণ কিছুই তাকে মুহূর্তের মধ্যে প্যানিক অ্যাটাকের গভীরে ঠেলে দিতে পারে।

তাই রেস্তোরাঁয় যাওয়া তার জন্য সহজ কোনো ব্যাপার নয়।

কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে লুকাসের একটা বায়না।

সে রেস্তোরাঁয় বসে বার্গার খাবে।

আর পাঁচটা মানুষের মতো।

ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে বসে ডেলিভারির বাক্স খুলে বার্গার খেতে তার আর ভালো লাগে না। সে চায় রেস্তোরাঁর টেবিলে বসতে। সামনে গরম গরম বার্গার থাকবে। পাশে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই থাকবে।

খুব সাধারণ একটা ইচ্ছা।

অথচ লুকাসের জন্য সেই সাধারণ ইচ্ছাটাই ছিল অনেক বড় একটা স্বপ্ন।

তার মা আমান্ডা অনেক জায়গায় চেষ্টা করেছেন। শেষ চেষ্টা হিসেবে একদিন তিনি ফোন করলেন ‘দ্য গ্রিল জংশন’-এর মালিক ডেভিডকে।

ফোন করার সময় তিনি ধরেই নিয়েছিলেন, উত্তরটা হবে—না।

কারণ একজন শিশুর জন্য পুরো একটা ব্যস্ত রেস্তোরাঁকে কয়েক ঘণ্টা নীরব করে রাখা খুব সহজ সিদ্ধান্ত নয়।

আমান্ডা ছেলের সমস্যার কথা বললেন। কেন সে সাধারণ পরিবেশে রেস্তোরাঁয় বসতে পারে না, সেটাও বোঝালেন।

সব শুনে ডেভিড কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর শুধু একটা প্রশ্ন করলেন,

“লুকাসের প্রিয় বার্গার কোনটা?”

আমান্ডা হয়তো এমন প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না।

বিকেল পাঁচটা বাজার ঠিক দুই মিনিট আগে 'দ্য গ্রিল জংশন' রেস্তোরাঁর কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল লুকাস।

তার দুই হাত শক্ত করে কানের ওপর চেপে ধরা।

চোখ দুটো একটু বড় বড়।

সেখানে ভয় আছে।

আবার কৌতূহলও আছে।

হয়তো সে মনে মনে অপেক্ষা করছে—এই বুঝি কোথাও একটা প্লেট পড়ে গেল। এই বুঝি রান্নাঘর থেকে বিকট কোনো শব্দ এল। কিংবা হঠাৎ কেউ জোরে হেসে উঠল।

কিন্তু কিছুই হলো না।

লুকাস দরজার কাছেই থেমে গেল।

রেস্তোরাঁটা নীরব।

পুরো ঘরে হলদেটে মৃদু আলো। কোনো উচ্চ শব্দ নেই। কোনো কোলাহল নেই।

মনে হচ্ছে, কেউ যেন হঠাৎ পৃথিবীর সমস্ত শব্দের ভলিউম কমিয়ে দিয়েছে।

ওয়েটার মার্ক এগিয়ে এল।

তার মুখে চওড়া হাসি। কিন্তু সেই হাসিরও কোনো শব্দ নেই। সে হাতের ইশারায় নীরব ভাষায় লুকাসকে স্বাগত জানাল। তারপর খুব নিচু, প্রায় ফিসফিস করা কণ্ঠে বলল,

“ওয়েলকাম, চ্যাম্প! তোমার টেবিল রেডি।”

লুকাস কিছুক্ষণ মার্কের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর খুব ধীরে ধীরে কান থেকে হাত দুটো নামিয়ে নিল।

সম্ভবত তখনও তার বিশ্বাস হচ্ছিল না।

সে চারদিকে তাকাল।

এত বড় একটা রেস্তোরাঁ।

এতগুলো টেবিল।

এতগুলো চেয়ার।

অথচ কোনো মানুষ কথা বলছে না। কেউ জোরে হাঁটছে না। কোথাও থালাবাসনের শব্দ নেই। শুধু তার জন্য পুরো জায়গাটা যেন থমকে আছে।

কিছুক্ষণ পর তার সামনে কাঁচের প্লেটে একটি গরম চিজবার্গার আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই রাখা হলো।

লুকাস বার্গারটার দিকে তাকাল।

তারপর মায়ের দিকে তাকাল।

তার মুখে ধীরে ধীরে একটা হাসি ফুটে উঠল।

খুব সাধারণ একটা হাসি।

কিন্তু আমান্ডার কাছে সেই হাসির মূল্য হয়তো পৃথিবীর অনেক বড় কিছুর চেয়েও বেশি।

লুকাস বার্গারে প্রথম কামড় দিল।

দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন ডেভিড।

শেফরাও দাঁড়িয়ে আছেন। ক্লিনাররাও আছেন। সবাই নিজেদের মধ্যে খুব নিচু স্বরে কথা বলছেন। একজন কর্মী পাশের একটা টেবিল পরিষ্কার করছিলেন। কাপড়টা তিনি এত ধীরে টেবিলের ওপর দিয়ে টেনে নিচ্ছিলেন, যেন সামান্য একটা ঘষার শব্দও লুকাসের এই মুহূর্তটা নষ্ট করে দিতে না পারে।

বার্গার খেতে খেতে একসময় লুকাস মায়ের দিকে তাকাল।

আমান্ডা হাসছেন।

কিন্তু তার চোখের কোণ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।

লুকাস হয়তো বুঝতে পারেনি তার মা কেন কাঁদছেন। মায়েদের কিছু কান্না সন্তানদের বোঝার দরকারও হয় না। গত নয় বছরে আমান্ডা হয়তো এমন একটা মুহূর্তের জন্যই অপেক্ষা করেছিলেন।

মাত্র এক ঘণ্টা।

একটা নীরব রেস্তোরাঁ।

একটা বার্গার।

কিছু ফ্রেঞ্চ ফ্রাই।

আর তার নয় বছরের ছেলেটা অন্য সবার মতো একটা টেবিলে বসে নিশ্চিন্তে খাবার খাচ্ছে।

অন্যদের কাছে ঘটনাটা খুব ছোট। কিন্তু একজন মায়ের কাছে এটা হয়তো স্বাভাবিক জীবনের এক টুকরো ছবি।

সেদিন ‘দ্য গ্রিল জংশন’ প্রায় দুই ঘণ্টার ব্যবসা হারিয়েছিল।

কয়েকজন ক্রেতাকে ফিরিয়ে দিতে হয়েছিল। ক্যাশ ড্রয়ারও অন্য দিনের মতো বারবার খোলেনি। হিসাবের খাতায় হয়তো দিনটা খুব লাভের ছিল না।

কিন্তু সব লাভের হিসাব টাকায় করা যায় না।

কিছু লাভ জমা হয় মানুষের মনে।

একজন নয় বছরের শিশু সেদিন প্রথমবারের মতো বুঝেছিল—পৃথিবীটা সব সময় তাকে নিজের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বাধ্য করবে না। কখনো কখনো পৃথিবীও তার জন্য একটু বদলে যেতে পারে।

একটু ধীরে চলতে পারে।

একটু চুপ করে থাকতে পারে।

শুধু তাকে আপন করে নেওয়ার জন্য।

সেদিন টেক্সাসের মেসকিট শহরের ছোট্ট একটা বার্গার শপে ঠিক সেটাই ঘটেছিল।

দুই ঘণ্টার ব্যবসার বদলে তারা একজন শিশুকে দিয়েছিল স্বাভাবিক জীবনের এক ঘণ্টা।

আর হয়তো অজান্তেই তৈরি করেছিল মানবতার এমন একটি গল্প, যার দাম কোনো ক্যাশ মেশিনে হিসাব করা যায় না।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০৯
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ভারত কেন মক্কা চুক্তি নিয়ে শ্বাসকষ্টে ভুগছে?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২৭ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:২৭


সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে চলতি মাসে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি যা মক্কা চুক্তি নামে পরিচিত। সবেমাত্র এতে বাংলাদেশকে যুক্ত করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। যা এখনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডানপন্থীদের তোয়াজ বা মক্কা প্যাক্টে ঢোকার আগ্রহ দ্রুতই বুমেরাং হতে পারে বিএনপি সরকারের জন্য

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ২৭ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৮



জামাত-এনসিপিকে 'বিরোধী দল হিসেবে' হাতে রাখতে বা আওয়ামী লীগের ফিরে আসাকে ঠেকাতে জামাত-এনসিপি বা এদের মতো ডা*নপন্থীদের দাবি-দাওয়াকে খুব বেশি প্রাধান্য দিলে সেটা বুমেরাং হয়ে দেখা দেবে বিএনপি সরকারের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মক্কাহ চুক্তি কি ?

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৭ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪৯



মক্কাহ চুক্তি লেখা হয়েছে আরবি ভাষায়। বাংলাদেশের পত্র পত্রিকা - পূর্ণাঙ্গ “মক্কাহ চুক্তি” বাংলা অনুবাদ করে প্রকাশ করছে না কেনো ? দেশের মানুষ কিভাবে জানবে এই চুক্তিতে কি লেখা... ...বাকিটুকু পড়ুন

চিঠির সঙ্গে আমার এক অন্যরকম সম্পর্ক

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২৮ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৭:৫৩



চিঠির সঙ্গে আমার এক অন্যরকম সম্পর্ক

উনি আমাদের ভবেরচর পোস্ট অফিসের পোস্টমাস্টার। অত্যন্ত ভালো মনের একজন মানুষ। তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়টা শুধু পোস্ট অফিসের প্রয়োজনের কারণে নয়; বরং দীর্ঘদিনের এক আন্তরিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

নীরব আত্মপক্ষ।

লিখেছেন রাজা সরকার, ২৮ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:৪০

নীরব আত্মপক্ষ।

স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র আন্দোলনের মাসুল বাঙালি হিন্দুকে গুণে গুণে দিতে হয়েছিল ব্রিটিশকে । বাকিটা মুসলিম লীগ ও নেহেরুইয়ান কংগ্রেস মিলে যা করার করে গেছে। এবং পরবর্তীকাল থেকে মুসলিম... ...বাকিটুকু পড়ুন

×