
হাসিনার পতনের পরে খুব করে চেয়েছিলাম বাংলাদেশের ইসলামীপন্থী দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করুক। কারণ, রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের দুর্দশার যদি একটি কারণ উল্লেখ করতে বলা হয়, আমার হিসেবে সেটি হল “দুর্নীতি”! আর এই দুর্নীতিই হল বাকী সব সমস্যার মূল।
এখন এই দুর্নীতি দূর করতে হলে কি করতে হবে? প্রথমতঃ মানুষ হিসেবে অবশ্যই আমাদের সৎ হতে হবে। কিন্তু, পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়ভাবে আইনের প্রয়োগ থাকতে হবে। রাষ্ট্রকে এমন ব্যবস্থা কায়েম করতে হবে যেখানে জবাবদিহিতা থাকবে, দুর্নীতি করলে সেটা ধরা পড়ার ব্যবস্থা থাকবে এবং শাস্তি নিশ্চিত হবে। স্বাধীনতার পর থেকে মোটাদাগে আমাদের সরকারগুলো এটি করতে ব্যর্থ হয়েছে। যারা একটু দেশ বিদেশ ঘুরেছেন, তারা সবাই জানেন এবং compare করতে পারেন যে ৯০% মুসলমানদের এই দেশের মানুষ কি পরিমাণ অসৎ এবং দুর্নীতিপরায়ন!
বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার প্রসারে কওমী ঘরানার ওলামা হযরতদের অবদান অনস্বীকার্য। আমাদের মসজিদ, মাদ্রাসাসহ অধিকাংশ দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলোতে আমরা ওনাদের উপস্থিতি দেখতে পাই। আমরা ওনাদের কাছ থেকে দ্বীন শিখি, সেভাবে নিজে এবং পরিবারগুলোকে চালানোর চেষ্টা করি। আমরা আমাদের ছেলেদের উপদেশ দিয়ে মসজিদে নিয়ে যাই, জামাতের সাথে নামাজ পড়তে, মসজিদে আলোচনা শুনে দ্বীন শিখতে। মক্তবে আমাদের ছেলে-মেয়েরা কুরআন শিখে। কেউ নতুন বাড়ির কাজ শুরু করলে মসজিদের ইমাম সাহেবকে ডেকে দোয়া পড়ান। মুসলমান মারা গেলে ইমাম সাহেব জানাযার নামাজ পড়ান। লাশ সামনে রেখে তিনি আমাদের নসিহত করেন কুরআন এবং রাসূল (সঃ) এর সুন্নাহর আলোকে। কওমী ওলামাগণ আমাদের কাছে খুবই সম্মানিত এবং তারা আমাদের জীবনের সাথে খুব ঘনিষ্টভাবেই প্রাসংগিক।
কিন্তু, একটা কথা কি ভেবে দেখেছেন, এই যে দেশ জুড়ে এত অসংখ্য মাদ্রাসা যেখান থেকে দ্বীন শিখে ওলামাগণ বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে আল্লাহর কথা, রাসূল (সঃ) এর সুন্নাহ ছড়িয়ে দিচ্ছেন, তারপরেও দেশের আপামর জনগণ কেন এত অসৎ? কেন নামাজীর সংখ্যা এত কম? কেন নামাজীদের মধ্যেও ঘুষখোর, সুদখোর এবং দুর্নীতিবাজ পাওয়া যায়? দেশের ধনী লোক যেমন, তেমনি একেবারে খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যেও সততা, নীতি, নৈতিকতা কেন এত কম?
তারমানে, শুধু ওয়াজ নসিহতই দ্বীন কায়েমের জন্য যথেষ্ট নয়। এজন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকেও কাঠামোগত পরিবর্তন এবং কুরআন এবং সুন্নাহ ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা প্রয়োজন। এই জায়গায় আমাদের কওমী ঘরানার ওলামাদের অবদান বা প্রচেষ্টা আসলে কতটুকু? গত ১০০ বছরের কথা যদি বাদও দেই, ১৯৪৭ সালে যখন ধর্মের ভিত্তিতে মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান গঠিৎ হল, সেই রাষ্ট্রে শাসন ব্যবস্থায় যেন আল্লাহর হুকুম আহকাম অনুসরণ করা হয়, সেজন্য আমাদের কওমী ঘরানার ওলামাদের প্রচেষ্টাটা কি ছিল? প্রচেষ্টা থেকে থাকলে সেটা কতটুকু কার্যকর ছিল? আমি জানি না, কেউ জানলে আমাকে জানাবেন।
সেই প্রচেষ্টা যদি কোন কার্যকর পন্থায় হয়েও থাকে, তাহলে কেন আজকে আমাদের সমাজের এই অবস্থা? ৯০% মুসলমানদের আ’মল আখলাখের এত বাজে অবস্থা কেন? কোন দিনতো দেখলাম না যে কওমী ওলামা এবং তলেবে ইলমরা একটা আন্দোলনের ডাক দিল যে ভূমি অফিসে গিয়ে অবস্থান ধর্মঘট করব এবং যেন ঘুষ ছাড়া জমি রেজিস্ট্রি হয় সেটা আদায় করে ছাড়ব! কোন দিনতো দেখলাম না যে ওনারা সরকারি প্রতিষ্ঠানে যে দুর্নীতি হয়, সেটা বন্ধে সরকারের সচিবালয়ে গিয়ে আন্দোলনের করার জন্য নিজেরা গিয়েছে এবং দেশের আপামর মুসলমানদের সেই আন্দোলনে শরিক হওয়ার জন্য ডাক দিয়েছে? রাসূল (সঃ) তো মদিনাতে একটি ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করে দেখিয়েছেন, সেখানে কি সবাই দুর্নীতিগ্রস্ত ছিল? তাহলে সেই রাষ্ট্র কায়েমের জন্য কওমী ওলামাদের দিক নির্দেশনা কই?
আমার ব্যক্তিগত মূল্যায়ন হল, বাংলাদেশের কওমী ওলামাগণের দ্বীনি ইলম থাকলেও আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্যতা নেই! কারণ, তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা সেই বিষয় বা জ্ঞানগুলো cover করে না। আর এ কারণে শত বছর পেরোলেও রাষ্ট্রে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা কায়েমে তাদের কোন উল্লেখযোগ্য তৎপরতা নেই। হেফাজতে ইসলামের মত এক অদ্ভূত অরাজনৈতিক সংগঠন কওমী ওলামাদের নেতৃত্বভিত্তিক ৭টি দলকে ডেকেছে যেন তারা রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হয় এবং জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট না বাঁধে! অথচ রাজনৈতিক দল হিসেবে দেশের ১% মানুষের কাছেও এই দলগুলোর কোন গ্রহণযোগ্যতা আছে কিনা সেটা নিয়ে তাদের কোন গবেষণা আছে কিনা সন্দেহ! ঐ ৭ টা কওমীপন্থী দলের নাম এই দেশের কয়জন লোক জানে?? আর মুসলমানতো ঐক্যবদ্ধ থাকবে দ্বীনের প্রশ্নে। তাহলে দেশে কওমীপন্থীদের এত এত দল কেন?
কিন্তু, একটা বড় অংশ কওমী ওলামা এবং ছাত্রদের বিশাল অর্জন হল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিরোধিতা করতে পারা! অথচ তাদের অনুধাবনে নেই যে বাংলাদেশের প্রায় ৪০% মানুষ গত নির্বাচনে চেয়েছে যে জামায়াত সরকার গঠন করুক! জামায়াত যে রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছে, সেটা নিয়ে তাদের কোন গবেষণা নেই! এরা জানে না যে তারা যেই সেকুল্যার দলের সাথে গিয়ে মাখামাখি করে আর জামায়াতকে ক্ষমতায় যেতে দেয় নাই বলে নিজেদের সাফল্য জাহির করে, সেই সেকুল্যারদের কাছে কওমী ওলামাদের মূল্য টিস্যু পেপারের চেয়ে বেশী নয়! নতুন ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর নিয়োগ তার প্রমাণ! জমিয়ত নেতার একটা সাক্ষাৎকার শুনেছিলাম। সস্তা কথাবার্তায় পরিপূর্ণ। আফসোস হয়, এনারাই বড় বড় আলেম আর এনাদের কাছ থেকেই আমরা দ্বীন শিখি!
২৪ পরবর্তী বাস্তবতায় কওমী ওলামাদের উচিৎ ছিল জামায়াতের সাথে এক হয়ে কাজ করা। জামায়াতের সাংগঠনিক এবং অর্থনৈতিক মেরুদন্ডকে ইসলামের জন্য ব্যবহার করা। মওদুদী মওদুদী জিকির বন্ধ করা। এই বাংলাদেশে মওদুদী সাহেবের ঠিক কি প্রাসংগিকতা আছে?? মওদুদী সাহেবের আকিদা বিশ্বাসে যদি সমস্যা থাকে, তাহলে কওমী ওলামাগণ চীন মৈত্রি সম্মেলন কেন্দ্রে ৭ দিনব্যাপী কর্মশালার আয়োজন করুন, সকল টিভি চ্যানেলে লাইভ সম্প্রচার করুন। আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান নেতৃত্ব দলিল ভিত্তিক প্রমাণ পেলে অবশ্যই মওদুদী সাহেবের সমস্যাযুক্ত (যদি থেকে থাকে) বক্তব্যগুলো প্রত্যাখ্যান করবেন। এই একই উদ্যোগ বর্তমান জামায়াতের নেতৃত্বও নিতে পারে। কিন্তু, তা না করে সারা দিন মওদুদী সাহেবের ভ্রান্ত আকিদার জিকির তুলে যাচ্ছেন আমাদের কওমী ওলামারা, যেটা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যের। অথচ তারা নির্দ্বিধায় এক দল প্রতারককে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন!
সূরা নিসা’র ৮৫ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ সুবহানা তা’লা বলেছেন,
“যে লোক সৎকাজের জন্য কোন সুপারিশ করবে, তা থেকে সেও একটি অংশ পাবে। আর যে লোক সুপারিশ করবে মন্দ কাজের জন্যে সে তার বোঝারও একটি অংশ পাবে। বস্তুতঃ আল্লাহ সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশীল। “
আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, যেসব ওলামাগণ ইনিয়ে বিনিয়ে প্রতারক, মিথ্যাবাদী এবং অসৎ লোকদের সমর্থন দিয়েছেন এবং দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের সাথে উপরোক্ত আয়াতের নিরিখে আল্লাহ সুবহানাতা’লার আচরণ কেমন হবে??
আমরা সবাই আল্লাহর কাছে দোয়া করি যেন বাংলাদেশের মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ হয় এবং আল্লাহ যেন আমাদের ওপর এমন শাসক নিযুক্ত করে দেন, যারা আল্লাহর হুকুম এবং রাসূল (সঃ) এর সুন্নাহ অনুসারে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। আমিন।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:২১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


