somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অন্য ভুবন

০৩ রা মে, ২০১৫ সন্ধ্যা ৭:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সামান্য একটু কষ্ট জীবনের জন্য অনেক বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। কেউ কেউ সারাজীবন কষ্ট করেও তার জীবনের পরিবর্তন ঘটাতে পারে না। আতিক খুব গরিব ঘরের ছেলে না হলেও জীবনে অভাবের অনুভূতি তাকে সবসময়ই করে আসতে হচ্ছে। আতিকের বাবা একজন ব্যবসায়ী, তিন মেয়ে তিন ছেলের মধ্যে আতিক সবার ছোট। বাবা মা ও ভাইবোনের সবার আদরের হলেও তার মাঝে সবসময় একটা শূন্যতা রয়েই গেছে। জারিফের সাথে আতিকের বন্ধুত্ব ল্যাংটা কাল থেকে। জারিফ খুবই শান্ত প্রাকৃতিক মানুষ। কোন সাত পাঁচের মধ্যে নেই। আতিক ইন্টার পাশ করার পর আর পড়ালেখা করতে পারেনি, কারণ বাবা তখন ভীষণ অসুস্থ, মায়ের ডায়াবেটিস সবসময় হাই লেভেলে থাকছে, বড় দুই ভাই বিয়ে করে আলাদা সংসার পেতেছে। বোনেরা যে যার শশুরবাড়িতে। শ্যামলী বাস স্ট্যান্ড থেকে একটু ভিতরে আতিকের বাবা মসলেম উদ্দিনের মুদি দোকান। প্রায় ৪৫ বছর ধরে তিনি এই দোকানটাকে আগলে রেখেছেন তার সমস্ত শক্তি দিয়ে। দোকানের পেছনেই একটা দোতলা বাড়ি যেটা মাত্র তিন কাঠা জমির উপর দাঁড়িয়ে আছে। আতিকের দাদা ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের একজন কেরানি, সেই সুবাদে ঢাকায় তিনি বেশ কিছু জায়গা কিনেছিলেন। বউয়ের চিকিৎসা আর নিজের অসুস্থতার কারণে শেষ বয়সে এসে সব জমি বিক্রি করতে করতে অবশিষ্ট ছিল এই তিন কাঠা জমি। যখন আতিকের দাদা মারা যায় তখন মসলেম উদ্দিন মানে আতিকের বাবার বয়স ২৩ বছর মাত্র। বড় দুইটা বোন তারা ছিলো শশুরবাড়িতে। বাবার মৃত্যু সংবাদ শুনে তারা এসেছিলো তাকে দেখতে, মসলেম কে দুই বোন তাদের চোখের মণি বলে জানতো, তাইতো তাদের ভাগের সম্পদ সবটাই আতিকের বাবার নামে লিখে দেয়। বাবার মায়ের মৃত্যুর পর মসলেম উদ্দিন অনেক কষ্টে বাড়ির একটা রুমকেই দোকানে রুপ দেন। তারপর আস্তে আস্তে ব্যবসা বড় করতে থাকে, একা একা চলতে পার ছিলো না বলে বোনেরা মিলে আমিনা বেগম এর সাথে তাকে বিয়ে করিয়ে দেয়। এরপর টোনাটুনি সংসারে একে একে ছয়টি সন্তান আসে। মসলেম উদ্দিন এতো বড় একটা সংসার চালালেও ছেলেমেয়ে সবগুলোকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন! শুধু মাত্র আতিকের ভাগ্যটাই খারাপ, বড় দুই ভাই আলাদা সংসার করার কারণে মা বাবা দায়িত্ব আতিকের উপরেই পড়েছে। বাবার দোকান কে সেই এখন পরিচালনা করে।

জারিফ ও আতিক একি স্কুল কলেজে পড়েছে। জারিফ এবার ঢাকা বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইনাল বর্ষের ছাত্র, দুই মাস পরেই কোন একটা প্রতিষ্ঠানে তার ইন্টার্নি করতে হবে! বিশ্ববিদ্যালয়ে এই চার বছরে কারও সাথেই কার ভালো সম্পর্ক করতে পারেনি, তবে ছাত্র হিসেবে খুবই মেধাবী সে! কারও সাথে বন্ধুত্ব করবেই বা কিভাবে? কেননা সারাদিন তার মন পরে থাকে প্রাণের বন্ধু আতিকের কাছে, আতিক জারিফ কে ভালোবাসে ঠিকই কিন্তু সে কখনো জারিফের জন্য কোন প্রকার চিন্তা করে না। আতিকের মনে একটাই চিন্তা কাজ করে সেটা হলো নিজের পজিশন কিভাবে বদলানো যায়? মুদিখানা দোকান কে কিভাবে সুপারসপ বানানো যায়? জারিফ পড়ালেখার পাশাপাশি যতটুকু সময় পায় তার পুরোটাই আতিকের দোকানে ব্যয় করে। দুই বন্ধু মিলে কে কি কিভাবে করবে এইসব নিয়ে আলোচনা করে, দুজন দুজনকে পরামর্শ দেয় কিভাবে কাজ করলে সফলতার সাথে সামনে এগোনো যাবে। জারিফ খুব শান্ত স্বভাবের তাই ও শুধু আতিকের কথা গুলো মন দিয়ে শোনে আর ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, আতিক মাঝে মাঝে খুব বিব্রত বোধ করে কেননা এমন সুদর্শন একটি ছেলে, যতোই বন্ধু হোক এক ধ্যানে এভাবে তাকিয়ে থাকলে কার ভালো লাগে! আতিক একটু রসিক স্বভাবেরও বটে! জারিফ যখন আতিকের দিকে পালকহীন তাকিয়ে থাকে ও তখন খোঁচা মেরে বলে, "কি রে দোস্তো আমি কি আগের চেয়ে বেশি সুন্দর হয়ে গেছি!" জারিফ সরম পেয়ে চোখ নিচে নামিয়ে নিয়ে বলে, "আমি তোর সৌন্দর্য দেখছি না দোস্তো! দেখছি তোর ভবিষ্যৎ!" তারপর দুই বন্ধু হাসাহাসি করতে থাকে।

সময়ের সাথে সাথে বদলে যায় সব, সেই সাথে বদলে যায় মানুষের চিন্তা ভাবনার, বছরের মধ্যে আতিকের বাবা মা দুজনেই মারা যায়, মৃত্যুর আগে তাদের জন্য আতিকের পুরো সঞ্চয় শেষ করেও ব্যাংক থেকে ও পরিচিত আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে ধার নিতে হয়, বড় দুই ভাই, তিনটা বোনের জামাই কেউই তার পাশে এসে দাঁড়ায় না! নিজের ছায়ার মতো সবসময় পাশে লেগে থাকে জারিফ, জারিফের মা নেই, বাবার টাকা পয়সায় অভাব নেই, ছয়তলা বিল্ডিং ভাড়া দিয়ে চলে তাদের, সব খরচ বাদেও প্রতি মাসে লক্ষাধিক টাকা জমে জারিফের বাবার, আতিকের ব্যবসা আর আগের মতো নেই, দোকানের অবস্থা খুবই নাকাল, জারিফের সাথে আতিক আর আগের মতো মজা করে কথা বলে না, জারিফ ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে এখন সরকারি চাকুরি করছে, আতিকের প্রতি তার ভালোবাসা আগের থেকে আরও বেগতিক, আতিক মন মরা হয়ে থাকে বলে জারিফের চোখে সুখের ঘুম হারাম হয়ে গেছে! সেও আতিকের চেয়ে অধিক চিন্তায় থাকে কখন আতিকের হাসি মুখ দেখতে পাবে! অনেক ভেবে চিন্তে বের করে আতিকের দোকান থেকেই ওকে দাড় করাতে হবে, নতুন করে ব্যবসা শুরু করাতে হবে, যেভাবেই হোক ওকে আতিকের স্বপ্ন পুরনে পাশে থাকতেই হবে! ভাবনা মতো সে আতিকের সাথে আলোচনায় বসে, কতো টাকা পুজি হলে সে একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সফল হতে পারবে তার একটা পরিকল্পনা ছক তৈরি করে নেয়, যেহেতু জারিফ এখন কর্মজীবি তাই আত্মনির্ভরশীলতার উপর বাবার টাকা কাজে না লাগিয়ে নিজের চাকরির জামিনদারিতে ব্যাংক থেকে আতিকের জন্য লোন নিয়ে দেয়, আতিক নব উদ্দ্বমে দোকান সাজাতে থাকে, সাথে থাকে প্রাণের বন্ধু জারিফ! দুজনে মিলে দুই বছরের মধ্যে ব্যবাসাকে অনেক ভালো একটা পজিশনে নিয়ে যায়। বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার শক্তি দিয়ে গড়ে তোলে তাদের জীবনের অন্য ভুবন।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মে, ২০১৫ সন্ধ্যা ৭:২৩
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মুহাম্মদ আলি জিন্না

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:৩৫



১৮৭৬ সালে করাচিতে এক দুষ্ট বালকের জন্ম হয়।
এবং ৭৬ বছর বয়সে দীর্ঘদিন যক্ষা রোগে ভূগে- দেশ ভাগের পরের বছর মারা যান। এই দুষ্ট বালক'ই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা। নাম তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

"রিকন্সিলিয়েশান"....ইহা কি খায় নাকি মাথায় দেয়?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:০০



সত্যি সত্যিই তাদের সুযোগ ছিলো ২৫ শে মার্চ এর পর যাবতীয় অপকর্ম জনগণের কাছে স্বীকার পূর্বক,
/মুক্তিযুদ্ধে তাদের দ্বারা নৃশংসতার শিকার জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা,
/তাদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে এবং,
/সব... ...বাকিটুকু পড়ুন

সেরা লেখক

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৪৭



বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভালো লেখক এক কথায় - হুমায়ূন আহমেদ। হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস মধ্যাহ্ন বা দেয়াল - এর পাশাপাশি রাখার মতো বাংলাদেশে আর কোনো উপন্যাস আছে কিনা আমার জানা... ...বাকিটুকু পড়ুন

=ডায়াটে একদিনের খাবার=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:৫১

ডায়াটের প্রথম দিকে-একদিনের খাবার। বর্তমানে আমাদের দেহে রোগসুগের অভাব নাই। ডায়াবেটিস, প্রেসার, ক্যান্সারসহ নানাবিধ রোগ বলা নাই কওয়া নাই শরীরে এসে বাসা বাঁধে।

আর এসব রোগের একমাত্র কারণ আনহেলদি... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিদায় নানা পাটেকার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৫৭



৯০ দশকের শুরুর দিকের কথা, সারা দিনের ক্লান্তি নিয়ে যখন বাসভবনে ফিরেছি, রুটিন মাফিক গোসল খাওয়া দাওয়া করে ঘুমোবো কিন্তু টিভি অন করে দেখি একটি সিনেমা শুরু হচ্ছে -... ...বাকিটুকু পড়ুন

×