somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আসছে 'ভাষারাজনীতি'

৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




'ভাষারাজনীতি' বইটি দীর্ঘ চার বছর ধরে লিখছিলাম। বায়তুল মোকাররমের এই ইসলামী বইমেলায় বইটি রাহনুমা প্রকাশনী থেকে আসছে ইন শা আল্লাহ। বইয়ের কিছু কোটেশন পাঠকের জন্য শেয়ার করছি।


ভাষারাজনীতির কোটেশনগুলো

কেউ যদি ‘এছলাম’ লেখেন তবে কেউ লিখেন ‘স্বলাত’, ‘স্বলাহ’, ‘তাজউইদ’ ও ‘নাবাউই’। আর একাডেমি লিখে ‘জুমওয়াতুলবিদা’ ও ‘জাহান্নম’। এইসবের ভেতর দিয়েই বাংলা বাগধারা ও বাগভঙ্গির ভেতরে শিরক পেয়ে যান কেউ কেউ।

কেউ আবার খোদা, নামাজ, রোজা ইত্যাদি শব্দ নিয়ে উপস্থাপন করেন জোর আপত্তি। সেইসব আপত্তির জায়গা থেকেই ‘অসৎ শব্দে সর্বনাশ’ সিরিজ লিখতে শুরু করেন আমাদের ওমর আলী আশরাফ।
―কেন এই ভাষারাজনীতি

যে ‘ভিক্ষাবৃত্তি’ শব্দটা বিরোধীদের শব্দ ছিল, আজকাল মাদরাসায় পড়ুয়া এবং পড়া শেষ করা অনেকেই আত্মসমালোচনার নামে মাদরাসা-মসজিদের জন্য কালেকশনকে অবলীলায় বলছেন ‘ভিক্ষাবৃত্তি’। একটা শব্দ ক্রমাগত, নানাভাবে, নানামাত্রিক ব্যবহারে―সেই শব্দ যাদের বিপক্ষে; তারাও ব্যবহার করতে থাকে। ফলে তারা আত্মপ্রবঞ্চিত হতে হতে আত্মপরিচয়হীন হয়ে যায়। ভাষারাজনীতির এ-ও এক জটিল দিক। এই রাজনীতিটা ধরতে না পারলে নিজেই নিজের প্রতিপক্ষ হয়ে, নিজের সর্বনাশ করার জন্য যথেষ্ট।
―একটি শব্দ এবং আমাদের আজকের মনোজগৎ

কবি হাসান রোবায়েত যখন ইসলাম ধর্মীয় অনুষঙ্গ অথবা কুরআনের আয়াত ও নবিজির নাম কবিতায় প্রয়োগ করেন, কবিতা লেখেন ইসলামের মিথ ও বিষয় নিয়ে; তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর সেই কবিতার নিচে মন্তব্য করেন, ‘আমি ধর্মীয় কবিতা পড়ব না।’ কেউ মন্তব্য করেন, ‘বাংলায় এতো আরবি কেন?’ ফলত দেখা যায়―প্রান্তিকতার চর্চা সরবেই চালু থাকে বাংলা ভাষায়। বাংলা ভাষার চর্চায়। সাহিত্যে ও কবিতায়। মননে ও চিন্তায়। একটা অসুন্দর সর্বত্রই চলমান থাকে―ভাষার ইসলামিকরণ অথবা ভাষায় ইসলাম দূরীকরণের অন্যায্য ভাবনায়।
― শব্দের ধর্মপরিচয়

আরবরা বাংলাদেশকে বলেন ‘বানজালাদিশ’। মিশরকে বলেন, ‘মিসর’। মরক্কোকে বলেন ‘মারাকিশ’। জিব্রাল্টারকে বলেন ‘জাবালুত তারিক’। পাকিস্তানকে বলেন, ‘বাকিস্তান’। আলজেরিয়াকে বলেন ‘জাজায়ের’। তারা কাছাকাছি উচ্চারণের চেষ্টা করেন না। সাধারণত তাদের কেউ ‘নিজস্ব বানানের’ মতো নিজেই ইন্সটিটিউট বা একাডেমিয়া হয়ে বসেন না।
আবার ইংরেজরা মিশরকে ‘ইজিপ্ট’, হাদিসকে ‘হাদিথ’, ইউসুফকে ‘জোসেফ’, ইয়াকুবকে ‘জ্যাকব’, ইব্রাহিমকে ‘আব্রাহাম’, ভারতকে ‘ইন্ডিয়া’, ইবনে সিনাকে ‘আবে সীনা’ ইত্যাদি বানানে লিখে থাকে। এইটা তাদের ভাষার (এবং ধর্মীয় কিতাবাদিরও) নিজস্বতা। সেইখানে এইসব নিয়ে খুব একটা বিশৃঙ্খলা আছে এমন দেখা যায় না। তাদের লেখালেখিতে কখনোই আরবির নিকটতম উচ্চারণের প্রচেষ্টা দেখতে পাওয়া যায় না।
―বাংলায় আরবি শব্দের বানান


“তোমরা ‘খারেজিরা’ (এই শব্দ নিয়ে সামনে আলোচনা আসবে) কি হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলো না? ” আমি বললাম, ‘বলি তো’! তারা বলল, “হুজুর মানে যিনি হাজির। তো নবিজি তোমাদের সামনে হাজির না থাকলে তোমরা ‘হুজুর’ বলো কীভাবে? আমরা শুধু ‘ইয়া নবি সালাম আলাইকা’ বলে কেয়াম করলেই দোষ! নবিজি হাজির-নাজির বললেই দোষ! আর তোমাদের কোনো দোষ নাই!”

এরপর দীর্ঘ গালাগাল। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওরা ওদের মতো বাস ধরে চলে গেল।
―মাওলানা শায়খ উস্তাজ

ইদানীং আরেক দল তৈরি হয়েছে। তাদের কথা হলো, আলেমগণ কেন হালাল-হারামের কথা বলবে? সিদ্ধান্ত দেওয়ার অথরিটি তাদের কে দিয়েছে? তাদের মূল চাওয়া হলো, তাদের মন ও তাদের যুক্তি যে জিনিসকে ঠিক বলবে, আপনি কুরআন-সুন্নাহের আলোকে সেটার বিপরীত বলতে পারবেন না। সুদ হারাম। বাজিভিত্তিক খেলা হারাম। নারীর পর্দা ফরজ। ইসলামের সিদ্ধান্ত―বেপর্দা হওয়া হারাম। নারীদের জন্য পরপুরুষদের সামনে সবধরনের খেলা হারাম। এসব শরিয়তের সিদ্ধান্ত নাকি একজন আলেম দিতে পারবেন না। বলতে পারবেন না। বললেও বহু হেকমত ও ইশারা-ইঙ্গিতে বলতে হবে। আর যদি আপনি ঈমান ও তাকওয়ার তাগিদে বলেন, তাহলে আপনি হবেন ধর্মান্ধ। আপনাকে ধর্ম সম্পর্কে মূর্খ বলতেও ওদের মুখে বাঁধবে না।
―বাকস্বাধীনতা ও মুসলমান

ফলে আমরা দেখি―একজন ‘বিসমিল্লাহর শপথ’ দিয়ে ভোট চান তো আরেকজন ‘তসবিহ হাতে ও হিজাব মাথায়’ ভোট চান। কেউ গেরুয়া কাপড় পরে ভোট চান। কেউ আবার সেক্যুলারিজমের মন্ত্র জপে ভোট চান। কেউ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মূলা ঝুলান তো কেউ সংখ্যাগরিষ্ঠের শ্লোগান তুলেন। রাজনীতি হয়। উন্নয়ন হয়। বাণিজ্য হয়। শিক্ষা খাতে বাজেট বাড়ে। শিক্ষার হার বাড়ে। পোশাকি ভদ্রলোকের বিচরণে দেশ-সমাজের চিকনাই বাড়ে। কমে যায় শুধু সম্প্রীতি। এইসবের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে স্বাস্থ্যবান হতে থাকে বিভাজন, পলিটিক্স, দমন আর শোষণ।
―ক্ল্যাশ অব ক্লাস

ভাষা এমন এক জিনিস, দেখবেন একই বক্তব্য; কিন্তু উপস্থাপনা ও এপ্রোচের কারণে পুরো একশো আশি ডিগ্রি উলটো অর্থ দিচ্ছে। ফলে বয়ানের ভাষাটা হওয়া উচিত পরিশীলিত। আদবপূর্ণ বা শিষ্টাচারে পূর্ণ। ভাষিক শিষ্টাচার সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। শৈশবে যখন আমরা বলতাম⸻‘আব্বা বাজারে গেছে।’ তখন মা অথবা ফুফু সংশোধন করে বলতে বলতেন⸻‘আব্বা বাজারে গেছুইন’। এটা বাংলা ভাষার একটা মৌলিক এবং গুরুত্বপূর্ণ বাকভঙ্গি।

আরবি ও ইংরেজিতে আপনি, তিনি নেই। বাংলায় আছে। ফলে বাংলার ক্রিয়াপদে আপনি, তিনি ও সম্মানিত ব্যক্তির জন্য ব্যবহৃত ক্রিয়াপদে ‘এসেছে’ না বলে বলতে হয় ‘এসেছেন’; ‘বলেছে’র পরিবর্তে ‘বলেছেন’; ‘দেখছে’ হয় ‘দেখছেন’; ‘গেছে’র জায়গায় হবে ‘গেছেন’। এই সময়ে প্রায়শই বক্তাদের ভাষায় এই শ্রদ্ধাজ্ঞাপক সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের ব্যবহারে দীনতা দেখা যায়।
―ওয়ায়েজের ভাষা

তখন শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পা রেখেছি। সুনামগঞ্জের বিশম্ভরপুর উপজেলায় আব্বার চাকরির সুবাদে পড়তে গেছি। লজিং বাড়ির অদূরে এক রাতে শুনি মিলাদ মাহফিল। রাত গভীর হলো। মাইকের শব্দে বারবার ঘুম ভাঙছে। হঠাৎই শুনি বক্তা বলছেন⸻‘যারা দেওবন্দি, যারা দেওবন্দির লগে আত্মীয়তা করে, যারা দেওবন্দিদের ঘরে খায়, দেওবন্দি মারা গেলে তার কবরের ঘাস যে গাইয়ে (গাভি) খায়, সেই গাইয়ের দুধ যে খায়, সে-ও কাফির।’ হয়রান হয়ে পরের দিন আব্বার কাছে এসে ঘটনা বললাম। আব্বা বললেন, ‘এইসব শুনলি কেন? এইগুলো ফিতনা। আবার কোনো দিন এইরকম হলে রাতে আমার কাছে চলে আসবি।’
― মিলাদুন্নবী : সীরাতুন্নবী

এইভাবেই প্রতিটি ঘটনায়, প্রতিটি ঐক্যের সম্ভাবনায়, প্রতিটি জুলুমের পরে মজলুমের পক্ষে জনতাকে ও বিচারের দাবিকে নানা রকমের ট্যাগের বদৌলতে বিভাজিত করে দেওয়া হয়। ফলে ‘সেক্যুলার’ নির্যাতিত ও মজলুম হলে ধার্মিক নীরব থাকে। ‘ধার্মিক’ নির্যাতিত ও মজলুম হলে সেক্যুলার নীরব থাকে। ‘জামাত-বিএনপি’ নির্যাতিত হলে আওয়ামী লীগ নীরব থাকে। ‘আওয়ামী লীগ’ নির্যাতিত হলে জামাত-বিএনপি নীরব থাকে। ‘মোল্লা’ নির্যাতিত হলে মাস্টার নীরব। ‘মাস্টার’ নির্যাতিত হলে মোল্লা নীরব। ‘ব্রাহ্মণের’ বিপদে হুজুর নাই; আবার ‘হুজুরের’ বিপদেও ব্রাহ্মণ নাই। এইগুলো খুব সাধারণ হিসাব। স্থ‚ল দর্শন।
― ট্যাগিং : বিভাজন ও দলবাজির স্বরূপ

সেই ভাই বললেন⸻“তুমি কি খেয়াল করেছ, ফখরুদ্দীন তার বক্তব্যে কতটা সচেতনভাবে ‘ভাবমূর্তি’ শব্দটা এড়িয়ে ‘ভাবমর্যাদা’ শব্দ ব্যবহার করেছেন?” আমি বললাম, ‘আসলেই খেয়াল করিনি।’ সেই ভাই বললেন, ‘শোনো, দেশের শীর্ষ ক্ষমতায় গিয়ে একজন মানুষ; যিনি সাধারণ শিক্ষিত, তিনি এইরকম একটা আদর্শিক শব্দ তার ভাষণে বলবেন⸻এইটা কোনো কোইন্সিডেন্ট হতে পারে না। এইটা সংগঠনের দীর্ঘ পরিশ্রমের ফসল। তিনি আমাদের লোক। আশা করি খুব দ্রæতই দেশের একটা বিরাট ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। ইসলামি আন্দোলনের জন্য বিস্তৃত ময়দান আমরা পাব। আমরা আসলে ক্ষমতায় যাওয়ার আগে ক্ষমতার ভেতরের জায়গাটাকে তৈরি করি।’
―শব্দের আদর্শ

লাজনাতুত তালাবা
মাওলানা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ রাহ., মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ, মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী রাহ. এবং আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া প্রমুখের নেতৃত্বে ‘লাজনাতুত তালাবা’ শিল্পসাহিত্য, বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই ও ভাষাচর্চার একটি অঙ্গন হয়ে উঠেছিল। সেই লাজনা থেকে তৈরি হয়েছেন আমাদের অনেক প্রিয় লেখক, চিন্তক ও বুদ্ধিজীবী। তাদের মধ্যে অন্যতম মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন, মাওলানা হেমায়েত উদ্দীন, মাওলানা আব্দুল মতীন, মাওলানা আব্দুল গাফফার, মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম, মাওলানা আবু সাবের আব্দুল্লাহ প্রমুখ।
―যশের ফাঁদ

জিহাদি বই ব্যাপারটা যে আদতেই একটা ডার্টি গেম, তা স্পষ্ট হবে অন্য কয়েকটি ঘটনায়। দৈনিক জনকণ্ঠের এক রিপোর্টে কওমি মাদরাসার সপ্তম শ্রেণিতে পাঠ্য, আরবি ভাষার ব্যাকরণের বই ‘শরহে মিয়াতে আমল’কে জিহাদি বই হিসেবে দেখানো হয়েছে। মোনাজাতে মকবুল, জিন জাতির ইতিহাস, আল-কুরআনের তাফসির ইত্যাদি বইকেও জিহাদি বই হিসেবে দেখিয়েছে আমাদের প্রশাসন ও মিডিয়া।

এই জিহাদি বই মূলত একটা খেলা। যখন যাকেই জঙ্গি সন্দেহে গ্রেফতার করে, অবধারিতভাবে তাদের কাছে জিহাদি বই পাওয়া যায়। আর জেহাদি বইয়ের তালিকায় দেখা যায় এমনসব বই, যেগুলোর ভেতর হয়তো একটিবারও জিহাদ শব্দটি নেই। কোথায় যেন দেখেছিলাম, বিখ্যাত মাসআলা-মাসায়েলের কিতাব ‘বেহেশতি জেওর’কেও জেহাদি বই হিসেবে দেখিয়েছে আমাদের মিডিয়া।
―জিহাদি বই

পৃথিবীতে সবসময়ই সত্য চিকনাইহীন। ঈমানের প্রাচুর্যে বস্তুবাদ সবসময়ই নিস্তেজ। আমলের রোশনাই দেখতে হয় হৃদয়ের চোখে। আলোঝলমল চাকচিক্যে অভ্যস্ত চোখ কখনোই রাতের তাহাজ্জুদগুজারের রোশনাই ফিল করতে পারবে না। চটের বিছানায় মাটির মেঝের তালিবে ইলমের ত্যাগ কখনোই একজন ভার্চুয়াল সেলেব শায়খ ও তার ফলোয়ার অনুভব করতে পারবে না। সেই কারণেই আমরা সবসময়ই একজন ট্রেডিশনাল আলেমের ফলোয়ার। দ্বীন জানা ও দ্বীন বোঝার ক্ষেত্রে তাঁরাই আমাদের উস্তাজ। তাঁরাই আমাদের শায়খ। আমরা তাদেরকেই মনে করি ইসলামের প্রকৃত খাদেম।
―ট্রেডিশনাল আলেম বনাম ননট্রেডিশনাল আলেম

আপনি সাইকেল চালিয়ে অথবা বাইক চালিয়ে এক্সিডেন্ট করেছেন, বৃষ্টির দিনে আছাড় খেয়েছেন, রাস্তায় লুঙ্গি ছিঁড়ে গেছে, আপনার ছেলে অথবা মেয়ে ফেল করেছে অথবা কোর্ট ম্যারেজ করেছে; এই অঞ্চলের মানুষের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া কী হবে? কখনো খেয়াল করেছেন? অবধারিতভাবে ‘হাসি’―আপনাকে প্রাথমিক বিব্রত হতেই হবে।
এই দেশে এক নেতা আরেক নেতাকে ইরোটিক ভাষায় আক্রমণ করেন। নতুন দম্পতির বাসরঘরের বাইরে কান পাতে দাদি, ভাবি অথবা বন্ধুরা। ভাবি-শালি-শালা, দুলাভাই মানেই পৃথিবীতে এসেছে কেবল বিব্রত হতে। অনলাইনে ‘ভাবি’ শব্দ লিখলে ভদ্রলোকের মরে যেতে ইচ্ছে হবে।
― যবন-মালাউন

আধুনিক পৃথিবীতে দ্বীনের দাঈ ও পÐিতদের সবচেয়ে বড় ফাঁদের নাম ‘তারুণ্য কী চায়’ এবং ‘যুগ-চাহিদা’। এই ফাঁদে আটকে অনেকেই নিজে পথ হারাচ্ছেন; আবার অনেকেই নিজে পথে থাকলেও অনুসারীদের করছেন বিপথগামী। ক্ষুদ্রার্থে ‘তারুণ্য কী চায়’ এবং ‘যুগ-চাহিদা’র সামান্য উপযোগ থাকলেও বৃহদার্থে এবং ক্রমচর্চায় এই চিন্তা বিচ্যুতি ও বিভ্রান্তির সদর দরজায় পরিণত হয় এবং হচ্ছে। ফিলহাল খুব জনপ্রিয় এবং খুব ধারালো এক অস্ত্র এই ‘তারুণ্য কী চায়’ এবং ‘যুগ-চাহিদা’ আসলে কী জিনিস?
― বিকল্পের প্রকল্প

‘অন্ত্যস্থ ব’কে বাদ দেওয়া হয়েছে। বর্ণটিকে বাদ দিয়ে ব-ফলা দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে এটা কোনোভাবেই শৃঙ্খলা হতে পারে না; সংস্কার হতে পারে না। ব-ফলা দিয়ে কম্বল, প্রতিবিম্ব, লম্বা লেখা যায়। কিন্তু স্বাগত, বিশ্ব, স্বাক্ষর লেখার জন্য ‘অন্ত্যস্থ ব’ লাগে। আমাদের মনে আসছে আর বাদ দিয়ে দিয়েছি। কখনো ভাবিনি, এর ফলে সংকটটা কোথায় তৈরি হবে! এখন কোনো কিশোর যদি প্রশ্ন করে⸻‘দুইটাই ‘ব’ তাহলে দুইটাতে দুই উচ্চারণ কেন?’ তখন আসলে জবাব থাকে না।
―বাংলা বর্ণের বিপদ

একজন মাদরাসার ছাত্র অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একজন স্কুল-কলেজ পড়–য়ার ক্ষেত্রে কিছু তথাকথিত ধারণা লালন করতে দেখা যায়। এর মধ্যে ‘খাড়ায়া মুতে’, ‘নামাজ-রোজা জানে না’, ‘কুরআন পড়তে পারে না’, ‘ঘুষ খায়’ ইত্যাদি কি-ওয়ার্ড দিয়ে তাদের চিত্রায়ন করে। যেন-বা তারা কেউ মুসলিমই নন। যদিও অধুনা এইসব চিন্তার বা বলার ক্ষেত্রে সহনশীলতা আসছে অনেকের মধ্যে। তারপরেও বিরোধের জায়গাটা ঠিকই থেকে যাচ্ছে।
―আলিয়া কওমি খারেজি

যেমন―যিনি ‘সংশয়বাদী’ নন, তাকে ‘সংশয়বাদ’ সংশ্লিষ্ট টেক্সট পড়তে দেওয়া; যিনি ‘নাস্তিক’ নন, তাকে ‘রদ্দে নাস্তিকতা’ পড়তে দেওয়া; যিনি ‘অজ্ঞেয়বাদী’ নন, তাকে ‘অজ্ঞেয়বাদ’ সংক্রান্ত যুক্তিতর্ক পড়তে দেওয়া ইত্যাদি যুক্তি-পাল্টা যুক্তি একসময় মানুষের মধ্যে আরও বেশি সংশয় সৃষ্টি করে। নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও তরবিয়তহীন যারাই এইরকম রদ্দ ও যৌক্তিক লড়াইয়ের মোহে পড়েছেন, তারাই একসময় হতাশ হয়েছে। বিব্রত হয়েছে। নিজেই সংশয়বাদী হয়ে উঠেছে। যে কারণে রাসুল আমাদের দুআ শিখিয়েছেন ‘ইলমে নাফে’ কামনা করতে। কারণ, মানুষকে দিকভ্রান্ত করে মূলত তার অপ্রয়োজনীয় ইলম।
―বিশ্বাস ও যুক্তির দ্বন্দ্ব

কোনো কোনো আলেমের মতে যারা অনারব ভাষায় খুতবা দিচ্ছেন, দিতে চান, দেওয়া জায়েজ মনে করেন, তাদের একমাত্র দলিল হলো বোধগম্যতার যুক্তি এবং নবিদেরকে নিজ নিজ মাতৃভাষায় পাঠানো হয়েছে মর্মে কুরআনের আয়াত। অপর দিকে তারাই আবার সদকাতুল ফিতর টাকায় আদায় হবে না বলছেন। কারণ, নবিজি ও সাহাবিগণ টাকা দিয়ে সদকাতুল ফিতর আদায় করেননি। সদকাতুল ফিতর টাকা না খাদ্য দ্বারা আদায় হবে প্রশ্নে তারা আবার ফকিহদের মতামতকে এড়িয়ে খাদ্য দিয়েই আদায় করতে হবে বলেন।
―জুমার খুতবার ভাষা

কথায় বলে, প্রতি চার কিলোমিটার অন্তর অন্তর মানুষের মুখের ভাষা বদলে যায়। যেমন, আমাদের গ্রামে আমরা বলি―পুষ্কুনি, খাদি, গামলা, সালুন, পানি, সিফি ইত্যাদি। আমাদের একটু উজানেই বলে―যথাক্রমে দিঘি, পায়া, ডিশ, তরহারি, ফানি, তাম্বশ ইত্যাদি। আবার আমাদের ঠিক দুই কিলোমিটার ভাটিতে বলছে⸻যথাক্রমে তালাব, খালই, বোল, সানুন, হানি, সিহি ইত্যাদি। এই যে পরিবর্তন বা নয়া শব্দ, এগুলো নিজ নিজ অঙ্গনেই বোধগম্য। অপর দিকে এগুলোর বিশেষ কোনো লিখিত ও পরিশীলিত রূপ নেই। যতটা না আমরা আমাদের মানভাষায় পাই। ফলে, একটা জাতির জাতীয় যোগাযোগ ও দৈশিক এবং বৈশ্বিক সাহিত্যের জন্য মানভাষা জরুরি।
―প্রমিত-অপ্রমিত : দ্বন্দ্ব না সন্ধি! ―০২

অপরদিকে ওরা পাকিস্তানের বিখ্যাত ক্রিকেটার ওয়াসিম আকরামকে ‘অসীম আক্রম’ লিখতে দেখেছি। সাঈদ আনোয়ারকে ‘সইদ’ এখনো লেখে।
এরা শুধু তামিম ইকবালকে ‘তামিন ইকবাল’, মাশরাফি মোর্তজাকে ‘মোশারফ মোর্তজা’, আব্দুর রাজ্জাককে ‘আব্দুর রজ্জাক’, শওকত ওসমানের নাম ‘সৈকত অসমান’, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের নাম ‘অকতারুজামান এলিয়াস’, চলচ্চিত্র নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেলের নাম ‘তানবির মকাম্মল’, শামসুর রাহমানের নাম ‘সামছুর রহামান’ এবং হুমায়ূন আহমেদের নাম ‘হুমাঅন আহমদ’ লিখেই থামেনি। মাহমুদুল্লাহকে ‘মামুদুল্লা’ও লিখেছে। বিখ্যাত রাজনীতিক হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নাম ‘সুরাবর্দী’ পর্যন্ত লিখেছে এরা।
―নাম নিয়ে যত কাণ্ড ―১

ব্যাংকিং সেক্টরে কিছুটা ইসলাম চলছিল। ব্যবসায়িক পলিটিক্সে তাও ধুঁকছে ফিলহাল। সরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কুরআন তেলাওয়াত ও মুনাজাত দিয়ে মাঝেমধ্যেই ‘রাষ্ট্রধর্ম’ ইসলামের মান রক্ষা করতে দেখা যায়। সেখানেও ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িকতার লাজ রাখতে গিয়ে ‘গীতা পাঠ’-কে কুরআনের সমান্তরালে দাঁড় করিয়েছে পলিটিক্স। কখনো কখনো এই গীতার সঙ্গে ‘বাইবেল’ ও ‘ত্রিপিটক’ পাঠের আয়োজনও দেখি। অবশ্য আরও যত ধর্ম বা মতবাদ পালন করে মানুষ, সবগুলোর ধর্মগ্রন্থ পাঠের ব্যবস্থা থাকলে হয়তো অনুষ্ঠানে বাকি আর কিছুর দরকার হতো না। ধর্মগ্রন্থ পাঠেই একটা অনুষ্ঠান শেষ হতে পারত!
―রাষ্ট্রধর্ম : রাজনীতি নাকি রাষ্ট্রনীতি

আর্য ব্রাহ্মণদের কর্তৃক বাংলা চর্চা নিষিদ্ধ প্রসঙ্গে কবি গোলাম মোস্তফা বলেন, “মুসলমানদের দ্বারা বঙ্গবিজয় না হইলে আর্যদের হাতে যে বাংলা ভাষা লোপ পাইত অথবা শুদ্ধিকৃত হইয়া ভিন্নরূপ ধারণ করিত, তাহাতে কোনোই সন্দেহ নাই। সেন রাজাদিগের অল্প-পরিসর সময়-রেখার মধ্যই আর্য ব্রাহ্মণগণ আইন করিয়া বাংলা ভাষার উৎখাত সাধনের প্রয়াস পাইয়াছিলেন। তাঁহারা এই নির্দেশ দিয়াছিলেন যে, যদি কোনো আর্য হিন্দু বেদ, পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি ধর্মশাস্ত্রসমূহ কোনো মানব ভাষায় (অর্থাৎ বাংলা ভাষায়) আলোচনা করে, তবে তাহাকে ‘রৌরব’ নামক নরকদণ্ড ভোগ করিতে হইবে-
‘অষ্টাদশ পুরাণানি রামস্য চারিতানি চ।
ভাষায়ং মানবঃ শ্রত্বা রৌরবং নরকং ব্রজেৎ।।’
― বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ : উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:১৩
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশ কি অন্যের যুদ্ধ লড়বে, নাকি নিজের দেশকে আগে রক্ষা করবে?

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:২৯

বাংলাদেশ কি অন্যের যুদ্ধ লড়বে, নাকি নিজের দেশকে আগে রক্ষা করবে?
============================================
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে যে নতুন যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশকে যুক্ত করার আলোচনা চলছে। বাংলাদেশের পক্ষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

দৃশ্যমানতা এখন একধরনের পুঁজি

লিখেছেন মুনতাসির, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:০০

মানুষ শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য কনটেন্ট নির্মাতা হতে চাইছে না। দৃশ্যমানতা নিজেই এখন একটি মূল্যবান সামাজিক সম্পদে পরিণত হয়েছে।

অনুসারীর সংখ্যা একজন মানুষকে পরিচিতি, আমন্ত্রণ, প্রভাব, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কাছে প্রবেশাধিকার, বাণিজ্যিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

।। রাশিয়ার মতো বাংলাদেশে হামলা করুক ভারত।।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:১২


আমি আজ পর্যন্ত আম্লিগে কোন ভালোমানুষ খুঁজে পাইনি। আম্লিগ মানেই ইয়ের বাচ্চা। আম্লিগ মননে মগজে ধর্ষক, লুন্ঠনকারী, দেশদ্রোহী ও পাচারকারী। এদের মাঝে কোন কালেই কোন ভালোমানুষ ছিলোনা বর্তমানেও নেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইয়ামানাকা ফ্যাক্টরস

লিখেছেন কলাবাগান১, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৫৭


ছবিতে যাকে দেখছেন উনার নাম প্রফেসর ইমানাকা। উনাকে সারা বিশ্ব মনে রাখবে উনার যুগান্তরী আবিস্কার এর জন্য। তার আবিস্কার যেভাবে সবার জীবনকে বদলে দিবে এবং দিচ্ছে সেটা জানানোর জন্যই... ...বাকিটুকু পড়ুন

Movie-Obsession(2026)

লিখেছেন ডি এইচ তুহিন, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯

বিশিদবার রাতে খুব বাজে আর একটা ছিনেমা দেখলাম। ভাই-রে ভাই কি বলবো, ঐ রাতে আর ঘুমাতে পারি নাই। মানে দেখার পর থেকে এখনো গা শিরশির করছে। চোখ বন্ধ করলেও চোখের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×