somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কাটি পাতাং - একটা প্রেমের গল্প

০৩ রা অক্টোবর, ২০১৭ বিকাল ৫:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



লাল একরঙা ঘুরির সাথে প্যাঁচ খেলছে সাদা কালো পেট-কাটা। কে জিতবে বলা মুশকিল।একবার লাল উপরে উঠে প্যাঁচ লরে তো আবার পেট-কাটাটা বাজ পাখীর মত গোঁত্তা মেরে তাকে কাটতে যায়। সারা আকাশ জুরে প্রচুর ঘুরি উড়চ্ছে। সারাং প্যালেস হোটেলের ছাতে বসে পশ্চিমে ডুবু ডুবু সূর্যের শেষ কিরণ উপভোগ করছিল রাহুল আর রতি। হোটেলের ছাতে সুন্দর বসবার ব্যবস্থা, বেয়ারা এসে চা আর কচুরি দিয়ে গেছে। পড়ন্ত বিকেলে জয়পুরের রাস্তার কোলাহল অল্প অল্প শোনা যাচ্ছে চার তলা হোটেল বাড়ির ছাত থেকে।

চায়ে চুমুক দিতে তিতে রতির দিকে নজর করল রাহুল। ওদের বিয়ে হয়েছে প্রায় ছয় মাস। হানিমুন কাটাতে দুই সপ্তাহের ছুটি নিয়ে রাজস্থান বেরাতে এসেছে দুইজনে। রতিকে একটু আড়াল থেকে দেখতে এখন মজা পায় রাহুল। বারান্দার পাচিলের উপর দুই হাত রেখে নিচের রাস্তার ভিড় দেখছে রতি। এক ধার থেকে বিকেলের সূর্যের আলোটা পরেছে ওর মুখের উপর। অদ্ভুত মুখ - রাস্তায়ে চললে ওর দিকে লোকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। চোখ কারা সুন্দরি - বিয়ের আগে বন্ধুরা সাবধান করে দিয়েছিল রাহুল্কে - সামলে হাত বারিয়ও গুরু ও মেয়ে হাই ভোল্টেজ হাতে ছ্যাকা খেও না। রতির সবটাই চড়া মাত্রায়ে - যেমনি সুন্দর, তেমনি তেজি - একবার কিছু ভেবে বসলে কার কথা শুনবে না। কলেজের ডিবেটিং সসাইটির মধ্যে দিয়ে ওদের আলাপ। প্রথম নজরেই প্রেমে পোরে যায়ে রাহুল। তবে রতির প্রেমে তো স্কটিশ চার্চের অর্ধেক ছেলে। এত ছেলের মধ্যে থেকে ওকেই যে বেছে নেবে এটা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি রাহুল। রাহুল তখন সেকেন্ড ইয়ার ইকনমিক্সের ছাত্র আর রতি ইংরেজি হনরস। রতির চার পাসে ২৪ ঘণ্টা মউমাছির মত ছেলেদের ভিড়। সবাই রতির সঙ্গে গল্প করতে চায়ে - সবাই চায়ে রতিকে গারি করে বাড়ি পৌঁছে দিতে। বাগাদিয়া, ঝুঞ্ঝুনভালা,আগারভাল,তিভারি প্রচুর মারয়ারী ছেলে স্কটিশে পরেতে আসে - তাদের টাকার গরমও আছে যথেষ্ট। সবাই রতিকে সিনেমা দেখাতে চায়ে। একটা দারুণ বইচিত্র ছিল রতির - সব দিক এক সঙ্গে বজায়ে রাখতে পারত। কাউকে বেশি বারতে দিত না আবার কাউকে ফেলেও দিত না। ঠিক যেন আকাশে ঘুরি ওড়াচ্ছে, কারোর সুতো টান দিচ্ছে আবার কারোটা ছার - কিন্তু কাউকে কেটে জেতে দেয় না রতি। রতির আকাশে যেন অজস্র ঘুরি উড়ছে। এর মধ্যে রাহুল রতির সঙ্গে একা কথা বলার সুযোগ কি করে পেল এটাই তাজ্জব। রাহুলের নিজের গারি তো দুর-স্থান ট্যাক্সি চরবার পয়সা পর্যন্ত থাকে না। এইরকম ফুটো পকেট নিয়ে রতিরে সাথে কথা বলবার সাহস কি করে হয়েছিল রাহুল নিজেও বলতে পারবে না । একদিন কলেজের বাইরে বাসস্টান্ড এ দারিয়ে আছে দেখল রতি এসে দারিয়ছে বাসের জন্য। আশ্চর্য - সাথে আজ কোন আডমাইরার নেই। রাহুল মনে মনে জয় গুরু বলে ঝাপ দিল। রতির পাশে গিয়ে জিগ্যেস করল হাল্কা সুরে - "কি ব্যাপার - আজ একটু আগে আগে কলেজ শেষ?"

রতি নাকের ডগায়ে সানগ্লাস নামিয়ে রাহুলের দিকে তাকাল - এটা আবার কে - কলেজে মুখ চেনা তাই ভদ্রভাবেই উত্তর দিল।

"আজ শেষের দুটো ক্লাস ক্যানসেল তাই একটু আগে বাড়ি ফিরছি।"

"আমি যাচ্ছিলাম গরিহাটের দিকটায়, আপনার কোন দিকে?" বেপরোয়া প্রশ্ন করল রাহুল।

"আমি নাবি বালিগঞ্জ মোরে" রতির মধ্যে একটু কৌতূহল, এই ছেলেটার দৌড় কতটা।

"তাহলে তো আমাদের একি দিকে যাওয়া - আমার সাথে যাবেন? আপনাকে বারিতে নাবিয়ে দেব।"

রতির খুব হাসি পেল - ছেলেটার ট্যাক্সি করবার পয়সা নেই , মিনিবাসে বাড়ি পৌছাতে চায়ে। প্রথমে ভাবল ফুটিয়ে দেবে, কিন্তু কি ভেবে ওর মুখ থেকে করা কথা বেরুল না। সামনে ঝুঁকে ফুটপাথ থেকে আগমনী বাস গুলর দিকে দেখে বলল - "ওই যে ৪৭A এসে গেছে, ঢাকুরিয়া অব্ধি যাবে - ওঠা যাক।"

ওইখান থেকেই ওদের আলাপ শুরু। দীর্ঘ ৬ বছর আগের কথা। বাস আড্ডায় জমান বন্ধ্যত্ব পরিণত হয়েছে ভালোবাসাতে - গভীর গারো ভালবাসা - বাধন ছেরা পাগল করা এই প্রেমের জোয়ারে ভেসে গেছে দুজনে। কলেজ শেষে কর্মজীবন শুরু করেছে দুজনে। একদিন অফিসের পরে বিকেল বেলায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে ঘরশয়ারির মূর্তির নিচে বসে রাহুল প্রশ্ন করেছিল - "আচ্ছা বলতো - এত আডমাইরার থাকতে তুমি আমার উপর দয়া করলে কেন? ঠিক ছেলে বাছলে তুমি এখন পার্ক হোটেলে বসে কফি খেতে পারতে - আমার সঙ্গে বাদাম ভাজা খেতে হত না।" শুনে রতি মুচকি হেসেছিল, উত্তর দেয় নি। এমন একটা ভাব যেন রাহুলের এসব প্রশ্নের উত্তর চাওয়া নেহাত ছেলেমানুষি। রাহুল্কে কাছে টেনে বলেছিল, "আমার হল মৎস্য রাশি, আমাদের চিহ্ন মাছ - আমরা গভীর জলের প্রাণী। মৎস্য রাশির চিহ্ন দুটো মাছ দুই দিকে টানছে। দুই দিকের স্রোত আমার মধ্যে বইছে - কখন কোন দিকের টান বেশি তা কেউ জানে না...আমিও না।

বোঝও ঠ্যালা - কি মুশকিল। এর পর থেকে রতিকে analyse করার চেষ্টা ছেরে দিয়েছে রাহুল। রতিকে পুরপুরি বোঝা তার শাধদ্দের বাইরে এটাই মেনে নিয়েছিল সেই দিন থেকে।

পাশের ছাত থেকে একদল ছেলের উল্লাসের চিৎকারে রাহুলের ভাবনার রোষী ভেঙ্গে গেল। চায়ে চুমুক দিয়ে আকাশের দিকে তাকাল, পেট কাটা ঘুরিটা কেটে গেছে। লাট খেতে খেতে নিচে রাস্তার দিকে ভেসে যাচ্ছে। রাস্তায় একদল ছেলে গারির ভিড় এড়িয়ে সেই কাটা ঘুরি ধরবার জন্য হই হই করে ছুটেছে। লাল ঘুরিটা যেন গর্বে বুক ফুলিয়ে আরও উপর দিকে উঠে যাচ্ছে।

2

সেদিন সন্ধ্যার প্রোগ্রাম - চউকিদানি। জয়পুর শহর থেকে পাক্কা আধ ঘণ্টা লাগলো গারি করে। যখন জায়গাটাতে পউছাল তখন সূর্য দুবে অন্ধকার পরতে শুরু করেছে। রাস্তার ধারে একটা মাঠ পাচিল দিয়ে ঘেরা। বাইরে প্রচুর গারির ভিড়, আশে পাশে অনেক ধাবা জাতিয় খাবার জাগা - ড্রাইভারদের জন্য।জয়পুর আসার আগেই চউকিদানির গল্প ওরা শুনেছে অনেকের মুখে - "জয়পুর যাচ্ছও, চউকিদানিটা দেখতে ভুলো না - ভাল লাগবে।" পয়সা দিয়ে টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকল দুজনে। পাচিলের ভেতর সে এক জমজমাট ব্যাপার - ঠিক জেন মেলা বসেছে। চউকিদানি একটা সাজানো রাজস্থানি গ্রাম - ঠিক যেমন সিনেমাতে দেখা - ঠিক তেমনি। এদিক ওদিক মাটির ঘর - জেন গ্রামের বাড়ি।কথাও বিজলি বাতি নেই - সব লন্ঠনের আলো। কথাও বা গ্রামের পাঠশালা, কথাও আবার গাছতলায় পঞ্চায়েতের স্থান। সবটাই সাজানো - সবটাই নকল - তবে নকলটা করেছে বড় যত্ন করে - বেশ সুন্দর মনোরঞ্জনের জাগা বানিয়ে দিয়েছে রাজস্থান পর্যটন দপ্তর। জায়গায় জায়গায় বেদি করা, তার উপর বিভিন্ন রকম কলা কৌশল দেখান হচ্ছে। কোথাও চলছে গানের বাজি তো কোথাও নাচের মহড়া। ঘুরে ঘুরে রাজস্থানের বাঞ্জার উপজাতির রমণীরা মাথার উপর কাঁসার ঘড়া বসিয়ে, রংবেরঙের কাঁচ বসান ঘাগরা ঘুরিয়ে অতিথিদের নাচ দেখাচ্ছে।

রতির চোখ মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

"ও মা কি দারুণ জায়গাটা - ওই দেখ নাগরদোলার লাইন, চল আমরা চরি।"
রাহুলের হাত ধরে টেনে নিয়ে চলল একটা নাগরদোলার দিকে। পুরনো ধাঁচের কাঠের নাগরদোলা, এরকমটা আর আজকাল দেখা যায়ে না। ছোটো বেলায় মহেশের রথের মেলার কথা মনে পরে গেল রাহুলের। গরম গরম জিলিপি খাওয়া আর নাগরদোলা চড়া, ঠিক এই রকম নাগরদোলা। প্রতি বছর যেত ওরা মহেশের রথের মেলাতে... প্রতি বছরই বৃষটি হত ওই সময়। একবার তো অনেক লোক মারা গেল রথের দরি ছিরে গিয়ে ভিড়ের চাপে। নাগরদোলা ঘুরছে জোরে - আরও জোরে। পাশে বসে রতি ওর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরেছে। রাহুলের চোখের সামনে পৃথিবীটা বনবন করে ঘুরছে - আর সব কিছুর পিছনে একটা হাসির আওয়াজ। রতির হাসি, রতি মাথা পিছনে হেলিয়ে প্রাণ খুলে হাসছে।

ঘুরতে ঘুরতে ওরা পৌছাল এক গাছতলায়। লন্ঠনের পাশে শাল গায়ে, পাগড়ি পরে এক বৃদ্ধ রাজস্থানি বসে পয়সার বিনিময় হাত দেখে ভবিষ্যৎ বলে দিচ্ছে।

"চলো আমরা হাত দেখাই," খুব উৎসাহ রতির।

"আমি যদিয়ও এসব বিশ্বাস করি না, তবুও চলো, তুমি যখন চাইছ," বলল রাহুল।

লোকটার সামনে বসে নিজের হাতটা বারিয়ে ধরল রতি। একটু দেখার পর লোকটা তার বাধা গত আওরাতে শুরু করল - "বরি ভাগ্যবতী... ঘর কি লাকশমি... ইত্যাদি।"

রতি বেশ চটে গেল। "নহি নহি - এইসে নহি - আপ ঠিক সে বাতায়িএ।"

চাপে পরে লোকটা পকেট থেকে টর্চ আর চশমা বার করে রতির হাতটা খুব মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করা শুরু করল। প্রায় পাঁচ মিনিট এক মনে হাত দেখার পর লোকটা যখন মুখ তুলল - ওর মুখের ভাবটা কেমন জেন পালটে গেছে। ও কথা বলল রাহুল্কে লক্ষ করে।

"বাবুজি - কোই আপকো দুশমন বুরি নজর লাগাই আপ লোগো পার। বাবু হাম আপকো ডরানা তো নেহি মাঙ্গটা, লেকিন বেহতার ইহেই হোগা আপ লোগ জয়পুর ছোর কর কোলকাতা ওয়াপাস চালা যায়।"

রাহুল আর রতি চমকে উঠে দাঁড়ালো। লোকটা কি ওদের সাথে রশি-কথা করছে - কিন্তু না ওর চোখ মুখ গম্ভীর - রশি-কথা নয় লোকটা ওদের সাবধান করে দিচ্ছে। এরকম হাত গণনার পর দুজনেই একটু ঘাবড়ে গেছিল। আর চউকিদানিতে দরকার নেই - এবার হোটেলে ফেরা যাক। গারিতে ফিরতে ফিরতে রাহুল বিড়বিড় করে বলল - "যত সব দেহাতি ঠক জোচ্চোরের দল, ভেবেছিল ভয় দেখিয়ে বেশি টাকা নিয়ে নেবে।"

3

পরদিন সকাল বেলা হোটেলের বুফফেট ব্রেকফাস্টে টোস্ট, জ্যাম, ডিমের অমলেটের সাথে কফি খেয়ে দুজনেই বেরিয়ে পরল। আজ ওদের জয়পুরে শেষ দিন। আজ রাতের ফ্লাইটে জয়পুর থেকে দিল্লি। রাতের খাওয়াটা বোনের সরিতাবিহারের ফ্লাটেতেই হবে। আজকের দিনটা সুধু দোকানপাট সারা আর জয়পুরের পরিবেশটা উপভোগ করা।

রাজস্থানের রাজধানী জয়পুর, এই শহরে অনেক দেখার জায়গা। হাওয়া মহল, যন্তর মন্তর, আম্বর প্যালেস এই সব গুলই দেখা হয় গেছে প্রথম দিনে। আজ ওরা ঘুরবে জয়পুরের প্রাচীন বাজার গলিতে। হরেক রকম বাজার লুকন আছে এই পুরনো গলি ঘুচিতে। চামড়ার জিনিস পত্র, পেতলের বাসনকোসন, লেপ কম্বল, কাচের চুরি সব কিছুরই আলাদা আলাদা বাজার এই শহরে। তবে এর মধ্যে সব থেকে নাম করা বাজার হল জহুরি পট্টি যাকে কেউ কেউ বলে মিনা বাজার। এই বাজারে পাথর বিক্রি হয়। গয়নাতে বসানোর দামি পাথর। জয়পুরে এই পাথরের পাইকারি ব্যবসা চলে, সারা পৃথিবী থেকে জহুরি আসে পাথর কিনতে। রাহুল রতি ঠিক করেছে ওরা এখান থেকে আংটি বানানোর পাথর কিনে নিয়ে যাবে। এখানে আংটি বানাবার সময় নেই, পাথরটা এখান থেকে কিনে কলকাতায় ফিরে আংটি গরবে।

হোটেল থেকে গারিতে করে জহুরি বাজারের দিকে বেরোল দুজনে। আজ রতি তার উদয়পুর থেকে কেনা সালোয়ার কামিজটা পরেছে। তার সঙ্গে চউকিদানিতে কেনা কাচের চুরি। দিব্যি রাজস্থানি লাগছে অকে। ওর সালওয়ারটা লাল রঙ, গলার কাছে জরির কাজ। গারির বাইরে রাস্তায় থই থই করছে লোকের ভিড়। বহু লোক যাচ্ছে স্কুটার বা মোটরবাইক চরে। রাস্তায় অনেক মেয়ে রতির মত সালওয়ার পরে। তাদের অনেকের আবার মাথার উপর দিয়ে শাল ঢাকা, অনেকটা মরুভূমির বেদুইনদের মত।

"ওরা মাথা ঢেকে ওইভাবে শাল পরে কেন?" প্রশ্ন করল রতি।

রাহুলো লক্ষ্য করেছে ব্যাপারটা - "ঠিক বলতে পারব না, তবে এখানকার লোকের ইজ্জত বোধটা একটু চড়া, তাই হয়ত নিজেদের বাইরের লোকের কাছে দেখাতে চায় না - ও ভাবে শাল পরা অনেকটা ঘোমটা দেওয়ার মত। তা ছাড়া রাস্তার ধুল বালি তো আছেই।"

রতি মাথা নাড়ল - " না আমার জেন মনে হচ্ছে ওরা ওইভাবে শালটা পরেছে আত্মরক্ষার জন্য।"

ওদের গারি এবার জহুরি পট্টির কাছে এসে পরেছে। পুরনো মহল্লা, এক তলা দুই তলা সব বাড়ি - একটার সঙ্গে একটা গায় লাগা। লকজনের ভিড় চারিদিকে। নীল আকাশে মেঘের লেশ মাত্র নেই, আজো আকাশে ঘুরি, অজস্র ঘুরি।

রত্ন-শাস্ত্র এক অদ্ভুত বিদ্যা। অনেকে আছেন যাদের রত্নের শক্তির উপরে অটল বিশ্বাস। আবার এমনও বহু লোক আছে যারা এই তথ্যের কোন মূল্যই দেন না। পাথরের মধ্যে দিয়ে সূর্যের রশ্মি যখন মানুষের শরীরে প্রবেশ করে তখন সেই পাথরের প্রভাব নাকি মানুষের জীবনের মোর পালটে দিতে পারে। রাহুল এইসব বিশ্বাস করে না। একটা রঙ্গিন পাথরের টুকরো কি কখন মানুষের জীবনে প্রভাব করতে পারে - যুক্তি দিয়ে একথা কখন মানা যায় না। তবে রাহুল যতই যুক্তি দিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করুক না কেন, রতিকে ও কিছুতেই বোঝাতে পারে নি। জয়পুর থেকে একটা ভাল পাথর রতিকে কিনতে হবেই হবে।

ওরা দুজনেই ঘুরতে লাগলো দোকানে দোকানে। আশ্চর্য জায়গা। সারা পৃথিবী থেকে লোক এসেছে এখানে পাথরের ব্যবসা করতে। কোন দোকানে কাচের শোকেসের সামনে চেয়ার লাগানো, কোথাও আবার দোকানের ভেতরটা গদি বেচানো। সারা সকাল ধরে পাথর দেখতে দেখতে ওরা ক্লান্ত হয় পরল। দুপুর হয় এসেছে, এবার ওদের চটপট কেনাকাটা সেরে এয়ারপোর্টের দিকে এগোতে হবে।

একটা দোকানের সামনে দারিয়ে পরল রাহুল। দরজার উপরে দোকানের নাম "Senc0 Jewellers"। এই নামে সোনার দোকান আছে গরিয়াহাট মার্কেটের পিছনে। মাঝে মধ্যে কিছু বিয়ের গয়না-টয়নাও গরান হয়েছে ওদের দোকান থেকে। দোকানের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল দুজনে। দোকানের ভিতরে এয়ারকন্ডিশান চলছে - ঠাণ্ডা। বাইরের আওয়াজ মোটেই আসে না। দোকানের ভিতরে এক মাজ বয়সী ভদ্রলোক কাউন্টারের পিছনে চোখে ম্যাগ্নিফাইং লেন্স এঁটে কিছু পাথর পরীক্ষা করছিলেন। ওদের ঢুকতে দেখে চোখ থেকে কাঁচ নামিয়ে হিন্দিতে বললেন - "আইয়ে, আন্দার আয়িয়ে, কেয়া সেবা কর সেক্তা হু?"

রাহুল হিন্দিতেই জবাব দিল - "দেখিয়ে, হাম লগ কোলকাতা সে আয়ে হায়। আপকা দুকান কা নাম দেক কে সোচা সায়েদ বাঙালি দুকান হোগা।"

ভদ্রলোক এবার হেসে বললেন - "আরে সব জেনেই যখন ঢুকেছেন, তখন আবার কষ্ট করে হিন্দিতে কেন? আসুন বসুন, আপনাদের জন্য চা বলছি।"

বসে বসে বেশ কিছুক্ষণ গল্প চলল। ভদ্রলোকের পরিচয় শ্রী নির্মল সেন। হ্যাঁ কলকাতার বিখ্যাত সেঙ্কো জুএলারসেরি এটা একটা শাঁখা। গরিয়াহাট বাজারের পাশে ওদের দুটো দোকানে নির্মল বাবুর মামারা বসেন। জয়পুরে দোকান খোলার প্রধান উদ্দেশ্য - দামি পাথরের পাইকারি বাজারের কাছাকাছি থাকা। অল্পক্ষণ কথা বলেই রাহুল বুঝতে পারল যে রত্ন-তথ্যে গভীর জ্ঞান রাখেন নির্মল বাবু। তাই অনাকে প্রশ্ন করলে "আচ্ছা আপনি তো এই সব পাথর নিয়ে রোজ ঘাটাঘাটি করেন। অনেকের তো দেখি এসব পাথর টাথরে অটল বিশ্বাস - তবে আপনাকেই জিজ্ঞাসা করি - এসব কি কোন যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করা যায়?"

"পাথরের গুনের উপর বিশ্বাস থাক না থাকাটা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার। আসলে পাথরের ব্যাপারটা অনেকটা ঔষধের সংগে মিলে যায়। এই ধরুন ভাল ডাক্তার রুগী পরীক্ষা করে রোগ বুঝে ওষুধ বলে দেবে। সেই ওষুধে রুগী ঠিক হয় যাবে। যদি ডাক্তার রোগটাই ঠিক মত ধরতে না পারে তাহলে ওষুধে কখনোই কাজ হবে না। তাই না?" ভদ্রলোক রাহুল্কে পালটা প্রশ্ন করলেন।

রাহুল মাথা নাড়ল - "হু।"

"ঠিক সেই রকম ভাল জ্যতিশি কারো কুশটি বিচার করে অথবা হাত দেখে যদি সঠিক অব্যর্থ গণনা করতে পারে এবং তারপর যদি সেই রগের অনুযায়ী সঠিক পাথর ধারণ করবার উপদেশ দেন তাহলে সেই পাথরে ফল পাওয়া অনিবার্য। এর মধ্যে আর কোন ছল চাতুরী নেই।" নির্মল বাবু অল্প হাসলেন।
রাহুলের কউতুহল জেগে উঠেছে - " বুঝলাম, কিন্তু ভুল পাথর ধারণ করলে তো আবার খারাপ ফল হতে পারে শুনেছি।"

নির্মল বাবু রুমাল দিয়ে চশমা মুছতে মুছতে বললেন - " এসব কথা বিস্তর বলতে গেলে অনেক সময় লাগবে, তবে সচরাচর পাথরের ক্ষতি করবার ক্ষমতা থাকে না - যদিয়ও এর ব্যতিক্রম আছে বইকি। এবার বলুন আপনারা কি পাথর কিনতে এসেছেন?"

ওরা গোমেদের খোজ করছে শুনে নির্মল বাবু একটা দেরাজ খুলে সাদা কাপড়ের কয়ক্টা পুটলি বার করে ওদের সামনে রাখলেন। তিন পুটলি থেকে তেন ধরনের গোমেদ দেখালেন নির্মল বাবু। ফিকে হলুদ থেকে ঘন লালচে অব্ধি রঙের পার্থক্য। অনেক বেছে ওরা একটা গোমেদ পছন্দ করল। পাথরটাকে যত্ন করে পাল্লায় ওজন করে দাম কশে দিলেন নির্মল বাবু। রতি ইতিমধ্যে চেয়ার ছেরে উঠে পরে দেয়ালের গায় আলমারিতে সাজানো অন্য পাথর দেখতে শুরু করেছে। একটা পাথর আঙুল দিয়ে দেখিয়ে জিজ্ঞাস করল - " এই নীল পাথরটা বেশ সুন্দর - এটার কত দাম?"

"ওটা নীলা - খুব দামি পাথর", বললেন নির্মল বাবু।

"আপনি বলুন না কত দাম", জেদ ধরল রতি।

"দেখুন নীলা একটা এমনি পাথর যেটা সবাইকে সুট নাও করতে পারে - তাই আমরা জ্যোতিষীর গণনা ছাড়া চট করে ওই ধরনের পাথর বিক্রি করি না।"

"আমি খদ্দের - আমার ইচ্ছে হোলে আমি কিনব এতে তো আপনার আপত্তি থাকা উচিত না।" বেশ ঝাঁজের সাথেই কথা-গুল বলল রতি। নিরমল বাবু কথা না বারিয়ে কেস থেকে পাথরটা নিয়ে ওজন করে দাম জানালেন - "সাতেরও হাজার আটশ টাকা।" ভদ্রলোকের ভাব দেখে মনে হল যে ওনার ধারনা রতি দাম শুনে পিছিয়ে যাবে। রতিকে ওনার চিনতে ভুল হয়েছে। রাহুল পরিষ্কার বুঝতে পারছিল রতির জেদ চরে গেছে। ওই নীলাটা রতি কিনেই ছাড়বে। নিজের ব্যাগ থেকে ক্রেডিট কার্ড বার করে বলল - "ভিসা কার্ড চলবে তো?"

দাম চুকিয়ে রাহুল আর রতি দোকান থেকে বেরিয়ে এলো। বাইরে জেন লোকের ভিড় আরও বেরে গেছে। গারি, রিকশা আর স্কুটারের স্রোতে রাস্তায় পা ফেলা দায়। গারির ভিড়ের মধ্যে একটু ফাঁক বুঝে, ভগবানের নাম নিয়ে নেমে পরল রাহুল। দুই হাত উপরে তুলে আরা-আরি ভাবে, রাস্তার স্রোতের সাথে তাল মিলিয়ে পার হল রাহুল। উল্টো ফুটে পৌঁছে পেছনে তাকিয়ে দেখে রতি আটকে গেছে রাস্তার মাঝখানে। কিছু একটা অসুবিধে হচ্ছে রতির। এক হাত দিয়ে তার দিকে ইশারা করছে রতি, অন্য হাতটা তার গলার উপর। কোন আওয়াজ করছে না - ওই ভিড়ে চিৎকার করলেও শোনা যেত না। রতির চোখে একটা অসহায় ভয়ের ছায়া দেখতে পেল রাহুল। আবার রাস্তার গারি কাটিয়ে রতির দিকে এগিয়ে গেল সে। কাছে গিয়ে দেখল রতির সারা গায়ে পাতলা সুতো জরিয়ে গেছে। এসব সুতো এলো কোথা থেকে? বিরক্ত হয় সুতো টেনে ছাড়াতে গেল রাহুল। চমকে হাত সরিয়ে নিতে হল তাকে - সুতটায় জেন ছুরির মত ধার। ওর আঙুল কেটে গিয়ে রক্ত বেরচ্ছে। আর বুঝতে অসুবিধে হল না রাহুলের - ঘুরির মাঞ্জা। রতির দিকে তাকাল, সাবধানে ওর গা থেকে সুতো গুল ছাড়াতে থাকল। চার পাশে গারির স্রোত কখন বন্ধ হয় গেছে। অনেক লোকের ভিড় ওদেরকে ঘিরে।

হিন্দুস্থানি ভাসায় লোকে কথা বলছে - "আভি হাসপাতাল লেকে চালো।"

"বেচারি - বরি চোট লাগি ...।"

রতি আস্তে আস্তে টলে পরেছে রাহুলের কোলের উপর। তার মুখে কোন আওয়াজ নেই কিন্তু চোখে একটা অস্ফুট মিনতি - "আমাকে বাচাও।" রতির হাতটা গলা থেকে শরে এসেছে। ওর গলার উপর লাল দাগটা কিসের দাগ? ঠিক জেন রতির গলার উপর দিয়ে দেউ সিঁদুর দিয়ে দাগ টেনে দিয়েছে। সুধু এই দাগটা সিঁদুরের নয় এটা রক্তের দাগ। রাহুল সব কিছু ঝাপসা বোধ করছিল - "হাসপাতাল - হ্যাঁ এখনি একটা হাসপাতালে নিয়ে গেলে রতি বেচে যাবে। রতির চোখ বুজে আসছে, ওর প্রাণশক্তি যেন অতি দ্রুত ম্লান হয় আসছে। শক্ত করে মুঠ করা হাতের আঙুল আলগা হয় গেল। একটা ছোট্ট নীল পাথর রতির হাত থেকে জহুরি বাজারের রাস্তায় গড়িয়ে পরল।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই অক্টোবর, ২০১৭ রাত ৮:১৬
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

"আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথঃ দ্য আয়নাঘর ফাইলস"..

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১০ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৯

"আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথঃ দ্য আয়নাঘর ফাইলস"
-একজন গুমের শিকার মানুষের চোখে একটি ভয়াবহ সত্যের দলিল।

“আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথ: দ্য আয়নাঘর ফাইলস”- নামটি যতটা আকর্ষণীয়, বইটির ভেতরের সত্য তার চেয়েও বেশি নির্মম, বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষের অহংকার ও বুদ্ধিমত্তার ভ্রান্ত ধারণা

লিখেছেন শেরজা তপন, ১০ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৫২


উৎসর্গঃ ব্লগার রাজীব নুর( ঈশ্বর বিশ্বাসের কোল ঘেঁষে যাওয়া কোন লেখা এলেই যিনি লেখককে ভীষন সন্দেহের চোখে দেখেন- ভাবেন; কি অদ্ভুত কথা- ইনি দেখি ঈশ্বর বিশ্বাসী!!))
ধর্ম ও বিজ্ঞান: সংঘর্ষ না... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঠেলায় নাম বাবাজি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:১৯


সময়টা সরকারের জন্য মোটেও ভালো যাচ্ছে না। একদিকে গ্যাস আর বিদ্যুতের সংকটে মানুষ প্রতিদিন কষ্টে দিন কাটাচ্ছে, অন্যদিকে সরকারের একের পর এক সিদ্ধান্ত নেটিজেনদের বাধার মুখে পড়ছে। ফলে সরকার নতুন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনার মত তারেক জিয়াও কি ভারতে ইলিশ পাচার করছে?

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ১০ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:২৬



চলছে ইলিশের ভরা মৌসুম কিন্তু বাজারে কোন ইলিশ নেই.... ইলিশ নেই বললে ভুল হবে ইলিশ আছে কিন্তু উহা সাধারণ মানুষের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আওয়ামীলীগ আমলের ১৭ টি বছর... ...বাকিটুকু পড়ুন

~~~সংশয়~~~

লিখেছেন জটিল ভাই, ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:০৩

♦أَعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشِّيْطَانِ الرَّجِيْمِ (বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহ্'র নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি)
♦بِسْمِ ٱللَّٰهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ (পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহ্'র নামে)
♦ٱلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ (আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক)


(ছবি নেট হতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×