somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দুর্বোধ্য

২৯ শে মে, ২০১৭ রাত ৮:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




' কিরে টিনি চিনতে পারছিস ? ' পিছনে ফিরে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থতমত হয়ে যায় টিনি । বরং তার বন্ধু নীতাই বলে ওঠে ' আরে স্মিতাদি না ? বাপরে , কতদিন পর দেখা । '

স্মিতা ধীঁলো । টিনি মানে তনিমাদের থেকে কয়েকবছরের সিনিয়র । তাদের কমপ্লেক্সেই থাকতো ।

ক্ষতকে মানুষ খুব যত্ন করে সারানোর চেষ্টা করে । না সারলে ভোলার চেষ্টা করে । স্মৃতিকেও সবাই ভুলতেই চায় । দুটোর কোনোটারই বিলুপ্তী নেই ! আজ স্মৃতি যেন ঝড়ের মতো এলোপাথারি তার মনে জড়ো হচ্ছে ।

তখন সে ক্লাস এইট । সেদিন কমপ্লেক্স থেকে বেরিয়ে সবে রাস্তায় উঠতে যাবে , এমনসময় একটা ছেলে ঠিকমতো সাইকেলের ব্রেক চাপতে না পারায় প্রায় তার গায়ে পড়ছিল । যদিও পড়েনি । তবে টিনি পড়ে গিয়েছিল । সেদিনও সাথে ছিল নিতা । সেই তাকে তুলেছিল । আর ছেলেটা ভীতুস্বরে বলেছিল ' সরি ইয়ার , লাগি তো নেহি ? ' ঝাঁঝিয়ে জবাব দিয়েছিল টিনি ' সরি মতলব ? সরি বললেই সব হয়ে গেলো ! চোখগুলো পকেটে নিয়ে ঘোরো নাকি ? ' ছেলেটি দ্বিতীয়বার করুনস্বরে বলেছিল সরি । কিন্তু টিনি তার দিকে না তাকিয়েই সেখান থেকে চলে গিয়েছিল । ' জানিস , এরা ননবেঙ্গলী । আমাদের কমপ্লেক্সে নতুন এসেছে । যেতে যেতে বলেছিল নীতা ।

তারপর একদিন বিকেলে আবার রাস্তায় ছেলেটির মুখোমুখি হয় সে । ছেলেটিই কথা শুরু করেছিল । ' হাই , আমি ঋষভ অগ্নিহোত্রী । ইলেভেন স্ট্যান্ডার মে হু । ওর তুম? 'এদিকে টিনি নিরুত্তর । তখন ঋষভ আবার বলে ' নাম ভি নেহী বাতায়োগী কেয়া ? '

এবার টিনি একটু নীচু স্বরে বলে ' তনিমা চ্যাটার্জ্জী । ক্লাস এইটে পড়ি । ' ঋষভ হাসি মেশানো স্বরে বলে ' হাই , তন্নু ।' টিনি সাথে সাথে জবাব দেয় ' তন্নু না টিনি । আমায় সবাই টিনি ডাকে ।' ঋষভ আবার হেসেই বলে ' আমি তন্নু বলি ? ' জবাবের অপেক্ষা না করে সে আরো বলে ' তুমলোগ ব্রাহ্মীণ হো কেয়া ? ম্যঁয় ভি অগ্নিহোত্রী ব্রাহ্মীণ হু । ' এবারে টিনি অবাক কন্ঠে বলে ' ব্রাহ্মীণ দেখে কথা বলো নাকি ? '
জবাবে ঋষভ সলজ্জ কন্ঠে বলে ' আরে নেহী নেহী । হামলোগোকে বিচ সিমিলার হ্যয় । ইসিলিয়ে ! '

কোনো ঘটনা কি নিজে থেকে ঘটে যায় ? নাকি তাকে ঘটানো হয় ? এই নিয়ে বহু ভেবেও কোনো জবাব পায়নি টিনি ! কারন সে সময় তাদের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা ঘটে যাচ্ছিল । যদিও প্রতিবারই তার ব্যবহারটা রুক্ষ হচ্ছিল । একবার কয়েকজন বন্ধুর সাথে সে বাড়ি ফিরছিল । পথে ঋষভের সাথে দেখা । ঋষভই প্রথম কথা শুরু করেছিল । কিছুক্ষণ বাদে টিনি বলেছিল ' তোমার কি নিজের কোনো ফ্রেন্ড নেই ? সবসময় মেয়েদের সাথে কথা বলো কেনো ? ' একথায় ঋষভসহ তার বন্ধুরাও অবাক হয়ে পড়েছিল !
মাঠে ফুটবল নিয়ে ড্রিবল করছিল ঋষভ । সামন্য দূরে দাঁড়িয়ে নিতা নীচু স্বরে বলেছিল ' ছেলেটা দারুন হ্যন্ডসাম না ? কি ব্রাইট কমপ্লেকশন ! ' এর উত্তরটা উঁচু পর্দাতে দিয়েছিল টিনি ' ধ্যেৎ , ছেলেরা বেশী ফর্সা হলে ক্যবলা লাগে । ' নিতা অসস্ত্বি মিশিয়ে বলে ' শুনে ফেলল বোধহয় ! ' টিনি একইভাবে বলে ' বয়ে গেছে । তাছাড়া চাপ নিস না । বাংলা বোঝে না অতো ! '
পরের দিন যখন সে কোচিং ক্লাস থেকে ফিরছিল তখন দেখল ঋষভ কমপ্লেক্সের মেইন গেটে দাঁড়িয়ে আছে । টিনি তাকে দেখেও না দেখার ভান করে ভিতরে চলে গেল । বুঝল ঋষভ তার পিছনে আসছে ।
' আমি আনস্মার্ট আছি ? ' পিছন ফিরে টিনি এই কথার কি উত্তর দেবে ভেবে পায় নি । যদিও তাকে ভাবার সময় না দিয়েই ঋষভ বলেছিল ' জবাব দো তন্নু ' এবারে টিনি বলে ওঠে ' তন্নু না টিনি । '
ম্যাঁয় তো তন্নু হি বুলাউঙ্গা । ইতনা ভি আনস্মার্ট নাহ হু ! কথাগুলো বলে হেসে চলে যেতে যেতে ঋষভ বলেছিল ' বেঙ্গলী সমঝতা হু ।'


এরপর একদিন সন্ধ্যেতে সে প্রাইভেট পড়তে যাচ্ছিল । হঠাৎ ঋষভের সাইকেল থেমেছিল ' রুকো তন্নু ! একটা কথা বলবো । ' টিনি উদাস ভাবে বলে ' এখন আমি পড়তে যাচ্ছি । পরে বোলো । '
' আভি মোমেন্টাম আছে । বাদ মে শায়েদ নেহী হোগা । আভি শুনো না.....
এই মোমেন্ট গেলে আর বলতে পারবে না মানে ? আজকের কথা কাল ভুলে যাও নাকি তুমি ?
একটু তির্যকভাবেই কথাগুলো বলে টিনি । তারপর শান্তভাবে বলে ' আমার পড়ার দেরি হয়ে যাচ্ছে , তুমি পরে বলো প্লিজ ! '

' ও।কে ! হামেশা তোমার বাতই শুননা পড়তা হ্যায়। পাতা নেহী কিঁউ ? ' ঋষভ সম্মতি জানিয়ে বলে । টিনি বিজয়িনীর হাসি হেসে সেখান থেকে চলে যায় ।

সেদিনই কোচিং থেকে ফেরার পথে নিতা বলে ' স্টোরীটা শুনেছিস ? ঋষভ আর স্মিতার ? 'কথাগুলো শুনেও শুনতে পায়না টিনি।
সে বলে' মানে ?' নিতা অবঙ্গার সাথে ' মানে তোর মাথা ' বলে যে গল্প শুনিয়েছিল তার সব শব্দ টিনি শুনতে পায়নি । শুধু মনে হয়েছিল কয়েক 'শ মৌমাছি তার কানের কাছে শব্দ করে হুল ফোটাতে আসছে ।
যদিও এই একই গল্প তারপর সে আরো অনেকের কাছে শুনেছে । আর গল্পের আকার ক্রমশ বেড়েছে । সাথে এটাও জেনেছে ,যেহেতু ঋষভ আর স্মিতারা এলাকায় দুটো মাত্র অবাঙালী ফ্যামিলী হলেও তাদের মধ্যে সদভাব একটুও ছিলো না , তাই এই গল্প নিয়ে তাদের পারিবারিক টেনসন আরো বেড়েছে ।

এরমধ্যেই একদিন ঋষভ হাজির হোলো তার সামনে । হাতে একটা দামি মোবাইল । বলেছিল ' তন্নু , এটা পাপার গিফট । সব ফ্রেন্ডদের নাম সেভ করেছি ।তোমারটা ভি দো ।' টিনা পাল্টা প্রশ্ন করে ' স্মিতাদির নাম্বার আছে ?' সম্মতি জানিয়ে ঋষভ আবার টিনির ফোন নম্বর চায় । সেদিনের কথাটা সে ফোনে বলতে চায় । একথাও বলে । টিনি বলে যে তার পারসোনাল ফোন নেই । এরপর সে যখন তার ল্যান্ডনম্বর চায় তখন টিনি ছোট্ট করে তাকে ' না' বলে । আর মনে মনে বলে ' নায়িকার নম্বর তো আগেই নিয়ে রেখেছ, আর আমার নম্বর দিয়ে কি করবে ? ' তারপরই বাষ্পেভরা চোখ নিয়ে সে সেখান থেকে চলে যায় । কিন্তু বাড়ির কাছে গিয়ে আবার ঋষভের মায়ের সাথে দেখা । উনি জানতে চেয়েছিলেন ঋষভকে কি সে পথে দেখেছে বা কোথায় আছে বলতে পারবে ? টিনি খুব নির্লিপ্তভাবে বলে ' স্মিতাদির সাথে আছে মনে হয় । ' বলেই সেখান থেকে চলে যায় ।

এই ঘটনার কয়েকদিন বাদেই টিনি শোনে ঋষভের বাবা চাকরীসূত্রে স্টেটসে যাচ্ছেন । তারপর ঋষভ চলে যায়। টিনির সাথে দেখা না করেই ।

জীবননদী নিজের মতো এগিয়ে যায় । ঘটনাগুলোকে তীরে ফেলে । সে কারনেই স্মিতারা কবে যে কোথায় চলে যায় টিনি আর খোঁজ রাখেনি ।

তারপর আজ স্মিতার সাথে দেখ। নিতাই প্রশ্নটা করে স্মিতাকে ' তুমি এখন কোথায় থাকো ? ' উত্তর আসে ' আমেরিকা ' । শব্দটা তীরের মতো বেঁধে টিনির কানে । ওটাই কি সেই দেশ যেখানে তার বহুচেনা বা একেবারেই অচেনা একটা নাম থাকে । ঋষভ ।

এদিকে স্মিতা বলে তার স্বামী এই শপিং মলে অন্যদিকে আছে । তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য তাকে ফোন করে ।
একথা শুনে টিনির মনে হয় মলের ঠান্ডা বাতাস কয়েকগুণ বেড়ে গেছে । সে যেন জমে ঠান্ডা কঠিন বরফ হয়ে যাবে । সে কুর্তি দেখার অছিলায় অন্যদিকে ফেরে ।
' ইনসে মিঁলো । বিবেক । আমার হাবি ।' কথাগুলোয় সম্বিত ফেরে টিনির । সে দেখে তার সামনে দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ অচেনা এক পুরুষ ।

ফেরার পথে নিতা বলে ' ব্যাপারটা কেমন হোলো বলত? সবাই তো জানত স্মিতার সাথে ঋষভের ....।একটু থেমে আবার বলে ' জানিস প্রথমে আমার মনে হোতো কি ঋষভ বোধহয় তোর উপর ফিদা ! কিন্তু তারপর ....।যাক এখন তুই বলিস তো সোস্যালমিডিয়ায় ঋষভের খোঁজ করে দেখি ?' এবারে রাগত স্বরে দ্রুততার সাথে টিনি বলে ওঠে ' কেনো ? কেউ কি খোঁজ রেখেছে ? না বলেই তো চলে গেছে ! ভার মে যায়ে ঋষভ অগ্নিহোত্রী ! মেরেকো কেয়া ? ' কিন্তু মনে মনে অনুভব করে যে, যখন থেকে সে বিবেককে দেখেছে তখন থেকেই খুব রিলিফ লাগছে । তবে এর কারনটা , দুর্বোধ্য ঠেকে !

"Even after you ruined me for any other,
I cannot regret you. Even as I cleave
the flesh of wanting from the bone,
I hope the night sky is pretty
wherever you are."

[ বি : দ্র : -- শেষের ইংরেজি কোটটার নেট থেকে সংগ্রহ করা । লেখকের নাম না থাকায় দিতে পারলাম না । নিজ গুণে মার্জনা করবেন , আশা রাখি । ]
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে মে, ২০১৭ রাত ৯:০১
১৩টি মন্তব্য ১৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নির্ভীক অভিযাত্রা

লিখেছেন আকিব হাসান জাভেদ, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৩

আমি চলি ঐ প্রান্তে,
যেখানে অসৎ থেকে মানুষ হয়েছে সৎ।
আমি চলি উড়ে উড়ে,
ডানাহীন পাখির মতো,
যেখানে দুর্বলতাকে জয় করে
হয়েছে দুঃসাহস।
আমি চলি শক্তির সাথে,
দেহ যায় না ঝুঁকে।
করি না প্রণাম,
করি না চাটুকারিতা আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

চুপ - একদম চুপ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭



আমরা শুধু চুপ থাকবো -
আমাদের কথা বলার মুখ নেই
আমাদের দেখার মতো চোখ নেই
আমাদের শোনার মতো কান নেই
মনে হয়, মনে হয় -
আমাদের হাত-পাও নেই।

আমাদের বিবেক নেই
আমাদের চিন্তা-চেতনাও নেই
আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

তবুও বেঁচে আছি

লিখেছেন সালমান মাহফুজ, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:১৫

এই নিথর নগ্ন শরীরের প্রতিটা পল্লবের করুণ আর্তচিৎকার
পৃথিবীর মাটি ভেদ করে কোনদিনও
ওই মৃত কানে পৌঁছাবে না
আমি জেনে গেছি ।

বিপন্ন আকাশের গায়ে লেপ্টে থাকা
দেবতাদের প্রতারণার ফাঁদ আর মিথ্যা প্রলোভনের গল্পগুলি
আমার শুনতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুলাই মিউজিয়ামঃ স্মৃতির বিরুদ্ধে বিস্মৃতির লড়াই....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫৩



জুলাই মিউজিয়ামঃ স্মৃতির বিরুদ্ধে বিস্মৃতির লড়াই....

১৫ আগস্ট আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে গিয়েছিলাম জুলাই মিউজিয়ামে। সেখানে গিয়ে মনে হলো- এটি শুধু একটি জাদুঘর নয়; এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক ভয়াবহ অধ্যায়ের বিরুদ্ধে... ...বাকিটুকু পড়ুন

হিজিবিজি নদী চলে মন উদাসের দেশে !

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:০২





হিজিবিজি নদী চলে মন উদাসের দেশে !

...................................................................
মানচিত্রের আঁকাবাঁকা রেখায় তারে পাবেনা,
সে নদী তো চেনা কোনো ঠিকানায় যাবে না।
তার কোনো কূল নেই, নেই কোনো ঘাট,
সে বয়ে চলে একা, বুক জুড়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×