
' কিরে টিনি চিনতে পারছিস ? ' পিছনে ফিরে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থতমত হয়ে যায় টিনি । বরং তার বন্ধু নীতাই বলে ওঠে ' আরে স্মিতাদি না ? বাপরে , কতদিন পর দেখা । '
স্মিতা ধীঁলো । টিনি মানে তনিমাদের থেকে কয়েকবছরের সিনিয়র । তাদের কমপ্লেক্সেই থাকতো ।
ক্ষতকে মানুষ খুব যত্ন করে সারানোর চেষ্টা করে । না সারলে ভোলার চেষ্টা করে । স্মৃতিকেও সবাই ভুলতেই চায় । দুটোর কোনোটারই বিলুপ্তী নেই ! আজ স্মৃতি যেন ঝড়ের মতো এলোপাথারি তার মনে জড়ো হচ্ছে ।
তখন সে ক্লাস এইট । সেদিন কমপ্লেক্স থেকে বেরিয়ে সবে রাস্তায় উঠতে যাবে , এমনসময় একটা ছেলে ঠিকমতো সাইকেলের ব্রেক চাপতে না পারায় প্রায় তার গায়ে পড়ছিল । যদিও পড়েনি । তবে টিনি পড়ে গিয়েছিল । সেদিনও সাথে ছিল নিতা । সেই তাকে তুলেছিল । আর ছেলেটা ভীতুস্বরে বলেছিল ' সরি ইয়ার , লাগি তো নেহি ? ' ঝাঁঝিয়ে জবাব দিয়েছিল টিনি ' সরি মতলব ? সরি বললেই সব হয়ে গেলো ! চোখগুলো পকেটে নিয়ে ঘোরো নাকি ? ' ছেলেটি দ্বিতীয়বার করুনস্বরে বলেছিল সরি । কিন্তু টিনি তার দিকে না তাকিয়েই সেখান থেকে চলে গিয়েছিল । ' জানিস , এরা ননবেঙ্গলী । আমাদের কমপ্লেক্সে নতুন এসেছে । যেতে যেতে বলেছিল নীতা ।
তারপর একদিন বিকেলে আবার রাস্তায় ছেলেটির মুখোমুখি হয় সে । ছেলেটিই কথা শুরু করেছিল । ' হাই , আমি ঋষভ অগ্নিহোত্রী । ইলেভেন স্ট্যান্ডার মে হু । ওর তুম? 'এদিকে টিনি নিরুত্তর । তখন ঋষভ আবার বলে ' নাম ভি নেহী বাতায়োগী কেয়া ? '
এবার টিনি একটু নীচু স্বরে বলে ' তনিমা চ্যাটার্জ্জী । ক্লাস এইটে পড়ি । ' ঋষভ হাসি মেশানো স্বরে বলে ' হাই , তন্নু ।' টিনি সাথে সাথে জবাব দেয় ' তন্নু না টিনি । আমায় সবাই টিনি ডাকে ।' ঋষভ আবার হেসেই বলে ' আমি তন্নু বলি ? ' জবাবের অপেক্ষা না করে সে আরো বলে ' তুমলোগ ব্রাহ্মীণ হো কেয়া ? ম্যঁয় ভি অগ্নিহোত্রী ব্রাহ্মীণ হু । ' এবারে টিনি অবাক কন্ঠে বলে ' ব্রাহ্মীণ দেখে কথা বলো নাকি ? '
জবাবে ঋষভ সলজ্জ কন্ঠে বলে ' আরে নেহী নেহী । হামলোগোকে বিচ সিমিলার হ্যয় । ইসিলিয়ে ! '
কোনো ঘটনা কি নিজে থেকে ঘটে যায় ? নাকি তাকে ঘটানো হয় ? এই নিয়ে বহু ভেবেও কোনো জবাব পায়নি টিনি ! কারন সে সময় তাদের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা ঘটে যাচ্ছিল । যদিও প্রতিবারই তার ব্যবহারটা রুক্ষ হচ্ছিল । একবার কয়েকজন বন্ধুর সাথে সে বাড়ি ফিরছিল । পথে ঋষভের সাথে দেখা । ঋষভই প্রথম কথা শুরু করেছিল । কিছুক্ষণ বাদে টিনি বলেছিল ' তোমার কি নিজের কোনো ফ্রেন্ড নেই ? সবসময় মেয়েদের সাথে কথা বলো কেনো ? ' একথায় ঋষভসহ তার বন্ধুরাও অবাক হয়ে পড়েছিল !
মাঠে ফুটবল নিয়ে ড্রিবল করছিল ঋষভ । সামন্য দূরে দাঁড়িয়ে নিতা নীচু স্বরে বলেছিল ' ছেলেটা দারুন হ্যন্ডসাম না ? কি ব্রাইট কমপ্লেকশন ! ' এর উত্তরটা উঁচু পর্দাতে দিয়েছিল টিনি ' ধ্যেৎ , ছেলেরা বেশী ফর্সা হলে ক্যবলা লাগে । ' নিতা অসস্ত্বি মিশিয়ে বলে ' শুনে ফেলল বোধহয় ! ' টিনি একইভাবে বলে ' বয়ে গেছে । তাছাড়া চাপ নিস না । বাংলা বোঝে না অতো ! '
পরের দিন যখন সে কোচিং ক্লাস থেকে ফিরছিল তখন দেখল ঋষভ কমপ্লেক্সের মেইন গেটে দাঁড়িয়ে আছে । টিনি তাকে দেখেও না দেখার ভান করে ভিতরে চলে গেল । বুঝল ঋষভ তার পিছনে আসছে ।
' আমি আনস্মার্ট আছি ? ' পিছন ফিরে টিনি এই কথার কি উত্তর দেবে ভেবে পায় নি । যদিও তাকে ভাবার সময় না দিয়েই ঋষভ বলেছিল ' জবাব দো তন্নু ' এবারে টিনি বলে ওঠে ' তন্নু না টিনি । '
ম্যাঁয় তো তন্নু হি বুলাউঙ্গা । ইতনা ভি আনস্মার্ট নাহ হু ! কথাগুলো বলে হেসে চলে যেতে যেতে ঋষভ বলেছিল ' বেঙ্গলী সমঝতা হু ।'
এরপর একদিন সন্ধ্যেতে সে প্রাইভেট পড়তে যাচ্ছিল । হঠাৎ ঋষভের সাইকেল থেমেছিল ' রুকো তন্নু ! একটা কথা বলবো । ' টিনি উদাস ভাবে বলে ' এখন আমি পড়তে যাচ্ছি । পরে বোলো । '
' আভি মোমেন্টাম আছে । বাদ মে শায়েদ নেহী হোগা । আভি শুনো না.....
এই মোমেন্ট গেলে আর বলতে পারবে না মানে ? আজকের কথা কাল ভুলে যাও নাকি তুমি ?
একটু তির্যকভাবেই কথাগুলো বলে টিনি । তারপর শান্তভাবে বলে ' আমার পড়ার দেরি হয়ে যাচ্ছে , তুমি পরে বলো প্লিজ ! '
' ও।কে ! হামেশা তোমার বাতই শুননা পড়তা হ্যায়। পাতা নেহী কিঁউ ? ' ঋষভ সম্মতি জানিয়ে বলে । টিনি বিজয়িনীর হাসি হেসে সেখান থেকে চলে যায় ।
সেদিনই কোচিং থেকে ফেরার পথে নিতা বলে ' স্টোরীটা শুনেছিস ? ঋষভ আর স্মিতার ? 'কথাগুলো শুনেও শুনতে পায়না টিনি।
সে বলে' মানে ?' নিতা অবঙ্গার সাথে ' মানে তোর মাথা ' বলে যে গল্প শুনিয়েছিল তার সব শব্দ টিনি শুনতে পায়নি । শুধু মনে হয়েছিল কয়েক 'শ মৌমাছি তার কানের কাছে শব্দ করে হুল ফোটাতে আসছে ।
যদিও এই একই গল্প তারপর সে আরো অনেকের কাছে শুনেছে । আর গল্পের আকার ক্রমশ বেড়েছে । সাথে এটাও জেনেছে ,যেহেতু ঋষভ আর স্মিতারা এলাকায় দুটো মাত্র অবাঙালী ফ্যামিলী হলেও তাদের মধ্যে সদভাব একটুও ছিলো না , তাই এই গল্প নিয়ে তাদের পারিবারিক টেনসন আরো বেড়েছে ।
এরমধ্যেই একদিন ঋষভ হাজির হোলো তার সামনে । হাতে একটা দামি মোবাইল । বলেছিল ' তন্নু , এটা পাপার গিফট । সব ফ্রেন্ডদের নাম সেভ করেছি ।তোমারটা ভি দো ।' টিনা পাল্টা প্রশ্ন করে ' স্মিতাদির নাম্বার আছে ?' সম্মতি জানিয়ে ঋষভ আবার টিনির ফোন নম্বর চায় । সেদিনের কথাটা সে ফোনে বলতে চায় । একথাও বলে । টিনি বলে যে তার পারসোনাল ফোন নেই । এরপর সে যখন তার ল্যান্ডনম্বর চায় তখন টিনি ছোট্ট করে তাকে ' না' বলে । আর মনে মনে বলে ' নায়িকার নম্বর তো আগেই নিয়ে রেখেছ, আর আমার নম্বর দিয়ে কি করবে ? ' তারপরই বাষ্পেভরা চোখ নিয়ে সে সেখান থেকে চলে যায় । কিন্তু বাড়ির কাছে গিয়ে আবার ঋষভের মায়ের সাথে দেখা । উনি জানতে চেয়েছিলেন ঋষভকে কি সে পথে দেখেছে বা কোথায় আছে বলতে পারবে ? টিনি খুব নির্লিপ্তভাবে বলে ' স্মিতাদির সাথে আছে মনে হয় । ' বলেই সেখান থেকে চলে যায় ।
এই ঘটনার কয়েকদিন বাদেই টিনি শোনে ঋষভের বাবা চাকরীসূত্রে স্টেটসে যাচ্ছেন । তারপর ঋষভ চলে যায়। টিনির সাথে দেখা না করেই ।
জীবননদী নিজের মতো এগিয়ে যায় । ঘটনাগুলোকে তীরে ফেলে । সে কারনেই স্মিতারা কবে যে কোথায় চলে যায় টিনি আর খোঁজ রাখেনি ।
তারপর আজ স্মিতার সাথে দেখ। নিতাই প্রশ্নটা করে স্মিতাকে ' তুমি এখন কোথায় থাকো ? ' উত্তর আসে ' আমেরিকা ' । শব্দটা তীরের মতো বেঁধে টিনির কানে । ওটাই কি সেই দেশ যেখানে তার বহুচেনা বা একেবারেই অচেনা একটা নাম থাকে । ঋষভ ।
এদিকে স্মিতা বলে তার স্বামী এই শপিং মলে অন্যদিকে আছে । তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য তাকে ফোন করে ।
একথা শুনে টিনির মনে হয় মলের ঠান্ডা বাতাস কয়েকগুণ বেড়ে গেছে । সে যেন জমে ঠান্ডা কঠিন বরফ হয়ে যাবে । সে কুর্তি দেখার অছিলায় অন্যদিকে ফেরে ।
' ইনসে মিঁলো । বিবেক । আমার হাবি ।' কথাগুলোয় সম্বিত ফেরে টিনির । সে দেখে তার সামনে দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ অচেনা এক পুরুষ ।
ফেরার পথে নিতা বলে ' ব্যাপারটা কেমন হোলো বলত? সবাই তো জানত স্মিতার সাথে ঋষভের ....।একটু থেমে আবার বলে ' জানিস প্রথমে আমার মনে হোতো কি ঋষভ বোধহয় তোর উপর ফিদা ! কিন্তু তারপর ....।যাক এখন তুই বলিস তো সোস্যালমিডিয়ায় ঋষভের খোঁজ করে দেখি ?' এবারে রাগত স্বরে দ্রুততার সাথে টিনি বলে ওঠে ' কেনো ? কেউ কি খোঁজ রেখেছে ? না বলেই তো চলে গেছে ! ভার মে যায়ে ঋষভ অগ্নিহোত্রী ! মেরেকো কেয়া ? ' কিন্তু মনে মনে অনুভব করে যে, যখন থেকে সে বিবেককে দেখেছে তখন থেকেই খুব রিলিফ লাগছে । তবে এর কারনটা , দুর্বোধ্য ঠেকে !
"Even after you ruined me for any other,
I cannot regret you. Even as I cleave
the flesh of wanting from the bone,
I hope the night sky is pretty
wherever you are."
[ বি : দ্র : -- শেষের ইংরেজি কোটটার নেট থেকে সংগ্রহ করা । লেখকের নাম না থাকায় দিতে পারলাম না । নিজ গুণে মার্জনা করবেন , আশা রাখি । ]
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে মে, ২০১৭ রাত ৯:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



