somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অপরাহ্নের আঁধার (শেষ)

২৪ শে মার্চ, ২০০৯ রাত ১২:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আকাশের ঘরে হারিকেন বাতির অনুরূপ হলদেটে চাঁদ। সে আলো থোকা থোকা হয়ে আটকে আছে গাছেদের পাতায় পাতায়। জীবন অনেককেই অনেক ধরনের অনাকাঙ্খিত ঘটনার সামনে দাঁড় করায়। যারা এড়িয়ে যেতে পারে তারাই সেরা। সেও পেরেছে। চমৎকার একটা অভিনয় চালিয়ে গেছে। এবং কোন ধরণের দুর্বলতা না দেখিয়েই। কে জানত এভাবে... এমন পরিস্থিতিতে...। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে মেয়েটার জন্য। শুধুই একটা দীর্ঘশ্বাস।
ঝুপরি ঘরটা পেছনে ফেলে সে এগিয়ে যায় আপন ঠিকানায়। একটিবারও পেছনে না তাকিয়ে। তাকালে হয়তো দেখতে পেত একশ টাকার নোটটি মুঠোয় চেপে ঠিক আগের ভঙ্গিতেই বসে আছে বারবনিতা। রক্তলাল চোখ জোড়া ছাপিয়ে ঝর ঝর করে ঝড়ে পড়ছে অশ্র“জল। ফোঁটা ফোঁটা জলে চুপসে যাচ্ছে ঝকঝকে নোট। ঘরে ঢুকে হারিকেন জ্বালানোর পর থেকেই সে সামলে রাখছিল এ বাঁধভাঙা জোয়ারকে, ভীষণ চাতুরতায় লুকিয়ে ফেলেছিল নিজের চমকে ওঠা। হারিকেনের আলোয় ওই চেনা মুখটা দেখার পর থেকেই মাথা নিচু করে নিজেকে অচেনা রাখার প্রাণান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছিল সে। তবে কী পারলো না? চিনে ফেলল তাকে!
দুহাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে ওঠে মেয়েটা। আঙুলের ভাঁজে আটকে থাকা একশ টাকার নোটটা ছুঁয়ে থাকে তার কপাল, চোখের কোণা। কটা একশ টাকার নোটাই যে তার নিয়তি হবে সেটা তো তার কপালে লেখা হয়েই ছিল পাঁচ বছর আগে। নবীনপুর মফস্বলের নদীঘাটের সেই ঝাকড়া বটগাছটার নিচে। বায়োস্কোপের ছবির মত সরে যেতে যেতে একে একে ফুটে উঠে অতীতের বিবর্ণ কিছু সময়।
সময় তখন কত? পাঁচটা, সাড়ে পাঁচটা, পৌনে ছটা? হয়তবা। কথা কিন্তু ছিল তেমনই। বেলা অপরাহ্নের সময় সে দাড়িয়ে থাকবে নদীর ঘাটের বুড়ো বটগাছটার নিচে। হাসান আসলে ওরা দুজনে পালিয়ে চলে আসবে ঢাকা। গৃহশিক্ষক ছাত্রীর প্রেম যে ওর বাবা মা কেউই মনে নেবে না সেটা আগে থেকেই জানা আছে সাবিনার। সে জন্যই তো রগচটা বাবার শাসনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিল পালানোর এ সিদ্ধান্ত। ম্ত্রা তো আজকের দিনটা। কাল থেকেই শুরু করবে তার নতুন সুখী জীবন।
অপরাহ্ন মিলিয়ে সন্ধ্যার আঁধার নামে। নদীর নোনা হাওয়া ডানা ঝাপটায় সাবিনার শঙ্কিত চোখেমুখে। এক অজানা ভয়ে বুকের ভেতরটা হীম হয়ে আসে। সত্যি কী হাসান আসলো না? এতক্ষণে বাড়িতে সাড়া পড়ে গেছে। বাবা হয়তো রামদা নিয়ে ঘুরছে মহল্লায় তাকে খুঁজতে। বাড়িতে ফেরার পথ তার সম্পূর্ণ বন্ধ। কোন মুখেই বা বাড়িতে ফিরবে সে? তাহলে... তাহলে সে কোথায় যাবে? নাকি আত্মহত্যা করবে? ঝাপিয়ে পড়বে ওই নদীর বুকে? অথবা ওড়না পেঁচিয়ে ঝুলে পড়বে বটের শাখায়? নাকি একাই পাড়ি দেবে ঢাকা?
নানা রকমের অশুভ চিন্তাভাবনায় পরিবৃতা হয়ে দিশা হারিয়ে ফেলে সাবিনা। কিছু ভেবে না পেয়ে মোহাচ্ছন্ন মাতালের মতই উঠে পড়ে ট্রলারে।
পর দিন এসে পড়ে ঢাকা। আবিষ্কার করে এক অন্য জগত। পরিচিত পরিবেশ, মা বাবার মায়ার বন্ধনের বদলে রূঢ় বাস্তবতা। সহায় সম্বলহীন, স্বজনহীন, অন্নহীন অসহায় সাবিনা বিক্ষিপ্তভাবে ঘুরে বেড়ায় শহরের এখান থেকে ওখানে। কাজ জোটে না। অপূর্ব মুখশ্রীর কারণে কেউ কাজের বুয়া হিসেবেও নিতে চায় না। গৃহকত্রীরা ভাবে সুযোগসন্ধানী কিংবা অন্য কিছু। সোয়েটার বোনার কারখানায় যাও চাকরীটা পেয়েছিল, কিন্তু কাজ শেখানোর ছলে শরীরের এখানে সেখানে উপরস্থ কর্মকর্তার অস্থির আঙুল তাকে সেখানেও টিকতে দেয় নি। কী করবে সে? কী?
কোন কাজ নেই, আশ্রয় নেই, কেবল ক্ষুধা। ক্ষুধা গিলে খাবে যেন তার নাড়িভুড়ি কলজে হৃপিণ্ড। ক্ষুধার চোটে বমি আসতে চায়। অবসন্ন দেহ নিয়ে সে পড়ে ছিল কোথায় সে নিজেও জানে না। শুধু জানে ভুল করে ফেলেছে, চরম ভুল। নিজেকে নিয়ে আর একটু ভাবতে পারলে তার পুরো জীবনটাই বদলে যেত। কারণ, হাসানরা কখনও থেমে থাকে না, থামেনা যেমন সঙ্গব সময়।
শুয়ে থেকেও মাথা ঘুরছিল। নাকি জ্ঞানই হারাচ্ছিল। ঠিক তখনই শুনতে পায় মাথার কাছে কে যেন ফিসফিস করে বলছেÑ ‘এই? এই ওঠ?’
অবাক হয়ে যায় সাবিনা। জোর করে উঠে বসায় ক্লান্ত শরীরটাকে। দেখে অপরিচিত একটা লোক দাড়িয়ে। মুখে দাঁতেল হাসি। চোখেমুখে প্রানহীন রুক্ষতা। কে এ লোক?
‘কত নেস?’
বুঝে উঠতে পারে না অঙ্গনা, প্রশ্নভরা চোখে তাকায় অপরিচিত লোকটার দিকে। ওড়না দেয় মাথায়।
‘হুহ্! মাগীর আবার সতীপনা? অত ঢং এর দরকার নাই। কত নিবি তাই ক?’ আশে পাশে চলাফেরা করতে থাকা লোকেদের কান বাঁচিয়ে যথা সম্ভব ঝাঁজালো গলায় বলে ওঠে লোকটা।
তখনই বুঝতে পারে সে কিসের আহবান করছে লোকটা? দপ করে ওঠে মাথার ভেতরটা। কড়া গলায় লোকটাকে কিছু বলতে যেয়েও পারে না। তখনই টের পায় পেট থেকে ক্ষুধার বুদ বুদ উঠে দলা পাকাচ্ছে গলার কাছে, দলা পাকাচ্ছে বুক ঠেলা কান্না, আজীবনের অনিশ্চয়তা।
এক সময় টলমল পায়ে উঠে দাঁড়ায় সে। জড়তা মেশানা গলায় বলেÑ ‘দেন, যা খুশি।’
তখন দিনের শেষ, বেলা অপরাহ্ন। একটা ক্ষুধিত শরীর ভুলের মাশুল দিতে পা বাড়ায় অন্ধকারের পথে। যেখানে কেবলই রাত। কেবলই আঁধার, নিঃস্ব সে আঁধারে ভাসে দিনের বসুন্ধরা।
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবন চালাতে শহরে থাকা কিন্তু বেঁচে থাকা যেন বাড়িতেই

লিখেছেন Sujon Mahmud, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৯

ঈদের ছুটিটা কেমন যেন চোখের পলকে শেষ হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল, এই তো সেদিন বাড়ি গেলাম—মায়ের হাতের রান্না, বাবার গল্প, ছোট মেয়ের হাসি, আর স্ত্রীর সেই নীরব অভিমান… সবকিছু মিলিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

×