somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ ঝলসানো গোলাপ

০৩ রা মে, ২০১৩ রাত ৩:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রাস্তায় নামলাম ।

আগে ধারণা ছিল স্পিডব্রেকারে শুধু গাড়িই 'উষ্টা' খায়, আমার ধারণা ভুল । মানুষও খায় । হাঁটতে হাঁটতে এইমাত্র আমিও উষ্টা খেলাম একটা নিরীহ স্পিডব্রেকারে ।

ভরদুপুরে প্রায় জনবিরল রাজপথ । তাই ফুটপাথ ছেড়ে রাস্তায় নেমে হাঁটছি । অনেকক্ষণ পর পর দুয়েকটা গাড়ি কিংবা বাইক হুশহাশ করে আসছে-যাচ্ছে । নিজেই পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে । আমার সরে দাঁড়াতে হচ্ছে না । শুধু স্পিডব্রেকারেই ঢালু অবাধ্যতা । সরে তো জায়গা দিচ্ছেই না বরং উষ্টা খাওয়াচ্ছে ।

একটু আগেই সুস্মিতাদের কলেজটা পেছনে ফেলে এলাম । সুস্মিতাও কি আমার জীবনে স্পিডব্রেকারের মতো ? হতে পারে । স্পিডব্রেকারে উষ্টা খেয়ে অনেক সময় গাড়ির বাম্পার মচকে যায় । সুস্মিতার উপর উষ্টা খেয়ে সম্ভবত আমারও মচকেছে ।

সোজাসাপটা বলতে গেলে গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে ওর পিছে 'ঘুরেছি' । কে কী নাম সংজ্ঞায়িত করবে তাতে আমার কিছু আসে যায় না, আমার কাছে এটা ভালোবাসা । যাকে বলে হান্ড্রেড পারসেন্ট লাভ । দাবির পক্ষে ভালো যুক্তিও আছে আমার । ওর প্রতি ভালো লাগা শুধু মুগ্ধতায় আটকে ছিল না, সেখানে অনেক স্বপ্নও জুড়েছিল । সুখী সংসার আর সন্তানের লালনীল স্বপ্ন । হুমায়ূন আহমেদ তাঁর একটা লেখায় বলেছিলেন, পুরুষরা নাকি প্রেমের ব্যাপারে স্বার্থপর । মেয়েরা যেখানে প্রেমে পড়লে যুগপৎ সংসার আর সন্তানের কথা ভাবে সেখানে প্রেমে পড়া পুরুষের স্বপ্নে থাকে শুধুই তার প্রেয়সী । হুমায়ূন আহমেদের থিওরিতে ভুল ছিল । ব্যাপার না, 'হোমার সামটাইমস নডস' ।

পাঞ্জাবির পকেটে গোলাপ ফুল নিয়ে হাঁটছি । দশটাকা দিয়ে ফুলের দোকান থেকে কিনেছি । গাছ থেকে তুলে আনা গোলাপ আর দোকানের গোলাপের মধ্যে বিস্তর ফারাক । গাছের গোলাপে কাঁটা থাকে, দোকানের কেনা গোলাপে থাকে না । নিষ্কন্টক গোলাপ যদি নিস্তরঙ্গ উত্থানপতনহীন প্রেমের প্রতীক হয় তবে কন্টকিত গোলাপ হওয়া উচিৎ উথালপাথাল উদ্দাম প্রেমের প্রতীক । জয় গোস্বামীর কবিতাটা মনে পড়ল-

'পাগলী, তোমার সঙ্গে ভয়াবহ জীবন কাটাব,
পাগলী, তোমার সঙ্গে ধুলোবালি কাটাব জীবন...'

পাগলীর সঙ্গে জীবন কাটানোর স্বপ্ন পকেটের গোলাপেই মরে গেছে । আজকে জানাতে গিয়েছিলাম মুগ্ধতার কথা । বুকের ভিতর ঢাক পিটানোর শব্দ, কপাল বেয়ে শঙ্কিত ঘামের ফোয়ারা, শেষ মুহূর্তে ছুটে পালিয়ে যাবার তীব্র ইচ্ছা- সবকিছু উপেক্ষা করে বলে দিয়েছিলাম সব কথা । নার্ভাসনেসের কারণে গোলাপের কথা ভুলে গিয়েছিলাম, গোলাপ পকেটেই রয়ে গেছে । সুস্মিতা নির্বিকারভাবে ফিরিয়ে দিয়েছে । তার 'ফিউচার' আছে । ফিউচার নিয়ে ভাবনা আছে ।

আর এই মুহূর্তে আমার আছে একটা বেঁচে যাওয়া লাল গোলাপ ।

প্রশস্ত রাজপথটা সোজা বরাবর অনেক দূর গিয়ে একটা পার্কের গেটে গিয়ে থেমেছে । এই অংশটায় এসে গেলে অস্বস্তিবোধ করি । দুইপাশের বড় বড় রেইন ট্রি গাছ আকাশটা ঢেকে দিয়েছে প্রায় । সেখানে প্রতিদিন অসংখ্য পাখি বসে । তারা অসংখ্যবার মলত্যাগ করে । সেগুলো বৃষ্টির মতো পুরো রাস্তাজুড়ে অজস্র ছোপ ছোপ দাগ ফেলে । আর এটা এমনই নৈমিত্তিক যে দাগ কোনোদিন পুরোনো হয় না । সেইসব স্বর্গচ্যুত প্রসাদ থেকে নিরাপদ নয় কোনো পথিকই- অস্বস্তির কারণ এটাই ।

অস্বস্তির জায়গাটা পার হয়ে এসেছি । আবারও সুস্মিতার কথা ভাবা যাক । ভাবতে ভাবতে একটা সিগারেট কিনে নিয়ে ধরালাম । সিগারেট কখনও কখনও মধ্যবিত্তের দুঃখবিলাস । মন খারাপের সময় যেহেতু দামি হুইস্কি কেনার সামর্থ্য থাকে না, সস্তা গাঁজার পুরিয়াও পায় না হাতের কাছে- তাই নিকোটিন ধোঁয়ায় কিছুটা দুঃখ ওড়ানোর অভিনয় চলে ।

বৈশাখের ঘর্মাক্ত দুপুরটা ধূমপানের জন্য সুবিধার নয়, বিশেষত আমার মতো খুচরা ধূমপায়ীর জন্য । এক টানে বেশি ধোঁয়া নিতে পারছি না । ধোঁয়া ভেতরে গিয়ে ধাক্কা দিচ্ছে তুমুল । সিগারেট নিয়ে অদ্ভুত একটা স্ট্র্যাটেজি দাঁড় করিয়েছিলাম । সিগারেটের গন্ধ নিয়ে মার কাছে ধরা খাওয়ার পর থেকে আরও সাবধান হয়েছি, তবুও ছাড়ি নি । আমি জানতাম সুস্মিতা সিগারেট খাওয়া দেখতে পারে না । তবুও ওকে দেখিয়ে দেখিয়ে টানতাম । যদি কোনোদিন হ্যাঁ বলে, নিশ্চয়ই সিগারেট ছেড়ে দিতে বলবে । তখন সত্যি সত্যি ছেড়ে দিতাম । আফসোস, আমার সিগারেটের খরচটা বাঁচলো না !

ফুটপাতে বসেছি । সিগারেট ফুরায় নি অর্ধেকটাও, আর টানতে পারছি না । পা আর ফুসফুস একত্রে বিদ্রোহ করে বসেছে । পকেটের গোলাপটা বের করে গন্ধ শোঁকা যাক কিছুক্ষণ । মাথায় ঝলসানো গোলাপ বিষয়ক একটা লাইন ওড়াউড়ি করছে । আবুল হাসানের লেখা কবিতাটার প্রথম লাইন-

'স্বদেশ তুমি ঝলসে যাওয়া গোলাপ কুঁড়ি...'

তারপর যেন কী ?
আমি জ্বলন্ত সিগারেটটা গোলাপের ঠিক মাঝখানে চেপে ধরলাম । এই ভরদুপুরে পতিত প্রেমিক আর ঝলসানো গোলাপের কী সম্পর্ক তা কেউ জানবে না ।
৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জনগণের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের পরিকল্পনাটা কোথায় ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১০


ডা. জাহেদ উর রহমান। জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা বিরোধী ছিলেন এবং তাঁকে চেনেন না, এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। মানুষটি অ্যাক্টিভিজম ছেড়ে নতুন সরকারের মুখপাত্র হয়েছেন। এতে আমার মতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:২৫

[মানুষ এতো দুষ্ট কেন? পুরনো কথা ভিডিও সহ ফেসবুকে এভাবে না ছাড়লে হয় না। ]

“আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন"

২৫ হাজার টাকার মজুরি আন্দোলন আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

পিনাকী ভট্টাচার্য কেন দেশে আসে না, জানেন?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৯


Pinaki Bhattacharya - পিনাকী ভট্টাচার্য তিনিঞ্চি কেন দেশে আসে না জানেন? তার পাসপোর্টই তাকে সে অনুমতি দেয় না। Meghna Alam থেকে প্রাপ্ত এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে তার পাসপোর্টে স্পষ্ট... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের সেই এন্টিনিয়ার।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৮

কিছু স্বপ্ন, কিছু স্মৃতি এবং নানীর বাড়ি



আমি বেশ কিছুদিন ধরে একটি বিশেষ ধরনের স্বপ্ন দেখছি। স্বপ্নের কথায় যাওয়ার আগে কিছু পেছনের গল্প বলা প্রয়োজন।

ক্লাস নাইনে পড়ার সময় থেকে অনার্স... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে- ভাল্লাগে!

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৭


আমাদের ঝাল খাওয়ার ইতিহাস হাজার বছরের নয়, তবুও কেন আমরা ঝাল পাগল জাতি হলাম এইটা নিঃসন্দেহে গবেষনার বিষয়। পর্তুগীজেরা না আসলে আমরা হয়তো কাঁচা লঙ্কা বা শুকনো লঙ্কা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×