somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

থেমিস প্রেম নয়, মৃণাল হক কার হয়ে আগুন নিয়ে খেলছেন?

৩১ শে মে, ২০১৭ সকাল ৭:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


সব আমলেই মৃণাল হক, তার শক্তির উৎস কোথায়? কেউ বলতে পারে না। বাবা অধ্যাপক একারামুল হক ভাষা আন্দোলনের মিছিলের মুখ ছিলেন। রাজশাহী কলেজের শিক্ষক ছিলেন। আইয়ুবের ফৌজি শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছিলেন। রাজশাহী কলেজ থেকে চাকরি চলে গিয়েছিল। জীবন-জীবিকার জন্য রাজশাহীর প্রগতিশীল সহমর্মীরা তার প্রতি সহানুভূতির হাত বাড়িয়েছিলেন। জীবিকা নির্বাহের জন্য একটি সেকেলে লেটার প্রেস বা ছাপা খানা দিয়ে সংসার চালাচ্ছিলেন।

৭৫ এর ১৫ আগস্ট পরিবার পরিজনসহ জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যার মধ্য দিয়ে সামরিক ক্যু-পাল্টা ক্যুর পথ ধরে সেনাশাসক জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসলেন। স্বাধীনতা বিরোধী দক্ষিণপন্থী, অতিবিপ্লবী চীনা পন্থী রাজনীতিবিদসহ সমাজের নানা মত পথের মানুষকে তার দল গঠনে শরিক করলেন। সেই রাজনীতিতে রাজশাহীতে যুক্ত হলেন অধ্যাপক একরামুল হক।

ভাস্কর মৃণাল হকের বাবা একরামুল হক ক্ষমতার দৌঁড়ে হোঁচট খেলেন। এমরান আলী সরকার হয়ে গেলেন মন্ত্রী। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তার শাসনামলের শেষ দিকে একরামুল হককে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ দিলেন। এতেই একরামুল হকের ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেল। অঢেল সম্পদের মালিক হতে থাকলেন। দূর হতে থাকলো অভাব-অনটন। পুত্র মৃণাল হকেরও দাপট বাড়তে থাকলো পিতার ক্ষমতার আলোয়।

এরশাদ জামানার শেষে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ছাত্রদল ও ছাত্র শিবিরের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন করলেও রাকসুতে ছাত্রলীগ ঐক্য থেকে ছিটকে পড়ে। ভিপি-জিএস’র কোনো একটি না দেয়া এটি ঘটে। রাকসু নির্বাচনে পাবনা ও চাপাইনবাগঞ্জের আঞ্চলিক প্রভাব প্রবল। সেখানে ছাত্রলীগ আমাকে সিনেট ও পত্রিকার সম্পাদক পদে মনোনয়ন দিয়েছিল। কথা ছিল ঐক্য হলে পত্রিকার সম্পাদক পদ থাকবে। কিন্তু ঐক্য ভেঙে যাওয়ায় আমাকে দুটোই করতে বলা হয়। আমি পত্রিকা সম্পাদক ভোট না চেয়ে সিনেটে একটি করে ভোট চাইতে থাকলাম। সেই সময় শহীদুল্লাহ কলা ভবনের সমানে শীতের মিষ্টি রোদ পেহানো বাংলা বিভাগের এক অপরূপা, হালকা-পাতলা গড়নের কাঁচা হলুদ গায়ে রঙের তরুণীর সঙ্গে পরিচয় ঘটে গেল। সে তার বন্ধুদের নিয়ে আমার জন্য ভোট চেয়েছে। সেই মেয়েটির নাম স্নিগ্ধা। পরবর্তীতে জেনেছি, সেই সুন্দরী তরুণী যার সঙ্গে আমার মিষ্টি সখ্যতা গড়ে উঠেছিল, সে মৃণাল হকের ছোট বোন এবং বিএনপির সাবেক মন্ত্রী ব্যরিস্টার আমিনুল হকের শ্যালিকা। ‍স্নিগ্ধার প্রতি ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতাবোধ নিয়েই আজকের চলমান পরিস্থিতিতে আমাকে লিখতে হবে।

সেই সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র আন্দোলনে অগ্নিমূখর ৫ দফার আন্দোলন গোটা মতিহারজুড়ে। সারা বাংলাদেশ জেনে গেছে, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী উপাচার্য আব্দুল বারীকে শহীদ জোহার রক্তস্নাত মতিহার ক্যাম্পাস থেকে তাড়াতে চায় ছাত্র সমাজ। সেই আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর আর্দশের অনুসারী ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন প্রয়াত বিচারপতি বজলুর রহমান ছানা ও সাবেক রাকসু জিএস খন্দকার জাহাঙ্গীর কবির রানা। সেই সময়টা ছাত্রলীগের জন্য ছিল অনেক বৈরী। উগ্রপন্থী, বিপ্লবী আর সেনাশাসকদের প্রতিহিংসার মুখোমুখি কঠিন বাস্তবতার মুখে ছাত্রলীগ রাকসু বিজয় করেছিল।

আজকের আওয়ামী লীগ সরকারের বেনিফিশিয়ারী অংশীদাররা যারা বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার নাম জপতে জপতে মুখে ফেনা তুলেন, তারা সেদিন রাকসুর অভিষেকে ছাত্রলীগের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বুকে বঙ্গবন্ধু ছবি শোভিত ব্যাজ লাগাতে দেননি। শেষ পর্যন্ত ভিসি মকবুলার রহমান সরকার ও সাবেক রাকসু ভিপি নুরুল ইসলাম ঠান্ডুর মধ্যস্থতায় ছাত্রলীগের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বঙ্গবন্ধুর ছবির বদলে কালো মুজিব কোট গায়ে পড়ে উঠেছিলেন অভিষেক মঞ্চে। সেই দুঃসময়ে একরামুল হক ও তার পুত্র ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক সম্পাদক মৃণাল হক বিনা উস্কানিতে, বিনা কারণে রাজশাহী নগর থেকে ট্রাকভর্তি গুন্ডা ভাড়া করে ক্যাম্পাসের হলে হলে ঘুমন্ত ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ওপর হামলার তান্ডব চালিয়েছিলেন।

আজকের বাংলাদেশে আকস্মিকভাবে সুপ্রিমকোর্টের সামনে ন্যায় বিচারের প্রতীক গ্রিক দেবী থেমিসের ভাস্কর্য বিকৃতভাবে অর্থাৎ বাঙালি নারী শাড়ি পড়িয়ে স্থাপন করে স্থিতিশীল পরিস্থিতি ও ঘুমন্ত মৌলবাদকে জাগিয়ে দিলেন মৃণাল হক। এক কথায় বিষয়টি সহজ সমীকরণের নয় যে এটা মৌলবাদীদের সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত নিঃশ্বাস। জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে শোলাকিয়ার পর ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের সবচে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল-ফিতর ও ঈদুল আযহার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য নামাজের শেষে মুসল্লিরা যখন ডান দিকে সালাম ফেরাবেন তখনই এই নারীর ভাস্কর্য বা মূর্তি বা স্থাপত্য চোখে পড়বে। এটা ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। হেফাজতে ইসলাম প্রতিবাদ করলে কওমী মাদ্রাসার নেতৃবৃন্দ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাত করলে তিনি যথার্থেই বলেছেন, যে এটি তারও পছন্দ নয়। এটা এখানে বসাবে কেন, আর বিকৃতভাবেই উপস্থাপন করবেন কেন?

ভাস্কর মৃণাল হক এই মূর্তি সরানোর পর কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেছেন, তার মায়ের মৃত্যুতেও তিনি এমন করে কাঁদেননি। এর চাইতে আত্নপ্রতারণা, এর চাইতে নিজের অন্তরের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার আর কি আছে! কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন পর্যন্ত বলেছেন, যার মা আছে সে গরিব নয়। মায়ের মৃত্যুর সঙ্গে একজন পেশাদার ভাস্করের ভাস্কর্য সরানোর বেদনার তুলনা হতে পারে না। এই ভাস্কর্য সরানোর জন্য শাহবাগ থেকে হাইকোর্ট এলাকা পর্যন্ত অনেকে প্রতিবাদ করেছেন। এই প্রতিবাদীরা যেদিন হেফাজত মহাপ্রলয় নিয়ে ঢাকা নগরীতে ভয়ংকর রকমের ত্রাস ও তান্ডব শুরু করেছিল, তখন প্রতিরোধে নামেনি। পল্টন থেকে মতিঝিল সেদিন আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং দু চার জন রাজনীতিবিদ মন্ত্রীকে নিয়ে একরাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই মহাপ্রলয় মোকাবিলা করেছিলেন। সেই দিন শুধু বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াই হেজাজতের পাশে ঢাকাবাসীকে নেমে আসার আহ্বান জানাননি, অনেক রাজনৈতিক শক্তিও শসার বস্তা, পানির জার নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। সেদিন তাদের রুখতে গণজাগরণ ঘটানোর মতো নেতৃত্ব বা সংগঠকদের ঢাকার বুকে নামতে দেখা যায়নি। হাতে গোনা যে কয়জন নেমেছিলেন, প্রেসক্লাব পর্যন্ত গিয়েই ফটোসেশনের মাধ্যমে ইতি টেনেছেন।

রাষ্ট্র পরিচালনায় যারা থাকেন, তাদেরকে কৌশলের আশ্রয় যেমন নিতে হয় তেমনি সকল মত পথের দাবি-দাওয়াকে আমলে নিয়েই স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার চিন্তা করতে হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সামরিক শাসন কবলিত বাংলাদেশে সংবিধানের মূল নীতিকে কাটা ছেঁড়াই করা হয়নি, রীতিমতো তুলে দেয়া হয়েছে। খুনি মোশতাক ইসলামী প্রজাতন্ত্র বানিয়ে তার টুপিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। সামরিক শাসকরা ধর্মের রাজনীতিকে উসকে দিয়েছিলেন। ধর্ম নিরপেক্ষতা সংবিধান থেকে মুছে গেছে। সমাজতন্ত্র সামাজিক ন্যায় বিচার হয়ে গেছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে পরিণত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের খুনিদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দেয়া হয়নি, রাজনীতিতেও নামানো হয়েছে। সংসদে বসানো হয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর রক্তের দাগ শুকাতে না শুকাতে তাদের রাজনৈতিক সংগঠনকে স্বসস্ত্র উল্লাস করতে দেখা গেছে। এমনকি ইডেমনিটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যম থেকে জাতীয় দিবসে বঙ্গবন্ধুর নাম নিষিদ্ধ হয়েছিল।

সামরিক শাসনের পর ৯১ সালের অবাদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিরোধী সকল শক্তির ঐক্যের কারণে নৌকার ভরাডুবি ঘটেছিল। বিএনপি ক্ষমতায় এসেছিল। সেদিন বিরোধী দলের আসনে বসে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনতে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিলেন। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দুই দলের আনা বিলের প্রেক্ষিতে সংসদীয় শাসনব্যবস্থার প্রবর্তন হয়েছিল সর্বসম্মতিক্রমে। কিন্তু গত ২৬ বছরে গণতান্ত্রিক শাসকরা রাষ্ট্রীয় সকল প্রতিষ্ঠানকে দিনে দিনে দুর্বল করেছেন। সংসদকে দিনে দিনে দুর্বল থেকে অকার্যকর করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ করে ছাত্র রাজনীতিকে আদর্শভিত্তিক তারুণ্যের শক্তি থেকে বিচ্যুত করেছেন। প্রশাসনকে দলীয়করণের সর্বোচ্চ আগ্রাসনে পতিত করেছেন। নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসকে খর্বই করেননি, প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা দুর্বলই হয়নি, শক্তিশালী সরকারের বিপরীতে শক্তিশালী বিরোধীদলের উত্থান ঘটেনি।

মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় অধ্যায়ের ইতিহাসকে সকলে মিলে বিকৃতই করেননি; সকলের প্রাপ্য মর্যাদা দিতে কার্পণ্য করেছেন। সকল পেশাজীবীদের দলের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। রাজনীতিতে নজির বিহীন প্রতিহিংসার আগ্রাসনে গ্রেনেড, বোমায় ক্ষত বিক্ষত হয়েছে বাংলাদেশ। একুশের গ্রেনেড হামলা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, গুম, খুন, তার বিভৎস চিত্র রাজনীতিতে দগদগে ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। আস্থা ও বিশ্বাস রাজনীতিতে নির্বাসিত হয়েছে। ২৬ বছরে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না দেয়া, জাতীয় ইস্যুতে বড়দলগুলোর ঐক্যমতে না আসায় ইতিহাসের পেছনে ফিরে তাকালে এই সত্যই উদ্ভাসিত হয়, সেদিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজয়ের সম্ভাবনা থেকে কারাবন্দী সেনাশাসক এইচ এম এরশাদকে ঠেকাতেই মূলত সবাই সংসদীয় শাসন ব্যবস্থার আলোর পথে হেঁটেছিলেন। যদিও পরবর্তীতে যখন যারা সরকার বিরোধী তাদের জন্য গণতান্ত্রিক শাসন দিনে দিনে ভয়ংকর রূপ নিয়েছে।

৯১ সালের পরাজয়ের পর বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের শক্তি ঐক্যের মোহনায় মিলিত হয়েছিল। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ বিরোধী শক্তিতে রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে বিভক্তি আনা হয়েছিল। তত্বাবধায়ক সরকার আন্দোলনে জামায়াতকে যুগপৎ আন্দোলনে শরীক করা হয়েছিল। সেই কৌশল বাস্তব ছিল বলেই তত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায়ের মধ্য দিয়ে ৯৬ সালের নির্বাচনে ২১ বছর পর শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় এনেছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করেছিলেন। বিএনপির শাসকেরা ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন দলীয়করণের পাশাপাশি তত্বাবধায়ক সরকারকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেন। রাজনৈতিক সহিংসতার মুখে বিএনপি যখন রক্তক্ষয়ী বাংলাদেশে একদলীয় নির্বাচনে ক্ষমতায় আসতে চাচ্ছিল তখন সহিংস সংঘাতের অন্ধকার রাজনীতির বুক চিড়ে জনসমর্থন নিয়ে ওয়ান ইলেভেন এসেছিল জাতির জীবনে।

সেই সময়ের রাজনৈতিক সমঝোতা শেষ করে দেয়া, শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্য দিবালোকে গ্রেনেড হামলায় উড়িয়ে দেয়া সবকিছুই ছিল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের ফসল। কিন্তু সেই ওয়ান ইলেভেন আসার মধ্য দিয়ে রাজনীতিবিদ থেকে সিভিল সোসাইটির অনেক দেশপ্রেমিক মানুষকে প্রশ্নবিদ্ধই করেনি, দেশের সকল শ্রেণী পেশার মানুষের ওপর নামিয়েছিল অত্যাচার আর দুঃশাসন। সেই দুঃশাসনের যাত্রাপথে এখন পর্যন্ত নির্যাতনের কাঠগড়ায় সর্বোচ্চ যন্ত্রণা ভোগ করছে বিএনপি। আর বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা তার একক চ্যালেঞ্জ ও ক্যারিশমায় ওয়ান ইলেভেনকে পরাস্ত করে ২০০৮ সালে অবাদ নির্বাচনে ব্যালট বিপ্লবে অভিষিক্ত হয়ে ব্রুট মেজরিটি নিয়ে মহাজোটকে ক্ষমতায় এনেছিলেন।

বাংলাদেশে এখন নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ৭৫ এর ১৫ আগস্টের পর যারা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে তারাই সর্বোচ্চ শাস্তিভোগ করেছে। যারা ওয়ান ইলেভেনে জীবনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে শেখ হাসিনার পক্ষে মাটি কামড়ে পড়ে ছিল, দেশান্তরী হতে বাধ্য হয়েছিল তারা বেনিফিশিয়ারী হতে পারে নি। যাদেরকে বিএনপি-জামায়াত শাসকরা এবং ওয়ান ইলেভেনের শক্তি অবাধ বিচরণের সুযোগ দিয়েছিল তারাই ক্ষমতার স্বাদ সবচে বেশি গ্রহণ করেছে। তাদের ছায়ায় সুবিধাভোগীরা বিগত নয় বছরের শাসনামলে প্রশাসনের ছায়ায় উন্নয়নের মহাযজ্ঞের আড়ালে খেয়ে ধেয়ে নাদুস নুদোস হয়েছে। রাজনীতি হয়েছে বাণিজ্যিকীকরণের শিকার। একসময় আওয়ামী লীগ সামরিক শাসকদের নির্যাতনের স্ট্রিমরোলার সয়ে প্রতিবাদের মাটি কামড়ে যে শক্তি অর্জন করেছিল, সেটি আজকের আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগীরা ভুলে গেছে। সুবিধাভোগীদের কখনো জীবনের ঝুঁকি নিতে হয় না। পুলিশী নির্যাতন, রিমান্ড ও কারাদহন সইতে হয় না। শেখ হাসিনার উন্নয়নের মহাসড়কে পশ্চিমাদের কাছেও বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার বাঘ। কিন্তু সুশাসন নিশ্চিত না করায় অর্থনৈতিক খাতে ব্যাপক অনিয়ম লুটপাট হওয়ায় ৯ বছরের শাসনামলে নতুন ভোটারসহ আওয়ামী লীগই সমালোচনার মুখে। দেশের ভোটের রাজনীতিতে ভোটব্যাংক বলতে আওয়ামী লীগেরই রয়েছে। বাদবাকি যেটুকু তা এরশাদের জাতীয় পার্টির। আওয়ামী লীগ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্য দলকে তৃণমূল পর্যায়ে বিভক্ত করেছে। অন্যদিকে বিএনপি তার শাসনামলের পাপের প্রায়শ্চিত ৯ বছরে অনেক করেছে। সরকারের নির্যাতনের মুখে সেও হয়েছে পোঁড়খাওয়া দল। শেখ হাসিনার পক্ষেই সম্ভব হয়েছে বিএনিপর কাছ থেকে জামায়াতকে সরিয়ে ৯৬ সালে দলবে ক্ষমতায় আনা তেমনি তার পক্ষে সম্ভব হয়েছে ওয়ান ইলেভেনের চ্যালেঞ্জে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় এসে একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের ফাঁসিতে ঝুলানো। বিএনপি ২০১৪ সালের নির্বাচনে ভোটের লড়াইয়ে আসেনি বলে আওয়ামী লীগ সংবিধানের দোহায় দিয়ে ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করেছে। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধের দুর্নীতির মামলার রায় কি হবে, সেই অনিশ্চয়তা সামনে নিয়েও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ২০১৪ সালে বলেছিলেন, নির্দ্বলীয় সরকার নেই, তিনি নির্বাচনেও নেই। এবার বিএনপি বলছে, নির্বাচনী সহায়ক সরকার কপালে জুটুক আর নাই জুটুক নির্বাচনে আছে। বিএনপির প্রার্থী বাছাই, প্রার্থীদের সবুজ সংকেত দান, জেলা কমিটি ঘোষণা চলছে। যারা ভাবছেন, বিএনপি শেষ তারা অংকের ফলাফল মিলাতে ভুল করছেন। নির্বাচনের তবসিল ঘোষণা হলেই বিএনপি যখন ভোট লড়াইয়ে নামবে তখন দৃশ্যপট অনেকটাই বদলে যেতে পারে। নির্বাচন কমিশন থেকে মাঠ প্রশাসন সেই অযোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারে যারা মানুষের জন্য কিছু করতে পারে না, প্রভুকেও কিছু দিতে পারে না।

৯৬ সালের নির্বাচনে দাপুটে আমলারা ও ৭৩ ব্যাচের তোফায়েল ক্যাডাররা নৌকার পক্ষে শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছিলেন। আওয়ামী লীগ ছিল ঐক্যবদ্ধ। জনমতও ছিল অনুকূলে। তারপর হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্ধিতা করে উঠে আসতে হয়েছে। ওয়ান ইলেভেনের পর মাঠ প্রশাসনের নাঁটাই যাদের হাতে তারা ছিলেন শেখ হাসিনার পাশে। এখন আগামী নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায়ে আভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকট। প্রশাসন নিয়ন্ত্রণের মতো শক্তি দৃশ্যমান নয়। জনগণের মধ্যে সরকার বিরোধী সমালোচনা রয়েছে। ৫ বছর ক্ষমতায় থাকলেই এদেশের মানুষের মধ্যে সরকার বিরোধী মনোভাব জাগতে থাকে। বিএনপির অতীতের পাপ ভুলতে বসেছে। ৯ বছরে ক্ষমতায় নেই। তাদের ওপর সমালোচনার ভারও কম। এমনি পরিস্থিতিতে বিএনপি নেত্রী রাষ্ট পরিচালনার দর্শণ ‘ ভিশন-২০৩০’ ঘোষণা করলে শেখ হাসিনার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও তার প্রশংসা করেছেন। আগামী ভোটযুদ্ধে বিএনপি অংশগ্রহণ করলে আওয়ামী লীগ হাসতে হাসতে বিজয় লাভ করবে এমনটি ভাবা সহজ অংকের ফলাফল নয়।

শেখ হাসিনা রাষ্ট্রনায়কের জায়গা থেকে হোক আর ভোটের রাজনীতির হিসাব থেকেই হোকে উপলব্ধি করেছিলেন যে, এদেশের মাদ্রাসা অনেক। এরা এদেশেরই নাগরিক। দেশেরই সন্তান। তাদের দাবি-দাওয়া মেনে নিয়ে মৌলবাদী ভোটের একটি বড় অংশ হেফাজতী বা কওমীদের পক্ষে টেনেছিলেন। যেটি ৯৬ সালের শাসনামলে কৌশলগত ভুল পদক্ষেপে পিটিয়ে ইসলামী ঐক্যজোটকে বিএনপির সঙ্গে সুসংহত করেছিল। শেখ হাসিনা যেখানে হেফাজত- কওমীদের নিয়ে খেলেছেন ম্যারাডোনার মতো, সেখানে আজ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের কোনো ভাস্কর্য তৈরি না করা মৃণাল হকের দেবী থেমিসের সৃষ্টি ফের বির্তকের ঝড় তুলেছে। মনে হচ্ছে কোথায় যেন খেলা শুরু হয়েছে। মৃণাল হক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এরশাদ জামানায় উপাচার্য প্রফেসর আমান উল্লাহ ও উপ উপাচার্য প্রফেসর আব্দুল হাই শিবলীর উদ্যোগে ছাত্র ছাত্রীদের, শিক্ষক-কর্মচারীদের সহায়তায় বড় ধরণের কমিটি গঠনের মাধ্যমে সিনেট ভবনের সামনে নীতুন কুণ্ডুকে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ‘ সাবাস বাংলাদেশ’ বসিয়েছিলেন, সেটিরও বিরোধীতা করেছিলেন। এমনকি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সুর্বণ জয়ন্তীতে বিএনপি-জামায়াতের শিক্ষকরা তাকে দিয়ে ‘সাবাস বাংলাদেশের’ কাউন্টার ৬৯ এর শহীদ শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহার কবরের খানিক দূরেই ‘সূর্বণ স্মারক’ বসিয়েছিলেন। অদৃশ্য ক্ষমতাবানদের চাপে মৃণাল হক অনেক স্পনশর জোগাড় করে ঢাকা নগরীতে বেশ কিছু ভাস্কর্য করলেও তার শিল্পমান নিয়ে হাজার প্রশ্ন রয়েছে।

এদিকে, বিচার বিভাগের সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের টানাপোড়েন দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। আইন মন্ত্রণালয় ও বিচার বিভাগ এখন মুখোমুখি। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে কোথায় যেন, নানামূখী খেলা শুরু হয়েছে। যে খেলার আলামত শুভ মনে হচ্ছে না।
সূত্র
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে মে, ২০১৭ সকাল ৭:৩৩
১০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নির্ভীক অভিযাত্রা

লিখেছেন আকিব হাসান জাভেদ, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৩

আমি চলি ঐ প্রান্তে,
যেখানে অসৎ থেকে মানুষ হয়েছে সৎ।
আমি চলি উড়ে উড়ে,
ডানাহীন পাখির মতো,
যেখানে দুর্বলতাকে জয় করে
হয়েছে দুঃসাহস।
আমি চলি শক্তির সাথে,
দেহ যায় না ঝুঁকে।
করি না প্রণাম,
করি না চাটুকারিতা আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

চুপ - একদম চুপ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭



আমরা শুধু চুপ থাকবো -
আমাদের কথা বলার মুখ নেই
আমাদের দেখার মতো চোখ নেই
আমাদের শোনার মতো কান নেই
মনে হয়, মনে হয় -
আমাদের হাত-পাও নেই।

আমাদের বিবেক নেই
আমাদের চিন্তা-চেতনাও নেই
আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

তবুও বেঁচে আছি

লিখেছেন সালমান মাহফুজ, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:১৫

এই নিথর নগ্ন শরীরের প্রতিটা পল্লবের করুণ আর্তচিৎকার
পৃথিবীর মাটি ভেদ করে কোনদিনও
ওই মৃত কানে পৌঁছাবে না
আমি জেনে গেছি ।

বিপন্ন আকাশের গায়ে লেপ্টে থাকা
দেবতাদের প্রতারণার ফাঁদ আর মিথ্যা প্রলোভনের গল্পগুলি
আমার শুনতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুলাই মিউজিয়ামঃ স্মৃতির বিরুদ্ধে বিস্মৃতির লড়াই....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫৩



জুলাই মিউজিয়ামঃ স্মৃতির বিরুদ্ধে বিস্মৃতির লড়াই....

১৫ আগস্ট আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে গিয়েছিলাম জুলাই মিউজিয়ামে। সেখানে গিয়ে মনে হলো- এটি শুধু একটি জাদুঘর নয়; এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক ভয়াবহ অধ্যায়ের বিরুদ্ধে... ...বাকিটুকু পড়ুন

হিজিবিজি নদী চলে মন উদাসের দেশে !

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:০২





হিজিবিজি নদী চলে মন উদাসের দেশে !

...................................................................
মানচিত্রের আঁকাবাঁকা রেখায় তারে পাবেনা,
সে নদী তো চেনা কোনো ঠিকানায় যাবে না।
তার কোনো কূল নেই, নেই কোনো ঘাট,
সে বয়ে চলে একা, বুক জুড়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×